শেষ যামানায় দাজ্জালের আবির্ভাব বা ঈসা নবীর আগমন সম্পর্কিত যেসব কাহিনী আমরা শুনতে পাই তার সবই এসেছে হাদিস, তাফসির, কিসসা এবং ইহুদি-খ্রিস্টানদের ধর্মগ্রন্থ থেকে। অপরদিকে কুরআনের আয়াতগুলো বিশ্লেষণ করলে এটাই প্রতীয়মান হয় যে ঈসা নবী মারা গেছেন এবং তার দ্বিতীয় আগমনের ব্যাপারে কুরআনে ন্যূনতমও কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায় না।
১. পৃথিবীতে ঈসার দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর কিয়ামত পর্যন্ত তার কোনো জ্ঞান নেই
[৫:১১৬-১১৭] “আর যখন আল্লাহ বলবেন, হে মরিয়ম-তনয় ঈসা! তুমি কি মানুষকে বলেছিলে যে, আল্লাহ ছাড়াও আমাকে ও আমার মাকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করো? তিনি বলবেন, মহাপবিত্র তুমি! আমার পক্ষে এমন কথা বলা সমীচীন নয় যার হকদার আমি নই। ……আমি তাদেরকে কিছুই বলিনি যা তুমি আমাকে আদেশ করেছিলে তা ব্যতীত—যে, আল্লাহর ইবাদত করো, যিনি আমার রব এবং তোমাদের রব। আর আমি তাদের কাজ-কর্মের সাক্ষী ছিলাম যতক্ষণ আমি তাদের মাঝে ছিলাম। অতঃপর যখন তুমি আমাকে মৃত্যু দান করেছিলে (তাওয়াফ্ফাইতানী), তুমিই ছিলে তাদের উপর নজর রাখার জিম্মাদার এবং তুমিই সবকিছুর সাক্ষী।”
- দেখা যাচ্ছে ঈসা কিয়ামতের দিন স্পষ্টভাবে বলবেন যে, তিনি শুধু তার জীবদ্দশায় তার সম্প্রদায়ের উপর সাক্ষী ছিলেন। মৃত্যুর পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত কোনো কিছুর জ্ঞান তার কাছে নেই।
- তার দ্বিতীয় আগমন সত্য হলে, তিনি প্রথমবার চলে যাওয়ার পর থেকে দ্বিতীয়বার আসা পর্যন্ত সবকিছু (খ্রিস্ট ধর্মের বিভিন্ন মতবাদসহ) জানতেন এবং আল্লাহর সামনে তা উল্লেখ করতেন।
- আল্লাহর সাথে তার কথোপকথনের কোথাও তার দ্বিতীয় আগমন, দাজ্জাল বা মাহদী কোনো কিছুরই উল্লেখ নেই।
২. তাওয়াফ্ফু এবং রাফা’—প্রথমে মৃত্যু, তারপর মর্যাদায় উন্নীত করণ
[৩:৫৫] “যখন আল্লাহ বললেন, হে ঈসা! নিশ্চয়ই আমি তোমাকে মৃত্যু দান করছি (মুতাওয়াফ্ফীকা), এবং তোমাকে আমার দিকে উঠাচ্ছি (রাফি’উকা ইলাইয়া), এবং তোমাকে কাফিরদের থেকে পবিত্র করছি এবং যারা তোমার অনুসরণ করে তাদেরকে কাফিরদের উপর প্রাধান্য দিচ্ছি কিয়ামতের দিন পর্যন্ত। তারপর তোমাদের সবার প্রত্যাবর্তন আমারই দিকে, অতঃপর আমি তোমাদের মাঝে ফায়সালা করব যে বিষয়ে তোমরা মতভেদ করতে।”
এই আয়াত স্পষ্ট করে যে, ঈসার দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর প্রথমে তাকে মৃত্যু (তাওয়াফ্ফু) দেয়া হয়, তারপর মর্যাদায় উন্নীত (রাফা’) করা হয়।
তাওয়াফ্ফু অর্থ মৃত্যু বা প্রাণ কবজ করা। পুরো কুরআনে এই শব্দের বিভিন্ন রূপ শুধুমাত্র মৃত্যু অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে।
- ১৬:৭০ “আল্লাহ তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন (ইয়াতাওয়াফ্ফাকুম)”
- ৩:১৯৩ “হে আমাদের রব! আমাদের পাপ ক্ষমা করো এবং আমাদেরকে মৃত্যু দাও (তাওয়াফ্ফানা) সৎকর্মশীলদের সাথে”
- ৭:১২৬ “আমাদেরকে মৃত্যু দাও (তাওয়াফ্ফানা) মুসলিম অবস্থায়”
- ৪৭:২৭ “কেমন হবে যখন ফেরেশতারা তাদের প্রাণ কবজ করবে (তাওয়াফ্ফাতহুম) তাদের মুখ ও পিঠে আঘাত করতে করতে?”
