(মূল লেখা: qurantalkblog.com)
সুন্নি ইসলামে ‘মুতাওয়াতির’ হাদিসগুলোকে প্রামাণ্যতার সর্বোচ্চ মানদণ্ড বা ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দাবি করা হয়, বিপুল সংখ্যক বর্ণনাকারী থেকে বর্ণিত হওয়ার কারণে এই হাদিসগুলো অকাট্য এবং সকল প্রকার সন্দেহের ঊর্ধে। তবে বাস্তবতা হলো, মুতাওয়াতির হাদিস নিয়ে সুন্নি স্কলারদের মধ্যেই সর্বসম্মত কোনো ইজমা নেই। সুন্নি আলেমদের মাঝেই মুতাওয়াতির হাদিসের সংখ্যা, প্রায়োগিক দিক, এমনকি হাদিসগুলোর মান নিয়েও বিস্তর মতবিরোধ রয়েছে। এই মতপার্থক্যগুলোই প্রমাণ করে যে, ‘তাওয়াতুর’ (mass transmission) সবসময় সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা ও শতভাগ বিশুদ্ধতার গ্যারান্টি দেয় না।
মুতাওয়াতির -এর সংজ্ঞা
‘মুতাওয়াতির’ বলতে এমন বর্ণনা বা সংবাদকে বোঝানো হয়, যা প্রতিটি যুগে এবং বিভিন্ন ভৌগোলিক স্থানে এত বিপুল সংখ্যক মানুষ থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তাদের সবার পক্ষে একজোট হয়ে একইরকম একটি মিথ্যা রটানো কার্যত অসম্ভব।
এই ধারণাটি ইসলামের আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল; প্রাচীন গ্রিক ও রোমান ইতিহাসেও কোন ঘটনার সত্যতা প্রমাণের জন্য বিপুল সংখ্যক মানুষের সাক্ষ্য বা ঐকমত্যকে নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
ইসলামের ইতিহাসে মুতাওয়াতির শব্দটি বিশেষ গুরুত্ব পায় হাদিসশাস্ত্র বিকাশের সময়কালে। রাসুল-এর দিকে যেসব বর্ণনা সম্বন্ধযুক্ত করা হয় সেগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সুন্নি আলেমগণ হাদিসগুলোকে বিভিন্ন স্তরে ভাগ করার উদ্যোগ নেন। আল-সুয়ুতিসহ প্রথম দিককার অন্যান্য হাদিস সংকলকগণ তাদের সংকলনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হাদিসগুলোর বিশুদ্ধতা জোরদার করতে ‘মুতাওয়াতির’-এর ধারণাটি প্রয়োগ করেছিলেন।
আসলেই কি কোন হাদিস মুতাওয়াতির?
কোন হাদিস মুতাওয়াতির হতে হলে রাসুলের সময়কাল থেকে প্রতিটি প্রজন্মে হাদিসটির বিপুল সংখ্যক বর্ণনাকারীর নিরবচ্ছিন্ন সূত্র থাকতে হয়। কিন্তু বাস্তবে এই শর্ত পূরণ করে এমন একটি হাদিসও খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত দুষ্কর ছিল। প্রাথমিক যুগের হাদিসী পণ্ডিতগণ ‘মুতাওয়াতির’ এর এই কঠোর মানদণ্ড মেলাতে গিয়ে বেশ হিমশিম খেয়েছেন।
কোনো বর্ণনাকে মুতাওয়াতির হিসেবে গণ্য করতে হলে এর বর্ণনাকারীদের সংখ্যা এত বেশি এবং ভৌগোলিকভাবে বর্ণনাকারীদের অবস্থান এত বিস্তৃত হতে হবে, যেন তাদের মধ্যে যোগসাজশ বা মিথ্যার আশ্রয় নেওয়ার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা না থাকে। বাস্তবতা হলো, কোনো হাদিসের পক্ষেই এই কঠিন মানদণ্ড অর্জন করা সম্ভব ছিল না।
