ইসলামে ‘কিবলা’ বলতে সালাত আদায়ের নির্দিষ্ট দিককে বোঝানো হয়। সূরা বাকারার ১৪৩ নম্বর আয়াত থেকে আমরা জানতে পারি যে, মসজিদুল হারামকে কিবলা হিসেবে মনোনীত করার আগে নবী মুহাম্মদ অন্য কিবলার অনুসরণ করতেন।
এই ঐতিহাসিক ঘটনাটিকে সামনে এনে অনেক সময় দাবি করা হয়—যেহেতু কুরআনে পূর্বের কিবলার কোনো বিস্তারিত বিবরণ নেই, তার মানে আল্লাহ কুরআনের বাইরেও নবীর ওপর কিছু জিনিস নাজিল করেছিলেন। আর তাই ইসলাম পালনের জন্য শুধু কুরআন যথেষ্ট নয়, বরং আমাদের হাদিসেরও আশ্রয় নিতে হবে। কিন্তু কুরআনের আয়াতগুলোকে যদি আমরা যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ করি, তবে এই দাবির অসারতা একেবারেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কিবলা পরিবর্তনের পটভূমি
কুরআনে আল্লাহ পূর্ববর্তী কিবলা পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে বলেছেন:
“আর তুমি যে কিবলার ওপর ছিলে তা আমি নির্ধারণ করেছিলাম কেবল এটা জানার জন্য যে, কে রাসুলের অনুসরণ করে আর কে পিছনে ফিরে যায়…”—(২:১৪৩)
এই আয়াতটি নিশ্চিত করে যে, আগে একটি কিবলা ছিল এবং আল্লাহ তা পরিবর্তন করেছেন। কিন্তু সেই আগের কিবলাটি ঠিক কোন দিকে ছিল, কুরআনে তা বলা হয়নি। কারণ, এটি জানা আমাদের জন্য মোটেও প্রয়োজনীয় নয়। সালাতের জন্য আমাদের কেবল চুড়ান্ত কিবলাটি জানা প্রয়োজন, যা আল্লাহ পরিষ্কার করে দিয়েছেন:
“তুমি যেখান থেকেই বের হও, তোমার মুখমণ্ডল মসজিদুল হারামের দিকে ফেরাও।…”—(২:১৪৯)
শূন্যের মধ্যে নবীর মুখ ফেরানো
কুরআন নাজিলের শুরুর দিকে আরবে একাধিক কিবলা প্রচলিত ছিল, একেক দলের মানুষ একেক দিকে মুখ করে উপাসনা করত:
“তারা তোমার কিবলা অনুসরণ করবে না, এবং তুমিও তাদের কিবলার অনুসরণকারী হয়ো না; আর তারাও একে অপরের কিবলার অনুসরণকারী নয়।”—(২:১৪৫)
এতগুলো কিবলার ভিড়ে নবী মুহাম্মদ ঠিক কোন দিকে মুখ করবেন, তা নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। কুরআনে তার এই মানসিক অবস্থার কথাই উল্লেখ করা হয়েছে:
“অবশ্যই আমি আকাশের মধ্যে তোমার বারবার মুখমন্ডল ঘোরানো লক্ষ্য করি। সুতরাং আমি অবশ্যই তোমাকে এমন এক কিবলার দিকে ফিরিয়ে দেব, যা তুমি পছন্দ করো। অতএব, তুমি মসজিদুল হারামের দিকে তোমার মুখ ফেরাও।…”—(২:১৪৪)
এখানে একটি বিষয় আছে, আয়াতটির অধিকাংশ অনুবাদে বলা হয়: “অবশ্যই আমি আকাশের দিকে তোমার বারবার মুখ ফেরানো লক্ষ্য করি”।
কিন্তু মূল আরবি আয়াতে ‘ইলা-সামা’ (আকাশের দিকে) বলা হয়নি, বরং বলা হয়েছে ‘ফি-সামা’ (فِي السَّمَاءِ), যার অর্থ ‘আকাশের মধ্যে’ বা ‘শূন্যের মধ্যে’। অর্থাৎ, মুহাম্মদ কোনো নির্দিষ্ট দিক না পেয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে শূন্যের মধ্যে একবার একদিকে মুখ ঘোরাচ্ছিলেন, তিনি বুঝতে পারছিলেন না ঠিক কোন দিকে স্থির হবেন।
হাদিসপন্থীরা দাবি করেন যে, প্রথম কিবলাটিও আল্লাহই ওহীর মাধ্যমে নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন। কিন্তু একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায় এটি অসম্ভব।
১. যদি প্রথম কিবলাটি আল্লাহই নির্দিষ্ট করে দিতেন, তবে নবী শূন্যের মাঝে এদিক-সেদিক মুখ ঘুরাতেন না, তিনি আল্লাহর নির্দেশের ওপরই স্থির থাকতেন।
২. আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, “এমন এক কিবলার দিকে ফিরিয়ে দেব যা তুমি পছন্দ করো।” যদি প্রথম কিবলাটি সরাসরি আল্লাহর নির্দেশ হতো, তবে একজন নবী কি কখনো আল্লাহর নির্দেশ অপছন্দ করতে পারেন?—কখনোই না।
এর থেকেই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে, পূর্ববর্তী কিবলাটি সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা কোনো হুকুম ছিল না। বরং নবী তার আশেপাশের মানুষদের কিবলাগুলোর অনুসরণ করতেন এবং তিনি চাচ্ছিলেন আল্লাহ যেন তাকে একটি নির্দিষ্ট কিবলা স্থির করে দেন। অবশেষে আল্লাহ নবী ও মুমিনদের জন্য মসজিদুল হারামকে চূড়ান্ত কিবলা হিসেবে মনোনীত করেন।