কুরআনের পরিভাষায় সুজুদ

ইসলামের মৌলিক ইবাদতগুলোর মধ্যে ‘সুজুদ’ বা সিজদা অন্যতম। কিন্তু বর্তমান সময়ে কিছু আধুনিক ব্যাখ্যায় দাবি করা হয় যে, সুজুদ মানে কেবল ‘আল্লাহর আনুগত্য করা’ বা ‘মনে মনে আত্মসমর্পণ করা’, এটি কোনো শারীরিক ইবাদত নয়। তারা যুক্তি হিসেবে সূরা আর-রাহমানের ৬ নম্বর আয়াতটি দেখান, যেখানে বলা হয়েছে নক্ষত্র এবং বৃক্ষরাজি সিজদা করে। তাদের প্রশ্ন হলো নক্ষত্র বা গাছপালা কীভাবে কপালে ভর দিয়ে সিজদা করবে?

কুরআনের বিভিন্ন স্থানে একই শব্দ ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে এবং এর অনেক উদাহরণ আছে। সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলোর সামগ্রিক বিশ্লেষণ এবং যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করলে দেখা যায়, সুজুদ কেবল একটি বিমূর্ত ধারণা নয়, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট শারীরিক ইবাদত।

কুরআনে বলা হয়েছে যে, মহাবিশ্বের প্রতিটি সৃষ্টিই আল্লাহর তাসবিহ (মহিমা ঘোষণা) এবং সালাত আদায় করে:

“তুমি কি দেখ না যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যারা আছে তারা এবং উড্ডীয়মান পক্ষীকুল আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে? প্রত্যেকেই তার সালাত এবং তাসবিহ জানে।” (২৪:৪১)

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— “প্রত্যেকেই তার পদ্ধতি জানে”। অর্থাৎ মানুষের সেজদা করার পদ্ধতি আর বৃক্ষ বা নক্ষত্রের সিজদা করার পদ্ধতি এক নয়। নক্ষত্র বা গাছ তাদের নিজস্ব উপায়ে আল্লাহর বিধানের কাছে সমর্পিত থাকে। সূরা আল-ইসরা-তে বলা হয়েছে:

“সাত আসমান, পৃথিবী এবং এদের অন্তর্বর্তী সব কিছু তাঁরই পবিত্রতা ঘোষণা করে… কিন্তু তোমরা তাদের পবিত্রতা ঘোষণা বুঝতে পারো না।” (১৭:৪৪)

উক্ত আয়াতে আল্লাহ বলছেন যে, আমরা অন্য প্রাণীদের বা জড়বস্তুর ইবাদতের ধরণ বুঝতে পারি না ।

একটি সহজ উদাহরণ: অক্সিজেন গ্রহণ করা সব প্রাণীর জন্য জরুরি। মানুষ ফুসফুস দিয়ে বাতাস থেকে অক্সিজেন নেয়, কিন্তু মাছ ফুলকা দিয়ে পানি থেকে অক্সিজেন ছেঁকে নেয়। এখন মাছের ফুসফুস নেই বলে কি আমরা বলব যে মাছ অক্সিজেন নেয় না? অবশ্যই না। ঠিক তেমনি, নক্ষত্র বা বৃক্ষ তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে সেজদা করে, আর মানুষের জন্য আল্লাহ সালাতের মাধ্যমে একটি সুনির্দিষ্ট শারীরিক পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

সূরা নিসার ১০২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ যুদ্ধের সময় সালাত আদায়ের নিয়ম শিখিয়েছেন:

“…অতঃপর যখন তারা ‘সুজুদ’ সম্পন্ন করবে, তখন তারা যেন তোমাদের পেছনে অবস্থান নেয় এবং অপর দল যারা সালাত পড়েনি তারা যেন এসে সালাত আদায় করে…” (৪:১০২)

এখন যদি সুজুদ মানে কেবল ‘আল্লাহর প্রতি আনুগত্য’ হতো, তবে এই আয়াতের অর্থ দাঁড়াতো অত্যন্ত অসংলগ্ন। কারণ:

  • মুমিনরা কি সালাত শুরুর সময় আল্লাহর প্রতি অনুগত ছিল না?
  • সালাতের মাঝখানে হঠাৎ তারা অনুগত হলো এবং সাথে সাথে পেছনে চলে গেল?