আমেরিকান ইসলামিক স্কলার জোনাথন এ.সি. ব্রাউন তাঁর “Hadith, Muhammad’s Legacy in the Medieval and Modern World” বইয়ের ১০৬ পৃষ্ঠায় লিখেছেন:
“হাদিসকে ‘মুতাওয়াতির’ এবং ‘আহাদ’—এই দুই শ্রেণিতে ভাগ করার পদ্ধতিটি মোটেও যুতসই ছিল না, কারণ মূলত প্রায় সব হাদিসই আহাদ। যেমনটি বলেছিলেন শেষ দিকের বিখ্যাত হাদিস বিশারদ ইবনে আল-সালাহ (মৃত্যু ১২৪৫ খ্রি.): সর্বোচ্চ একটিমাত্র হাদিস (‘যে ব্যক্তি আমার নামে মিথ্যা রটায়, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়’) মুতাওয়াতির হওয়ার শর্তগুলো পূরণ করতে পারে। [১] প্রকৃতপক্ষে এমন কোনো হাদিসের অস্তিত্ব নেই, যেটি বর্ণনার প্রতিটি স্তরে বিপুল সংখ্যক বর্ণনাকারী থেকে বর্ণিত হয়েছে। এমনকি মুতাযিলারা যখন শর্ত দিয়েছিল যে, কোন হাদিস গ্রহণযোগ্য হতে হলে প্রতিটি প্রজন্মে হাদিসটির অন্তত দুজন করে বর্ণনাকারী থাকতে হবে, তখন সুন্নি আলেম ইবনে হিব্বান তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেছিলেন যে, তারা নবীর সুন্নাহকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দিতে চাইছে। [২]”
[১] ইবনে আল-সালাহ, মুকাদ্দিমা, পৃ. ৪৫৪
[২] ইবনে হিব্বান, সহীহ ইবনে হিব্বান, খণ্ড ১, পৃ. ১৪৫
পরিহাসের বিষয় হলো, ইবনে আল-সালাহ যে একটিমাত্র হাদিসকে মুতাওয়াতির হওয়ার যোগ্য বলে মনে করেছেন, সেই হাদিসটিরও বিভিন্ন বর্ণনায় শাব্দিক এবং মর্মার্থগত পার্থক্য রয়েছে। যেমন, রাসুলের ওপর মিথ্যারোপের বিষয়টি ‘ইচ্ছাকৃত’ হতে হবে কি না—তা নিয়ে আলেমদের মাঝে বিতর্ক রয়েছে।
সুহাইল ইসমাইল লাহের তার “Tawatur in Islamic Thought” বইয়ের ৬২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন:
“আবু আলী আল জুব্বায়ী এবং আবু হাশিম আল জুব্বায়ী মনে করতেন, একমাত্র কুরআন ছাড়া আর কোন বর্ণনাই মুতাওয়াতিরভাবে আসেনি।… ইবনে হিব্বান মনে করতেন হাদিসের বেলায় মুতাওয়াতির বলতে কোন কিছু হয় না। আল-হাযিমি (মৃত্যু ১১৮৮-৮৯ খ্রি.) এবং ইবনে আবি আল-দাম (মৃত্যু ১২৪৪ খ্রি.) বলেছেন যে, তাওয়াতুরের শর্ত পূরণ করে এমন একটি হাদিসও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ইবনে আল-সালাহ (মৃত্যু ১২৪৫ খ্রি.)-ও একই ধরনের সংশয় প্রকাশ করেছিলেন।”
“এমনকি আল-শাফিঈ, যিনি ছিলেন ইসলামি আইনশাস্ত্রের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী ইমাম, তিনি বলেন যে, এমন কোন হাদিস নেই যেটি পৃথকভাবে চারটি ভিন্ন শহরে বর্ণিত হয়েছে, অতঃপর পরবর্তী প্রজন্মে সেগুলো ধারাবাহিকভাবে সংক্রমিত হয়েছে।“
