‘সালাত আলা আন-নাবী’ এবং ‘তাসলিম’
মুসলিম সমাজে বহুল প্রচলিত একটি আরবি পরিভাষা হলো আল-সালাত আলা আন-নবী ওয়া আল-তাসলিম, যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় নবীর প্রতি সালাত এবং তাসলিম। উক্ত পরিভাষাটি নিম্নোক্ত আয়াত থেকে উৎসারিত:
নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ ‘ইউসাল্লুনা আলা আন-নাবী’। হে বিশ্বাসীগণ! তোমরাও ‘সাল্লু আলাইহি’ এবং ‘সাল্লিমু তাসলিমান’। (৩৩:৫৬)
আয়াতটির আক্ষরিক অনুবাদ হলো:
- আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি সালাত প্রদান করেন। হে বিশ্বাসীগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি সালাত প্রদান ও তাসলিম করো।
‘ইউসাল্লুনা’ শব্দটি ‘সালাত’ শব্দের ক্রিয়াপদ, যার অর্থ ‘সালাত প্রদান করা’ এবং এটি ‘ইউসাল্লি’-শব্দের বহুবচন। আয়াতটিতে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে কারণ এখানে সম্মিলিতভাবে আল্লাহ এবং ফেরেশতাগণের সালাত প্রদানের কথা বলা হয়েছে।
যেহেতু ‘সালাত আলা আন-নাবী’ এবং ‘তাসলিম’ আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সুস্পষ্ট নির্দেশনা, তাই এর সঠিক অর্থ বোঝাটা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আলোচ্য আয়াতটিতে দুটি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; একটি হলো ‘নবীর প্রতি সালাত প্রদান করা’ এবং অন্যটি হলো ‘তাসলিম করা’।
এখন কুরআনের আলোকে আমরা নির্দেশ দুটির প্রকৃত অর্থ খুঁজে বের করার চেষ্টা করবো।
প্রথম অংশ: ‘সালাত আলা আন-নাবী’
আমরা যদি মুসলিমদেরকে জিজ্ঞাসা করি, ‘সাল্লি আলা আন-নাবী’-এর অর্থ কী, তাহলে বিভিন্নজন থেকে বিভিন্নরকম উত্তর পাওয়া যাবে।
পাঠক নিজেও চেষ্টা করে দেখতে পারেন আপনার পক্ষে নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া সম্ভব হয় কিনা:
“আপনি যখন ‘সাল্লি আলা আন-নাবী’ বলেন, তখন আপনি আসলে কী বোঝাচ্ছেন? আপনি কি নবীর প্রশংসা করছেন? আপনি কি আল্লাহর কাছে নবীর জন্য কল্যাণ/বরকত প্রার্থনা করছেন? আপনি কি নবীকে স্মরণ করছেন যাতে তিনি কিয়ামতের দিন আপনার জন্য সুপারিশ করেন? নাকি… আসলে ঠিক কী?”
সাধারণ মুসলিমরা প্রতিদিন এই শব্দগুলো বহুবার উচ্চারণ করলেও এর সঠিক অর্থ সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত নয়; এখন প্রশ্ন হলো এই ব্যাপারে আলেমদের অভিমত কী?