যারা সালাতে দাঁড়িয়েছে, তারা তো আগেই মুমিন এবং আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণকারী। তাহলে, সালাতের মাঝপথে নতুন করে ‘আত্মসমর্পণ’ করার পর পেছনে যাওয়ার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে? এছাড়াও এখানে সুজুদকে একটি নির্দিষ্ট ‘ধাপ’ বা ‘পর্যায়’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ সালাতের একটি শারীরিক ধাপ শেষ করে তারা পাহারায় যাবে এবং অন্য দল আসবে। এটি স্পষ্ট করে যে, সিজদা একটি দৃশ্যমান শারীরিক ভঙ্গি।

কুরআনে বর্ণিত হয়েছে যে, বিচার দিবসে অপরাধীদের সিজদা করতে বলা হবে কিন্তু তারা পারবে না:

“যেদিন পায়ের গোছা উন্মোচিত করা হবে এবং তাদেরকে সিজদা করতে আহ্বান জানানো হবে, কিন্তু তারা সক্ষম হবে না।” (৬৮:৪২)

অথচ অন্য আয়াতে বলা হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন সকল অবিশ্বাসীই আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করবে (১৬:৮৭)। যদি সুজুদ মানে কেবল ‘আত্মসমর্পণ’ হতো, তবে অপরাধীরা সেদিন তা করতে সক্ষম হতো। কিন্তু তারা সিজদা করতে পারবে না কারণ তাদের শরীর তখন শৃঙ্খলিত থাকবে (১৪:৪৯, ৪০:৭০-৭২)। অর্থাৎ তাদের শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণেই তারা সেদিন এই ইবাদতটি করতে পারবে না।

কুরআনে সিজদার শারীরিক অস্তিত্বের আরেকটি বড় প্রমাণ হলো শরীরের অঙ্গের উল্লেখ:

“বলো, তোমরা এতে বিশ্বাস করো বা না করো, যাদেরকে এর আগে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে, যখন তাদের কাছে এটি পাঠ করা হয়, তখন তারা চিবুকের দিকে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে (ইয়াখির্‌রুনা লিলআয্‌ক্বনি সুজ্জাদা)।” (১৭:১০৭)

এখানে ‘চিবুক’ (Chin) একটি শারীরিক অঙ্গ। মানুষ যখন মাথা উঁচু করে সোজা হয়ে দাঁড়ায় তখন তার চিবুক সাধারণত সামনের নিচের দিকে ইঙ্গিত করে, অর্থাৎ সিজদা দিতে হবে সামনে নিচের দিকে ঝুঁকে। (বি:দ্র: উক্ত আয়াতে ‘চিবুকের উপর’ সিজদার কথা বলা হয়নি, বলা হয়েছে ‘চিবুকের দিকে’ সিজদা করার কথা।)

সিজদা মানে কেবল মানসিক আত্মসমর্পণ হলে চিবু্কের দিকে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার কোনো প্রয়োজন হতো না। এই বর্ণনাটি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে, সিজদা একটি শারীরিক ভঙ্গি।

আল্লাহ ইব্রাহিম ও ইসমাইল-কে তাঁর ঘর পবিত্র রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন:

“আর আমার গৃহকে পবিত্র রাখ তাওয়াফকারী, কিয়ামকারী, রূকু‘কারী ও সিজদাকারীদের জন্য।” (২২:২৬)

মানুষ মসজিদে বা আল্লাহর ঘরে কেবল ‘মানসিকভাবে আত্মসমর্পণ’ করতে যায় না, কারণ তা যেকোনো জায়গা থেকেই করা সম্ভব। নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে রুকু ও সিজদা করার নির্দেশ প্রমাণ করে যে, এগুলো সুনির্দিষ্ট শারীরিক ক্রিয়া—যা সালাতের অংশ।

কুরআনের আয়াতগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে বিচার না করে সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করলে সিজদার প্রকৃত স্বরূপটি আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গাছ বা নক্ষত্রের সিজদা তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে হয়, যা আমাদের বোধগম্য নয়। কিন্তু মানুষের জন্য সুজুদ হলো আল্লাহর নির্দেশে, বিনয়ের সাথে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার সেই শারীরিক ভঙ্গি—যা যুগে যুগে সকল নবী-রাসূল ও মুমিনরা পালন করে এসেছেন। কুরআনের অকাট্য যুক্তি ও প্রমাণ এটাই নিশ্চিত করে যে, সুজুদ কেবল মনের আত্মসমর্পণ নয়, বরং মাটিতে মুখমন্ডল ঠেকিয়ে মহান রবের সামনে চূড়ান্ত দাসত্বের শারীরিক প্রকাশ।

মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর সাথে যারা আছে তারা কাফিরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর দয়াশীল। আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় আপনি তাদেরকে রুকু ও সিজদারত দেখবেন। তাদের মুখমণ্ডলে রয়েছে সিজদার চিহ্ন। তাওরাতে তাদের দৃষ্টান্ত এইরূপই।” (৪৮:২৯)