অধিকারভুক্ত দাসীর সাথে সম্পর্ক

“মা মালাকাত আইমানুকুম” (যারা তোমাদের ডান হাতের অধিকারভুক্ত) কথাটি দ্বারা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দাস-দাসী বা যুদ্ধবন্দিদের বোঝানো হয়। শব্দগুচ্ছটি লিঙ্গ-নিরপেক্ষ এবং এর দ্বারা বোঝানো হয় “যাদেরকে সুরক্ষা, সম্মান ও দায়িত্বের সাথে রাখা হয়”। দাস-দাসী, যুদ্ধবন্দি বা অনুরূপ ব্যক্তিগণ “মা মালাকাত আইমান” এর অন্তর্ভূক্ত। প্রাচীন আরবে ধনী নারীদেরও পুরুষ দাস থাকতো, যেমনটি কুরআনে বলা হয়েছে “মা মালাকাত আইমানুহুন্না” (যারা নারীদের ডান হাতের অধিকারভুক্ত) — (২৪:৩১, ৩৩:৫৫)।

এই শ্রেণীভুক্ত নারী ও পুরুষরা স্বাধীন নারী বা পুরুষদের মতো নন, বরং সমাজের দুর্বল শ্রেণী, যাদের মুক্তি ও সম্মানের ব্যাপারে কুরআন বারবার উৎসাহিত করেছে। কুরআন দাসপ্রথাকে সমর্থন করেনি, বরং ধীরে ধীরে বিলোপের দিকে নির্দেশনা দিয়েছে।

কুরআন এদের সাথে পিতা-মাতা, এতিম বা প্রতিবেশীর মতো সদয় আচরণের নির্দেশ দিয়েছে এবং তাদের মুক্তিকে উত্তম কাজ বলেছে। তাদেরকে জোরপূর্বক ব্যভিচারে বাধ্য করাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।

[৪:৩৬] “…আর তোমাদের ডান হাত যাদের অধিকার করে তাদের সাথে সৎ ব্যবহার করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ অহংকারী, দাম্ভিককে ভালোবাসেন না।”

[২৪:৩৩] “…আর তোমাদের দাসীরা যদি সতীত্ব বজায় রাখতে চায়, তবে দুনিয়ার জীবিকার লোভে তাদেরকে ব্যভিচারে বাধ্য করো না।”

[৯০:১৩] “দাস মুক্ত করা…” (দাসমুক্তি উত্তম কাজ)।

[২৩:৫-৬] “যারা তাদের লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করে, তবে তাদের স্ত্রী(আজওয়াজ) অথবা যারা তাদের ডান হাতের অধিকারভুক্ত তাদের ব্যতীত — এতে তারা নিন্দনীয় হবে না।”

[৭০:২৯-৩০] একই অর্থ।

অনেকে মনে করেন কুরআনে যেহেতু স্ত্রী(আজওয়াজ) এবং ‘মা মালাকাত আইমান’কে পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তাই দাসীদের সাথে বিয়ে ছাড়াই যৌন সঙ্গম করা যাবে।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কুরআন কোথাও বিয়ে ছাড়া যৌন সম্পর্কের অনুমতি দেয়নি। কুরআনে যিনা (ব্যভিচার) কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

[১৭:৩২] আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না, নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ।

কারণ হলো দাসীরা স্বাধীন নারীদের মতো সকল সুযোগ-সুবিধা পায় না, তারা সমাজের দুর্বল শ্রেণী। সমাজের অনিয়মে তাদের শোষিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। একারণেই দেখা যায়, বিবাহিত দাসীরা ব্যভিচার করলে কুরআন তাদের শাস্তি স্বাধীন নারীর অর্ধেক করে দিয়েছে (৪:২৫)।

‘মা মালাকাত আইমান’ কে ‘আজওয়াজ’ (স্বাধীন স্ত্রী) থেকে পৃথকভাবে উল্লেখ করার অর্থ এই নয় যে বিয়ে ছাড়াই তাদের সাথে সঙ্গম করা যাবে।

কুরআনের অন্যান্য আয়াত থেকে এটি আরো স্পষ্ট হয় যে দাসীদের সাথে সম্পর্ক করতে হলে তাদেরকে বিয়ে করতে হবে।

[৪:২৫] “আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি স্বাধীন-মুমিনা নারীদেরকে বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে না, সে (বিয়ে করবে) তোমাদের ঈমানদার দাসীদের মধ্য থেকে, যারা তোমাদের ডান হাতের অধিকারভুক্ত তাদের কাউকে।… অতএব তাদেরকে তাদের মনিবদের অনুমতিক্রমে বিয়ে করো এবং তাদেরকে তাদের মোহরানা দিয়ে দাও ন্যায়সঙ্গতভাবে।”

[৪:৩] “…তোমরা বিয়ে কর নারীদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভাল লাগে; দুটি, তিনটি অথবা চারটি। আর যদি ভয় কর যে, তোমরা সমান আচরণ করতে পারবে না, তবে একটি অথবা তোমাদের ডান হাত যার অধিকারী।”

