কেন একজন মুসলিমের জন্য শুধু কুরআনই যথেষ্ট

ইসলাম ধর্মের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর বাণী। কিন্তু পৃথিবীর অধিকাংশ মুসলিমই কুরআনের পাশাপাশি হাদিস, সুন্নাহ এবং বিভিন্ন মাযহাবের অনুসরণকে অপরিহার্য মনে করেন। অথচ পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বারবার নির্দেশ দিয়েছেন শুধুমাত্র তাঁর কিতাব বা ওহী অনুসরণ করার জন্য। কেন একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের একমাত্র মানদণ্ড হওয়া উচিত আল-কুরআন? — বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।

১. শুধু কুরআন অনুসরণের নির্দেশ এবং অন্য সব ‘হাদিস’ বর্জন

আল্লাহ তায়ালা কুরআনে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন শুধুমাত্র কুরআন অনুসরণ করতে এবং অন্য সব ধরনের ‘হাদিস’ বা কথা বর্জন করতে। আরবি শব্দ ‘হাদিস’ অর্থ কথা, বাণী বা গল্প। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা অন্য যেকোনো উৎসকে বর্জন করার জন্য ‘হাদিস’ শব্দটিই ব্যবহার করেছেন।

“এগুলো আল্লাহর আয়াত, যা আমি তোমার কাছে যথাযথভাবে আবৃত্তি করছি। অতএব, আল্লাহ ও তাঁর আয়াতের পর তারা আর কোন ‘হাদিসে’ বিশ্বাস স্থাপন করবে?” (৪৫:৬)

এখানে লক্ষ্যণীয় যে, আল্লাহ সচেতনভাবেই ‘হাদিস’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। তিনি প্রশ্ন করছেন, আল্লাহর কুরআনের পর আর কোন হাদিস মানা হবে? একইভাবে সূরা আ’রাফের ১৮৫ নং আয়াতে এবং সূরা মুরসালাতের ৫০ নং আয়াতেও একই প্রশ্ন করা হয়েছে।

এছাড়াও আল্লাহ বলেন:

“তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার প্রতি যা নাজিল হয়েছে (কুরআন), তুমি শুধু তারই অনুসরণ করো এবং তাঁকে ছাড়া অন্য কোনো অভিভাবকের অনুসরণ করো না। তোমরা খুব সামান্যই উপদেশ গ্রহণ করো।” (৭:৩)

২. কুরআনে রয়েছে সবকিছুর বিস্তারিত বিবরণ

অনেকে দাবি করেন, কুরআন সংক্ষিপ্ত এবং এর ব্যাখ্যার জন্য হাদিস প্রয়োজন। কিন্তু এই দাবিটি কুরআনের আয়াতের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। আল্লাহ তায়ালা নিজেই ঘোষণা করেছেন যে, কুরআন পূর্ণাঙ্গ এবং বিশদ।

“আমি তোমার প্রতি এমন কিতাব নাজিল করেছি, যা সবকিছুর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা, হিদায়াত, রহমত এবং আত্মসমর্পণকারীদের জন্য সুসংবাদ।” (১৬:৮৯)

“তাদের কাহিনীতে বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে শিক্ষা। এটি (কুরআন) কোনো বানানো ‘হাদিস’ নয়, বরং এটি পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যয়নকারী, সবকিছুর বিস্তারিত বিবরণ এবং মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও রহমত।” (১২:১১১)

যদি আল্লাহ বলেন তিনি সবকিছু বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন, তবে আমাদের কি অধিকার আছে বলার যে কুরআনে বিস্তারিত নেই?

৩. আল্লাহই একমাত্র বিধানদাতা

আইন বা বিধান দেওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহর। কোনো নবী, রাসুল বা ইমামের আইন তৈরির ক্ষমতা নেই।

“আমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো বিচারক খুঁজব? অথচ তিনিই তোমাদের প্রতি বিস্তারিত কিতাব নাজিল করেছেন।” (৬:১১৪)

এখানে আল্লাহ নিজেকে একমাত্র ‘হাকাম’ (বিধানদাতা বা বিচারক) হিসেবে উল্লেখ করেছেন। নবীজির কাজ ছিল শুধুমাত্র আল্লাহর বিধান পৌঁছে দেওয়া, নিজের পক্ষ থেকে কোনো হালাল-হারাম নির্ধারণ করা নয়।

