নবী-রাসুলদের নামের শেষে ‘আলাইহিস সালাম’ পড়া কি বাধ্যতামূলক?

কুরআনের কোথাও বলা হয়নি যে, কোনো নবী বা রাসুলের নাম উচ্চারণের সময় নামের সাথে ‘আলাইহিস সালাম’ (তার উপর শান্তি বর্ষিত হোক / Peace Be Upon Him) কথাগুলো যোগ করা আবশ্যক। বরং, কুরআন আমাদের জানায় যে, নবী-রাসুলদের নাম কোনো অতিরিক্ত শব্দ ছাড়াই বলা সম্পূর্ণ বৈধ।

নবী ও রাসুলগণ ছিলেন আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত বান্দা, যারা আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেওয়ার জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু দিনশেষে, তারাও ছিলেন সাধারণ মানুষ; তাদেরকেও অন্য সকল মানুষের মতোই আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে এবং নিজ নিজ আমল অনুযায়ী প্রতিদান পেতে হবে।

আল্লাহ বলেন:

“তোমরা বলো, ‘আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর ওপর এবং যা আমাদের ওপর নাজিল করা হয়েছে এবং যা ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকূব ও তাঁর বংশধরদের ওপর নাজিল করা হয়েছিল এবং যা মূসা ও ঈসাকে প্রদান করা হয়েছিল এবং যা অন্যান্য নবীকে তাঁদের রবের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছিল। আমরা তাঁদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করি না। আর আমরা তাঁরই অনুগত (মুসলিম)।” (২:১৩৬)

উপরের আয়াতে ‘বলো’ (ক্বু’লু’) শব্দটি বহুবচনে এসেছে, যার অর্থ দাঁড়ায় ‘তোমরা বলো’। অর্থাৎ, আমাদের সকলকেই এ কথাগুলো ঠিক যেভাবে আছে সেভাবেই বলতে হবে, কোনো বাড়তি শব্দ যোগ না করে। উক্ত আয়াতে কি কোনো নবীর নামের শেষে ‘আলাইহিস সালাম’ বা ‘PBUH’ ব্যবহার করা হয়েছে? – উত্তর হলো ‘না’।

মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুলদের একজন। তিনি অন্যান্য রাসুলদের থেকে ভিন্ন নন। আল্লাহ নিজেই তাঁকে বলতে নির্দেশ দিয়েছেন:

“বলো, ‘আমি রাসুলদের মধ্যে নতুন কেউ নই। আমি জানি না আমার সাথে এবং তোমাদের সাথে কী আচরণ করা হবে। আমি কেবল তারই অনুসরণ করি, যা আমার কাছে ওহী পাঠানো হয়। আর আমি তো একজন স্পষ্ট সতর্ককারী মাত্র।’” (৪৬:৯)

সুতরাং, অন্যান্য নবী-রাসুলদের ক্ষেত্রে যা প্রযোজ্য, মুহাম্মাদ-এর ক্ষেত্রেও তাই প্রযোজ্য। যদি আমরা মুহাম্মাদ-কে অন্যান্য নবীদের চেয়ে পৃথক মর্যাদা দেই বা বাড়তি সম্মান দেখাই, তাহলে সেটি আল্লাহর নির্দেশের পরিপন্থী হবে। আল্লাহ বলেন:

“রাসুল তাঁর রবের পক্ষ থেকে তাঁর ওপর যা নাজিল করা হয়েছে তার ওপর ঈমান এনেছেন এবং মুমিনগণও। প্রত্যেকেই ঈমান এনেছে আল্লাহর ওপর, তাঁর ফেরেশতাদের ওপর, তাঁর কিতাবসমূহের ওপর এবং তাঁর রসূলগণের ওপর। (তারা বলে) ‘আমরা তাঁর রসূলগণের মধ্যে কোনো পার্থক্য করি না।’ তারা আরও বলে, ‘আমরা শুনলাম ও মানলাম। হে আমাদের রব! আমরা আপনার ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং আপনার দিকেই প্রত্যাবর্তনস্থল।’” (২:২৮৫)

