কুরআন থেকে পূর্ণাঙ্গ সালাতের নিয়ম

শুধু কুরআন মানতে হবে – এই কথা বললে অনেকেই বলেন যে কুরআনেতো সালাতের নিয়ম-কানুন বর্ণনা করা হয়নি। প্রকৃতপক্ষে সালাত সম্পন্ন করতে যা যা দরকার তার প্রয়োজনীয় সকল তথ্য কুরআনেই দেয়া আছে। মনোযোগ দিয়ে অধ্যয়ন করলে আমরা বুঝতে পারবো যে, এর জন্য অন্য কোনো উৎসের প্রয়োজন নেই। অনেকে বলেন, সালাত শিখতে হাদিসের প্রয়োজন হয়। এর জবাবে আমি বলবো— কোন হাদিস? আজ পর্যন্ত আমি এমন কোনো হাদিস পাইনি যা ধাপে ধাপে সালাতের সম্পূর্ণ পদ্ধতি বর্ণনা করে। ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি ও অঞ্চলের মানুষজন ভিন্ন ভিন্ন নিয়মে সালাত আদায় করে। তবুও সেগুলোর সবকটিই সালাত হিসেবে গণ্য করা হয় – কারণ সেগুলো কুরআনে বর্ণিত সালাতের মৌলিক শর্তগুলো পূরণ করে।

“তবে কি আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে বিচারক হিসেবে গ্রহণ করব? অথচ তিনিই তোমাদের নিকট অবতীর্ণ করেছেন বিস্তারিত কিতাব। আর যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি, তারা জানে যে, এটি তোমার রবের পক্ষ থেকে সত্যসহ অবতীর্ণ। সুতরাং তুমি সংশয়বাদীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। (৬:১১৪)

নিচে আল্লাহ কর্তৃক অনুমোদিত সালাতের বিস্তারিত নিয়ম দেয়া হলো:

কুরআনে ওযুর নিয়ম অত্যন্ত সহজ, মাত্র ৪টি ধাপ:
১. মুখমণ্ডল ধৌত করা
২. কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত করা
৩. মাথা মাসেহ করা
৪. টাখনু পর্যন্ত পা মাসেহ করা (বা মোছা)

“হে মুমিনগণ, যখন তোমরা সালাতের জন্য দাঁড়াবে, তখন তোমাদের মুখমণ্ডল এবং কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত করো, আর তোমাদের মাথা এবং টাখনু পর্যন্ত পা মাসেহ করো।” (৫:৬)

কুরআনে যতটুকু আছে ততটুকুই যথেষ্ট, এখানে কোনো অতিরিক্ত ধাপ বা বারবার ধোয়ার বাধ্যবাধকতা নেই।

আর যদি শরীর ও কাপড় ময়লা বা অপবিত্র অবস্থায় থাকে তবে তা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে (৫:৬, ৪:৪৩)।

যদি আপনি অসুস্থ থাকেন বা সফরে থাকেন এবং পানি না পান, তবে পরিষ্কার মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করে নিবেন।

“…যদি পানি না পাও, তবে পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করো—তোমাদের মুখমণ্ডল ও হাত মাসহ করো।” (৪:৪৩)

তায়াম্মুমের ধাপ ২টি:
১. মুখমণ্ডল মোছা
২. হাত মোছা

“…অতএব তোমরা মাসজিদুল হারামের দিকে মুখ ফেরাও। তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, সেদিকেই মুখ ফেরাও…” (২:১৪৪)

  • সালাতুল ফজর – ভোরের সালাত
  • সালাতুল উস্তা – মধ্যবর্তী সালাত
  • সালাতুল ইশা – সন্ধ্যার সালাত

(ইশা অর্থ অন্ধকার রাত নয়, ইশা অর্থ সন্ধ্যা, উদাহরণস্বরূপ ১২:১৬ আয়াতের অনুবাদ দেখুন)

সালাতুল ফজর ও সালাতুল ইশার নাম ২৪:৫৮ আয়াতে এবং সালাতুল উস্তার নাম ২:২৩৮ আয়াতে উল্লেখ আছে।