সূরা তাহরিমে আমরা দেখি, নবীজি যখন নিজের স্ত্রীদের সন্তুষ্টির জন্য আল্লাহর হালাল করা একটি বস্তুকে নিজের জন্য হারাম করেছিলেন, তখন আল্লাহ তাকে ভর্ৎসনা করে বলেন:

“হে নবী! আল্লাহ যা তোমার জন্য হালাল করেছেন, তুমি তা হারাম করছ কেন? তুমি তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি চাচ্ছো?” (৬৬:১)

এটি প্রমাণ করে যে, স্বয়ং নবীরও আইন তৈরির কোনো ক্ষমতা ছিল না।

৪. আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ধর্মীয় আইন মানা শিরক

যদি কেউ আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উৎসের (যেমন কোনো আলেম, ইমাম বা কিতাবের) ধর্মীয় আইন বা রিচুয়াল মেনে চলে যা আল্লাহ অনুমোদন করেননি, তবে সে শিরক বা অংশীদারিত্ব স্থাপনের অপরাধে দুষ্ট হবে।

“তাদের কি এমন কোনো শরিক আছে, যারা তাদের জন্য দ্বীনের এমন বিধান দিয়েছে, যার অনুমতি আল্লাহ দেননি?” (৪২:২১)

এখানে ‘শরিক’ বা অংশীদার বলতে তাদের বোঝানো হয়েছে যারা ধর্মের নামে নিজস্ব আইন তৈরি করে। কিয়ামতের দিন এই শরিকদের দেখিয়ে প্রশ্ন করা হবে। সুতরাং, কুরআন বহির্ভূত কোনো ধর্মীয় নিয়ম মানা সরাসরি শিরকের শামিল।

৫. নবী কি কুরআনের বাইরে কিছু মেনেছিলেন?

আমাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে রাসুল-কে অনুসরণ করতে। কিন্তু রাসুল নিজে কী অনুসরণ করতেন? তিনি কি কুরআনের বাইরে অতিরিক্ত কোনো ওহী বা সুন্নাহ মেনে চলতেন?

“বলো, আমি আমার রবের পক্ষ থেকে আমার প্রতি যা ওহী (কুরআন) করা হয়, তা ছাড়া অন্য কিছুর অনুসরণ করি না।” (৪৬:৯ এবং ১০:১৫)

এই আয়াতগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, নবীজি শুধুমাত্র কুরআনের অনুসরণ করতেন। তাই আমরা যদি প্রকৃতই নবীজিকে অনুসরণ করতে চাই, তবে আমাদেরও শুধুমাত্র কুরআনই মানতে হবে।

আল্লাহ আরও বলেন:

“তোমার প্রতি তোমার রবের পক্ষ থেকে যা নাজিল হয়েছে, তুমি তার অনুসরণ করো…” (৭:৩)

৬. রাসুলকে অনুসরণের প্রকৃত অর্থ

কুরআনে বহুবার ‘রাসুলের আনুগত্য করো’-কথাটি বলা হয়েছে। কিন্তু এর অর্থ কী? এর অর্থ হলো রাসুল যে বার্তা (কুরআন) নিয়ে এসেছেন, তা মেনে চলা।

কুরআনে ‘সুন্নাহ’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, কিন্তু তা সর্বদা ‘সুন্নাতুল্লাহ’ বা আল্লাহর সুন্নাহ (আল্লাহর রীতি) হিসেবে এসেছে। যেমন:

“তুমি আল্লাহর সুন্নাহর কোনো পরিবর্তন পাবে না।” (৩৫:৪৩)

কুরআনের কোথাও ‘মুহাম্মদের সুন্নাহ’ শব্দটি নেই। রাসুলের দায়িত্ব ছিল আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেওয়া। তাই রাসুলের আনুগত্য মানেই হলো কুরআনের আনুগত্য। আল্লাহ বলেন:

“যে রাসুলের আনুগত্য করল, সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল।” (৪:৮০)

যেহেতু রাসুল শুধু কুরআন মেনেছেন, তাই তাকে মানা মানে কুরআনকেই মানা। আল্লাহ কোথাও বলেননি যে তোমরা মুহাম্মদের আনুগত্য করো। কেননা মানুষ হিসেবে নবী মুহাম্মদ ভুলের ঊর্ধ্বে ছিলেন না।

৭. একমাত্র কুরআনই সংরক্ষিত, অন্য কিছু নয়

আল্লাহ তায়ালা শুধুমাত্র কুরআন সংরক্ষণের নিশ্চয়তা দিয়েছেন। অন্য কোনো কিতাব বা বাণীর সংরক্ষণের দায়িত্ব তিনি নেননি।