২:২৮৫ আয়াতে বলা হয়েছে যে, মুমিনদের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তারা আল্লাহর রাসুলদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না। সুতরাং, কোনো নির্দিষ্ট নবী বা রাসুলকে অন্যদের তুলনায় বিশেষ মর্যাদা দেওয়া বা শুধু তাঁর নামের সাথে বিশেষ সম্মানসূচক শব্দ যুক্ত করা, মূলত এই নির্দেশনার পরিপন্থী।

উপরের আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারলাম যে, নবী ও রাসুলদের নামের সাথে ‘আলাইহিস সালাম’ যুক্ত করা বাধ্যতামূলক নয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে, নবী-রাসুলদের জন্য দোয়া করা বা শান্তির বাণী প্রেরণ করা কুরআনবিরোধী কাজ। বরং কুরআনে আমরা দেখতে পাই যে বহু জায়গায়, আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবী-রাসুলদের জন্য ‘সালাম’ বা শান্তির বাণী উল্লেখ করেছেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এখানে তিনি কোনো নবীকে আলাদা না করে সবার জন্য একই শব্দ ব্যবহার করেছেন।

“আর আমি পরবর্তীদের মাঝে তার (ইবরাহিমের) সুখ্যাতি রেখে দিয়েছি। শান্তি বর্ষিত হোক ইবরাহিমের ওপর (আরবি: সালামুন আলা ইব্রাহিম)।” (৩৭:১০৮-১০৯)

“আর আমি পরবর্তীদের মাঝে তার (নূহের) সুখ্যাতি রেখে দিয়েছি। শান্তি বর্ষিত হোক বিশ্বজগতের মধ্যে নূহের ওপর (আরবি: সালামুন আলা নূহিন)।” (৩৭:৭৮-৭৯)

“আর আমি পরবর্তীদের মাঝে তাদের উভয়ের (মূসা ও হারুনের) সুখ্যাতি রেখে দিয়েছি। শান্তি বর্ষিত হোক মূসা ও হারুনের ওপর (আরবি: সালামুন আলা মূসা ওয়া হারুনা)।” (৩৭:১১৯-১২০)

“আর আমি পরবর্তীদের মাঝে তার (ইলিয়াসের) সুখ্যাতি রেখে দিয়েছি। শান্তি বর্ষিত হোক ইলিয়াসীন-এর ওপর (আরবি: সালামুন আলা ইলইয়াসীন)।” (৩৭:১২৯-১৩০)

শুধু নির্দিষ্ট কয়েকজন নবীর জন্যই নয়, বরং সমস্ত রাসুলের জন্যই আল্লাহ ‘সালাম’ এর বাণী উল্লেখ করেছেন:

“এবং শান্তি বর্ষিত হোক রাসুলগণের ওপর (সালামুন আলা’ল মুরসালিন)।” (৩৭:১৮১)

উপরের আয়াতগুলো থেকে এটি স্পষ্ট যে, নবী-রাসুলদের জন্য ‘সালাম’ বা শান্তির দোয়া করা একটি কুরআনসম্মত কাজ। আর এটিও স্পষ্ট যে, কুরআনে বর্ণিত পদ্ধতিটি অবলম্বন করলে কোনো নবীর মধ্যে পার্থক্য করা হয় না; বরং সকল নবী-রাসুলের প্রতিই সমানভাবে ‘সালাম’ প্রেরণ করা হয়।

অনেকের মনে হতে পারে, মৃতরা তো ইতোমধ্যে তাদের গন্তব্যে পৌঁছে গিয়েছে। তাদের ব্যাপারে আল্লাহর ফায়সালা নির্ধারিত হয়ে গিয়েছে। এবং কুরআনে যেহেতু কবরের জীবন বলতে কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই তাই মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করে কি কোন ফায়দা আছে?

