মুসলিমদের মধ্যে বহুল প্রচলিত একটি রীতি হলো, সাহাবীগণ বা কিছু শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের নামের সঙ্গে ‘রাযি আল্লাহু আনহু’ যুক্ত করা। অধিকাংশ মুসলিম মনে করে—এটি হয়তো একপ্রকার দোয়া। কিন্তু কথাটির সঠিক মর্ম না বোঝার কারণে অনেক সময় আমরা আল্লাহর ওপর এমন বিষয় আরোপ করি যে বিষয়ে আমাদের কোনো জ্ঞান নেই।
‘রাযি আল্লাহু আনহু’ এর তিনটি রূপ:
১. রাযি আল্লাহু আনহু – একবচন, পুরুষের জন্য
২. রাযি আল্লাহু আনহা – একবচন, নারীর জন্য
৩. রাযি আল্লাহু আনহুম – বহুবচন, নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য (এটিই একমাত্র রূপ যা কুরআনে ব্যবহৃত হয়েছে)
আরবি ভাষায় বাক্যটি সাধারণত দুটি অর্থে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়:
দোয়া হিসেবে: ‘আল্লাহ তাঁর উপর সন্তুষ্ট হোন’ – প্রচলিত আরবিতে অধিকাংশ লোক এই অর্থে বাক্যটি ব্যবহার করলেও, এটি কুরআন সমর্থিত অর্থ নয়।
নিশ্চিত সত্য হিসেবে: ‘আল্লাহ তাঁর উপর সন্তুষ্ট’ – কুরআনে এই অর্থেই বাক্যটি ব্যবহৃত হয়েছে।
এই দুটি অর্থের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো: প্রথমটি একটি দোয়া (আশা প্রকাশ), আর দ্বিতীয়টি একটি সত্য ঘোষণা (নিশ্চিত জ্ঞান)। আমরা যদি ‘রাযি আল্লাহু আনহু’ কথাটি কুরআনে যে অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে সে অর্থে ব্যবহার করি, তাহলে তা বোঝায়, ওই ব্যক্তি সম্পর্কে আমাদের নিশ্চিত জ্ঞান আছে যে আল্লাহ তার উপর সন্তুষ্ট !—বিষয়টি আসলে অত্যন্ত গুরুতর।
কুরআনে ‘রাযি আল্লাহু আনহুম’ এর ব্যবহার
১. [৯৮:৮] “তাদের রবের নিকট তাদের প্রতিদান হচ্ছে স্থায়ী জান্নাত, যার তলদেশ দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। এটি তার জন্য, যে তার রবকে ভয় করে।”
এখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যারা জান্নাতে প্রবেশ করেছে আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট। কিন্তু কে জান্নাতে যাবে আর কে জাহান্নামে যাবে এই জ্ঞান কেবল আল্লাহরই। সুতরাং আল্লাহ কার ওপর সন্তুষ্ট সেটি ঘোষণা করার অধিকারও একমাত্র আল্লাহর।
২. [৫৮:২২] “আর তিনি তাদেরকে প্রবেশ করাবেন এমন জান্নাতে, যার তলদেশ দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত; সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আল্লাহর দল। জেনে রাখুন, আল্লাহর দলই সফলকাম।”
৩. [৯:১০০] “আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম ও অগ্রগামী এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন জান্নাত, যার তলদেশ দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত; সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। এটাই হলো মহাসাফল্য।”
এখানে লক্ষ্য করার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো, এই আয়াতগুলোতে যাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে তাদের কারো ব্যক্তিগত পরিচয় কুরআনে উল্লেখ করা হয়নি।
পরবর্তী ইতিহাসবিদরা কয়েক শতাব্দী পরে এসে এসব পরিচয় বের করেছেন!
কুরআনে সাহাবীদের নাম উল্লেখ করা হয়নি
একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো: কুরআনে রাসূলুল্লাহর সাহাবীদের নাম উল্লেখ করা হয়নি। একমাত্র ব্যতিক্রম হলো:
- যায়েদ (৩৩:৩৭) – পালক পুত্রের বিষয়ে
এখন প্রশ্ন হলো: যদি কুরআন অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে যায়েদের নাম উল্লেখ করে থাকে, তাহলে:
- কেন শিয়া ইমামতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলীর নাম উল্লেখ করেনি?
- কেন আবু বকর, ওমর, ওসমানের নাম উল্লেখ করেনি?
- কেন আয়েশা বা নবীর অন্য কোনো স্ত্রীর নাম উল্লেখ করেনি?