আল্লাহ বলেন:

“নিশ্চয়ই আমি এই জিকির নাজিল করেছি এবং আমিই এর হেফাজতকারী।” (১৫:৯)

অন্যদিকে, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের কিতাবগুলো মানুষের হাতে বিকৃত হয়েছে বলে আল্লাহ জানিয়েছেন। হাদিসের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য; আল্লাহ কোথাও হাদিস সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দেননি। তাই যে কিতাব সংরক্ষিত নয়, তার ওপর ভিত্তি করে ধর্ম পালন করা নিরাপদ নয়।

৮. পূর্ববর্তী কিতাবগুলো বিকৃত হয়েছে

কুরআন আমাদের জানায় যে পূর্ববর্তী জাতিগুলো তাদের কিতাব বিকৃত করেছিল। তারা আল্লাহর বাণীর সাথে মানুষের কথা মিশিয়ে ফেলেছিল।

“তাদের মধ্যে একদল আছে যারা কিতাবকে জিহ্বা দিয়ে বিকৃত করে পড়ে, যাতে তোমরা মনে করো তা কিতাবের অংশ, অথচ তা কিতাবের অংশ নয়। তারা বলে, ‘এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে’, অথচ তা আল্লাহর পক্ষ থেকে নয়।” (৩:৭৮)

আজকের দিনেও হাদিসের নামে এমন অনেক কথা চালু আছে যা কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক, অথচ বলা হয় এগুলো নবীর কথা। এটি পূর্ববর্তী জাতিদের মতোই একটি বিভ্রান্তি।

৯. পূর্ববর্তী জাতিরা তাদের সালাত ও রিচুয়াল হারিয়ে ফেলেছিল

অনেকে দাবি করেন, আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদের কাছ থেকে বা সামাজিকভাবে (Tawatur) সালাত ও অন্যান্য ইবাদত শিখেছি। কিন্তু আল্লাহ বলেন, পূর্ববর্তী জাতিরা তাদের সালাত নষ্ট করে ফেলেছিল।

“অতঃপর তাদের পরে এলো এমন এক অপদার্থ বংশধর, যারা সালাত নষ্ট করল এবং কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করল।” (১৯:৫৯)

বংশপরম্পরায় প্রাপ্ত কোনো ইবাদত বা রীতি যে অবিকৃত থাকে না, তার প্রমাণ এই আয়াত। তাই ‘বাপ-দাদার আমল’ বা ‘তাওয়াতুর’ ধর্মের দলিল হতে পারে না, দলিল হতে হবে একমাত্র আল্লাহর কিতাব।

১০. বংশপরম্পরায় প্রাপ্ত ধর্ম (তাওয়াতুর) কুরআনে প্রত্যাখ্যাত

কুরআন বারবার সেই সব লোকদের নিন্দা করেছে যারা আল্লাহর কিতাবের পরিবর্তে তাদের বাপ-দাদার রীতিনীতি আঁকড়ে ধরে থাকে।

“আর যখন তাদের বলা হয়, ‘আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তা অনুসরণ করো’, তারা বলে, ‘বরং আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদের যাতে পেয়েছি, তার অনুসরণ করব।’ যদিও শয়তান তাদেরকে জ্বলন্ত আগুনের শাস্তির দিকে ডাকতে থাকে?” (৩১:২১)

আল্লাহর কিতাব বাদ দিয়ে ‘বাপ-দাদারা যা করে এসেছে’ তা অনুসরণ করা শয়তানের ধোঁকা ছাড়া আর কিছু নয়।

১১. আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের কাজের জন্য জিজ্ঞাসিত হবো না

অনেকে ভয় পান, “হাজার বছর ধরে আলেমরা যা মেনে আসছেন, তা কি ভুল হতে পারে?” আল্লাহ এর উত্তর দিয়েছেন:

“তারা ছিল এক উম্মত, যারা গত হয়ে গেছে। তারা যা অর্জন করেছে তা তাদের, আর তোমরা যা অর্জন করবে তা তোমাদের। তারা যা করত সে সম্পর্কে তোমাদের প্রশ্ন করা হবে না।” (২:১৩৪)