তারা প্রথমেই বলবেন যে, ‘আল্লাহ এবং ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি সালাত পেশ করেন’ – এই কথার মাধ্যমে আল্লাহ ৩৩:৫৬ আয়াতে নবী মুহাম্মদ-কে আলাদাভাবে সম্মানিত করেছেন।
১. কুরআনের অন্যান্য অনেকগুলো আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে তাদের এই দাবি পুরোপুরি সঠিক নয়। একই সূরায় অল্প কয়েকটি আয়াত আগেই আমরা দেখতে পাই যে, আল্লাহ এবং ফেরেশতাগণ শুধু নবীর জন্য নন, বরং সকল বিশ্বাসীদের জন্যই সালাত প্রদান করেন:
তিনিই সেই সত্তা যিনি তোমাদের প্রতি ‘ইউসাল্লি’ (সালাত প্রদান করেন) এবং তাঁর ফেরেশতাগণও, তোমাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোতে বের করে আনার জন্য। (৩৩:৪৩)
২. ২:১৫৭ আয়াতেও আমরা একইরকম বর্ণনা দেখতে পাই:
তারা (বিশ্বাসীগণ) তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে ‘সালাওয়াত’ (সালাত-এর বহুবচন) ও করুণা লাভ করে এবং তারাই সৎপথপ্রাপ্ত। (২:১৫৭)
২:১৫৭ এবং ৩৩:৪৩ – দুটি আয়াতেই আমাদেরকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, আল্লাহ সকল বিশ্বাসীর জন্যই ‘সালাওয়াত’ প্রদান করেন। সুতরাং, ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে নবীর প্রতি ‘সালাত’ প্রদান করা – শুধু নবীর জন্য বিশেষ একপ্রকার সম্মান’, এই কথাটি সঠিক নয়।
৩. এছাড়াও, সূরা তাওবায় আল্লাহ নবীকে বিশ্বাসীদের প্রতি সালাত প্রদান করার নির্দেশ দিয়েছেন:
তাদের ধন-সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করুন, যা দ্বারা আপনি তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবেন। এবং আপনি তাদের জন্য ‘সাল্লি’ (সালাত প্রদান) করুন। আপনার ‘সালাওয়াত’ (সালাত-এর বহুবচন) তাদের জন্য প্রশান্তি স্বরূপ। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। (৯:১০৩)
৪. একই সূরায় আমরা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত পাই:
আর আরবদের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে এবং যা তারা ব্যয় করে তাকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের এবং রাসূলের ‘সালাওয়াত’ (সমর্থন) লাভের উপায় বলে গণ্য করে। জেনে রাখো, নিশ্চয়ই তা তাদের জন্য নৈকট্যে লাভের মাধ্যম। অচিরেই আল্লাহ তাদেরকে নিজ করুণার অধিভুক্ত করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (৯:৯৯)
এখানে ‘সালাওয়াত আর-রাসূল’ (রাসূলের সালাওয়াত) বাক্যাংশটি দ্বারা – বিশ্বাসীদের প্রতি রাসুলের সম্মান প্রদর্শন বা দরুদ পাঠ বুঝানো হয়নি। আবার এই ক্ষেত্রে রাসুলের পক্ষ থেকে বিশ্বাসীদের ওপর বরকত (blessing) আসে – এমনটিও হতে পারে না; যেহেতু সমস্ত বরকত (blessing) একমাত্র আল্লাহর কাছ থেকেই আসে।
উক্ত আয়াতের, একমাত্র গ্রহণযোগ্য অর্থ হলো যে, আরবদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস রাখে, তারা আল্লাহর নৈকট্য লাভের পাশাপাশি রাসূলের সমর্থন (সালাওয়াত আর-রাসূল) লাভের জন্যও দান করে থাকে।
যেহেতু এই ‘ইউসাল্লি’ (সালাত প্রদান করা) ক্রিয়াটি- আল্লাহ বিশ্বাসীদের জন্য (২:১৫৭, ৩৩:৪৩) এবং নবীও বিশ্বাসীদের জন্য (৯:১০৩) করে থাকেন, তাহলে কীভাবে কেউ দাবি করতে পারে যে ৩৩:৫৬ আয়াতে সাল্লি আলা মানে হলো কেবল নবীর ওপর দরুদ প্রেরণ?
এই জটিল অবস্থা থেকে উদ্ধার পেতে ব্যাখ্যাকারকগণ অত্যন্ত অস্বাভাবিক একটি অজুহাত দাঁড় করিয়েছেন। তারা দাবি করেন যে, উপরোক্ত আয়াতগুলোতে ব্যবহৃত ‘সালাওয়াত’ শব্দটির কমপক্ষে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন অর্থ রয়েছে!