অর্থাৎ, যেই ব্যক্তিদেরকে শিয়া ও সুন্নিরা পরম আরাধ্য বলে মনে করে তাদের কারো নাম কেন কুরআনে উল্লেখ করা হয়নি? অথচ হাদিস-তাফসির ও ইসলামের দ্বিতীয় উৎসগুলো তাদের গল্প-গাঁথায় পরিপূর্ণ!
হাওয়ারিয়ুন: ঈসার সঙ্গীগণ
এছাড়াও কুরআনে ঈসার সঙ্গীদের কারো নামও সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। সূরা আলে ইমরান-এ ঈসার সঙ্গীদের বোঝাতে ‘আল-হাওয়ারিয়ুন’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যারা অর্থ সাদা পোশাকধারী:
[৩:৫২] “অতঃপর ঈসা যখন তাদের কুফরী উপলব্ধি করলেন, তখন বললেন, ‘আল্লাহর পথে কারা আমার সাহায্যকারী?’ হাওয়ারিয়ুন (সাদা পোশাকধারীগণ) বললো, ‘আমরাই আল্লাহর সাহায্যকারী; আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি এবং আপনি সাক্ষী থাকুন যে, নিশ্চয়ই আমরা মুসলিম (আত্মসমর্পণকারী)।’”
হাওয়ারিয়ুন’ শব্দটি ‘হাওয়ার’ থেকে এসেছে – যার অর্থ ‘শুভ্রতা’। এখানে আল্লাহ নির্দিষ্ট করে কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেননি। কারণ, এমন হতে পারে যে ঈসার সঙ্গী/ছাত্রদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো পরবর্তীতে পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে।
মুহাম্মদের সাহাবীদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য; তারা শেষপর্যন্ত সত্যের উপর অটল থেকেছেন কিনা সেটি কুরআনের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ নয়।
আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা: নিজেকে পবিত্র বলে দাবি করো না
[৫৩:৩২] “যারা ছোটখাট দোষ-ত্রুটি ছাড়া বড় বড় পাপ ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত থাকে, নিশ্চয় আপনার রবের ক্ষমা অতি প্রশস্ত। তিনি তোমাদের সম্পর্কে সম্যক অবগত—যখন তিনি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যখন তোমরা তোমাদের মাতৃগর্ভে ভ্রূণরূপে ছিলে। অতএব তোমরা নিজেদেরকে পবিত্র বলে দাবি করো না; কে তাকওয়া অবলম্বন করেছে সে সম্পর্কে তিনিই সবচেয়ে ভালো জানেন।”
সুতরাং, কোনো ব্যক্তির পবিত্রতা বা আল্লাহর সন্তুষ্টি সম্পর্কে নিশ্চিত করে বলা কেবল আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত। তিনি কার ওপর সন্তুষ্ট আর কার ওপর অসন্তুষ্ট তা আমাদের পক্ষে বলা সম্ভব নয়।
বাইয়াত গ্রহণকারীদের ওপর আল্লাহর সন্তুষ্টি
অনেকেই ৪৮:১৮ আয়াতটি উল্লেখ করে বলেন যে আল্লাহ সকল সাহাবীর ওপর সন্তুষ্ট:
[৪৮:১৮] “মুমিনগণ যখন গাছের নিচে আপনার কাছে বাইয়াত গ্রহণ করছিল, তখন আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন। তাদের অন্তরে যা ছিল তা তিনি জেনে নিয়েছেন; অতঃপর তিনি তাদের ওপর প্রশান্তি নাজিল করলেন এবং তাদেরকে আসন্ন বিজয়ের পুরস্কার দিলেন।”
কিন্তু এই আয়াতে উল্লেখ করা হয়নি:
- বাইয়াত গ্রহণকারী কারা ছিলেন বা তাদের নাম।
- এখানে কি সকল ঈমানদার সাহাবীর কথা বলা হয়েছে নাকি শুধু তাদের একটি অংশের কথা বলা হয়েছে। (৪৮:১৬ থেকে জানা যায় বাইয়াত গ্রহণকালে সবাই উপস্থিত ছিল না)
- তাদের জন্য উক্ত আয়াতে উল্লিখিত ‘আসন্ন বিজয়’ ছাড়া পরবর্তীতে আর কোন পুরস্কার আছে কিনা।
তার চেয়েও বড় কথা হলো, তারা পরবর্তীতে সরল পথের উপর অবিচল থেকেছেন কিনা এবং পরকালে তাদের কী পরিণতি হবে সেটিও আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। একই সূরায় কয়েকটি আয়াত আগেই বলা হয়েছে:
