কিয়ামুল-লাইল: কুরআন কী বলে?

আমাদের সমাজে ইশা ও ফজরের মধ্যবর্তী সময়ে যে অতিরিক্ত সালাতগুলো (যেমন: কিয়ামুল-লাইল, নফল, তারাবিহ এবং তাহাজ্জুদ) প্রচলিত আছে, কুরআনে কি সেগুলোর ব্যাপারে কোনো ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে? অনেকে সুরা মুজ্জাম্মিলের ১–৫ ও ২০ নম্বর আয়াত এবং সুরা বনি ইসরাইলের ৭৯ নম্বর আয়াতকে এগুলোর পক্ষে দলিল হিসেবে পেশ করেন। কিন্তু কুরআনের যৌক্তিক ও সামগ্রিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আয়াতগুলোতে এমন অতিরিক্ত কোনো বিশেষ বা বাধ্যতামূলক সালাতের নির্দেশ নেই। বরং এগুলো প্রধানত কুরআন তিলাওয়াত ও অধ্যয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত।

কুরআন আল্লাহর সুস্পষ্ট বিধানের গ্রন্থ। সালাতের ব্যাপারে কুরআন শুধুমাত্র তিনটি ফরজ সালাতের কথা উল্লেখ করে এবং প্রত্যেকটির সময়সীমা নির্দিষ্ট করে দিয়েছে (৪:১০৩)।

১. ফজর সালাত
– নাম: সালাতুল ফজর (২৪:৫৮)
– সময়: ভোরের আলো থেকে সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত (১১:১১৪)

২. উস্তা (মধ্যবর্তী) সালাত
– নাম: সালাতুল উস্তা (২:২৩৮)
– সময়: দুপুরে সূর্য ঢলে পড়া থেকে সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত (১৭:৭৮)

৩. ঈশা সালাত
– নাম: সালাতুল ঈশা (২৪:৫৮)
– সময়: সূর্যাস্ত থেকে গাঢ় অন্ধকার হওয়া পর্যন্ত (১১:১১৪)

কুরআনে এই তিনটি ছাড়া আর কোনো ফরজ সালাতের উল্লেখ নেই।

এই আয়াতগুলো প্রায়ই কিয়ামুল-লাইলের দলিল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু ভালোভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আয়াতগুলো রাসুলকে ব্যক্তিগতভাবে সম্বোধন করে নাজিল হয়েছে এবং এগুলোর বিষয়বস্তু সালাত নয়; বরং কুরআন পাঠ।

“হে বস্ত্রাবৃত! রাতে দণ্ডায়মান হোন কিছু অংশ ছাড়া; অর্ধরাত্রি অথবা তদপেক্ষা কিছু কম, অথবা তদপেক্ষা বেশি; এবং কুরআন আবৃত্তি করুন ধীরস্থিরভাবে ও স্পষ্টভাবে। আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করব এক গুরুভার বাণী।” (৭৩:১–৫)

আয়াতগুলো পড়ে প্রতীয়মান হয় যে, এটি নবীজির নবুয়তের শুরুর দিকে অবতীর্ণ একটি সুরা। তখন ওহি নাজিল হচ্ছিল এবং রাসুল-এর জন্য জরুরি ছিল রাতে জেগে কুরআনের শব্দগুলো সঠিকভাবে আয়ত্ত করা। আয়াতে স্পষ্টভাবে কুরআন আবৃত্তির কথা বলা হয়েছে, সালাতের কথা নয়। আর “গুরুভার বাণী” বলতে আসন্ন ওহি বা কুরআনের কথাই বোঝানো হয়েছে।

“তোমার পালনকর্তা জানেন যে, তুমি এবং তোমার সঙ্গীদের একটি দল রাতের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ, অর্ধাংশ বা এক-তৃতীয়াংশ সময় দাঁড়িয়ে থাকো। … তিনি জানেন যে, তোমরা এর সঠিক হিসাব রাখতে পারবে না; তাই তিনি তোমাদের প্রতি ক্ষমা করেছেন। অতএব, তোমরা কুরআনের যতটুকু সহজসাধ্য, ততটুকু আবৃত্তি করো। … সালাত কায়েম করো, যাকাত প্রদান করো…” (৭৩:২০)

এই আয়াত থেকে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়—

  • আল্লাহ দেখছিলেন যে, রাসুল এবং তাঁর সঙ্গীরা দীর্ঘ সময় রাত জেগে ইবাদত করছিলেন।
  • আল্লাহ জানিয়ে দিচ্ছেন যে, মানুষ হিসেবে রাতের এই দীর্ঘ ইবাদতের সঠিক হিসাব বা ধারাবাহিকতা বজায় রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
  • আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাদের প্রতি “ক্ষমা” করেছেন। প্রশ্ন হলো—আল্লাহ কেন ক্ষমা করবেন? এর একমাত্র যৌক্তিক উত্তর হতে পারে, তারা নিজেদের ওপর এমন একটি কাজের বোঝা চাপিয়ে নিয়েছিলেন (রাতের দীর্ঘ ইবাদত), যার আদেশ আল্লাহ দেননি।
  • তাই আল্লাহ সহজ সমাধান দিলেন—“কুরআনের যতটুকু সহজসাধ্য, ততটুকু পড়ো; সালাত কায়েম করো, যাকাত দাও…”। এখানে “সালাত কায়েম করো” বলতে কুরআনে নির্দেশিত ফরজ সালাতগুলোর কথাই বলা হয়েছে; কোনো কুরআন-বহির্ভূত বা অতিরিক্ত সালাতের কথা নয়।