১. যখন আল্লাহ নবীর জন্য ‘সালাত’ প্রদান করেন (৩৩:৫৬), তখন এর অর্থ তাঁকে বিশেষভাবে সম্মানিত করা।
২. যখন আল্লাহ বিশ্বাসীদের জন্য ‘সালাত’ প্রদান করেন (৩৩:৪৩, ২:১৫৭), তখন এর অর্থ তাদের প্রতি অনুগ্রহ বর্ষণ করা।
৩. যখন ফেরেশতারা নবীর জন্য ‘সালাত’ প্রদান করেন (৩৩:৫৬), তখন এর অর্থ তাঁর (নবীর) প্রশংসা করা।
৪. যখন ফেরেশতারা বিশ্বাসীদের জন্য (৩৩:৪৩) অথবা নবী বিশ্বাসীদের জন্য (৯:১০৩) ‘সালাত’ প্রদান করেন, তখন এর অর্থ তাদের জন্য আল্লাহর কাছে করুণা প্রার্থনা করা।
৫. যখন বিশ্বাসীরা নবীর জন্য ‘সালাত’ প্রদান করেন (৩৩:৫৬), তখন এর তাঁকে ভালোবাসা এবং তাঁকে অনুসরণ করা।
তাদের এমন ব্যাখ্যা কতটুকু গ্রহণযোগ্য? আল্লাহ যখন নবী এবং সকল বিশ্বাসীকে একই শব্দ দ্বারা একটি নির্দেশ দিলেন, তখন আলেমরা কীভাবে বলেন যে এর অর্থ পাত্রভেদে ভিন্ন ভিন্ন হবে?
তারচেয়েও বড় পরিতাপের বিষয় হলো, এই আলেমরা যে পাঁচটি অর্থ দিয়েছেন তার একটিও আয়াতগুলোর প্রেক্ষাপটে মানানসই নয়!
কুরআনে ‘সালাত’ শব্দটি প্রধানত দুটি ভিন্ন অর্থে উল্লেখিত হয়েছে:
প্রথম অর্থ: বিশ্বাসীদের পক্ষ থেকে আল্লাহর প্রতি সালাত – এটি একটি সুনির্দিষ্ট ইবাদত যা কুরআনে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ওজু, কিবলামুখী হওয়া, দাঁড়ানো, রুকু ও সিজদা করা এবং আল্লাহর প্রশংসা ও পবিত্রতা ঘোষণা করা। কুরআনের অনেকগুলো আয়াতে এই শারীরিক সালাতের বিবরণ উল্লেখ করা হয়েছে:
নিশ্চয়ই আমিই আল্লাহ, আমি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। সুতরাং তুমি আমার ইবাদত করো এবং আমাকে স্মরণ করার জন্য সালাত কায়েম করো। (২০:১৪)
দ্বিতীয় অর্থ: আল্লাহ ও ফেরেশতাদের পক্ষ থেকে প্রদত্ত সালাত – এটি কোন ইবাদত হতে পারে না; আল্লাহ কারো জন্য রুকু-সিজদা করেন না, আর বিশ্বাসীদেরও অন্য বিশ্বাসীদের উদেশ্যে রুকু-সিজদা করা সমীচীন নয়। সুতরাং, এই ক্ষেত্রগুলোতে সালাতের অর্থ ভিন্ন হতে হবে। দ্বিতীয় প্রকারের এই সালাতের কথা আমরা ৩৩:৪৩, ৩৩:৫৬, ৯:১০৩ এবং ২:১৫৭-ইত্যাদি আয়াতে দেখতে পাই।
এই দ্বিতীয় প্রকারের সালাতের সঠিক অর্থ খুঁজে পেতে হলে আমাদের যাত্রা শুরু করতে হবে ৩৩:৫৬ আয়াত থেকে। আয়াতটি থেকে আমরা জানতে পারি যে, আল্লাহ এবং ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি সালাত প্রদান করেন, এবং ঠিক একইভাবে বিশ্বাসীদেরকেও নবীর প্রতি সালাত প্রদান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যভাবে বললে, আল্লাহ নবীর জন্য, ফেরেশতাগণ নবীর জন্য এবং বিশ্বাসীরা নবীর জন্য একই কাজ সম্পাদন করে থাকেন।
সুতরাং, আমাদেরকে কুরআন থেকে এমন একটি কাজ খুঁজে বের করতে হবে যা নবীর জন্য আল্লাহ, ফেরেশতাগণ ও বিশ্বাসীগণ—সকলেই সম্পাদন করে থাকেন।
পুরো কুরআনে আমরা কেবল এমন একটিই কাজ দেখতে পাই যা আল্লাহ, ফেরেশতাগণ ও বিশ্বাসীগণ প্রত্যেকেই নবীর জন্য করে থাকেন—আর তা হলো ‘সমর্থন করা’ বা ‘সাহায্য করা’।
১. আল্লাহ তাঁর রাসূলকে এবং সকল বিশ্বাসীকে সমর্থন দেন:
নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলগণকে এবং যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে পার্থিব জীবনে সমর্থন দেব এবং সাক্ষীগণ দণ্ডায়মান হওয়ার দিনেও। (৪০:৫১)
যদি তোমরা তাঁকে (মুহাম্মদকে) সমর্থন না কর, তবে আল্লাহ তাঁকে সমর্থন করেছেন যখন কাফিররা তাঁকে বহিষ্কার করেছিল এবং তিনি ছিলেন গুহার দুজনের একজন; তিনি তার সঙ্গীকে বলেছিলেন, “বিষণ্ণ হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।” (৯:৪০)
২. আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতাগণ রাসূল ও বিশ্বাসীদের সাহায্য করেন:
যখন তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ফরিয়াদ করছিলে, তখন তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন: “আমি তোমাদেরকে এক হাজার অনুসরণকারী ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য করছি।” (৮:৯)
তুমি তখন বিশ্বাসীদেরকে বলছিলে, “এটা কি তোমাদের জন্য যথেষ্ট নয় যে, তোমাদের প্রতিপালক তোমাদেরকে তিন হাজার নাযিলকৃত ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য করবেন?” (৩:১২৪)
হ্যাঁ, যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, আর তারা তোমাদের উপর আকস্মিক আক্রমণ করে বসে, তবে তোমাদের প্রতিপালক তোমাদেরকে পাঁচ হাজার চিহ্নিত ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য করবেন। (৩:১২৫)
যদি তোমরা উভয়ে আল্লাহর কাছে তওবা কর, তবে তোমাদের অন্তর তো ঝুঁকে পড়েছে। কিন্তু যদি তোমরা তাঁর (নবীর) বিরুদ্ধে একে অপরকে সমর্থন কর, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর অভিভাবক এবং এরপর জিবরীল ও সৎকর্মপরায়ণ বিশ্বাসীগণ এবং ফেরেশতাগণও তার সহায়। (৬৬:৪)
৩. আল্লাহ বিশ্বাসীদেরকে রাসূলকে সমর্থন করার নির্দেশ দিয়েছেন:
(এ সম্পদ) সেই দরিদ্র মুহাজিরদের জন্য যারা তাদের নিজগৃহ ও সম্পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে, তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সমর্থন করে। তারাই সত্যাশ্রয়ী। (৫৯:৮)
সুতরাং যারা তাঁর (নবীর) প্রতি ঈমান এনেছে, তাঁকে সম্মান দিয়েছে, তাঁকে সমর্থন দিয়েছে এবং তাঁর সাথে নাযিলকৃত আলো (কুরআন) অনুসরণ করেছে, তারাই সফলকাম। (৭:১৫৭)
এই আলোচনায় ৩৩:৪৩ আয়াতের শব্দগুলো বিশ্লেষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ, কেননা এই আয়াত থেকেই ধারণা পাওয়া যায় – এই ধরণের আয়াতগুলোতে ‘সালাত’ শব্দের শুধুমাত্র একটি অর্থই গ্রহণযোগ্য হয়, আর তা হলো সমর্থন করা/সাহায্য করা।
১. ফেরেশতাদের এই ক্ষমতা নেই যে তারা বিশ্বাসীদের উপর বরকত (blessing) বর্ষণ করবে; সমস্ত বরকত (blessing) একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। ফেরেশতারা কোনো ঈমানদারের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করেন না; পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা হবে কেবল আল্লাহর জন্য। ফেরেশতারা কোনো মানুষকে দয়া করতে পারে না; সমস্ত দয়া আল্লাহর কাছ থেকেই আসে। ফেরেশতাদের কাউকে ক্ষমা করার ক্ষমতা নেই; সমস্ত ক্ষমা একমাত্র আল্লাহর কাছ থেকে আসে। ফেরেশতারা যা করতে পারেন তা হলো আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে বিশ্বাসীদের সমর্থন করা।