[৪৮:১০] “যারা আপনার কাছে বাইয়াত গ্রহণ করে, তারা তো আল্লাহরই কাছে বাইয়াত গ্রহণ করে। তাদের হাতের ওপর আল্লাহর হাত রয়েছে। সুতরাং যে অঙ্গীকার ভঙ্গ করে, সে নিজের ক্ষতির জন্যই তা ভঙ্গ করে; আর যে আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করে, আল্লাহ অচিরেই তাকে মহাপুরস্কার দান করবেন।”
এই আয়াতে অঙ্গীকার ভঙ্গের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে। বনী ইসরাঈলের ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি যে,তারা বারবার অঙ্গীকার করেও সেগুলো ভঙ্গ করতো।
নবী জানতেন না কারা মুনাফিক ছিলো
[৯:১০১] “আর তোমাদের আশপাশের বেদুঈনদের মধ্যে কিছু মুনাফিক আছে এবং মদিনাবাসীদের মধ্যেও; তারা মুনাফেকিতে চরমভাবে অভ্যস্ত। আপনি তাদেরকে জানেন না, আমি তাদেরকে জানি। আমি তাদেরকে দু’বার শাস্তি দেব; তারপর তাদেরকে মহাশাস্তির দিকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে।”
নবী নিজেও জানতেন না কারা মুনাফিক। এমনকি যারা নবীজির সাথে সালাতে দাঁড়াতো তাদের মধ্যেও হয়তো কেউ কেউ মুনাফিক ছিল (৪:১৪২-১৪৩)।
এছাড়াও সূরা আল-আহকাফ-এ নবীকে বলতে বলা হয়েছে:
[৪৬:০৯] “বলুন, ‘আমি তো রাসূলদের মধ্যে নতুন কেউ নই। আমি জানি না আমার ও তোমাদের সাথে কী আচরণ করা হবে। আমার প্রতি যা ওহী করা হয়, আমি শুধু তারই অনুসরণ করি। আর আমি তো একজন সুস্পষ্ট সতর্ককারী মাত্র।’”
খিলাফতের প্রতিশ্রুতি
[২৪:৫৫] “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি অবশ্যই তাদেরকে পৃথিবীতে খিলাফত (প্রতিনিধিত্ব) দান করবেন, যেমন তিনি খিলাফত দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে। আর তিনি অবশ্যই তাদের জন্য সুদৃঢ় করবেন তাদের দীনকে, যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়-ভীতির পরিবর্তে তাদেরকে অবশ্যই নিরাপত্তা দান করবেন। তারা কেবল আমারই ইবাদত করবে, আমার সাথে কাউকে শরিক করবে না। আর এরপর যারা কুফরী করবে, তারাই ফাসিক।”
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, নবীর সমসাময়িক যারা ঈমান এনেছিলেন এবং সৎকাজ করেছিলেন তাদের মধ্যে যারা ক্ষমতা (খিলাফত) পেয়েছিলেন তারা আল্লাহর দেওয়া এই প্রতিশ্রুতির আওতায় পড়েন—কিন্তু শর্ত হলো, তারা যেন শেষ পর্যন্ত ঈমানের ওপর অটল থাকেন।
নবীর স্ত্রীদের ব্যাপারে সতর্কতা
[৩৩:৩০] “হে নবীর স্ত্রীগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ প্রকাশ্য অশ্লীল কাজ করলে তাকে দ্বিগুণ শাস্তি দেওয়া হবে। আর আল্লাহর পক্ষে এটা খুবই সহজ।”
যদি নবীর সকল স্ত্রীর জান্নাত আগে থেকেই নিশ্চিত থাকতো, তাহলে কুরআনে এই সতর্কবার্তা উল্লেখের কোনো অর্থ থাকতো না।
উপসংহার
যে ব্যাপার কেবল আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত এবং যে ব্যাপারে আমাদের কোন জ্ঞান নেই সে ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলা আমাদের উচিত নয় (২:১৬৯)। কে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করেছে—সেটি কেবল আল্লাহই জানেন। কিয়ামতের দিনই তা প্রকাশ পাবে।
এছাড়াও, পূর্ববর্তীদের ঈমান ও আমল নিয়ে গবেষণা করা আমাদের জন্য সমীচীন নয়।
[২:১৪১] “তারা এমন এক সম্প্রদায়, যারা অতীত হয়ে গেছে। তারা যা অর্জন করেছে তা তাদের, আর তোমরা যা অর্জন করেছ তা তোমাদের। তারা যা করত সে সম্পর্কে তোমাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে না।”
বরং, আমাদের উচিত নিজ নিজ আমলের প্রতি মনোযোগী হওয়া। সাহাবীদের জন্য দোয়া করা যায়, কিন্তু তাদের ব্যাপারে নিশ্চিত করে এই কথা বলা যে – আল্লাহ তাদের ওপর সন্তুষ্ট—এটি মোটেও কুরআনসম্মত নয়।