মুসলিম সমাজে প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, মেয়েরা পিরিয়ড চলাকালীন সময়ে সালাত পড়তে পারেন না এবং রোজা রাখতে পারেন না। এই নিষেধাজ্ঞাটি বহু শতাব্দী ধরে চলে আসলেও, প্রশ্ন হলো—আল্লাহর কিতাবে কি এর কোনো ভিত্তি আছে? নাকি এটি পরবর্তীকালে মানুষের তৈরি একটি বিধান? এই পোস্টে আমরা কুরআনের আলোকে বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখবো।
সালাত প্রসঙ্গে
১. একটিমাত্র ক্ষেত্রে সালাতে নিষেধাজ্ঞা
সমগ্র কুরআনের কোথাও মাসিককালীন মেয়েদেরকে সালাত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়নি। বরং, সালাত থেকে বিরত থাকার জন্য আল্লাহ শুধু একটিমাত্র কারণ উল্লেখ করেছেন:
“হে মুমিনগণ, তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সালাতের নিকটবর্তী হয়ো না, যতক্ষণ না তোমরা যা বলছ তা বুঝতে পারো।” — (৪:৪৩)
কারণটি স্পষ্ট: নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি তার নিজের কথাই বুঝতে পারে না, ফলে তার সালাত অর্থহীন হয়ে যায়। কিন্তু নেশাগ্রস্ত অবস্থা ছাড়া অন্য কোনো কারণে সালাত ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি আল্লাহ দেননি।
২. বিশেষ পরিস্থিতিতেও সালাত আদায়ের নির্দেশ
আল্লাহ বিভিন্ন কঠিন পরিস্থিতিতেও সালাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন:
- বিপদের আশঙ্কা থাকলে: হাঁটা বা আরোহী অবস্থাতেই (২:২৩৯)
- যুদ্ধের সময়ে: একদলের পর আরেকদল পর্যায়ক্রমে (৪:১০২)
- পানি না পাওয়া গেলে: তায়াম্মুমের মাধ্যমে (৪:৪৩)
অর্থাৎ, আল্লাহ কখনোই সালাত সম্পূর্ণ ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি দেননি। ঋতুস্রাবের কারণে যদি সালাত পড়া নিষিদ্ধ হতো তাহলে অবশ্যই কুরআনে স্পষ্টভাবে তার উল্লেখ থাকতো।
৩. পিরিয়ড সংক্রান্ত কুরআনের একমাত্র আয়াত
কুরআনে পিরিয়ডের বিষয়টি এসেছে শুধুমাত্র বিবাহিত দম্পতির যৌন সম্পর্কের প্রসঙ্গে:
“আর তারা আপনাকে ঋতুস্রাব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। আপনি বলুন, এটি আযা(কষ্টদায়ক/অস্বস্তিকর)। সুতরাং তোমরা ঋতুকালীন অবস্থায় স্ত্রীদের থেকে (সহবাস থেকে) বিরত থাকো এবং তারা পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হয়ো না। অতঃপর যখন তারা পবিত্র হবে, তখন তাদের নিকট সেইভাবে গমন করো যেভাবে আল্লাহ তোমাদের আদেশ দিয়েছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে তাদেরও ভালোবাসেন।” — (২:২২২)
এ আয়াতে ‘আযা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ কষ্ট, যন্ত্রণা বা অস্বস্তি। শুধুমাত্র স্বামী-স্ত্রীর শারীরিক সম্পর্কের প্রসঙ্গে এটি বলা হয়েছে—সালাত বা রোজার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
৪. ‘পবিত্রতা’র প্রসঙ্গ ভিন্ন
কেউ কেউ যুক্তি দেন যে ২:২২২ আয়াতে ‘পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত’ কথাটির উল্লেখ বোঝায় যে ঋতুকালীন সময়ে নারীরা অপবিত্র থাকে, তাই এসময় তারা সালাত আদায় করতে পারবে না। কিন্তু কুরআনের অন্যান্য আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।
কোন কোন বিষয়ের ক্ষেত্রে সালাতের আগে পবিত্রতা অর্জন করতে হবে সেগুলো কুরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে:
“”হে মুমিনগণ, যখন তোমরা সালাতের জন্য দাঁড়াও, তখন তোমাদের মুখমণ্ডল ও কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত করো এবং তোমাদের মাথা ও টাখনু পর্যন্ত পা মাসেহ করো। আর যদি তোমরা ‘জুনুব’ অবস্থায় থাকো, তবে পবিত্র হও। আর যদি তোমরা অসুস্থ হও কিংবা সফরে থাকো অথবা তোমাদের কেউ শৌচাগার থেকে আসে কিংবা তোমরা নারীদের সাথে সংগত হও এবং পানি না পাও, তবে পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করো…” — (৫:৬)