২. অনুরূপভাবে, আল্লাহ বিশ্বাসীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবেন না; আল্লাহ নিজেই ক্ষমাকারী। আল্লাহ কারো মহিমা ঘোষণা করেন না; সকল মহিমা আল্লাহরই। আবার আল্লাহ কারো ওপর দরুদও পড়েন না; মুসলিমদের মধ্যে যেসকল দরুদ প্রচলিত আছে সেগুলোতে সাধারণত আল্লাহর নিকট নবীর কল্যাণ কামনা করে প্রার্থনা করা হয়, আর আল্লাহ কারো নিকট প্রার্থনা করেন না। আল্লাহ যা করেন তা হলো তিনি বিশ্বাসীদের সমর্থন দেন (নবী মুহাম্মদসহ) তাদের অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসার জন্য।
৩. অনুরূপভাবে, যখন নবী বিশ্বাসীদের জন্য সালাত করেন, যেমন ৯:১০৩ আয়াতে তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, অথবা যখন বিশ্বাসীরা নবীর জন্য সালাত করে, যেমন ৩৩:৫৬ আয়াতে তাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তখন তা সাহায্য ও সমর্থন প্রদানের অর্থই প্রকাশ করে।
৪. সর্বোপরি, এটি উল্লেখ করা জরুরি যে, সমর্থনের এই কাজটি, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে নবীর জন্য হোক, ফেরেশতাদের পক্ষ থেকে নবীর জন্য হোক, অথবা বিশ্বাসীদের পক্ষ থেকে নবীর জন্য হোক, তা কেবলমাত্র নবীর জীবদ্দশায়ই সম্পাদিত হতে পারে। নবী এখন ইন্তেকাল করেছেন। তিনি বিশ্বাসীদের সমর্থন করতে সক্ষম নন (৯:১০৩ অনুযায়ী), আর বিশ্বাসীরাও তাঁকে সমর্থন করতে সক্ষম নন (৩৩:৫৬ অনুযায়ী)।
উদাহরণস্বরূপ, ৩৩:৪৩ আয়াতে প্রদত্ত সকল বিশ্বাসীর প্রতি আল্লাহর সমর্থনের উদ্দেশ্য হলো তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোতে বের করে আনা। এই সমর্থন কেবল বিশ্বাসীদের জীবদ্দশায় প্রযোজ্য, তাদের মৃত্যুর পর নয়। কেননা মৃত্যুর পর অন্ধকার থেকে আলোতে বেরিয়ে আসার কোন অবকাশ থাকে না; তখন আল্লাহর সত্য প্রকাশিত হয়ে যায় এবং সমস্ত মিথ্যা ধ্বংস হয়ে যায়।
দ্বিতীয় অংশ: ‘তাসলিম’-এর অর্থ
৩৩:৫৬ আয়াতে উল্লিখিত নির্দেশের দ্বিতীয় অংশ হলো ‘সাল্লিমু তাসলিমান’। এই নির্দেশের অর্থ বুঝতে হলে আমাদের ‘তাসলিম’ শব্দটির অর্থ নির্ধারণ করতে হবে।
একইভাবে, এই নির্দেশটিও আলেমরা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে। আয়াতের অর্থ ভুল বোঝার কারণে মুসলিমরা মৃত ব্যক্তির প্রতিও সালাম ও অভিবাদন প্রেরণ করে, অথচ কুরআনের আয়াত অনুসারে মৃত ব্যক্তিরা শুনতে বা প্রতিউত্তর দিতে সক্ষম নন। এই ভুল বুঝাবুঝি মূল কারণ হলো ৩৩:৫৬-আয়াতের ‘তাসলিম’ শব্দটিকে ‘সালাম’ বা ‘অভিবাদন’ অর্থে অনুবাদ করা, যেটি সঠিক নয়।
‘তাসলিম’ শব্দটির কুরআনিক অর্থ বের করতে হলে আমাদের কুরআনে ব্যবহৃত তাসলিম শব্দের অনুরূপ শব্দগুলোর অর্থ বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে।
