“আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসুলের আনুগত্য করো” (আতিউল্লাহা ওয়া আতিউর রাসূল) – নির্দেশনাটি কুরআনে বর্ণিত আল্লাহর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাগুলোর একটি। অনেক হাদিসপন্থী ব্যক্তি হাদিস ও সুন্নাহকে ধর্মীয় বিধানের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে এই নির্দেশটি ব্যবহার করেন। তাদের দাবি হলো, আল্লাহর আনুগত্য মানে কুরআন মেনে চলা, আর রাসুলের আনুগত্য মানে তার ব্যক্তিগত বাণী (হাদিস) ও পদ্ধতি (সুন্নাহ) মেনে চলা। তাদের মতে, যদি রাসুলের আনুগত্য কেবল কুরআনের আনুগত্য হতো, তাহলে আল্লাহ শুধু “আল্লাহর আনুগত্য করো” বলেই ক্ষান্ত দিতেন। তাই “রাসুলের আনুগত্য করো” আলাদাভাবে বলার অর্থ হলো, রাসুলের পক্ষ থেকে কুরআনের বাইরেও স্বতন্ত্র কিছু শিক্ষা আছে যেগুলো আমাদের মেনে চলতে হবে।
আমরা এই লেখায় কুরআনের আলোকে এই দাবির যাচাই-বিশ্লেষণ করবো এবং দেখবো যে কুরআনে “রাসুলের আনুগত্য” বলতে আসলে কী বোঝানো হয়েছে।
১. কেন কুরআনে ‘রাসুলের আনুগত্য’ করতে বলা হয়েছে?
প্রশ্ন জাগতে পারে, আল্লাহ কেন শুধু “আল্লাহর আনুগত্য করো” না বলে “রাসুলের আনুগত্য করো” বলেছেন? এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে:
ক. রাসুলকে ‘বলো’ দ্বারা নির্দেশ: কুরআনে অন্তত ৩৩২টি আয়াত রয়েছে যেখানে আল্লাহ মুহাম্মাদ-কে নির্দিষ্ট কিছু কথা “বলো” (ক্বুল) বলে মানুষের সামনে উপস্থাপন করার নির্দেশ দিয়েছেন। এই কথাগুলোই রাসুলের সেই বাণী যা আমরা মানতে বাধ্য। কারণ এই কথাগুলো সরাসরি আল্লাহর নির্দেশে রাসুল বলেছেন। যেমন:
[৬:১৪] বলো, ‘আমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করব, যিনি আসমান ও জমিনের স্রষ্টা? অথচ তিনি সবাইকে আহার দান করেন এবং তাঁকে কেউ আহার দেয় না।’ বলো, ‘আমি আদিষ্ট হয়েছি যেন আমিই প্রথম আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) হই; আর তুমি কখনোই মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।’
[৬:৬৩] বলো, ‘স্থল ও সমুদ্রের অন্ধকার থেকে কে তোমাদের রক্ষা করেন? যখন তোমরা তাঁর কাছে বিনীতভাবে এবং গোপনে প্রার্থনা করো যে—তিনি যদি আমাদের এ থেকে উদ্ধার করেন, তবে আমরা অবশ্যই কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হব।’
[৬:১৫১] বলো, ‘এসো, তোমাদের রব তোমাদের ওপর যা নিষিদ্ধ করেছেন তা পাঠ করি: তোমরা তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরিক করো না, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো; দারিদ্র্যের কারণে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না—আমিই তোমাদের এবং তাদের রিজিক দিই; প্রকাশ্য হোক কিংবা গোপন, অশ্লীল কাজের কাছেও যেয়ো না; আর আল্লাহ যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন তাকে ন্যায়সংগত কারণ ছাড়া হত্যা করো না। তিনি তোমাদের এই নির্দেশ দিয়েছেন যেন তোমরা বুঝতে পারো।’
এই আয়াতগুলোই হলো সেই কারণ, যে কেন আল্লাহ মুমিনদেরকে “রাসুলের আনুগত্য” করার নির্দেশ দিয়েছেন।
খ. রাসুলের মাধ্যমেই আল্লাহর নির্দেশ পৌঁছানো: রাসুলের সাহাবিদের মধ্যে কি কেউ সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে ওহি শুনেছেন?— উত্তর হলো ‘না’। তাই তারা আল্লাহর আনুগত্য করতে পারেন শুধুমাত্র রাসুলের মাধ্যমে যা এসেছে তা মেনে চলার মাধ্যমেই। তাই আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন রাসুলের আনুগত্য করতে, কেননা তিনিই তাদের কাছে আল্লাহর বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন।