আমাদের হিসাব আমাদের নিজেদের দিতে হবে। আমরা কুরআন পেয়েছি কিনা এবং তা মেনেছি কিনা—সেটাই হবে আমাদের বিচার। পূর্বপুরুষরা কী মেনেছেন, তা আমাদের দেখার বিষয় নয়।

১২. জাহান্নামে একে অপরকে দোষারোপ

কিয়ামতের দিন যারা জাহান্নামে যাবে, তারা তাদের পূর্বসূরিদের অভিশাপ দেবে।

“অবশেষে যখন তারা সবাই তাতে (জাহান্নামে) একত্রিত হবে তখন তাদের পরবর্তী দলটি পূর্বের দল সম্পর্কে বলবে, ‘হে আমাদের রব, এরা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে। তাই আপনি তাদেরকে আগুনের দ্বিগুণ শাস্তি দিন’।” (৭:৩৮)

যদি বংশপরম্পরায় প্রাপ্ত ধর্ম সঠিক হতো, তবে তারা কেন তাদের পূর্বসূরিদের দায়ী করবে? এটি প্রমাণ করে যে অন্ধভাবে পূর্ববর্তীদের অনুসরণ জাহান্নামের কারণ হতে পারে।

১৩. নবীর প্রতি সতর্কবাণী: অতিরিক্ত কিছু শিক্ষা দিলে কঠোর শাস্তি

নবী মুহাম্মদ-কে আল্লাহ কঠোরভাবে সতর্ক করেছিলেন যেন তিনি কুরআনের বাইরে নিজের পক্ষ থেকে কোনো কথা ধর্মের নামে চালিয়ে না দেন।

“সে (মুহাম্মদ) যদি আমার নামে কোনো কথা রচনা করত, তবে আমি অবশ্যই তার ডান হাত ধরে ফেলতাম, অতঃপর কেটে দিতাম তার হৃদ-ধমনী। তোমাদের মধ্যে কেউ তাকে রক্ষা করতে পারতে না।” (৬৯:৪৪-৪৭)

এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, নবীজি কখনোই আল্লাহর বাণীর বাইরে কোনো কথা বা হাদিস ধর্মের অংশ হিসেবে প্রচার করেননি।

১৪. নবীর সাক্ষ্য: শুধু কুরআনই ওহী

আল্লাহ নবীকে জিজ্ঞেস করতে বলেছেন সবচেয়ে বড় সাক্ষ্য কোনটি?

“বলো, ‘সবচেয়ে বড় সাক্ষ্য কোনটি?’ বলো, ‘আমার ও তোমাদের মধ্যে আল্লাহই সাক্ষী। আর এই কুরআন আমার কাছে ওহী করা হয়েছে, যাতে এর মাধ্যমে আমি তোমাদের এবং যাদের কাছে এটি পৌঁছাবে, তাদের সতর্ক করতে পারি।’” (৬:১৯)

নবী এখানে সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে মানুষের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেয়ার জন্য তাকে ‘কুরআন’ ওহী করা হয়েছে। তিনি বলেননি যে তাকে ‘কুরআন ও হাদিস’ ওহী করা হয়েছে।

১৫. নবীজি নিজেই হাদিস লিখতে নিষেধ করেছিলেন

ইতিহাস ও হাদিস গ্রন্থগুলো সাক্ষ্য দেয় যে, নবীজি তার জীবদ্দশায় কুরআন ছাড়া অন্য কিছু লিখতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছিলেন।

রাসুল বলেন:

“তোমরা আমার পক্ষ থেকে কুরআন ছাড়া আর কিছু লিখো না। আর যে ব্যক্তি কুরআন ছাড়া অন্য কিছু লিখেছে, সে যেন তা মুছে ফেলে।” (সহিহ মুসলিম, কিতাবুয যুহদ)

নবীজির মৃত্যুর প্রায় ২০০ বছর পর্যন্ত হাদিস লেখা নিষিদ্ধ ছিল। বুখারী ও মুসলিমসহ সব হাদিস গ্রন্থ নবীজির মৃত্যুর ২০০-২৫০ বছর পর সংকলিত হয়েছে। যা নবীজি নিজেই নিষেধ করে গেছেন, তা আজ ধর্মের দ্বিতীয় উৎস কীভাবে হতে পারে?