১. ইসলাম: এটি আল্লাহ কর্তৃক অনুমোদিত একমাত্র দ্বীন বা জীবনব্যবস্থার নাম, এর অর্থ আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করা।
নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে একমাত্র মনোনীত ধর্ম হলো ইসলাম। (৩:১৯)
যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম অনুসন্ধান করে, তবে তা তার কাছ থেকে কখনো গৃহীত হবে না এবং আখিরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত। (৩:৮৫)
২. সালাম: এর অর্থ শান্তি, এবং এই শব্দটি মূলত শুভেচ্ছা বা অভিবাদন হিসেবেই বেশি ব্যবহৃত হয়।
আর যে ব্যক্তি তোমাদেরকে ‘সালাম’ (শান্তি) জানায়, তাকে তুমি বলো না, “তুমি মুমিন নও।” (৪:৯৪)
৩. সাল্ম্: এই শব্দটির অর্থও শান্তি।
আর যদি তারা শান্তি (সাল্ম্)-এর দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে তুমিও তার দিকে ঝুঁকে পড়ো এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করো। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। (৮:৬১)
৪. সালিম: এর অর্থ ত্রুটিহীন, সম্পূর্ণ বা পবিত্র।
যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো কাজে আসবে না, তবে যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে ‘সালিম’ (পবিত্র) হৃদয় নিয়ে আসবে, (সে ছাড়া)। (২৬:৮৮-৮৯)
৫. ইসতিসলাম: এর অর্থ আত্মসমর্পণ।
বরং আজ তারা ‘মুস্তাসলিমুন’ (পূর্ণ আত্মসমর্পণকারী)। (৩৭:২৬)
৬. সুল্লামান: এর অর্থ মই বা সিঁড়ি।
আর যদি তাদের বিমুখতা আপনার কাছে কষ্টকর হয়, তবে আপনি যদি সক্ষম হন, তবে পৃথিবীর মধ্যে কোনো সুড়ঙ্গ অথবা আকাশে কোনো ‘সুল্লামান’ (সিঁড়ি) সন্ধান করুন, অতঃপর তাদের কাছে কোনো নিদর্শন নিয়ে আসুন (তবুও তারা ঈমান আনবে না!) (৬:৩৫)
a শব্দটি ৩৩:৫৬ আয়াতে বর্ণিত নির্দেশের একটি অংশ, এর অর্থ স্বীকৃতি দেওয়া বামেনে নেওয়া।
পুরো কুরআনে মাত্র তিনটি আয়াতে ‘তাসলিম’ শব্দটির উল্লেখ আছে।
আয়াত ১
কিন্তু না, তোমার প্রতিপালকের কসম, তারা ঈমানদার হবে না যতক্ষণ না তারা নিজেদের সকল বিরোধে তোমাকে বিচারক করে, তারপর তুমি যে বিচার করো তাতে তাদের মন সবরকম সঙ্কীর্ণতামুক্ত থাকে এবং ‘ইউসাল্লিমু তাসলিমান’ (তা পুরোপুরি মেনে নেয়)। (৪:৬৫)
উক্ত আয়াতে আল্লাহ এই কথা বলছেন না যে, কেউ নবীর প্রতি সালাম প্রেরণ না করা পর্যন্ত সে মুমিন নয়; বরং তিনি বলছেন যে বিশ্বাসীদের মধ্যে বিবাদ মীমাংসার সময় নবী যে রায় দেন তা মেনে নেওয়া ঈমানদারদের কর্তব্য।
আয়াত ২
আর মুমিনরা যখন সম্মিলিত বাহিনীকে দেখলো তখন বললো, “এ তো তাই, যার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদেরকে দিয়েছিলেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সত্যই বলেছিলেন।“ আর এতে তাদের ঈমান ও তাসলিম (মান্যতা) কেবল বৃদ্ধিই পেলো। (৩৩:২২)
এখান আল্লাহ এই কথা বলছেন না যে, মুমিনদের ঈমান ও অভিবাদন বৃদ্ধি পেয়েছিল!