গ. পূর্ববর্তী কিতাবের অনুসারীদের জন্য: কুরআন যখন নাজিল হয়েছিল, তখন আরব ভূখণ্ডে মূর্তিপূজারি, ইহুদি ও খ্রিস্টানরা বসবাস করত। ইহুদি ও খ্রিস্টানরা বলতে পারতো, “আমরা তো আল্লাহর আনুগত্য করছিই, তিনি আমাদের কাছে কিতাব পাঠিয়েছেন (তাওরাত, ইঞ্জিল) এবং আমরা তার অনুসরণ করছি।” তাই ইহুদি-খ্রিস্টানরা যেন মুহাম্মদ রাসুলের প্রতি প্রেরিত এই নতুন বার্তা (কুরআন) গ্রহণ করে নেয় সেজন্য সকলকে “রাসুলের আনুগত্য” করতে বলা হয়েছে। এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, সকলকে পূর্ববর্তী কিতাবগুলো বাদ দিয়ে নতুন এই চূড়ান্ত কিতাবের অনুসরণ করতে হবে। যেমন আল্লাহ বলেন:
[৫:৪৮] আর আমি তোমার প্রতি সত্যসহ এই কিতাব (কুরআন) নাযিল করেছি, যা তার পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী এবং সেগুলোর ওপর রক্ষণাবেক্ষণকারী (মুহাইমিন)।
২. রাসুলের দায়িত্ব কী?
কুরআনে স্পষ্টভাবে রাসুলের দায়িত্ব সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে:
[৫:৯২] আর তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসূলের আনুগত্য করো এবং সতর্ক থাকো। অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে জেনে রেখো যে, আমার রাসূলের দায়িত্ব কেবল স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া।
[৬৪:১২] আর তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসূলের আনুগত্য করো। অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে আমার রাসূলের দায়িত্ব কেবল স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া।
এই আয়াতগুলো স্পষ্টভাবে বলে দেয় যে রাসুলের একমাত্র দায়িত্ব ছিল আল্লাহর বার্তা (message) মানুষের নিকট পৌঁছে দেওয়া। তাই রাসুলের আনুগত্য বলতে বোঝায়, তিনি যে বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন, তার আনুগত্য করা। “বার্তা (message)” ও “বার্তাবাহক (messenger)” পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। বার্তা না থাকলে বার্তাবাহকের প্রয়োজনই হতো না।
৩. ‘মুহাম্মদের’ আনুগত্য নাকি ‘রাসুলের’ আনুগত্য?
আমরা কুরআনের কোথাও “আল্লাহ ও মুহাম্মদের আনুগত্য করো” বা “আল্লাহ ও ঈসার আনুগত্য করো” এরকম বাক্য দেখতে পাই না। সর্বত্র বলা হয়েছে “রাসুলের আনুগত্য করো”। ব্যাপারটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আল্লাহ তাঁর বাণীতে প্রতিটি শব্দ সুনিপুণভাবে বেছে নিয়েছেন। “রাসুলের আনুগত্য” কথাটির দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, আনুগত্য হবে ব্যক্তি মুহাম্মদের জন্য নয়, বরং তিনি যে “বার্তা” (রিসালাত) নিয়ে এসেছেন তার জন্য। নিম্নোক্ত আয়াতে এটি পুনরায় নিশ্চিত করা হয়েছে:
[৫:৯৯] রাসূলের দায়িত্ব কেবল পৌঁছে দেওয়া; আর তোমরা যা প্রকাশ করো এবং যা গোপন করো, আল্লাহ তা জানেন।
৪. মুহাম্মদ-এর কাছে প্রেরিত একমাত্র বার্তা ছিল কুরআন
কিছু হাদিসপন্থী দাবি করেন যে, হাদিসগুলোও আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত ওহি। কিন্তু কুরআনের আয়াতগুলো পরীক্ষা করলে দেখা যায়, মুহাম্মাদ কুরআন ছাড়া আর কোনো ধর্মীয় বিধান লাভ করেননি।
আল্লাহ বলেন:
[৬:১৯] বলো, ‘কোনটি সবচেয়ে বড় সাক্ষ্য (আকবার শাহাদাহ)?’ বলো, ‘আল্লাহ আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী; আর এই কুরআন আমার কাছে ওহী হিসেবে পাঠানো হয়েছে যাতে এর মাধ্যমে আমি তোমাদেরকে এবং যাদের কাছে এটি পৌঁছাবে তাদেরকে সতর্ক করতে পারি ।
এখানে আল্লাহ এই কথাগুলোকে “আকবার শাহাদাহ” (সবচেয়ে বড় সাক্ষ্য) বলে আখ্যায়িত করেছেন। এই সাক্ষ্যে বলা হচ্ছে মুহাম্মদ আল্লাহর কাছ থেকে শুধু কুরআনই পেয়েছেন। যদি তিনি আরও কিছু পেতেন, তাহলে সেটাও এই সাক্ষ্যে উল্লেখ থাকত।
অধিকন্তু, যদি মুহাম্মদ-এর বলা প্রতিটি কথাই আল্লাহর পক্ষ থেকে হতো, তাহলে তিনি ভুল করতেন না। অথচ কুরআনে ছয়টি স্থানে মুহাম্মদের ভুলের কথা উল্লেখ করে তাকে সংশোধন করে দেয়া হয়েছে। যেমন তিনি একবার নিজে থেকে একটি জিনিস হারাম করে নিয়েছিলেন, যার জন্য আল্লাহ তাকে ভর্ৎসনা করে বলেন:
[৬৬:১] “হে নবী! আল্লাহ যা তোমার জন্য হালাল করেছেন, তুমি তা হারাম করছ কেন? তুমি তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি চাচ্ছো?”
আল্লাহ যা হারাম করেননি তা নিজ থেকে হারাম ঘোষণা করা গর্হিত অপরাধ:
[১৬:১১৬] আর তোমাদের জিহ্বা থেকে যে মিথ্যা বর্ণিত হয় তার ভিত্তিতে আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করার জন্য তোমরা বলো না যে—‘এটি হালাল এবং এটি হারাম’; নিশ্চয় যারা আল্লাহর ওপর মিথ্যা অপবাদ দেয়, তারা সফল হবে না।
যদি মুহাম্মদের সব কথাই ওহি হতো, তাহলে তিনি যে ভুলগুলো করতেন, সেগুলো করার জন্যও কি আল্লাহ তাঁকে ওহি পাঠাতেন, তারপর আবার সেই ভুলের জন্যই তাঁকে ভর্ৎসনা করতেন?—এটি যুক্তিসংগত নয়।
৫. আল্লাহ শুধু কুরআন সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন
আল্লাহ বলেন:
[১৫:৯] নিশ্চয় আমিই এই যিকর নাযিল করেছি এবং আমিই অবশ্যই এর সংরক্ষক।
আল্লাহ শুধু কুরআন সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। রাসুলের ব্যক্তিগত বাণী বা হাদিস সংরক্ষণের কোনো প্রতিশ্রুতি তিনি দেননি। পূর্ববর্তী কিতাবগুলো যেমন তাওরাত ও ইঞ্জিল সংরক্ষিত হয়নি, কিন্তু কুরআন সংরক্ষিত হবে। তাই ধর্মীয় বিধানের জন্য শুধু কুরআনই যথেষ্ট।
৬. হাদিসের গ্রন্থায়ন
আজকে যেসব হাদিস গ্রন্থ “সহিহ” (নির্ভুল) বলে পরিচিত, সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীনতমটির গ্রন্থকার ছিলেন ইমাম বুখারি। তিনি হিজরি ১৯৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। অর্থাৎ রাসুলের মৃত্যুর অন্তত ২০০ বছর পর এসব হাদিস লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, যদি “রাসুলের আনুগত্য” বলতে হাদিস মেনে চলা বোঝাতো, তাহলে প্রথম ২০০ বছর মুসলিমরা কীভাবে এই আদেশ পালন করতেন? আল্লাহ কি তাদের জন্য সে সময় রাসুলের আনুগত্য করার কোনো ব্যবস্থা রাখেননি?
৭. শুধু কুরআন অনুসরণের নির্দেশ
কুরআনে বহু জায়গায় একমাত্র কুরআন অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:
[৬:১১৪] বলো, ‘তবে কি আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে বিচারক হিসেবে তালাশ করব? অথচ তিনিই তোমাদের প্রতি বিস্তারিত কিতাব নাযিল করেছেন।’
[৭:৩] তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে, তোমরা তার অনুসরণ করো এবং তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য অভিভাবকদের অনুসরণ করো না। তোমরা খুব সামান্যই উপদেশ গ্রহণ করে থাকো।
৮. কুরআনে কি রাসুলের ‘সুন্নাহ’ অনুসরণের নির্দেশ আছে?