এ আয়াতে ‘জুনুব’ (যৌনসম্পর্ক পরবর্তী অবস্থা) এবং পেশাব-পায়খানার পর নিজেদেরকে পানি দিয়ে পবিত্র করতে বলা হয়েছে, কিন্তু মাসিকের ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি। যদি মাসিকের জন্য সালাত পড়া নিষিদ্ধ হতো, তবে এ আয়াতে স্পষ্টভাবে তা উল্লেখ করা হতো।
তারচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কুরআনে ‘তাহারা’ (পবিত্রতা) শব্দটি ভিন্ন ভিন্ন প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে, যার সবগুলো সালাতের সাথে সম্পর্কিত নয়। উদাহরণস্বরূপ:
- “…তিনি আকাশ থেকে তোমাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলেন তোমাদের পবিত্র করার জন্য…” — (৮:১১)
- “আপনি তাদের সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করুন, যার মাধ্যমে আপনি তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবেন।…” — (৯:১০৩)
- “হে নবীর পরিবার (আহলে বাইত)! আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদের পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।” — (৩৩:৩৩)
উপরোক্ত আয়াতগুলোতে ‘পবিত্রতা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, তারমানে কি এই যে, এই নির্দিষ্ট পবিত্রতাগুলো অর্জনের আগে লোকজন সালাতের জন্য অনুপযোগী ছিল?—কখনোই না। বরং প্রতিটি আয়াতের আলাদা আলাদা প্রসঙ্গ রয়েছে—একটিতে বৃষ্টির কথা, একটিতে দানের কথা, অন্যটিতে নবীর পরিবারের কথা বলা হয়েছে। এই ‘পবিত্রতা’গুলোর কোনোটিই সালাতের সাথে সম্পর্কিত নয়।
তদ্রূপ, ২:২২২ আয়াতের ‘পবিত্রতা’ (তাত্বহ্হারনা) শব্দটিও কেবল একটি নির্দিষ্ট প্রসঙ্গে—(যৌন সম্পর্ক স্থাপনের প্রেক্ষিতে) ব্যবহৃত হয়েছে। সালাতের জন্য ‘পবিত্রতা’ অর্জনের সঙ্গে একে গুলিয়ে ফেললে হবে না।
৫. অপরিচ্ছন্নতার যুক্তি খণ্ডন
যারা বলে মেয়েরা মাসিক অবস্থায় সালাত আদায় করতে পারবে না কারণ মেয়েরা এসময় অপরিচ্ছন্ন থাকে, তাদের উদ্দেশ্যে বলতে হয়—কোন মানুষই, হোক সে পুরুষ বা নারী, শারীরিকভাবে শতভাগ পরিচ্ছন্ন থাকে না। উদাহরণস্বরূপ:
- একজন পুরুষের শরীরে ইনফেকশন থাকতে পারে, যা জীবাণু আর ব্যাকটেরিয়া দিয়ে পূর্ণ। আমরাতো কখনোই শরীরে ইনফেকশন, ক্ষত বা পঁচনের কারণে কাউকে সালাত থেকে বিরত থাকতে দেখি না।
- আমাদের সবার শরীরের ভিতর অন্ত্রে বা মলাশয়ে মল জমা থেকে। আমরা এগুলো নিয়েই সারাদিন ঘুরি। এসবের কারণেতো কেউ যুক্তি দেয় না যে—মানব জাতি সৃষ্টিগতভাবেই অপবিত্র – তাই তারা সালাত পড়তে পারবে না!
তাহলে কেন শুধুমাত্র ঋতুস্রাবকে ‘অপবিত্র’ বলে মেয়েদেরকে সালাত থেকে বিরত রাখা হবে?— যদিও এটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার একটি অংশ!
সিয়াম প্রসঙ্গে
১. রোজা ছাড়ার কারণ
আল্লাহ শুধুমাত্র দুটি কারণে রমজান মাসে রোজা ভাঙার অনুমতি দিয়েছেন:
“রমজান মাস, যাতে কুরআন নাজিল করা হয়েছে—মানুষের জন্য পথনির্দেশক এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এই মাস পায়, তারা যেন এতে রোজা রাখে। আর যে অসুস্থ (মারিদ) বা সফরে থাকে, সে অন্য দিনগুলোতে এ সংখ্যা পূরণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ চান, তিনি তোমাদের জন্য কঠিন চান না…” — (২:১৮৫)
এ আয়াতে ‘ঋতুস্রাব’-এর কোনো উল্লেখ নেই। রোজা ছাড়ার অনুমতি কেবল অসুস্থতা (মারিদ) এবং সফরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
২. পিরিয়ড কি অসুস্থতার অন্তর্ভুক্ত?
এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো ঋতুস্রাবকে কি ‘অসুস্থতা’ বা ‘রোগ’ (মারিদ) হিসেবে গণ্য করা যায়?—কুরআনের কোথাও মেয়েদের পিরিয়ডকে মারিদ(রোগ/অসুস্থতা) হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি, বরং ২:২২২ আয়াতে একে আযা(কষ্ট/অস্বস্তি) হিসেবে উল্লখ করা হয়েছে।
কুরআন নিজেই একাধিক আয়াতে ‘মারিদ’ (অসুস্থতা) এবং ‘আযা’ (কষ্ট)-এ দুটি বিষয়কে আলাদাভাবে উল্লেখ করেছে:
“…অতঃপর তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ (মারিদান) থাকে অথবা যার মাথায় কোনো কষ্ট (আযা) থাকে, তাহলে তার উপর ফিদয়া…” — (২:১৯৬)
এ আয়াতে ‘মারিদ’ (অসুস্থতা) এবং ‘আযা’ (কষ্ট)—এই দুটি ভিন্ন শব্দ পাশাপাশি ব্যবহৃত হয়েছে, যা প্রমাণ করে শব্দ দুটি পরস্পর সমার্থক নয়।
“…তবে তোমাদের ওপর কোনো দোষ নেই যদি বৃষ্টির কারণে তোমরা কষ্ট (আযা) পাও অথবা তোমরা অসুস্থ (মারদা) হও…” — (৪:১০২)
এখানেও ‘আযা’ এবং ‘মারদা’ (অসুস্থ)—দুটি বিষয়কে পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পিরিয়ডের ব্যাপারে ২:২২২ আয়াতে ‘আযা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, ‘মারিদ’ নয়। তাই পিরিয়ডকে সরাসরি ‘অসুস্থতা’ বলা যায় না।
৩. মাসিককালে সিয়াম পালন
যেহেতু কুরআনে মাসিককালে রোজা ছাড়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি, তাই—নারীগণ পিরিয়ড চলাকালেও স্বাভাবিকভাবে রোজা রাখবেন। তবে যদি মাসিকের সময় এতটাই ব্যথা বা কষ্ট হয় যে তা শারীরিক অসুস্থতার পর্যায়ে চলে যায় সে ক্ষেত্রে ওই দিনগুলোতে রোজা ভাঙা যেতে পারে— পরবর্তীতে আবার সেগুলো কাযা করে নিতে হবে।
শেষ কথা: কুরআনই একমাত্র আইনের উৎস
আল্লাহ স্পষ্টভাবে বলেছেন:
“আপনি বলুন, ‘তোমাদের সেই সাক্ষীদের নিয়ে এসো যারা সাক্ষ্য দেবে যে আল্লাহ এগুলো হারাম করেছেন।’ অতঃপর তারা যদি সাক্ষ্য দেয়ও, আপনি তাদের সাথে সাক্ষ্য দেবেন না।…” — (৬:১৫০)
“তবে কি তাদের এমন কতগুলো শরীক আছে যারা তাদের জন্য দ্বীনের এমন বিধান প্রবর্তন করেছে যার অনুমতি আল্লাহ দেননি?” — (৪২:২১)
আল্লাহ ছাড়া কেউ হালাল-হারাম নির্ধারণ করতে পারেন না। যারা কুরআনে অনুমোদিত নয় এমন বিধান চালু করে, তারা মূলত আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করে।
মাসিক চলাকালে মেয়েদেরকে সালাত ও সিয়াম থেকে বিরত রাখার যে বিধান—এর ভিত্তি হলো হাদিস, কুরআন নয়। কিন্তু কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:
“তবে কি আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন বিচারক খুঁজব? অথচ তিনিই তোমাদের প্রতি নাযিল করেছেন বিস্তারিত কিতাব ।” —(৬:১১৪)
কুরআন বিস্তারিত, সুতরাং যেই বিধান কুরআনে নেই সে বিধান আল্লাহ দেননি। যারা কুরআনের আইন লঙ্ঘন করে এবং নারীদের ওপর মানবসৃষ্ট বিধান চাপিয়ে দেয় তাদেরকে কিয়ামতের দিন এর জন্য জবাবদিহি করতে হবে।