আয়াত ৩
নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি ‘ইউসাল্লুন’ (সমর্থন দেন)। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তার প্রতি ‘সাল্লু’ (সমর্থন দাও) এবং ‘সাল্লিমু তাসলিমান’ (তাঁকে পুরোপুরি মেনে নাও)। (৩৩:৫৬)
এই তৃতীয় আয়াতেও, তাসলিম শব্দের সঠিক অর্থ হলো মুহাম্মদকে আল্লাহর নবী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং পুরোপুরি মেনে নেওয়া।
‘তাসলিম’ শব্দটির অর্থ যে ‘অভিবাদন’ বা ‘সালাম জানানো’ নয় বরং ‘স্বীকৃতি প্রদান/মেনে নেওয়া’, তা নিশ্চিত করার একটি সহজ উপায় হলো উপরোক্ত তিনটি আয়াতে ‘তাসলিম’ শব্দটির জায়গায় প্রথমে ‘মেনে নেওয়া’ এবং পরে ‘অভিবাদন’ শব্দ দুটি বসিয়ে দেখা যে কোনটির ক্ষেত্রে আয়াতগুলোর অনুবাদ অর্থপূর্ণ হয়।
‘অভিবাদন’ শব্দটি ব্যবহার করে:
- আয়াত ১- কিন্তু না, তোমার প্রতিপালকের কসম! তারা ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না … তুমি যে বিচার করো তাতে তাদের মন সবরকম সঙ্কীর্ণতামুক্ত থাকে এবং তোমাকে অভিবাদন/সালাম জানায়। (৪:৬৫)
- আয়াত ২- “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সত্যই বলেছিলেন।” আর এতে তাদের ঈমান ও তাদের অভিবাদন কেবল বৃদ্ধিই পেল। (৩৩:২২)
এটা স্পষ্ট যে এই আয়াতগুলিতে তাসলিম শব্দের অর্থ হিসেবে ‘অভিবাদন/সালাম/শুভেচ্ছা’ ইত্যাদি বসানো সম্পূর্ণ অর্থহীন। কিন্তু আমরা যদি ‘তাসলিম’-এর জায়গায় ‘স্বীকৃতি দেওয়া/মেনে নেওয়া’ বসাই, তাহলে তিনটি আয়াতই পুরোপুরি অর্থপূর্ণ হয়।
সুতরাং, সূরা ৩৩-এর আয়াত ৫৬-এর সঠিক অর্থ হলো:
আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীকে সমর্থন দেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তাঁকে সমর্থন দাও এবং তাঁকে পুরোপুরি মেনে নাও। (৩৩:৫৬)
আয়াতের শেষ অংশে ‘সাল্লিমু তাসলিমান’ কথাটি এসেছে, সাল্লিম এবং তাসলিম – দুটো শব্দই একই মূল থেকে এসেছে। এখানে একই মূল থেকে উদ্ভূত দুটি শব্দ পাশাপাশি উল্লেখ করার মাধ্যমে ‘মেনে নেওয়া’র বিষয়টির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ, নবীকে পুরোপুরিভাবে মেনে নেওয়ার জন্য বিশ্বাসীদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আয়াতটি ভুল বোঝার কারণে অনেকে মনে করেন, নবীকে সম্বোধন করে সালাম দেওয়া যায় আর নবী সেই সালামের উত্তর দেন। অথচ, কুরআন বলছে ভিন্ন কথা। কুরআন বলছে যারা মৃত, তারা আমাদের কথা শুনতে পায় না, ফলে আমাদের কথার জবাবও দিতে পারে না।
বিশেষ করে, সালাতের মধ্যে তাশাহুদে নবীকে সম্বোধন করে সালাম দেওয়ার যে নিয়ম মুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত আছে তা বড় ধরনের একটি ভুল। সালাত হতে হবে শুধু আল্লাহর উদ্দেশ্যে (৬:১৬২, ২০:১৪)।
তাঁকে ছাড়া তোমরা যাদেরকে ডাকো তারা তো খেজুরের আঁটির আবরণটুকুরও মালিক নয়। যদি তোমরা তাদেরকে ডাকো, তবে তারা তোমাদের ডাক শুনতে পায় না, আর যদি শুনতেও পেত, তবুও তারা তোমাদের ডাকে সাড়া দিত না। (৩৫:১৩-১৪)