“হে মুমিনগণ, তোমাদের দাসদাসী এবং তোমাদের সন্তানদের মধ্যে যারা সাবালক হয়নি, তারা যেন তিন সময়ে (তোমাদের কক্ষে প্রবেশের আগে) অনুমতি নেয়—সালাতুল ফজরের আগে, দুপুরে যখন তোমরা পোশাক ছেড়ে বিশ্রাম নাও এবং সালাতুল ইশার পর…” (২৪:৫৮)

“তোমরা সালাতসমূহ এবং সালাতুল উস্তা (মধ্যবর্তী সালাত) রক্ষা করো এবং আল্লাহর সামনে বিনীতভাবে দাঁড়াও।” (২:২৩৮)

সালাত মুমিনদের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে ফরজ করা হয়েছে (৪:১০৩)। আল্লাহ যেহেতু নির্দিষ্ট সময়ের কথা বলেছেন, তাই আমাদের প্রতিটি সালাতের শুরু ও শেষ সময় খুঁজে বের করতে হবে।

ব্যাখ্যা: ‘সালাতুল ইশা’ অংশে দেখুন।

“সূর্য হেলে পড়ার পর (দুলুক) রাতের অন্ধকার পর্যন্ত সালাত কায়েম করো…” (১৭:৭৮)

‘দুলুক’ মানে হলো আকাশ থেকে সূর্যের হেলে পড়া, যা মধ্যদুপুরের পর ঘটে।

বর্তমানে সুন্নিদের যোহর এবং আসর – এই দুই ওয়াক্তের সময় মিলিয়ে আমাদের মধ্যবর্তী (উসতা) সালাতের ওয়াক্ত।

“সালাত কায়েম করো দিনের দুই প্রান্তে এবং রাতের নিকটবর্তী অংশসমূহে। নিশ্চয়ই নেক আমল গুনাহ দূর করে দেয়…” (১১:১১৪)

অনেকে মনে করেন (১১:১১৪) আয়াতে তিনটি সালাতের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি দুটি সালাতের সময়সীমা দেয় – ফজর ও ইশা। “দিনের দুই প্রান্ত” বলতে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত-কে বোঝায়। কিন্তু সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত সালাতের সময় নয়, কেননা সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত খুব অল্প সময় স্থায়ী হয়। আয়াতে ঠিক এর পরের অংশেই বলা আছে “এবং রাতের নিকটবর্তী অংশসমূহ”। এখানে রাতের নিকটবর্তী অংশসমূহ বলতে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত সংলগ্ন যে সময়গুলো রাতের মধ্যে পড়ে সে সময়কে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, ভোর (সূর্যোদয়ের পূর্বে) এবং সন্ধ্যা (সূর্যাস্তের পর)। ভোর এবং সন্ধ্যা দুটোই রাতের অংশ। সুতরাং, দিনের দুই প্রান্ত এবং রাতের নিকটবর্তী অংশ বলতে ভোর (ফজর) এবং সন্ধ্যা (ইশা) কে নির্দেশ করে।

দ্রষ্টব্য: কোনো সালাতের নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলে তা আর কাজা করা যায় না। কুরআনে রোজা কাজা করার নিয়ম বর্ণিত আছে, কিন্তু সালাতের কোনো কাজা নেই।

কুরআনে সালাতের ৩ টি অবস্থান বর্ণনা করা হয়েছে:

১. দাঁড়ানো (কিয়াম)
২. রুকু ও
৩. সিজদা

“আমি ইব্রাহিমকে ঘরের স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম এই বলে যে, আমার সাথে কাউকে শরিক করো না এবং আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, দণ্ডায়মান (দাঁড়ানো), রুকুকারী ও সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখো।” (২২:২৬)

“সালাত কায়েম করো, যাকাত দাও এবং রুকুকারীদের সাথে রুকু করো।” (২:৪৩)

সালাতে হাত বাঁধার ব্যাপারে কুরআনে কিছু বলা হয়নি। তাই আপনি চাইলে হাত বাঁধতে পারেন আবার নাও বাঁধতে পারেন।

সালাত শুধুমাত্র আল্লাহর প্রতি নিবেদিত হবে, সেখানে ইব্রাহিম, মুহাম্মদ বা ফেরেশতাদের প্রতি দরূদ প্রেরণ করা যাবে না।

“বলো, নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও মরণ জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য। তাঁর কোনো শরিক নেই…” (৬:১৬২-১৬৩)