কুরআনে আমরা রাসুলের সুন্নাহ অনুসরণের কোনো নির্দেশ পাই না। বরং কুরআনে একমাত্র আল্লাহর সুন্নাহর কথা উল্লেখ রয়েছে:
[৩৫:৪৩] …তুমি আল্লাহর সুন্নাহতে (নিয়মে) কোনো পরিবর্তন পাবে না এবং তুমি আল্লাহর সুন্নাহতে কোনো বিচ্যুতিও পাবে না।
রাসুলকে যে সুন্নাহ অনুসরণ করতে বলা হয়েছিল, সেটিও ছিল আল্লাহর সুন্নাহ:
[৩৩:৩৮] …আল্লাহর এই সুন্নাহ তাদের ক্ষেত্রেও ছিল যারা পূর্বে গত হয়েছে। আর আল্লাহর আদেশ সুনির্ধারিত ও সুপরিকল্পিত।
সূরা আল-আহযাবের ২১ নং আয়াতকে (রাসুলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ) হাদিসপন্থীরা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন। প্রকৃতপক্ষে এখানে উত্তম আদর্শ বলতে বোঝানো হয়েছে রাসুলের ‘সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ করা এবং আখিরাত কামনা করা’র গুণটিকে। কিন্তু হাদিসপন্থীরা এটাকে খাওয়া-দাওয়া, পায়খানা-পেশাবের নিয়ম, ঘুমানোর পদ্ধতি ইত্যাদি তুচ্ছ বিষয়ের আদর্শে পরিণত করেছেন।
৯. কুরআনে কি রাসুলের ‘হাদিস’ অনুসরণের নির্দেশ আছে?
কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে আল্লাহর কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য হাদিস হলো কুরআন:
[৪৫:৬] এগুলো আল্লাহর আয়াত, যা আমি তোমার নিকট পাঠ করছি সত্যসহকারে। সুতরাং, আল্লাহ ও তাঁর আয়াতের পর আর কোন হাদিসে তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে?
[৭:১৮৫] …সুতরাং, তারা এরপর আর কোন হাদিসে বিশ্বাস স্থাপন করবে?
[৬৮:৩৬-৩৮] তোমাদের কী হয়েছে? তোমরা কীভাবে ফয়সালা করছো? তোমাদের কাছে কি এমন কোনো কিতাব আছে যাতে তোমরা এসব পড়ে থাকো? যে, তাতে তোমাদের জন্য তা-ই আছে যা তোমরা চাও?
এই আয়াতগুলোতে কুরআন ছাড়া অন্য কোনো হাদিস (বাণী, গ্রন্থ) মেনে চলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। হোক সেটি “সহিহ” বা “যঈফ”, তা এখানে প্রাসঙ্গিক নয়।
আল্লাহ আরও বলেন যে, তিনি শয়তানদের মাধ্যমে মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য মিথ্যা বাণীর প্রচার হতে দিয়েছেন:
[৬:১১২-১১৩] এভাবেই আমি প্রত্যেক নবীর জন্য শত্রু সৃষ্টি করেছি—মানুষ ও জিন শয়তানদের মধ্য থেকে। তারা একে অপরকে প্রতারণার উদ্দেশ্যে চটকদার কথা দ্বারা প্ররোচিত করে। তোমার রব চাইলে তারা এমন করত না; সুতরাং তাদের এবং তাদের মিথ্যা রটনাকে বর্জন করো।
১০. রাসুল কি কুরআন ছাড়া অন্য কোনো শিক্ষা দিতে পারতেন?
