ইসলামে বহুবিবাহের বিধানটি নিয়ে সমকালীন সমাজে এবং প্রথাগত ব্যাখ্যায় নানা ধরনের বিভ্রান্তি ও ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, ইসলাম পুরুষদের যেকোনো পরিস্থিতিতে চারজন স্ত্রী রাখার একটি সাধারণ বা শর্তহীন অধিকার দিয়েছে। কিন্তু পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নিসার ৩ নম্বর আয়াতের সঠিক প্রেক্ষাপট এবং ব্যাকরণগত গঠন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বহুবিবাহের এই অনুমতিটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং এটি কেবল এতিম শিশুদের কল্যাণ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই দেওয়া হয়েছে।
সূরা আন-নিসা (৪:৩): “আর যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে, তোমরা এতিমদের প্রতি সুবিচার করতে পারবে না, তবে নারীদের মধ্যে যাদেরকে তোমাদের পছন্দ হয় তাদের বিয়ে করো— দুই, তিন বা চারজনকে। কিন্তু যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে, তাদের (স্ত্রীদের) মধ্যে সমতা বজায় রাখতে পারবে না, তবে মাত্র একজনকে (বিয়ে করো)…।”
বহুবিবাহের জন্য কুরআনে নির্ধারিত তিনটি শর্ত
প্রথাগত আলেমরা বহুবিবাহের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র স্ত্রীদের মাঝে সমতা বিধানের শর্তটির কথা বলে থাকেন, কিন্তু কুরআনে মূলত তিনটি সুস্পষ্ট শর্ত দেওয়া হয়েছে:
১. এতিমদের অভিভাবকত্ব গ্রহণ: আয়াতে ব্যবহৃত “যদি” (إِنْ) এবং “তবে” (فَـ) শব্দগুলো প্রমাণ করে যে, বহুবিবাহের প্রথম শর্ত হলো একজন পুরুষকে অবশ্যই এতিমদের লালন-পালন বা অভিভাবকত্বের দায়িত্বে থাকতে হবে।
২. এতিমদের প্রতি সুবিচার করতে না পারার আশঙ্কা: শুধু এতিমদের দায়িত্ব নিলেই হবে না, বরং যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, এতিমদের সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে একা বা এক স্ত্রীর পক্ষে তাদের সঠিক যত্ন, শিক্ষা এবং স্নেহ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, কেবল তখনই দ্বিতীয় বা তার বেশি বিয়ের অনুমতি প্রযোজ্য।
৩. স্ত্রীদের মধ্যে সমতা বজায় রাখা: যদি একাধিক বিয়ে করা হয়, তবে সব স্ত্রীর সাথে সমান ও ন্যায়সঙ্গত আচরণ করতে হবে। যদি এই সমতা বজায় রাখার ব্যাপারে সামান্যতম আশঙ্কাও থাকে, তবে কুরআন সুস্পষ্টভাবে মাত্র একজনকে বিয়ে করার নির্দেশ দিয়েছে।
প্রচলিত দুটি ভুল ধারণার খণ্ডন
১. এতিমদের মায়েদের বিয়ে করার ধারণা: অনেকে মনে করেন, এখানে ‘এতিমদের প্রতি সুবিচার’ বলতে এতিমদের মায়েদের বিয়ে করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ৪:৩ আয়াতটিতে উল্লেখ করা হয়েছে ‘নারীদের মধ্যে যাদেরকে তোমাদের পছন্দ হয়’ কথাটি। অর্থাৎ, এই ক্ষেত্রে পছন্দমতো যেকোনো নারীকে বিয়ে করা যাবে, ওই নারীকে এতিমদের মা হতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
২. এতিম বালিকাদের বিয়ে করার ধারণা: প্রচলিত আরেকটি ভুল ধারণা হলো, ৪:৩ আয়াতে এতিম বালিকাদের বিয়ে করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আয়াতে ব্যবহৃত ইয়াতামা (يَتَـٰمَىٰ) শব্দটি লিঙ্গ নিরপেক্ষ, অর্থাৎ এটি দ্বারা এতিম বালক ও বালিকা উভয়কেই বোঝানো হয়। যদি এতিম বালিকাদেরই বিয়ে করার নির্দেশ থাকতো, তবে আল্লাহ বিয়ের ক্ষেত্রে ‘নারী’ শব্দের পরিবর্তে ‘এতিম বালিকাদের’ শব্দটি ব্যবহার করতেন। তাছাড়া, ৪:৬ আয়াত অনুযায়ী এতিমরা যখন বিয়ের বয়সে পৌঁছায়, তখন তারা আর ‘এতিম’-এর সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না। আর যারা বিয়ের বয়সে পৌঁছায়নি (অর্থাৎ এতিম অবস্থায়) তাদেরকে তো বিয়ে করার সুযোগই নেই। সুতরাং, আয়াতে উল্লিখিত ‘নারী’ বলতে সমাজের যেকোনো (বিবাহযোগ্য) নারীকে বোঝানো হয়েছে, এতিম নাবালিকা শিশুদের নয়।
বহুবিবাহের প্রকৃত উদ্দেশ্য
কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী, ‘বহুবিবাহ’ পুরুষদের যৌন আকাঙ্ক্ষা পূরণের কোনো মাধ্যম নয়, বরং এটি এতিম শিশুদের জন্য সামাজিক ও পারিবারিক নিরাপত্তামূলক একটি মানবিক ব্যবস্থা। কোনো পুরুষ যদি অনেকগুলো এতিমের দায়িত্ব নেন, তবে তাদের জন্য মাতৃস্নেহ ও সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করতে তিনি একাধিক নারীকে বিয়ে করে সংসারে আনতে পারেন।