“বলো, তোমরা আল্লাহকে ডাকো বা রহমান নামে ডাকো… তোমরা সালাতে স্বর খুব উচ্চে করো না আবার একেবারে নিচুও করো না, বরং এ দুয়ের মধ্যবর্তী পথ অবলম্বন করো।” (১৭:১১০)

“তোমার প্রতি কিতাবের যা ওহি করা হয়েছে তা পাঠ করো এবং সালাত কায়েম করো…” (২৯:৪৫)

সালাত শুরুর আগে মনে মনে বা শব্দ করে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া যেতে পারে (১৬:৯৮)। যেহেতু কুরআন আরবিতে নাজিল হয়েছে, তাই সালাতে আরবিতে পাঠ করাই উত্তম, তবে অন্য ভাষায় পাঠ করলেও কোনো সমস্যা নেই।

সালাতের শুরুতে সুরা ফাতিহা পাঠ করা একটি ভালো অভ্যাস হতে পারে (১:১-৭)। মনে রাখতে হবে, “আমিন” শব্দটি কুরআনের অংশ নয়, তাই সুরা ফাতিহার পর এটি বলার প্রয়োজন নেই।

“আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই; ফেরেশতাগণ এবং জ্ঞানীগণও ন্যায়নিষ্ঠার সাথে এই সাক্ষ্য দেয়…” (৩:১৮)।

সালাতের মধ্যে এই শাহাদাহ পাঠ করা যেতে পারে।

সালাতের মধ্যে আল্লাহর প্রশংসাসূচক আয়াতগুলো পাঠ করা যেতে পারে:

“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি কোনো সন্তান গ্রহণ করেননি, যাঁর সার্বভৌমত্বে কোনো শরিক নেই এবং যিনি দুর্বলতা থেকে বাঁচার জন্য কোনো সাহায্যকারীর মুখাপেক্ষী নন।” (১৭:১১১)

এবং সেই সাথে বারবার আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করা (৭৪:৩, ৯:৭২, ৫৬:৭৪, ৮৭:১)।

“সেখানে তাদের প্রার্থনা হবে—’হে আল্লাহ, আপনি পবিত্র (সুবহানাকা আল্লাহুম্মা)’, তাদের সম্ভাষণ হবে ‘সালাম’ এবং তাদের প্রার্থনার সমাপ্তি হবে—’সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য’।” (১০:১০)

  • দাঁড়িয়ে: আউযুবিল্লাহ… বিসমিল্লাহ… সুরা ফাতিহা… আল্লাহু আকবার
  • রুকুতে: “সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম” (আমার মহান রবের পবিত্রতা ঘোষণা করছি)
  • সিজদায়: “সুবহানা রাব্বিয়াল আলা” (আমার সর্বোচ্চ রবের পবিত্রতা ঘোষণা করছি)
  • পরিশেষে: “আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন” (সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য)

সালাতে যে এই নির্দিষ্ট আয়াত বা শব্দগুলোই পাঠ করতে হবে এমন কোনো বাধাধরা নিয়ম নেই। বরং আপনার পছন্দ অনুযায়ী, যেকোনো অবস্থানে আল্লাহর প্রশংসাসূচক বা আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করে এমন যেকোনো আয়াত পাঠ করতে পারেন, কিংবা আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করতে পারেন।

৪:১০২ আয়াত অনুযায়ী সিজদার মাধ্যমে সালাতের সমাপ্তি ঘটে। কুরআনে কোনো ‘রাকাত’ বা ‘রাকাত সংখ্যা’-র উল্লেখ নেই। কেউ চাইলে একবার কিয়াম, রুকু ও সিজদা করেই সালাত শেষ করে দিতে পারে, আবার কেউ চাইলে এগুলো একাধিকবারও করতে পারে।

সালাত কায়েম করা সরাসরি আল্লাহর আদেশ (৯৮:৫)। ২:২-৩, ৫:৫৫ ও ২:২৭৭ আয়াতগুলোতে সালাত ও যাকাতকে মুমিনদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যারা সালাত রক্ষা করে, তারা জান্নাতে সম্মানিত হবে (৭০:৩৪-৩৫)। অপরদিকে সালাত বর্জন করাকে উল্লেখ করা হয়েছে জাহান্নামিদের অন্যতম একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে (৭৪:৪২-৪৭)।

(source: rightlyguidedteacher.com)