কুরআন সৃষ্ট না অসৃষ্ট?

(Source: qurantalkblog.com)

খ্রিস্টীয় নবম শতাব্দীতে মুসলিম বিশ্বে মুতাযিলা ও সুন্নি সম্প্রদায়ের মধ্যে বিতর্কের সবচেয়ে বড় বিষয়টি ছিল ‘কুরআন কি—সৃষ্ট না অসৃষ্ট?’। মুতাযিলারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতো যে কুরআন সৃষ্ট, কারণ কুরআন যেহেতু আল্লাহর বাণী তাই আল্লাহকে অবশ্যই তার বাণীর আগে থাকতে হবে। অন্যদিকে সুন্নিরা মনে করতো কুরআন আল্লাহর অনাদি সত্তার অংশ। তাদের এই অবস্থানের সবচেয়ে কঠোর প্রকাশ পাওয়া যায় সুন্নি আলেম আল-তাবারীর একটি উক্তিতে: “যে ব্যক্তি এর বিপরীত কথা বলবে (অর্থাৎ যে বলবে কুরআন মাখলুক) সে কাফির, তার রক্ত বৈধ এবং তার থেকে আল্লাহ সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন।”

প্রথম দর্শনে এই বিতর্কটি তুচ্ছ মনে হতে পারে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এর মধ্যে গভীর দার্শনিক তাৎপর্য লুকিয়ে আছে।

৭৫০ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসীয় রাজবংশ উমাইয়াদের উৎখাত করে খিলাফত দখল করে। আব্বাসীয়রা ছিল নবী মুহাম্মদ এর চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের বংশধর।

নীচে আব্বাসীয় খলিফাদের একটি তালিকা দেওয়া হলো। কুরআন সৃষ্ট কি না এই বিতর্কের সাথে সবচেয়ে বেশি জড়িত খলিফারা হলেন আল-মামুন থেকে আল-মুতাওয়াক্কিল পর্যন্ত।

  • আল-সাফফাহ (৭৫০–৭৫৪ খ্রি.)
  • আল-মানসুর (৭৫৪–৭৭৫ খ্রি.
  • আল-মাহদী (৭৭৫–৭৮৫ খ্রি.)
  • আল-হাদী (৭৮৫–৭৮৬ খ্রি.)
  • হারুন আর-রশীদ (৭৮৬–৮০৯ খ্রি.)
  • আল-আমীন (৮০৯–৮১৩ খ্রি.)
  • আল-মামুন (৮১৩–৮৩৩ খ্রি.) — কুরআন অসৃষ্ট মতবাদের বিরুদ্ধে মিহনা শুরু করেন।
  • আল-মু’তাসিম (৮৩৩–৮৪২ খ্রি.)
  • আল-ওয়াসিক (৮৪২–৮৪৭ খ্রি.)
  • আল-মুতাওয়াক্কিল (৮৪৭–৮৬১ খ্রি.) — প্রথম সুন্নি আব্বাসীয় খলিফা হিসেবে পরিচিত। ৩৯ বছর বয়সে মারা যান এবং তার পুত্র আল-মুনতাসির উত্তরসূরী হন।

আব্বাসীয় খিলাফতের সবচেয়ে উজ্জ্বল কীর্তি হলো ইসলামী স্বর্ণযুগের সূচনা এবং খলিফা হারুন আর-রশীদের শাসনামলে বাগদাদে বাইতুল হিকমাহর প্রতিষ্ঠা। বাইতুল হিকমাহ ছিল তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাবলিক লাইব্রেরি এবং এখানে গ্রিক, সিরিয়াক, পাহলভি ও সংস্কৃত ভাষার গ্রন্থ সংগ্রহ করে আরবিতে অনুবাদ করা হতো। এর ফলে বাগদাদ তৎকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী শহরে পরিণত হয় এবং দর্শন, গণিত, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিদ্যা, শারীরবিদ্যাসহ নানা ক্ষেত্রে অসাধারণ সব প্রতিভাবানদের জন্ম দেয়।

মুতাযিলাদেরকে বলা হতো ‘আহলে কালাম’ (যুক্তিবাদী), কারণ তারা তর্ক-বিতর্ক ও যুক্তিবিদ্যায় অত্যন্ত পারদর্শী ছিলো। তারা হাদিস অস্বীকার করতো এবং কুরআনকে প্রধান উৎস হিসেবে গ্রহণ করে যুক্তির মাধ্যমে বিধান ও তথ্য বের করার চেষ্টা করতো। উদাহরণস্বরূপ, সুন্নিরা যখন হাদিসের সনদের চেইন মুখস্থ করে সময় ক্ষেপণ করতো, তখন মুতাযিলা আলেম ইবরাহীম আন-নাজ্জাম কুরআনের পাশাপাশি তাওরাত, গসপেল ও যাবুর মুখস্থ করে ফেলেছিলেন, যাতে খ্রিস্টানদের সাথে বিতর্কে জয়ী হতে পারেন।

অন্যদিকে সুন্নিরা প্রধানত হাদিসের ওপর নির্ভর করতো। ‘কুরআন মাখলুক’—এই মতবাদের বিরোধিতায় সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন আহমাদ ইবনে হাম্বল (হাম্বলী মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা)।

মুতাযিলারা বলতো: কুরআন সৃষ্ট(মাখলুক)। সুন্নিরা বলতো: কুরআন অসৃষ্ট এবং আল্লাহর সাথে অনাদিকাল থেকে অস্তিত্বশীল। আল্লাহর যেমন কোনো শুরু নেই, তেমনি তাঁর বাণীরও কোনো শুরু নেই—এটি সবসময়ই অস্তিত্বশীল ছিল।

আহমদ ইবনে হাম্বল চাইতেন ইসলামের সব বিধান যেন সরাসরি হাদিস থেকে আসে। এমনকি তিনি দুর্বল হাদিসকেও যুক্তি ও বিবেকের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন। তিনি তার জীবনের বেশিরভাগ সময় হাদীস সংগ্রহের পিছনে ব্যয় করেছেন। তার লিখিত ‘মুসনাদ’-এ প্রায় ৩০ হাজার হাদিস রয়েছে, এবং তিনি দাবি করতেন – হাদিসগুলো যদি সহীহ নাও হয়, তবুও যেগুলো নবীর সাথে সম্পৃক্ত করা যায় এবং যেগুলো নিরেট জাল নয় — সেগুলো গ্রহণ করতে হবে।!

