পুলসিরাত: কুরআন কী বলে?

মুসলিমদের মধ্যে বহুল প্রচলিত একটি জনপ্রিয় বিশ্বাস হলো কিয়ামতের দিন জাহান্নামের উপর একটি সেতু স্থাপন করা হবে – যাকে ‘পুলসিরাত’ বলা হয়। আর কিয়ামতের দিন প্রত্যেককেই সেই সূক্ষ্ম, ধারালো ও কাঁটাযুক্ত সেতুটি অতিক্রম করতে হবে। পাপীরা সেখান থেকে জাহান্নামে পতিত হবে, আর সৎকর্মশীলরা তা পার হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কুরআনে কি এই সেতুর কোনো উল্লেখ আছে? সরাসরি উত্তর হলো – না। ‘পুলসিরাত’ নামক কোনো সেতুর বর্ণনা কুরআনে নেই। তবে কুরআনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলা হয়েছে: সব মানুষ (ঈমানদার ও কাফির উভয়েই) জাহান্নামের কাছে উপস্থিত হবে বা পাশ দিয়ে অতিক্রম করবে। তবে তা কোনো সেতু বা ব্রিজ পার হওয়ার কোনো ইঙ্গিত দেয় না।

অনেকে ১৯:৭১ আয়াতটি দেখিয়ে বলতে চান যে এ আয়াতে পুলসিরাত অতিক্রম করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই আয়াতের আগে বা পরে কোথাও কোনো প্রকার ব্রিজ বা সেতু পার হওয়ার কোনো ইঙ্গিত নেই।

আবার অনেকে ১৯:৭১ আয়াতে ব্যবহৃত ‘ওয়ারদা’ শব্দটির অর্থ করেন ‘প্রবেশ করা’, যার দ্বারা তারা বোঝাতে চান যে পাপী ঈমানদাররা প্রথমে জাহান্নামে প্রবেশ করবে, অতঃপর পরবর্তী আয়াতে যখন আল্লাহ বলছেন তাকওয়া অবলম্বনকারীদের উদ্ধার করা হবে, তখন এর অর্থ হলো মুহাম্মদের শাফায়াতের মাধ্যমে পাপী ঈমানদারদের জাহান্নাম থেকে উদ্ধার করা হবে!

‘ওয়ারাদা’ ক্রিয়াপদটির সঠিক অর্থ জানতে হলে আমাদের কুরআনের অন্যান্য আয়াতে এই শব্দের ব্যবহার সম্পর্কে জানতে হবে। একটি উদাহরণ দেখা যাক:

[২৮:২৩] “যখন তিনি (মুসা) মাদইয়ানের পানির কাছে উপস্থিত হলেন/পাশ দিয়ে গেলেন (ওয়ারাদা), তখন তিনি সেখানে লোকদের একটি দলকে পানি পান করাতে দেখতে পেলেন।”

এখানে কি মুসা ‘পানির মধ্যে প্রবেশ করেছিলেন’? অবশ্যই না! তিনি পানি পান করতে যাননি, বরং পানির স্থানটির কাছে এসেছিলেন বা পাশ দিয়ে গিয়েছিলেন। কেউ যদি ‘ওয়ারাদা’ শব্দের অর্থ ‘প্রবেশ করা’ ধরি, তাহলে অর্থ দাঁড়ায় ‘মূসা পানির মধ্যে প্রবেশ করলেন’ – যা সম্পূর্ণ ভুল। সুতরাং সঠিক অর্থ হলো: কাছে আসা, উপস্থিত হওয়া, অতিক্রম করা বা পাশ দিয়ে যাওয়া (প্রবেশ না করে)।

এখন এই সঠিক অর্থটি যদি আমরা ১৯:৭১ আয়াতে প্রয়োগ করি, তাহলে আয়াতটির অনুবাদ দাঁড়ায়:

[১৯:৭১] “আর তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে জাহান্নামের কাছে উপস্থিত হবে না/পাশ দিয়ে যাবে না। এটি তোমার প্রতিপালকের নিকট চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।”

অর্থাৎ, প্রতিটি মানুষ – ঈমানদার ও কাফির – জাহান্নাম দেখতে পাবে, তার কাছে যাবে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে সবাই জাহান্নামে প্রবেশ করবে।

কুরআন যখন কাউকে জাহান্নামে প্রবেশ করানোর কথা বলে, তখন ‘দাখালা’ (دخل) শব্দটি ব্যবহার করে। অপরদিকে ‘ওয়ারাদা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয় ‘পাশ দিয়ে যাওয়া’ বা ‘উপস্থিত হওয়া’ ইত্যাদি বোঝাতে।
উদাহরণস্বরূপ:
[৪০:৬০] “তোমাদের প্রতিপালক বলেন, ‘আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেব। নিশ্চয় যারা আমার ইবাদতে অহংকার করে তারা অবশ্যই প্রবেশ করবে (ইয়াদখুলুন) জাহান্নামে, নতজানু হয়ে।’”

