সূরা ফজরে বর্ণিত দশ রাত

শপথ ফজরের, এবং দশ রাতের।”—(সূরা ফজর ৮৯:১-২)

যেহেতু মহান আল্লাহ কুরআনে এই ‘দশ রাত’-এর শপথ করেছেন, তাই এটি স্পষ্ট যে এই রাতগুলোর বিশেষ কোনো তাৎপর্য রয়েছে। তবে সূরা ফজরে নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি যে এই দশ রাত আসলে কোন দশ রাত। এর ফলে যুগ যুগ ধরে এই বিষয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে ব্যাখ্যার ভিন্নতা দেখা গেছে।

প্রচলিতভাবে আলেমদের মধ্যে দুটি প্রধান মত পাওয়া যায়:
১. প্রথম দলের মত: এটি রমজান মাসের শেষ দশ রাত।
২. দ্বিতীয় দলের মত: এটি জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ রাত (যখন হজ্জের আনুষ্ঠানিকতা পালিত হয়)।

কিন্তু এই দুই মতের কোনোটিই কুরআনের মৌলিক শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়:

  • রমজানের শেষ দশ রাত: কুরআনের কোথাও রমজানের শেষ দশ রাতকে আলাদা করে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়নি। আল্লাহ নির্ধারিত ইবাদতগুলোর জন্য একটি সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন এবং সেই সীমার মধ্যে ইবাদত করলেই তা গ্রাহ্য হয়। সময়ের নির্দিষ্ট অংশের (প্রথম, মধ্য বা শেষ) ওপর ভিত্তি করে কুরআনে অতিরিক্ত কোনো সওয়াবের কথা বলা হয়নি। আল্লাহর কাছে ইবাদতের সময়কালের চেয়ে ইবাদতের আন্তরিকতা ও গুণগত মান বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
  • জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ রাত: হজ্জের আচার-অনুষ্ঠানগুলো মূলত দিনের আলোতে পালিত হয়, অথচ আল্লাহ শপথ করেছেন ‘রাতের’। এছাড়াও, কুরআনের ২:১৯৭ এবং ৯:৩৬ আয়াত অনুযায়ী হজ্জ পালনের জন্য চারটি ‘নিষিদ্ধ মাস’ নির্ধারণ করা হয়েছে। এই চার মাসের যেকোনো সময় হজ করা যায়। এটিকে কেবল জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনে সীমাবদ্ধ করা কুরআনের নির্দেশনার পরিপন্থী।

কুরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, কুরআন নিজেই সবকিছুর বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করে:

“আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনা, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ।”—(সূরা নাহল ১৬:৮৯)

যেহেতু কুরআন সবকিছুর ব্যাখ্যা দেয়, তাই সূরা ফজরের (৮৯:২) এই ‘দশ রাত’-এর পরিচয় কুরআনেরই কোনো একটি আয়াতে খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

কুরআন অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, সূরা ফজর বাদে সম্পূর্ণ কুরআনে মাত্র একটি আয়াতেই নির্দিষ্টভাবে ‘দশ রাত’-এর উল্লেখ রয়েছে:

আমি মূসাকে ত্রিশ রাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম এবং আরও দশ দিয়ে তা পূর্ণ করেছিলাম। এভাবে তার রবের নির্ধারিত সময় চল্লিশ রাতে পূর্ণ হয়। মূসা তার ভাই হারুনকে বলল, ‘আমার অনুপস্থিতিতে আমার সম্প্রদায়ের মধ্যে তুমি আমার প্রতিনিধিত্ব করবে, সংশোধন করবে এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পথ অনুসরণ করবে না।’”—(সূরা আল-আরাফ ৭:১৪২)

সূরা আরাফের ৭:১৪২ আয়াতে উল্লেখিত এই ‘দশ রাত’ যে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, তা কুরআনের বর্ণনাভঙ্গি থেকেই বোঝা যায়। আল্লাহ চাইলে সরাসরি ‘চল্লিশ রাত’ বলতে পারতেন, যেমনটি তিনি সূরা বাকারায় বলেছেন:

আর যখন আমি মূসাকে চল্লিশ রাতের জন্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, তার চলে যাওয়ার পর তোমরা বাছুরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছিলে, আর তোমরা ছিলে সীমালঙ্ঘনকারী।”—(সূরা বাকারা ২:৫১)

সাধারণভাবে একটি নির্দিষ্ট সময় বোঝাতে ‘চল্লিশ রাত’ বলাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সূরা আরাফে আল্লাহ অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে প্রথম ৩০ রাত থেকে শেষের ১০ রাতকে আলাদা করে উল্লেখ করেছেন। এর অর্থ হলো, শেষ দশ রাতের বিশেষ এবং সুমহান কোনো গুরুত্ব রয়েছে।

সূরা আরাফের পরবর্তী আয়াতগুলো পড়লেই আমরা সেই গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারি:

তিনি বললেন, ‘হে মূসা! আমার বাণী আমার সাথে তোমার কথোপকথনের মাধ্যমে আমি তোমাকে মানুষের ওপর মনোনীত করেছি। সুতরাং আমি তোমাকে যা দিলাম তা শক্তভাবে ধারণ করো এবং কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হও।’ আর আমি তার জন্য ফলকগুলোতে লিখে দিলাম সব বিষয়ের উপদেশ বিস্তারিত ব্যাখ্যা: ‘সুতরাং এগুলো শক্তভাবে ধারণ করো এবং তোমার সম্প্রদায়কে এর উত্তম বিষয়গুলো গ্রহণ করার নির্দেশ দাও। আমি শীঘ্রই তোমাদেরকে অবাধ্যদের আবাসস্থল দেখাব।’”—(সূরা আল-আরাফ ৭:১৪৪-১৪৫)

এই আয়াতগুলো থেকে জানা যায়, ওই রাতগুলোতে আল্লাহ মূসার সাথে কথা বলেছিলেন এবং তাঁকে নিজের বাণী খোদাই করা ফলক প্রদান করেছিলেন।