আল্লাহ রাসুলকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন যে, তিনি যদি কুরআন ছাড়া অন্য কিছু আল্লাহর নামে বলার চেষ্টা করেন, তাহলে তাঁকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে:
[৬৯:৪৩-৪৭] এটি জগতসমূহের রবের নিকট হতে অবতীর্ণ। আর সে (মুহাম্মদ) যদি আমার নামে কোনো কথা রচনা করত, তবে আমি অবশ্যই তার ডান হাত ধরে ফেলতাম, অতঃপর কেটে দিতাম তার হৃদ-ধমনী। তোমাদের মধ্যে কেউ তাকে রক্ষা করতে পারতে না।
যারা দাবি করেন রাসুল কুরআনের পাশাপাশি আরেকটি স্বতন্ত্র ধর্মীয় উৎস রেখে গেছেন, তারা হয় এই আয়াত অস্বীকার করছেন, অথবা রাসুলের ওপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করছেন।
১১. রাসুলের নির্দেশনা
স্পষ্ট কুরআনি নির্দেশনার আলোকে রাসুল নিজেও তাঁর উম্মতকে তার ব্যক্তিগত বাণী লিপিবদ্ধ না করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এটি সহিহ মুসলিম ও আহমাদ ইবনে হাম্বলের গ্রন্থে বর্ণিত আছে:
আমার মুখ নিঃসৃত বাণী তোমরা লিপিবদ্ধ করো না। কুরআন ছাড়া কেউ যদি আমার কথা লিপিবদ্ধ করে থাকে তবে সে যেন তা মিটিয়ে ফেলে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৭৪০০)
রাসুলের এই নির্দেশনার কারণে তাঁর মৃত্যুর পর প্রায় ২০০ বছর পর্যন্ত তাঁর হাদিস লিপিবদ্ধ করা নিষিদ্ধ ছিল। এরপর যখন হাদিস গ্রন্থায়ন শুরু হয়, তখন তা ছিল রাসুলের সুস্পষ্ট নির্দেশের লঙ্ঘন।
১২. রাসুল নিজে কী অনুসরণ করতেন?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাসুল নিজে কী অনুসরণ করতেন? এর উত্তর কুরআনে স্পষ্টভাবে দেওয়া আছে:
[৪৬:৯] বলো, ‘আমি রাসূলদের মধ্যে নতুন নই এবং আমি জানি না আমার সাথে কী করা হবে আর তোমাদের সাথেই বা কী করা হবে। আমার প্রতি যা ওহী করা হয়, আমি কেবল তারই অনুসরণ করি; আর আমি তো কেবল একজন সুস্পষ্ট সতর্ককারী।’
[৫:৪৮] আর আমি তোমার প্রতি সত্যসহ কিতাব নাযিল করেছি… সুতরাং আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তুমি সে অনুযায়ী তাদের বিচার-ফয়সালা করো এবং তোমার কাছে যে সত্য এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়ালখুশির অনুসরণ করো না।
যেহেতু রাসুল নিজে শুধু কুরআন অনুসরণ করতেন, তাই তার অনুসারীদেরও উচিত একই কাজ করা। যে ব্যক্তি কুরআন ছাড়া অন্য কিছু অনুসরণ করে, সে মূলত রাসুল যা অনুসরণ করেননি তা অনুসরণ করছে।
উপসংহার
“আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য” বলতে বোঝায়, রাসুলের মুখ দিয়ে উচ্চারিত আল্লাহর বাণী তথা পবিত্র কুরআনের সম্পূর্ণ ও একনিষ্ঠ আনুগত্য করা। রাসুলের দায়িত্ব ছিল শুধু এই বাণী মানুষের নিকট পৌঁছে দেওয়া। তিনি নিজেও শুধু এই বাণীর অনুসরণ করেছেন। আল্লাহ শুধু এই বাণীই সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং কুরআন ছাড়া অন্য কোনো হাদিস মেনে চলতে নিষেধ করেছেন। রাসুল নিজেও তাঁর ব্যক্তিগত বাণী লিপিবদ্ধ করতে নিষেধ করে গিয়েছেন।
অতএব, রাসুলের মৃত্যুর ২০০ বছর পরে লিপিবদ্ধ হাদিস গ্রন্থগুলোকে “রাসুলের আনুগত্য” বলে চালানো আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশের পরিপন্থী। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রকৃত আনুগত্য হলো সেই “আলোকবর্তিকা” (কুরআন) অনুসরণ করা, যা রাসুল নিয়ে এসেছিলেন:
[৭:১৫৭] সুতরাং যারা তাঁর প্রতি ঈমান আনে, তাঁকে সম্মান করে, তাঁকে সাহায্য করে এবং তাঁর সাথে যে নূর (কুরআন) নাযিল করা হয়েছে তার অনুসরণ করে; তারাই সফলকাম।
আল্লাহর আনুগত্য ও রাসুলের আনুগত্য এক ও অভিন্ন—তা হলো একমাত্র কুরআনের অনুসরণ।