এখানে ‘ইয়াদখুলুন’ (يَدْخُلُونَ) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যার মূল ‘দাখালা’ – অর্থ ‘প্রবেশ করা’। আল্লাহ যখন ইচ্ছা করেছেন কেবল কাফির ও অহংকারীদের জাহান্নামে প্রবেশের কথা বলতে, তখন তিনি ‘দাখালা’ ব্যবহার করেছেন। আর যখন সব মানুষের (ঈমানদারসহ) জাহান্নামের কাছে উপস্থিত হওয়ার কথা বলেছেন, তখন ব্যবহার করেছেন ‘ওয়ারাদা’।

প্রশ্ন জাগতে পারে: ঈমানদাররা যদি জাহান্নামের কাছে যায়, তাহলে তাদের কী কোনো ক্ষতি হবে? কুরআনের স্পষ্ট আয়াত বলে, না – আল্লাহ তাদের রক্ষা করবেন।

[৭৬:১১] “অতএব আল্লাহ তাদেরকে সে দিনের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করলেন এবং তাদের দান করলেন প্রফুল্লতা ও আনন্দ।”

[৩৯:৬০-৬১] “কিয়ামতের দিন তুমি দেখবে যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা বলেছে তাদের মুখ কালো হয়ে গেছে। অহংকারীদের জন্য কি জাহান্নামে আবাস নেই? আর আল্লাহ যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে তাদেরকে উদ্ধার করবেন। তাদের সাফল্যের কারণে কোনো অনিষ্ট তাদের স্পর্শ করবে না এবং তারা দুঃখিতও হবে না।”

এখান থেকে স্পষ্ট হয় যে, ঈমানদাররা জাহান্নাম দেখলেও কোনো অনিষ্ট তাদের স্পর্শ করবে না।

[৪৩:৬৮] “হে আমার বান্দাগণ, আজ তোমাদের কোনো ভয় নেই, আর তোমরা দুঃখিতও হবে না।”

এখন প্রশ্ন হলো, কেন আল্লাহ এটি নির্ধারণ করেছেন যে ঈমানদারদেরকেও জাহান্নাম দেখতে হবে?

উত্তরটি অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত: আল্লাহর প্রতিশ্রুতির সত্যতা প্রত্যক্ষ করার জন্য

কিয়ামতের দিন সব মানুষ – ঈমানদার ও কাফির – জাহান্নাম দেখতে পাবে, যাতে তারা নিশ্চিত হয় যে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। পাশাপাশি ঈমানদাররা জান্নাতও দেখবে এবং বুঝতে পারবে যে আল্লাহ তাদের প্রতি কত দয়ালু। অন্যদিকে কাফিররা জাহান্নামে প্রবেশ করবে এবং তারাও জানতে পারবে যে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য ছিল।

[৩৯:৭৪] “তারা বলবে, ‘সব প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাদের কাছে তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন এবং আমাদেরকে এই যমিনের উত্তরাধিকারী করেছেন, আমরা জান্নাতে যেখানে ইচ্ছা বসবাস করি।’ সুতরাং কতই না উত্তম পুরস্কার আমলকারীদের!”

এখানে ঈমানদাররা স্বীকার করছে যে আল্লাহ তাদের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন। তারা জাহান্নাম দেখেছে বলেই বুঝতে পেরেছে যে তাদেরকে তা থেকে রক্ষা করা হয়েছে।

আর কাফিরদের সম্পর্কে কুরআন বলে যে তারা জান্নাত দেখতেও পাবে না, কারণ তাদের এবং জান্নাতবাসীদের মাঝে একটি অন্তরাল থাকবে:

[৭:৪৬] “আর তাদের উভয়ের মাঝখানে থাকবে একটি হিজাব (পর্দা/দেয়াল)।”

সুতরাং শুধু ঈমানদাররাই জান্নাত দেখতে পাবে; কাফিররা জাহান্নাম ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাবে না।

কুরআনে ‘সিরাত’ শব্দটি বহুবার এসেছে, যেমন ‘আস সিরাতুল মুস্তাকীম’ (সরল পথ) – যা এই জীবনেই অনুসরণ করতে হয়। কিন্তু জাহান্নামের ওপর কোনো সেতুকে ‘আস সিরাত’ বা ‘পুল সিরাত’ নামে কুরআনের কোথাও উল্লেখ করা হয়নি

হাদিস ও তাফসীর গ্রন্থগুলোতে এই কাল্পনিক সেতুর বিস্তারিত বর্ণনা এসেছে, যেমন – এর নাম ‘পুলসিরাত’, এর গঠন, এর কাঁটা, কীভাবে নবী মুহাম্মদ প্রথমে পার হবেন ইত্যাদি। কিন্তু কুরআনে এর কোনো অস্তিত্ব নেই।