আয়াতগুলোতে স্পষ্টভাবে “ফানকিহূহুন্না” (তাদেরকে বিয়ে করো) এবং মোহরানার কথা বলা আছে। যা পুনরায় নিশ্চিত করে যে বিয়ে ছাড়া দাসীদের সাথে যৌন সম্পর্ক বৈধ হবে না।

[৪:২৪] “…আর (তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে) বিবাহিত নারীদেরকে, তবে যারা তোমাদের ডান হাতের অধিকারভুক্ত তারা ব্যতীত। … এতদ্ব্যতীত সকল নারীকে তোমাদের জন্য বৈধ করা হয়েছে যে, তোমরা অর্থের বিনিময়ে তাদেরকে চাইবে বিবাহের জন্য,”

(৪:২৪) আয়াতে দেখা যাচ্ছে “মা মালাকাত আইমান” বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও তাদেরকে বিয়ে করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে- এর কারণ হলো মুমিনদের ডান হাতের অধিকারভুক্ত নারীরা যখন ইসলাম গ্রহণ করেছে তখন তাদের পূর্ববর্তী অমুসলিম স্বামীদের সাথে বিবাহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। নিম্নোক্ত আয়াত থেকে ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়:

[৬০:১০] “হে মুমিনগণ! তোমাদের নিকট মুমিনা নারীরা দেশত্যাগী হয়ে এলে তোমরা তাদেরকে পরীক্ষা কর……যদি তোমরা জানতে পার যে, তারা মুমিনা তাহলে তাদেরকে কাফিরদের নিকট ফেরত পাঠিয়ে দিওনা। মুমিনা নারীরা কাফিরদের জন্য বৈধ নয় এবং কাফিররা মুমিনা নারীদের জন্য বৈধ নয়। কাফিররা (ওই নারীদের জন্য) যা ব্যয় করেছে তা তাদেরকে ফিরিয়ে দিবে। অতঃপর তোমরা তাদেরকে বিয়ে করলে কোন অপরাধ হবেনা, যদি তোমরা তাদেরকে তাদের মোহর দিয়ে দাও”

এজন্যই আমরা দেখতে পাই (৪:২৫) আয়াতে কেবল ঈমানদার দাসীদের বিয়ে করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। দাসী যদি ইসলাম গ্রহণ না করে, তবে তার পূর্ববর্তী সম্পর্ক অক্ষুন্ন থাকবে এবং কুরআনের কোথাও কাফির নারীদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক বজায় রাখার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

(৬০:১০) …তোমরা কাফির নারীদের সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রেখনা।

কুরআনে তালাকের বিধান বর্ণনার সময় “নিসা” শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, “আজওয়াজ” নয়। যদি কেবল স্বাধীন স্ত্রী বা “আজওয়াজ”দেরকেই বিয়ে করা বাধ্যতামূলক হতো, তাহলে তালাকের ক্ষেত্রেও শুধু “আজওয়াজ” শব্দটিই ব্যবহৃত হতো। কিন্তু কুরআনে তালাকের ক্ষেত্রে নিসা (নারী) শব্দের ব্যবহার প্রমাণ করে যে “আজওয়াজ” বা “মা মালাকাত আইমান” উভয়ের ক্ষেত্রেই বৈবাহিক সম্পর্ক থাকা আবশ্যক।

[৬৫:১] “হে নবী! তোমরা যদি তোমাদের নারীদেরকে তালাক দিতে চাও (তাল্লাক্বতুমুন-নিসা’আ) তাহলে তাদেরকে তালাক দিও ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে…”

[২:২২৬-২৩২] তালাকের বিস্তারিত নিয়ম বর্ণিত হয়েছে নিসা (নারী) শব্দ ব্যবহার করে, “আজওয়াজ”(স্বাধীন স্ত্রী) শব্দে নয়।

এটিই প্রমাণ করে যে স্বাধীন স্ত্রী (আজওয়াজ) বা “মা মালাকাত আইমান” উভয়ের ক্ষেত্রে বৈবাহিক সম্পর্কের বিধান একই।

এছাড়াও কুরআন নির্দেশ দিয়েছে দাস-দাসীদেরকে যেন বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়, যা প্রমাণ করে যৌন সম্পর্ক হতে পারে কেবল বিবাহের মধ্যমেই।

[২৪:৩২] “আর তোমাদের মধ্যে যারা আবিবাহিত তাদের বিয়ে দাও এবং তোমাদের দাস ও দাসীদের মধ্যে যারা ন্যায়পরায়ণ তাদেরও।”

কুরআনের আয়াতগুলো সামগ্রিকভাবে যাচাই করলে স্পষ্ট হয় যে, ‘মা মালাকাত আইমান’ বা ‘ডান হাতের অধিকারভুক্ত দাসী’র সাথে যৌন সম্পর্কের জন্য বিবাহ, মোহরানা ও যথাযথ সম্মান নিশ্চিত করা আবশ্যক। বিয়ে ছাড়া যেকোনো যৌন সম্পর্ক যিনার শ্রেণীভুক্ত এবং তা কুরআনের সততা, সমতা ও ন্যায়পরায়ণতার নীতির পরিপন্থী।