- ২:২৩৪ “যারা মৃত্যুবরণ করে (তাওয়াফ্ফাওনা) এবং স্ত্রী রেখে যায়…”;
- ৪:১৫ “যতক্ষণ না মৃত্যু তাদের উঠিয়ে নেয় (তাওয়াফ্ফাহুন্না)…”
- ৬:৬১ “অবশেষে যখন তোমাদের কারো কাছে মৃত্যু আসে আমার প্রেরিত দূতগণ তার মৃত্যু ঘটায় (তাওয়াফফাতহু)…”
রাফা’ মানে সম্মানে উন্নীত করা বা উচ্চ মর্যাদা দেওয়া।
- [১৯:৫৬-৫৭] “ আর স্মরণ করো কিতাবে উল্লেখিত ইদরিসের কথা । নিশ্চয় তিনি ছিলেন সত্যবাদী, নবী। আর আমি তাঁকে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছি (রাফা’নাহু)।”
- ঈসার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়, তারপর আল্লাহ তাকে মর্যাদায় উন্নীত করেন। এখানে কোথাও জীবিত উঠিয়ে নেওয়ার কোনো ইঙ্গিত নেই।
৩. কোনো রাসূল মৃত্যুর পর পৃথিবীর খবর রাখেন না
[৫:১০৯] “আল্লাহ যে দিন রাসূলগণকে একত্রিত করবেন; অতঃপর বলবেন, ‘তোমরা (তোমাদের অনুসারীদের কাছ থেকে) কী জবাব পেয়েছিলে?’ তারা বলবে, আমরা কিছুই জানি না, তুমিই সকল অদৃশ্যেরর খবর জান।”
এখানেও ঈসার জন্য কোনো ব্যতিক্রম নেই। এটি ৫:১১৭ আয়াতের সাথে মিলে যায়, যা প্রমাণ করে মৃত্যুর পর তার কোনো জ্ঞান নেই।
৪. ‘তারা তাকে হত্যা করেনি’ আয়াতের ব্যাখ্যা
[৪:১৫৭-১৫৮] “এবং তাদের কথার জন্য যে, আমরা আল্লাহর রাসূল মরিয়ম-তনয় মসীহ ঈসাকে হত্যা করেছি। অথচ তারা তাকে হত্যা করেনি এবং তাকে ক্রুশবিদ্ধও(সালাবুহু) করেনি, কিন্তু তাদের কাছে তা এমনই মনে হয়েছিল। আর যারা এ বিষয়ে মতবিরোধ করেছিল নিশ্চয়ই তারা সন্দেহের মধ্যে ছিল। অনুমান ছাড়া তাদের কোনো জ্ঞান নেই। আর এটা নিশ্চিত যে তারা তাকে হত্যা করেনি। বরং আল্লাহ তাকে নিজের দিকে উঠিয়ে নিয়েছেন (রাফা’হু ইলাইহি)। আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।”
- ইহুদিদের গর্বোক্তি: ইহুদিরা গর্ব করে বলেছিল তারা আল্লাহর রাসূলকে হত্যা করেছে, যদিও তারা ঈসাকে আল্লাহর রাসূল হিসেবে বিশ্বাস করতো না। উপহাস করে তারা কথাটি বলেছিল।
