✪ কুরআন সংকলনের ইতিহাস নিয়ে যেসকল বিতর্ক দেখা যায়, তার সবই এসেছে কুরআন বহির্ভূত উৎসগুলো থেকে। অন্যদিকে কুরআন এর আয়াতগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে প্রতীয়মান হয় যে কুরআনের লিখন, সংকলন ও একত্রকরণ-এর পুরোটাই নবীর জীবদ্দশাতেই সম্পূর্ণ হয়েছিল।
✪ কুরআনিক দৃষ্টিকোণ থেকে নবীর মৃত্যুর পর কুরআন সংগ্রহ ও সংকলনের যে ইতিহাস শোনা যায় তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
✪ কেউ যদি কুরআনের সাক্ষ্য মেনে নেয়, তাহলে তাকে অবশ্যই পরবর্তী খলিফাগণ কর্তৃক কুরআন সংগ্রহ, সংকলন, কুরআনের অতিরিক্ত কপি পুড়িয়ে ফেলা বা কুরআনের আয়াত হারিয়ে যাওয়ার হাদিসগুলো পরিত্যাগ করতে হবে।
আল্লাহর নির্দেশে নবীর জীবদ্দশাতেই কুরআন একত্র করা হয়েছিলো
[২৫:৩২] আর যারা অবিশ্বাসী তারা বলে, তাঁর উপর পুরো কুরআন কেন একবারে অবতীর্ণ হলো না? এভাবেই (নাযিল করেছি) যাতে এর দ্বারা তোমার হৃদয় সুদৃঢ় হয়, এবং আমি এটিকে সঠিক ক্রমে সাজিয়েছি (রাতালনাহু তারতিলা)।
[৭৫:০৬-১৭] তাড়াতাড়ি কুরআন আয়ত্ত করার উদ্দেশ্যে তুমি তোমার জিহ্বাকে সঞ্চালন কোরো না। এটি সংরক্ষণ ও পড়ানোর দায়িত্ব আমার।
অধিকাংশ অনুবাদকই [৭৩:০৪] আয়াতের বিকৃত অনুবাদ করেছেন যে -“আর কুরআন আবৃত্তি কর স্পষ্টভাবে ধীরে ধীরে।”
আয়াতটির আরবিতে কী বলা আছে সেটা যদি আমরা দেখি:
[৭৩:০৪] আর আমি সাজিয়েছি (ওয়া-রাত্তিলি) এই কুরআন, এর সঠিক সজ্জায় (তারতিলান)।
রাত্তিলি এবং তারতিলান – দুটি শব্দই একই মূল ‘রা-তা-লাম’ থেকে এসেছে। যার অর্থ হয় কোনো কিছু সঠিক বিন্যাসে রাখা, সাজানো বা একত্র করা ইত্যাদি।
সুতরাং, কুরআন থেকে এটিই প্রতীয়মান হয় যে নবীর জীবদ্দশাতেই কুরআন একত্রকরণের কাজটি সম্পাদিত হয়েছিল।
ঠিক এর পরবর্তী আয়াতে বলা আছে:
[৭৩:০৫] নিশ্চয়ই আমি তোমার প্রতি এক অতিভারী বাণী নাযিল করবো।
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, [৭৩:৪-৫] আয়াতগুলো কুরআন নাযিলের শুরুর দিকের আয়াত, এবং নবী মুহাম্মদকেই কুরআন সংকলনের গুরুদায়িত্বটি নিতে হয়েছিল।
এবং কুরআন সাজানোর কাজটি যেহেতু ওহী নাযিলের সাথে সাথেই করতে হবে, সুতরাং এটা পরিষ্কার যে নবীর ওপর যখন কুরআন নাযিল সমাপ্ত হয়, তখনই কুরআন পরিপূর্ণভাবে সঠিকক্রমে সজ্জিত একটি কিতাবের রূপ পেয়ে যায়।
নবীর জীবদ্দশাতেই দ্বীন পরিপূর্ণ হয়
[০৫:০৩] আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম, তোমাদের উপর আমার নিআমাত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।
আয়াতটি পড়ে স্বাভাবিকভাবেই একটি যৌক্তিক প্রশ্ন আসে, কোনো দ্বীন কি কখনো একটি পূর্ণাঙ্গ কিতাব ছাড়া পরিপূর্ণ হতে পারে?
নবীর জীবদ্দশায় কুরআন লিখনের কাজটি সম্পাদিত হয়েছিল সম্মানিত লিপিকারদের দ্বারা
[৮০:১৩] এটি আছে মর্যাদাপূর্ণ পত্রসমূহে (ফি সুহুফিন মুকাররামা)
[৮০:১৪] সমুন্নত, পবিত্র (মারফু’আতিন মুতাহহারা)
[৮০:১৫] লিপিকারদের হাতে (বি’আইদি সাফারা)
[৮০:১৬] (যারা) সম্মানিত, পূত-পবিত্র (কিরামিন বারারা)
আরও বেশকিছু আয়াত থেকে নবীর জীবদ্দশাতেই কুরআন লিপিবদ্ধ হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়:
[৯৮:২-৩] আল্লাহর পক্ষ থেকে এক রাসুল, যে পাঠ করে পবিত্র পত্রসমূহ। যাতে আছে সঠিক বিধিবদ্ধ বিধান।
[২৫:০৫] আর তারা বলে এগুলো প্রাচীন গল্পগাঁথা, যা সে লিখে নিয়েছে, এবং এগুলো তাকে সকাল-সন্ধ্যা পড়ে শোনানো হয়।
অর্থাৎ, কাফিররা দাবি করতো মুহাম্মদ প্রাচীন যুগের কাহিনী কপি করে কুরআন লিখতো।
এখান থেকে একটি জিনিস স্পষ্ট হয় যে নবীর যুগেই কুরআন লিখনের কাজটি সম্পাদিত হতো।
কুরআনকে পার্চমেন্টে (চামড়ার কাগজে) লিপিবদ্ধকরণ
অধিকাংশ মুসলিমদের বিশ্বাস হলো নবীর যুগে কুরআনের আয়াত গাছের পাতা, পাথর, চামড়া ইত্যাদিতে লিখে রাখা হতো। এবং নবীর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সম্পূর্ণ কুরআন একত্রিত করা হয়নি।
এই দাবি মেনে নেওয়া কষ্টকর, কেননা আরবরা তখন এতটাও পশ্চাদপদ জাতি ছিলনা যে লিখার জন্য তাদের নিকট স্ক্রল বা পার্চমেন্ট কিছুই ছিল না।
বরং, কুরআন থেকে দেখা যায় যে, পূর্ববর্তী কিতাবধারীদের নিকট তাদের কিতাব পার্চমেন্টে লিপিবদ্ধ থাকতো।
[৬:৯১] বল,‘কে নাযিল করেছে সে কিতাব, যা মূসা নিয়ে এসেছে মানুষের জন্য আলো ও পথনির্দেশস্বরূপ, তোমরা তা বিভিন্ন কাগজে (ক্বারাতিসা) লিখে রাখতে, তোমরা তার কিছু অংশ প্রকাশ করতে আর কিছু অংশ গোপন রাখতে।
ক্বারাতিসা – পার্চমেন্ট, কাগজ, পত্র ইত্যাদি
পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির ধর্মগ্রন্থগুলোকে উন্নতমানের পার্চমেন্ট বা কাগজে লিখে রাখার প্রথা বহু প্রাচীন কাল থেকেই বিদ্যমান।
[৮৭:১৮-১৯] “নিশ্চয়ই এটি আছে পূর্ববর্তী পত্রসমূহে (সুহুফি)। ইবরাহিম ও মুসার পত্রসমূহে।“
সহিফা – লিখিত কাগজ বা পত্র
কুরআন সংরক্ষণের দায়িত্ব ছিল আল্লাহর, মানুষের নয়
[১৫:০৯] নিশ্চয় আমি এই উপদেশ নাযিল করেছি, আর আমিই এর সংরক্ষক।
কুরআনের আয়াতগুলো পড়ে আমরা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, কুরআন একটি সুস্পষ্ট কিতাব। এর বার্তা, সজ্জা এবং বিন্যাস থেকেই এটা প্রমাণিত হয় যে নবীর যুগেই, স্বয়ং আল্লাহর নির্দেশে কুরআন একত্রকরণ ও সংকলনের কাজটি সমাপ্ত হয়েছিল।
নোট: ড. অ্যাড্রিয়ান ব্রকেট কুরআনের ট্রান্সমিশন নিয়ে বিস্তারিত গবেষণার পর তার পর্যবেক্ষণ থেকে বলেছেন:
“… কুরআন যদি প্রথম শতাব্দীতে শুধুমাত্র মৌখিকভাবে সংরক্ষিত হতো, তাহলে হাদিসগুলোর মধ্যে যেরূপ বিশাল বৈচিত্র্য ও পার্থক্য দেখা যায়, কুরআনের মধ্যেও সেরূপ বৈচিত্র্য দেখা যেত। আবার, যদি কুরআন কেবল লিখিতভাবে সংরক্ষিত হতো, তাহলে মদিনা সনদের বিভিন্ন রেওয়াতে যেমন উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়, কুরআনের মধ্যেও সেরকম পার্থক্য দেখা যেত। কিন্তু কুরআনের ক্ষেত্রে এর কোনোটিই ঘটেনি। অতএব, এটি স্পষ্ট যে মৌখিকভাবে কুরআন সংরক্ষণের পাশাপাশি একইসাথে লিখিত আকারে কুরআন সংরক্ষণ করা হয়েছিল।“