হাদিসপন্থীরা যে কথাগুলো আপনাকে বলবে না

(মূল লেখা – Mubashir)

যারা রাসুলের সুন্নাহ সংরক্ষণের নামে বানোয়াট হাদিস লিখেছে ও প্রচার করেছে তারা মূলত পৌত্তলিক, ইহুদি,খ্রিস্টান ও মধ্যযুগীয় আরব সংস্কৃতির এক অদ্ভুত জগাখিচুড়ি পাকিয়ে সেটিকে রাসুলের ‘উত্তম আদর্শ’ হিসেবে চালিয়ে দিয়েছে।

অথচ, কুরআনের সূরা আহযাবের ২১ নম্বর আয়াতের (৩৩:২১) প্রেক্ষাপট দেখলে বোঝা যায়, সেখানে ‘উত্তম আদর্শ’ (উসওয়াতুন হাসানাহ) বলতে মূলত নবীর অদম্য সাহসিকতা এবং সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ করার গুণটিকে বোঝানো হয়েছে।

কিন্তু হাদিসের নামে ইসলাম বিকৃতকারীরা এই মহান গুণগুলোকে পাশ কাটিয়ে অপ্রাসঙ্গিক ব্যক্তিগত ও সাংস্কৃতিক আচরণকে ‘রাসুলের আদর্শ’ বানিয়ে ফেলেছে।

উদাহরণস্বরূপ, তারা দাড়ি রাখা বা পাগড়ি পরাকে পবিত্রতা বা সুন্নতের মাপকাঠি বানিয়েছে, অথচ তারা বেমালুম ভুলে যায় যে—মক্কার কাফের সর্দার আবু জাহেল বা ওয়ালিদ বিন মুগিরার মতো লোকদেরও লম্বা দাড়ি এবং বড় পাগড়ি ছিল।

সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, হাদিসের কিতাবগুলোতে নবীর চরিত্রকে এমনভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছে যেগুলো পড়লে তাঁকে মোটেও অনুসরণযোগ্য ব্যক্তি মনে হবে না।

হাদিসের বইগুলোতে নবীজিকে এক অলীক, রূপকথার চরিত্রের মতো ‘মাল্টিপল পারসোনালিটি’র মানুষ হিসেবে দেখানো হয়েছে। হাদিস পড়লে মনে হবে এই চরিত্রটি যেন হার্মিস, পসাইডন বা আফ্রোদিতির মতো গ্রীক দেব-দেবীর চেয়েও বেশি কাল্পনিক। হাদিসের কিতাবগুলোতে তাকে এক দোদুল্যমান চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে—কখনও তাকে দেবতার আসনে বসানো হয়েছে, আবার কখনও নামানো হয়েছে সর্বনিম্ন স্তরে।

সেখানে তিনি একইসাথে জ্ঞানী আবার মূর্খ! কখনও তিনি আল্লাহর চেয়েও বেশি দয়ালু, আবার কখনও নিষ্ঠুর নির্যাতনকারী!

হাদিসের পাতায় তিনি একইসাথে নিষ্পাপ আবার অপরাধী, বিনয়ী আবার অহংকারী, সচ্চরিত্র আবার নারীলোলুপ, বিশ্বাসী আবার প্রতারক, নিরক্ষর আবার শিক্ষিত, ধনী আবার দরিদ্র, স্বজনপ্রীতিপূর্ণ আবার গণতান্ত্রিক নেতা, নারীর প্রতি যত্নবান আবার নারীবিদ্বেষী, এমনকি মুমিন আবার কাফের! কোথাও তিনি হাদিস লিখতে নিষেধ করছেন, আবার কোথাও উৎসাহ দিচ্ছেন!