- ‘সালাবুহু’ অর্থ শূলে চড়িয়ে, ক্রুশবিদ্ধ করে বা অন্য কোনো প্রচলিত পদ্ধতিতে হত্যা করা। এই পদ্ধতিগুলোতে ধীরে ধীরে রক্তক্ষরণে মৃত্যু হয়। ‘সালাবুহু’ এর শর্ত হলো এই পদ্ধতিগুলোতে মৃত্যু নিশ্চিত হতে হবে। কুরআন বলে তারা ঈসাকে এভাবে হত্যা করতে পারেনি। আল্লাহ তাকে তাদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন।
- শুব্বিহা লাহুম (তাদের কাছে বিষয়টি এমনই মনে হয়েছিল): এর অর্থ এই নয় যে অন্য কাউকে আল্লাহ ঈসার মতো করে দিয়েছিলেন। বরং কুরআনের সামগ্রিক বর্ণনা অনুসারে বলা যায়, তাকে হত্যা করার আগেই আল্লাহ তার প্রাণ তুলে নিয়ে যান। কোমায় থাকা একজন ব্যক্তির যেমন শারীরিক কার্যক্রম চলতে থাকে, কিন্তু তার দেহে প্রাণ থাকে না, ব্যাপারটি সেরকম। কোমায় চলে যাওয়া ব্যক্তিটি যদি কখনো জেগে না ওঠে তাহলে তার মৃত্যু তখনই হয়ে গিয়েছিলো যখন সে কোমায় গিয়েছিল (৩৯:৪২ আল্লাহ ঘুমের সময় মানুষের প্রাণ তুলে নেন)। অর্থাৎ, রোমকরা জীবিত ঈসাকে নয়, ঈসার প্রাণহীন দেহকে ক্রুশবিদ্ধ করেছিল।
- ‘রাফা’হু ইলাইহি’ (আল্লাহ তাঁকে নিজের দিকে উঠিয়ে নিয়েছেন) এর অর্থ জীবিত অবস্থায় আসমানে উঠিয়ে নেওয়া নয়, বরং মৃত্যুর মাধ্যমে সম্মানে উন্নীত করা। [৩:৫৫ আয়াতের সাথে মিলিয়ে দেখুন, যেখানে মুতাওয়াফ্ফীকা (মৃত্যু) আগে এবং রাফিউকা পরে]।
- ঐতিহাসিক দলিল: ১৯৪৫ সালে মিসরের নাগ হাম্মাদিতে প্রাচীন খ্রিস্ট ধর্মের বেশ কয়েকটি নথি আবিষ্কৃত হয়, যার একটিতে বলা আছে:
“ত্রাণকর্তা আমাকে বললেন, ‘যাকে তুমি গাছের ওপর আনন্দিত ও হাস্যোজ্জ্বল অবস্থায় দেখলে, সে হলো জীবন্ত ইয়েসুস (ঈসা)। আর যার হাতে ও পায়ে তারা পেরেক ঠুকছে, তা কেবলই রক্ত-মাংসের শরীর।“
[অ্যাপোক্যালিপস অফ পিটার, VII, ৩, ৮১], দ্য নাগ হাম্মাদি লাইব্রেরি (হার্পার অ্যান্ড রো, ১৯৭৭, জেমস এম. রবিনসন সম্পাদিত, পৃষ্ঠা ৩৩৯)
এই বর্ণনাটি কুরআনের সাথে অনেকাংশে সামঞ্জস্যপূর্ণ – যে, ঈসাকে ক্রুশকাষ্ঠে মৃত্যুদন্ড দেওয়ার আগেই আল্লাহ তার প্রাণ নিয়ে যান।
৫. ঈসার জীবনচক্র অন্য নবীদের মতোই
ঈসার কথা: [১৯:৩৩] “শান্তি আমার উপর যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি, যেদিন আমি মৃত্যুবরণ করব এবং যেদিন আমি জীবিত অবস্থায় উত্থিত হব।”