প্রশ্নগুলো খুবই যৌক্তিক। কুরআনের অনেকগুলো আয়াত থেকেও এটি প্রতীয়মান হয় যে মৃত ব্যক্তিদের জন্য দোয়া করলেও পরকালে তা তাদের কোন উপকারে আসবে না। উদাহরণস্বরূপ, ইবরাহিম তাঁর পিতার জন্য দোয়া করেছিলেন, কিন্তু যখন স্পষ্ট হয়ে গেল যে তিনি আল্লাহর শত্রু, তখন তিনি দোয়া করা থেকে বিরত হন (৯:১১৪)। মহাপ্লাবণের সময় নূহ তাঁর পুত্রের জন্য সুপারিশ করতে পারেননি (১১:৪৬)। নবী ও অন্য মুমিনদেরকেও মুশরিক আত্মীয়দের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার অনুমতি দেওয়া হয়নি (৯:১১৩)। বরং, বলা হয়েছে মুনাফিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কোন কাজে আসবে না:

“তুমি তাদের (মুনাফিকদের) জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো অথবা না করো (উভয়ই সমান)। যদি তুমি সত্তর বারও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো, তবুও আল্লাহ তাদের কখনোই ক্ষমা করবেন না। এটা এ কারণে যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে অস্বীকার করেছে। আর আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে হিদায়াত দেন না।” (৯:৮০)

এছাড়াও কুরআনের বহু আয়াতে বলা হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন কারো সুপারিশ কোন কাজে আসবে না (২:৪৮, ২:১২৩, ৬:৫১, ৬:৭০, ১৯:৮৭, ৩০:১৩, ৩২:৪, ৩৯:৪৪, ৪০:১৮, ৪৩:৮৬, ৫৩:২৬, ৭৪:৪৮)।

তবে আমাদের একটি কথা মাথায় রাখতে হবে – মহান আল্লাহ আমাদের মতো সময়ের অধীন নন। তিনি সময়ের ঊর্ধ্বে। তিনি সময়ের স্রষ্টা এবং তিনিই আমাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত নির্ধারণ করেন। তিনি সৃষ্টির আগে থেকেই জানতেন আমরা কখন, কার জন্য, কী দোয়া করবো। তাই আমরা যখন মৃত ব্যক্তির জন্য শান্তি কামনা করি, তখন ব্যাপারটি এমন হতে পারে যে – তিনি সেই দোয়াকে সৃষ্টির মধ্যে এমনভাবে স্থাপন করেছেন, যেন এর ফলাফল ওই ব্যক্তির জীবদ্দশায় কার্যকর হয়। অর্থাৎ, যখন আল্লাহ বলছেন ‘সালামুন আলা ইব্রাহিম’ (ইব্রাহিমের ওপর শান্তি) – তখন এই আশীর্বাদ ইব্রাহিমের জীবদ্দশায় কার্যকর হচ্ছে।

এর মানে হলো, পরবর্তী প্রজন্মের মুখে যখন পূর্ববর্তী নবীদের জন্য ‘সালাম’ বা শান্তির বাণী উচ্চারিত হয়, তখন সেই দোয়া ও সম্মান মূলত ওই নবীদের জীবদ্দশায় তাদের মর্যাদা ও শান্তির কারণ হয়ে যায়। কারণ আল্লাহ, যিনি সময়ের উর্ধ্বে, তিনি পরবর্তী প্রজন্মের এই দোয়াকে সৃষ্টির শুরু থেকেই ওই নবীদের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে দেন।

শেষ কথা হলো, কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী, নবী-রাসুলদের নামের শেষে ‘আলাইহিস সালাম’ বা অন্য কোনো সম্মানসূচক শব্দ যোগ করা বাধ্যবাধতামূলক নয়।

তবে, কুরআনে নবী-রাসুলদের জন্য ‘সালাম’ বা শান্তির দোয়া করার উদাহরণ রয়েছে, যা অনুসরণ করা যেতে পারে (উদাহরণস্বরূপ – যেকোনো নবীর নামের শেষে ‘সালামুন আলাইহি’ বা ‘peace be upon him’ বলা যেতে পারে)। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যে পদ্ধতিই অবলম্বন করা হোক না কেন, আমাদের সতর্ক থাকতে হবে যেন আল্লাহর রাসুলদের মধ্যে কোনো পার্থক্য বা বৈষম্য সৃষ্টি না হয়। তাই আমরা কেবল মুহাম্মদের নামের শেষে ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ কথাটি যোগ করার অভ্যাস পরিত্যাগ করবো। এবং যদি নবীদের জন্য শান্তির দোয়া করি, তাহলে সবার জন্য একই নিয়মে তা করবো।