অনেকে ১৭:৭৯ নম্বর আয়াতকে ‘তাহাজ্জুদ সালাত’-এর দলিল হিসেবে পেশ করেন। আয়াতটিতে বলা হয়েছে—

“আর রাত্রির কিছু অংশে তা (কুরআন) নিয়ে জাগ্রত থাকুন (ফাতাহাজ্জাদ বিহি); এটি আপনার জন্য অতিরিক্ত (নাফিলাতান লাকা)…” (১৭:৭৯)

‘ফাতাহাজ্জাদ’ শব্দটি ‘হুজুদ’ মূল থেকে এসেছে, যার অর্থ ঘুম থেকে জাগা। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই জাগরণের উদ্দেশ্য কী? এর ঠিক আগের আয়াতেই (১৭:৭৮) আল্লাহ ‘কুরআন আল-ফজর’—অর্থাৎ ফজরের কুরআন পাঠের কথা বলেছেন। সুতরাং এখানে রাসুল-কে রাতে জেগে কুরআন নিয়ে গবেষণা বা অধ্যয়ন করতে বলা হয়েছে, কোনো নির্দিষ্ট সালাত আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়নি। এটি নবীর জন্য একটি অতিরিক্ত (নাফিলা) দায়িত্ব ছিল, কোনো ফরজ বা সুন্নাহ সালাতের বিধান নয়।

আল্লাহ রাতকে মানুষের বিশ্রামের জন্য নির্ধারণ করেছেন। কুরআনের একাধিক আয়াতে আল্লাহ এই প্রাকৃতিক নিয়মের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন—

“তিনিই তোমাদের জন্য রাতকে আবরণ এবং ঘুমকে বিশ্রাম বানিয়েছেন, আর দিনকে বানিয়েছেন পুনরুত্থানের সময়।” (২৫:৪৭)

“আল্লাহই তোমাদের জন্য রাত বানিয়েছেন, যাতে তোমরা তাতে বিশ্রাম নিতে পারো, এবং দিনকে করেছেন আলোকোজ্জ্বল…” (৪০:৬১)

“তারা কি দেখে না যে, আমি রাতকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা তাতে বিশ্রাম পায়, এবং দিনকে করেছি দেখার জন্য?” (২৭:৮৬)

যেখানে আল্লাহ স্বয়ং রাতকে বিশ্রামের জন্য সৃষ্টি করেছেন, সেখানে সারা রাত বা রাতের বড় একটি অংশ বাধ্যতামূলকভাবে জেগে নামাজ পড়ার বিধান আল্লাহর এই প্রাকৃতিক নিয়ম (ফিতরাত)-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয় কি? আল্লাহ মানুষের সাধ্যের বাইরে কোনো বোঝা চাপিয়ে দেন না। অতএব, বাধ্যতামূলক রাতজাগা ইবাদতের ধারণা কুরআনের এই আয়াতগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

রাসুল নিজের পক্ষ থেকে ধর্মে নতুন কিছু সংযোজন করেননি। আল্লাহ তাঁকে স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন—

“বলুন, আমি রাসুলগণের মধ্যে নতুন নই। আমি জানি না, আমার সঙ্গে কী করা হবে এবং তোমাদের সঙ্গে কী করা হবে। আমি কেবল তারই অনুসরণ করি, যা আমার প্রতি ওহি করা হয়…” (৪৬:৯)

যেহেতু রাসুল কেবল ওহির অনুসরণ করতেন, তাই এটা বিশ্বাস করা কঠিন যে তিনি এমন কোনো সালাত বাধ্যতামূলক হিসেবে আদায় করতেন, যার অনুমোদন কুরআনে নেই। যারা দাবি করেন যে রাসুল কুরআনের বাইরে অতিরিক্ত সালাত নিয়মিত আদায় করতেন, তারা পরোক্ষভাবে তাঁর ওপর আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার মিথ্যা অপবাদ আরোপ করেন।

কুরআনের সামগ্রিক ও যৌক্তিক বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয় যে, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ওপর সাধ্যাতীত কোনো বোঝা চাপিয়ে দেননি। সুরা মুজ্জাম্মিলে মূলত কুরআন তিলাওয়াতের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে এবং নিজেদের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত কষ্টের বোঝা থেকে মুমিনদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সুতরাং কুরআন কেবল নির্ধারিত ফরজ সালাতগুলো আদায়ের কথাই বলে; অতিরিক্ত কোনো বিশেষ সালাত বা বাধ্যতামূলক রাত্রি-জাগরণের বিধান আরোপ করে না।