ইয়াহইয়ার ব্যাপারে: [১৯:১৫] “শান্তি তার উপর যেদিন তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন, যেদিন তিনি মৃত্যুবরণ করবেন এবং যেদিন তিনি জীবিত অবস্থায় উত্থিত হবেন।”
- দুজনের জীবনচক্র একই: জন্ম → মৃত্যু → পুনরুত্থান। এখানো ‘জীবিত উঠিয়ে নেয়া → ফিরে আসা → মৃত্যু’ এমন কিছুর উল্লেখ নেই।
৬. কুরআনে ঈসার নবুয়তের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী উল্লেখিত, কিন্তু দ্বিতীয় আগমনের কোনো উল্লেখ নেই
- [৫:১০৯-১১৫] আয়াতগুলো ঈসার নবুয়তের সব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা (শৈশবে কথা বলা, মাটির পাখিতে প্রাণ দেওয়া, অন্ধ-কুষ্ঠী নিরাময়, মৃতকে জীবিত করা, আসমান থেকে খাবার নামানো) বর্ণনা করেছে। কিন্তু দ্বিতীয় আগমনের কোনো উল্লেখ নেই, এত বড় ঘটনা সত্য হলে তা কুরআনে উল্লেখহীন থাকা অসম্ভব।
৭. ৪৩:৬১ আয়াত—দ্বিতীয় আগমনের প্রমাণ হিসেবে ভুল ব্যবহার
[৪৩:৬১] “আর নিশ্চয়ই সে কিয়ামতের এক সুনিশ্চিত জ্ঞান (ইন্নাহু লা’ইলমুন লিসসা’আহ)।”
প্রায় সব অনুবাদকই এই আয়াতের অনুবাদ করে রেখেছেন: আর নিশ্চয়ই সে (ঈসা) কিয়ামতের এক সুনিশ্চিত নিদর্শন। অথচ আয়াতটির কোথাও নিদর্শন(আয়াত) শব্দটি নেই। আছে ইলম (জ্ঞান) শব্দটি। অর্থাৎ, ঈসা ছিলেন কিয়ামতের একটি জ্ঞান।
- ঈসার মুজিযাগুলো ছিল পুনরুত্থান দিবসের প্রমাণ—কেন আল্লাহ মৃতকে জীবিত করতে পারবেন না যখন ঈসা মৃতদেহ বা মাটির পাখিতে প্রাণ সঞ্চার করতে পারতেন?
৮. মুহাম্মদ সর্বশেষ নবী
[৩৩:৪০] “মুহাম্মদ তোমাদের মধ্যেকার কোনো পুরুষের পিতা নন, তবে তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী।”
- খাতামুন নাবিয়্যীন: ঈসার দ্বিতীয় আগমন সত্য হলে তিনি শেষ নবী হতেন। কেউ কেউ বলে যে তিনি সাধারণ মানুষ হিসেবে আসবেন—তাহলে প্রশ্ন থাকে, তিনি সাধারণ মানুষ হয়ে আসলে কেন আল্লাহ তাকে বিশ্বশাসনের দায়িত্ব দেবেন?
কুরআন থেকে এটিই প্রতীয়মান হয় যে ঈসা নবী স্বাভাবিক নিয়মে মৃত্যুবরণ করেছেন। দাজ্জাল, মাহদী, ঈসা বা শেষ যমানার যুদ্ধ-বিগ্রহ—কুরআনের কোথাও এগুলোর কোনো উল্লেখ নেই।