১৬. কিয়ামতের দিন জবাবদিহিতা হবে শুধু কিতাবের ভিত্তিতে

বিচার দিবসে প্রতিটি জাতিকে তাদের ‘কিতাব’ বা ঐশী গ্রন্থের দিকে ডাকা হবে, কোনো হাদিস গ্রন্থের দিকে নয়।

“তুমি প্রত্যেক জাতিকে দেখবে নতজানু অবস্থায়। প্রত্যেক জাতিকে তাদের কিতাবের প্রতি আহ্বান করা হবে। আজ তোমাদের তারই প্রতিদান দেওয়া হবে যা তোমরা আমল করতে।” (৪৫:২৮)

আমাদের জন্য সেই কিতাব হলো আল-কুরআন। আল্লাহ প্রশ্ন করবেন আমরা কুরআন মেনেছি কিনা। বুখারী বা মুসলিম শরীফ মেনেছি কিনা, সেই প্রশ্ন করা হবে না।

১৭. নবীজি ভুলের ঊর্ধ্বে ছিলেন না

অনেকের বিশ্বাস হলো নবীগণ নিষ্পাপ এবং ভুলের ঊর্ধ্বে। কিন্তু কুরআন আমাদের জানায়, ওহী প্রচারের ক্ষেত্র ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনে নবীজি ভুল করতেন এবং আল্লাহ তাকে সংশোধন করে দিতেন।

আল্লাহ নবীকে বলতে বলেছেন:

“বলো, ‘আমি যদি পথভ্রষ্ট হই, তবে নিজের অকল্যাণের জন্যই পথভ্রষ্ট হবো। আর যদি আমি সঠিক পথে থাকি, তবে তা আমার রবের ওহীর কল্যাণেই।’” (৩৪:৫০)

কুরআনে বেশ কয়েকটি ঘটনায় আল্লাহ নবীর ভুলকে সংশোধন করেছেন (যেমন: সূরা আবাসা, সূরা তাহরিম, সূরা তাওবা)। যদি নবীর ব্যক্তিগত কথাই (হাদিস) ওহী হতো, তবে তাতে ভুলের কোনো অবকাশ থাকত না।

১৮. আল্লাহ কেন হাদিসের অস্তিত্ব থাকতে দিয়েছেন?

প্রশ্ন জাগতে পারে, যদি হাদিস অনুসরণযোগ্য না-ই হয়, তবে আল্লাহ কেন এগুলোকে থাকতে দিলেন? আল্লাহ উত্তর দিয়েছেন—এটি একটি পরীক্ষা।

“এভাবেই আমি প্রত্যেক নবীর জন্য শত্রু সৃষ্টি করেছি—মানুষ ও জিন শয়তানদের মধ্য থেকে। তারা একে অপরকে চটকদার কথা দ্বারা প্ররোচিত করে প্রতারণার উদ্দেশ্যে। তোমার রব চাইলে তারা এমন করত না… যাতে যারা আখেরাতে বিশ্বাস করে না, তাদের মন সেদিকে (মিথ্যা হাদিসের দিকে) ঝুঁকে পড়ে এবং তারা তা পছন্দ করে…” (৬:১১২-১১৩)

চটকদার হাদিস বা বানোয়াট কথাগুলো মুমিন এবং মুনাফিকদের আলাদা করার একটি মাধ্যম। যারা সত্যিকার অর্থে আল্লাহকে বিশ্বাস করে, তারা শুধু আল্লাহর কিতাবই মানবে।

১৯. কুরআনই আমাদের জন্য যথেষ্ট

পরিশেষে, একজন মুমিনের জন্য আল্লাহর এই আশ্বাসই যথেষ্ট হওয়া উচিত যে, কুরআন পরিপূর্ণ।

“তোমার রবের কথা সত্য ও ন্যায়ের দিক দিয়ে পরিপূর্ণ। তাঁর কথার কোনো পরিবর্তনকারী নেই।” (৬:১১৫)

“আমি কোরআনকে বোঝার জন্য সহজ করে দিয়েছি। অতএব, কোন উপদেশ গ্রহণকারী আছে কি?” (৫৪:১৭)

কুরআন পূর্ণাঙ্গ, সহজবোধ্য এবং বিস্তারিত। আমাদের হিদায়াতের জন্য অন্য কোনো উৎসের প্রয়োজন নেই। হাদিস, ইতিহাস বা মাযহাবের গোলকধাঁধায় না জড়িয়ে, আসুন আমরা ফিরে আসি সেই অকাট্য সত্যের দিকে যা আল্লাহ নিজেই সংরক্ষণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে শুধুমাত্র তাঁর কিতাব আঁকড়ে ধরার এবং শিরকমুক্ত ঈমান নিয়ে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন।