কোরআনে চুরির শাস্তি হাত কাটা?

[৫:৩৮] “আর পুরুষ চোর এবং নারী চোর, ইক্বতাঊ (কেটে দাও) তাদের হাত, তাদের কৃতকর্মের প্রতিদান ও আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি হিসেবে, এবং আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।“

উক্ত আয়াতে ব্যবহৃত ‘ইক্বতাঊ’ শব্দের সরল অর্থ হলো ‘কেটে দাও’। কিন্তু এখানে কেটে দেওয়া বলতে কি হাতে কাটা দাগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে নাকি হাত বিচ্ছিন্ন করে ফেলার কথা বলা হয়েছে সেটা একটু ভেবে দেখার দরকার। ‘ইক্বতাঊ’ শব্দের দুটি অর্থই প্রেক্ষাপট ভেদে সঠিক হতে পারে। এখন, কুরআনে ‘পুরুষ ও নারী চোর উভয়ের হাত কেটে দাও’ বলতে আল্লাহ আসলে কী বুঝিয়েছেন, ব্যাপারটি কুরআন থেকেই দেখে নেয়া যাক।

সূরা ইউসুফের একটি আয়াত দেখা যাক, যেখানে নবী ইউসুফের সৌন্দর্য দেখে রাজমহলে আমন্ত্রিত নারীদের হাত কেটে ফেলার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে:
[১২:৩১] “অতঃপর তারা যখন তাকে (ইউসুফকে) দেখতে পেল তখন তারা তার সৌন্দর্যে অভিভূত হল এবং নিজেদের হাত কেটে ফেলল। তারা বলল: আল্লাহ রক্ষা করুক, এতো মানুষ নয়, এতো এক মহিমান্বিত ফেরেশতা!”

উক্ত আয়াতে ‘নারীরা হাত কেটে ফেলল’ বোঝাতে ‘ক্বাত্তানা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। ‘ক্বাত্তানা’ এবং ‘ইক্বতাঊ’—দুটি শব্দ একই মূল থেকে এসেছে।

এখন কথা হচ্ছে, ইউসুফকে দেখে মহিলারা কি নিজেদের হাত বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল?—নিশ্চয়ই না, তারা ছুরি দিয়ে নিজেদের হাতে কাটা দাগ দিয়ে ফেলেছিল। অনুরূপ ভাবে চুরির শাস্তি হাত কাটা বলতেও কুরানে হাতে কাটা দাগ দেওয়ার কথা বোঝানো হয়েছে, হাত বিচ্ছিন্ন করে ফেলা নয়।

যারা এতটুকুতে সন্তুষ্ট নন তারা আরেকটি জিনিস দেখতে পারেন।
চুরির শাস্তি বর্ণিত হয়েছে ৫নং সূরার ৩৮ নং আয়াতে। ৫+৩৮=৪৩
আর মহিলাদের হাত কাটার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে ১২নং সূরার ৩১ নং আয়াতে। ১২+৩১=৪৩
যোগফল দুটির এই মিল আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি ইঙ্গিত হওয়া অসম্ভব কিছুই নয়!

আরেকটি ব্যাপার হলো, যদি চুরির শাস্তি হিসেবে চোরের হাত বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হতো, তবে তা চোরের জন্য একটি যাবজ্জীবন শাস্তি হয়ে যেতো। সেক্ষেত্রে, চুরির এই পাপ থেকে ফিরে আসার কোন অর্থ থাকতো না এবং তওবা করারও কোন অর্থ থাকতো না। অথচ, আল্লাহ চুরির শাস্তি বর্ণনা করার পর ঠিক পরবর্তী আয়াতেই বলেন:
[৫:৩৯] “অতঃপর যে ব্যক্তি তার অন্যায়ের পর তওবা করে এবং নিজেকে সংশোধন করে নেয়, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।”

এখানে আল্লাহ বলছেন যে, যে ব্যক্তি অন্যায়ের পর তওবা করে এবং নিজেকে সংশোধন করে আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন, তাকে ক্ষমা করবেন এবং তার প্রতি দয়া করবেন। আল্লাহ যখন কাউকে ক্ষমা করেন এবং কারো প্রতি দয়া করেন, তখন তার অর্থ দাঁড়ায় যে সেই ব্যক্তিটি আর তার পাপের কারণে শাস্তিপ্রাপ্ত হবে না। বলাই বাহুল্য, যদি চুরির শাস্তি হিসেবে চোরের হাত বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হতো, তবে সে সারাজীবন এমন এক শাস্তির বোঝা বয়ে বেড়াতো যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব নয়; অর্থাৎ, সে কখনোই তার শাস্তি থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারতো না! সেক্ষেত্রে তওবা কবুল করা বা ক্ষমা করারও কোনো অর্থ থাকতো না।

সুতরাং, কুরআনের আয়াত বিশ্লেষণ এবং আল্লাহর অসীম দয়ার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, চোরের হাতে কাটা দাগ দেওয়াই চুরির উপযুক্ত শাস্তি, হাত বিচ্ছিন্ন করে ফেলা নয়।