হাদিসের গ্রন্থগুলোতে ফুটিয়ে তোলা এমন হাজারো পরস্পরবিরোধী ঘটনার মধ্য থেকে আপনি আপনার পছন্দমতো যেকোনো একটি চরিত্র বেছে নিতে পারেন। যাদের মনে আগে থেকেই কোনো ধারণা গেঁথে আছে, তারা হাদিসের ভাণ্ডার থেকে তাদের মনমতো একটা ‘হিরো’ বা আদর্শ দাঁড় করানোর জন্য ঠিক সেই হাদিসটিই খুঁজে বের করবে। আপনি কি একজন সন্ত্রাসী নবীকে খুঁজছেন? বুখারিতেই এমন কিছু হাদিস পাবেন যা যুদ্ধে নারী ও শিশুদের হত্যাকে বৈধতা দেয়। আবার আপনি কি একজন অত্যন্ত নিরীহ ও শান্তিকামী নবী চান? বুখারিতেই আপনি এমন হাদিস পাবেন যেখানে তায়েফের লোকেরা তাকে পাথর মারার পরও তিনি তাদের জন্য দোয়া করছেন। অর্থাৎ, হাদিসের বইগুলোতে আপনি যা চাইবেন, ঠিক তা-ই পাবেন—বিশেষ করে মুহাম্মদের চরিত্র সম্পর্কে। এক পৃষ্ঠায় তিনি দয়ার সাগর, তো পরের পৃষ্ঠায় তিনি এক নিষ্ঠুর শাসক।

কোথাও দেখবেন তিনি মহান নৈতিকতার প্রতীক, আবার কোথাও তাকে চিত্রিত করা হয়েছে শিশুকামী হিসেবে। এক বর্ণনায় দেখবেন তিনি আঙুলের ইশারায় চাঁদ দ্বিখণ্ডিত করে আলীর উঠোনে ফেলছেন, আবার অন্য বর্ণনায় দেখবেন তিনি সামান্য একটি চিঠিও পড়তে পারছেন না।

হাদিসের বইগুলোর প্রকৃতিই এমন যে, এগুলো অপব্যবহারের জন্য চমৎকার একটি উৎস। শত শত বছর ধরে হাজারো লেখকের হাতে, নানামুখী এজেন্ডা, অসামঞ্জস্যপূর্ণ ভাষা এবং বিচ্ছিন্ন জনশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে এই হাদিসগুলো লেখা হয়েছে।

একজন তথাকথিত ‘মুহাদ্দিস’ চাইলেই তার অপছন্দের যেকোনো হাদিসকে ‘উসুলুল-হাদিস’ বা হাদিস শাস্ত্রের নীতিমালার দোহাই দিয়ে বাতিল করে দিতে পারেন। হাদিসের বর্ণনাকারীদেরকে যাচাই করার এই পদ্ধতিটি মোটেও নিরপেক্ষ নয়, বরং এর পুরোটাই আরেকজনের শোনা কথা, ফেরকাবাজি বা ব্যক্তিগত পছন্দের ওপর নির্ভরশীল। তারা এর নাম দিয়েছে ‘জারহ’ এবং ‘তাদিল’—যার সোজা বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘ডাস্টিবিনে ফেলা’ (Trash) অথবা ‘সংরক্ষণ করা’ (Save)।

উদাহরণ হিসেবে সুন্নি ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত হাদিস সংকলক ইমাম বুখারির কথাই ধরা যাক। তিনি নবীর মৃত্যুর প্রায় ২০০ বছর পর বুখারায় জন্ম গ্রহণ করেন। গাল-গল্প সংগ্রহকারী এই ব্যক্তি নিজের সতর্কতা সম্পর্কে বড়াই করতে গিয়ে দাবি করেছেন, তিনি একটি মাত্র হাদিস শোনার জন্য একবার এক মাস ভ্রমণ করেছিলেন। কিন্তু বর্ণনাকারীর বাড়িতে গিয়ে দেখলেন, লোকটি তার ঘোড়াকে আস্তাবলে নেওয়ার জন্য খালি থলি দেখিয়ে ধোঁকা দিচ্ছে। ব্যাস! আমাদের অতি সতর্ক বুখারি সাহেব সিদ্ধান্ত নিলেন, যে লোক ঘোড়াকে ধোঁকা দিতে পারে, তার কাছ থেকে তিনি হাদিস নেবেন না। অর্থাৎ, তিনি ‘জারহ’ বা বাতিলের নীতি প্রয়োগ করলেন।

এখন ভাবুন, তিনি ৬ লক্ষ হাদিস থেকে যাচাই-বাছাই করে মাত্র ৭,২৭৫টি হাদিস (যার মধ্যে আবার অনেকগুলোর পুনরাবৃত্তি আছে) নির্বাচন করেছেন। অর্থাৎ তার সংগ্রহের ৯৯%-ই ছিল ত্রুটিপূর্ণ! এখান থেকে সহজেই অনুমান করা যায়, বাকি হাজার হাজার বর্ণনাকারীর ক্ষেত্রে তার চোখ ঘোড়ার মালিকের ওই ঘটনা দেখার মতো এতটা তীক্ষ্ণ ছিল না, অথবা তিনি অন্যান্য বর্ণনাকারীদের ধোঁকাবাজি ধরতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।

পরিহাসের বিষয় হলো, এই বুখারিই আবার মদ্যপ ও অত্যাচারী উমাইয়া শাসকদের কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি শত শত হাদিস নিয়েছেন আবু হুরায়রা থেকে, যাকে স্বয়ং ওমর, ইবনে আব্বাস এবং আয়েশার মতো বিশিষ্ট সাহাবীরা মিথ্যাবাদী ও হাদিস জালকারী হিসেবে গণ্য করতেন। হয় বুখারি নিজেই ধোঁকা খেয়েছেন, নয়তো তিনি নিজেই ছিলেন আরেক ধোঁকাবাজ।

এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে গিয়ে সাধারণ একটা অঙ্ক কষা যাক। বুখারি নিজে এবং তার পরবর্তী সম্পাদকরা বুখারিকে একজন ধর্মপ্রাণ, জিনিয়াস এবং অত্যন্ত সতর্ক পণ্ডিত হিসেবে জাহির করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন।

যদিও খ্রিস্ট ধর্মের বিকৃতরূপের প্রচারক ‘সেন্ট পল’ নিজের প্রচারণায় বুখারির চেয়েও বেশি চতুর ছিলেন, তবুও বুখারি তার নিজের বাজারে বেশ ভালোই কাজ করেছেন।

বুখারির ভূমিকায় আমরা জানতে পারি, তিনি একটি হাদিস সংগ্রহের জন্য এক দেশ থেকে অন্য দেশে লম্বা সফর করতেন। বর্ণনাকারীদের যাচাই করতে তিনি এতটাই সতর্ক ছিলেন যে, প্রতিটি হাদিস লেখার আগে তিনি ওজু করতেন এবং নামাজ পড়তেন।

এতকিছুর পরেও তার কিতাবে হাস্যকর কিছু কার্টুনের মতো গল্প পাওয়া যায়। যেমন: কিছু সাহাবী নাকি জঙ্গলে একদল বানরকে দেখেছেন যারা ব্যভিচারী এক বানরকে পাথর মেরে শাস্তি দিচ্ছে! (হয়তো ছাগলের কুরআনের আয়াত খেয়ে ফেলার মতো আজগুবি হাদিসগুলো পরবর্তীতে বুখারির এই হাদিস থেকেই অনুপ্রাণিত হয়েই লিখা হয়েছে)।

যাই হোক, চলুন অঙ্কটা কষা যাক:

  • ধরে নিলাম, বুখারি ৬ লক্ষ হাদিস শোনা এবং যাচাই করার ব্যাপারে সত্য বলেছেন।
  • বুখারির প্রতি অত্যন্ত উদার হয়ে ধরে নিলাম, প্রতিটি হাদিস শুনতে, বর্ণনাকারীর সাক্ষাৎকার নিতে এবং যাচাই করতে তার গড়ে মাত্র ‘এক ঘণ্টা’ সময় লেগেছে।
  • ধরে নিলাম, তিনি ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শুধু হাদিস বর্ণনাকারীদের খুঁজে বেড়িয়েছেন এবং যাচাই করেছেন।
  • আরও ধরে নিলাম, তার জীবনের সব দিনই ছিল লম্বা গ্রীষ্মের দিন, তাই তিনি প্রতিদিন টানা ১০ ঘণ্টা বিরতিহীন কাজ করেছেন।