তিনি বলতেন, ‘আমার কাছে দুর্বল হাদিসও আলেমের মতামত বা কিয়াসের চেয়ে উত্তম।‘

আহমাদ ইবনে হাম্বল কালামশাস্ত্র (যুক্তিবিদ্যা) অধ্যয়ন নিষিদ্ধ করতেন। যারা যুক্তিবাদী ছিল, তিনি তাদের সমালোচনা করতেন।

আহমাদ ইবনে হাম্বলের যুক্তি ছিল যে কুরআন আল্লাহর বাণী, এবং আল্লাহর বাণীকে আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। কুরআন আল্লাহর জ্ঞানের অংশ, আর আল্লাহর জ্ঞান সৃষ্ট নয়।

এমনকি তিনি বলতেন, “কেউ যদি হিশামের পিছনে নামাজ পড়ে, তবে তাকে পুনরায় নামাজ পড়তে হবে।“ (হিশাম ছিলেন একজন ক্বারী, যিনি বিশ্বাস করতেন আল্লাহ কুরআন সৃষ্টি করেছেন।)

ইয়াসির কাজী তার বই “An Introduction to the Sciences of the Qur’an”-এর ৩৯ পৃষ্ঠায় বলেছেন:

আব্বাসীয় খলিফা আল-মামুন (৭৮৬-৮৩৩ খ্রি.) প্রকাশ্যে ‘কুরআন সৃষ্ট’- এই মতবাদ গ্রহণ করেন। তার শাসনের শেষের দিকে তিনি এই অবস্থান নিয়ে অনেক বেশি কঠোর হয়ে ওঠেন।

খলিফা আল-মামুন তার সম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রদেশের অফিসারদের কাছে পাঠানো একটি চিঠিতে উল্লেখ করেন:

(আল-মামুনের চিঠি, রবিউল-আউয়াল, ২১৮ হি.)

মুতাযিলাদের দাবির সমর্থনে নীচে কুরআনের কিছু আয়াত উদ্ধৃত করা হলো:

[৪৩:৩] আমি এটিকে বানিয়েছিআরবি কুরআন, যাতে তোমরা বুঝতে পারো।

[১৯:৯৭] আর আমি তো তোমার ভাষায় কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি, যাতে তুমি এর দ্বারা মুত্তাকীদেরকে সুসংবাদ দিতে পার এবং কলহপ্রিয় কওমকে তদ্বারা সতর্ক করতে পার।

[৪২:৫২] তুমি জানতে না কিতাব কী এবং ঈমান কী? কিন্তু আমি একে আলো বানিয়েছি, যার মাধ্যমে আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করি। আর নিশ্চয় তুমি সরল পথের দিক নির্দেশনা দাও।

[৩২:২৩] আমিতো মুসাকে কিতাব দিয়েছিলাম — অতএব, তুমি তার সাথে সাক্ষাতের ব্যাপারে সন্দেহে থেকো না — এবং আমি এটাকে বনী ইসরাইলের জন্য হিদায়াত বানিয়েছিলাম

আরও অনেকগুলো আয়াত, যেমন ৬:১১৫, ৪৬:১২, ২:১১৭, ৬:৭৩, ৪১:১১, ৩:৫৯, ১৫:২৮ ইত্যাদি—‘কুরআন সৃষ্ট’ এই মতবাদকেই সমর্থন করে।

কুরআন যদি আল্লাহর অস্তিত্বের অংশ হয়, তাহলে বলতে হবে আল্লাহর সকল বাণীই অসৃষ্ট। কিন্তু কুরআনে ঈসা নবী-কে ‘কালিমাতুল্লাহ’ (আল্লাহর বাণী) বলা হয়েছে, এবং তিনি মাখলুক। যদি আল্লাহর বাণী অসৃষ্ট হয়, তাহলে ঈসা নবীও অনাদি-অনন্ত হয়ে যান, যেটা খ্রিস্টানদের বিশ্বাস।

[৪:১৭১] হে কিতাবী সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের দ্বীনে সীমালঙ্ঘন করো না এবং আল্লাহ সম্পর্কে সত্য ছাড়া কিছু বলো না। মসীহ ঈসা ইবনে মরিয়ম আল্লাহর রাসূল, তাঁর বাণী যা তিনি মরিয়মের প্রতি প্রেরণ করেছেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে একটি রূহ। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের প্রতি ঈমান আনো এবং বোলো না ‘তিন (ট্রিনিটি)’। তোমরা বিরত হও, তা তোমাদের জন্য উত্তম। আল্লাহই কেবল এক ইলাহ।

এই আয়াতে ঈসা-কে ‘কালিমাতুহু’ (আল্লাহর বাণী) বলা হয়েছে, যা মরিয়মের প্রতি প্রেরিত হয়েছে। যদি আল্লাহর বাণী অসৃষ্ট হয়, তাহলে এই আয়াত অনুযায়ী ঈসা নবী অনাদিকাল থেকে অস্তিস্ত্বশীল, যা বিশ্বাস করাটা শিরক।