যেহেতু বুখারি বা অন্য কেউ দাবি করেননি যে তার সময়কে দীর্ঘায়িত করার বা থামিয়ে রাখার কোনো অলৌকিক ক্ষমতা ছিল, তাই আমরা তাকে প্রকৃতির নিয়মে বাঁধা একজন সাধারণ মানুষ হিসেবেই বিবেচনা করব।

এই অনুমানগুলো দিয়ে হিসাব করলে দেখা যায়:

  • ৬,০০,০০০ হাদিস × ১ ঘণ্টা = ৬,০০,০০০ ঘণ্টা।
  • প্রতিদিন ১০ ঘণ্টা কাজ করলে = ৬০,০০০ দিন।
  • বছরে রূপান্তর করলে = প্রায় ১৬৪ বছর!

অথচ বুখারি বেঁচে ছিলেন মাত্র ৬০ বছর। তার মানে, তিনি যা দাবি করেছেন, তা করতে হলে তার ১০০ বছরেরও বেশি আয়ুর প্রয়োজন ছিল।

সত্যি বলতে, বুখারি আর তার সমগোত্রীয়রা মুহাম্মদের চরিত্রকে হাইজ্যাক করেছে। তারা কুরআনের আলোকে সরিয়ে সেখানে অজ্ঞতার অন্ধকার স্থাপন করেছে। অনারবদের অবাক করার জন্য আলেমরা বিভিন্ন চমকপ্রদ আরবি পারিভাষিক শব্দের ব্যবহার করে, যাতে মানুষ ভাবে এই ‘আলেমদের’ কাছে হয়তো স্রষ্টাপ্রদত্ত বিশেষ কোনো জ্ঞান আছে!

একজন মুহাদ্দিস তার পূর্ববর্তী পণ্ডিতদের তৈরি করা অন্তর্দ্বন্দ্বে পরিপূর্ণ নীতিগুলো ব্যবহার করে যেকোনো হাদিসের সনদ বা চেইনকে ‘সহিহ’ বা ‘বাতিল’ ঘোষণা করতে পারেন। শুধুমাত্র হাতেগোনা কিছু হাদিস, যেগুলোকে ‘মুতাওয়াতির’ (বহু সংখ্যক সাহাবী থেকে বর্ণিত) বলা হয়, সেগুলো হয়তো এই বাছ-বিচারের খেলা থেকে রক্ষা পেতে পারে।

মজার ব্যাপার হলো, কোনটা মুতাওয়াতির আর কোনটা নয়, তা নিয়েও তাদের মধ্যে মতবিরোধের শেষ নেই। তাদের হাদিসের ময়লার ঝুড়ি কতটা গভীর তা বোঝাতে তারা মুরসাল, হাসান, যইফ, মাওজু ইত্যাদি গালভরা নাম ব্যবহার করে।

আপনি যদি ‘মুকাল্লিদ’ বা কোনো মাযহাবের অন্ধ অনুসারী হন, তবে তারা আপনার জন্য যা বেছে দিয়েছে, আপনাকে সেটাই গিলতে হবে। যদি আপনি আধুনিক পৃথিবীতে বাস করেন, তবে দুই হাজার বছরের পুরনো সংস্কৃতি আর আজকের বাস্তবতার চাপে আপনার মধ্যে ‘মাল্টিপল পারসোনালিটি’ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

যেহেতু প্রায় সব হাদিসই ‘আহাদ’ বা একজন ব্যক্তির থেকে বর্ণিত, তাই ব্যক্তিগতভাবে চাইলেই আপনি সেগুলোর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। এর ফলে যে কেউ যেকোন সময় মধ্যযুগীয় সংস্কৃতির এই জগাখিচুড়ি থেকে হাজারো নতুন ধর্ম, উপদল, মাযহাব বা ফিরকা তৈরি করে ফেলতে পারে।

হাদিসশাস্ত্রের এই অদ্ভুত দিকটি কুরআনের একটি আয়াতে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে:

“তোমাদের কী হলো? তোমরা কীভাবে বিচার-ফায়সালা করছো? নাকি তোমাদের কাছে এমন কোনো কিতাব আছে, যা তোমরা অধ্যয়ন করো? যে, তাতে তা-ই আছে যা তোমরা পছন্দ করো?”—(৬৮:৩৫-৩৮)