সহজ সত্যটি হলো, কুরআন ছাড়া আর কোনো হাদিসই প্রকৃত অর্থে মুতাওয়াতির বা mass-transmitted নয়। এর কারণ হলো, কোনো তথ্য যখন সত্যিকার অর্থেই বিপুল সংখ্যক মানুষের মাধ্যমে প্রচারিত হয়, তখন তা প্রমাণের জন্য কোনো ‘সনদ’ বা বর্ণনাকারীর সূত্রের প্রয়োজন হয় না। সনদের প্রয়োজন তখনই পড়ে, যখন তথ্যটি স্বতঃসিদ্ধ (self-evident) বা সর্বজনবিদিত না হয়। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি বলে যে ‘সম্রাট বাবর মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন’, তখন এই সত্যটি প্রমাণ করার জন্য কেউ বর্ণনাকারীদের সনদের খোঁজ করে না।
মুতাওয়াতিরের সংজ্ঞা পরিবর্তন
হাদিসবিদ আলেমগণ যখন দেখলেন যে কোন হাদিসই ‘মুতাওয়াতির’ হওয়ার কঠিন শর্তগুলো পূরণ করতে পারছে না, তখন তারা তাওয়াতুর (mass-transmission) এর সংজ্ঞা শিথিল করতে শুরু করলেন। ব্যাপারটি অনেকটা ম্যারাথনের দৈর্ঘ্যকে ২৬.২ মাইল থেকে কমিয়ে ১০ মাইল করা এবং সেটিকেই ম্যারাথন বলে চালিয়ে দেওয়ার মতো। এরপরও তাদের ঝামেলা শেষ হয়ে যায়নি। কারণ কোনো হাদিসকে ‘মুতাওয়াতির’ হতে হলে কী কী শর্ত পূরণ করতে হবে তা নিয়ে হাদিসী আলেমরা কখনো একমত হতে পারেননি।
উদাহরণস্বরূপ, সুহাইল ইসমাইল লাহের তার বই “Tawatur in Islamic Thought”-এর ২১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন:
“আবু আল-হুযাইল আল-আল্লাফ (মৃত্যু ৮৪০ খ্রি.)-এর মতে কোন হাদিসকে ধর্মের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে হলে হাদিসটির অন্তত ২০ জন বর্ণনাকারী থাকতে হবে—(কুরআন ৮:৬৫ অনুযায়ী), যাদের মধ্যে অন্তত একজনকে আল্লাহর ওলি হতে হবে। আরেকজন মুতাকাল্লিম আবু আব্দুর রহমান আল-শাফিঈ (মৃত্যু ৮৪৫ খ্রি.) এই সংখ্যা কমিয়ে ৫-এ নিয়ে আসেন, তিনি আবু আল-হুযাইল এবং ইমাম শাফিঈ উভয়ের ছাত্র ছিলেন। সম্ভবত তিনি তাঁর শিক্ষক ইমাম শাফিঈর দ্বারা প্রভাবিত হয়েই এমনটি করেছিলেন।“
এছাড়াও, বর্ণিত আছে যে প্রখ্যাত হাদিসবিশারদ ইয়াহিয়া বিন মাঈন (মৃত্যু ৮৪৭ খ্রি.) বলেছেন:
“আমরা যদি কোনো হাদিসকে ৩০ টি ভিন্ন ভিন্ন সূত্র থেকে লিপিবদ্ধ না করি, তবে আমরা সেটি (সঠিকভাবে) বুঝতে পারি না।”
তাওয়াতুরের সংজ্ঞা নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে, সুন্নি আলেমগণ শেষপর্যন্ত একমত হতে পারেননি প্রকৃত মুতাওয়াতির হাদিসের সংখ্যা ঠিক কতটি। বিভিন্ন আলেমের বই থেকে মুতাওয়াতির হাদিসের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্নরকম মত পাওয়া যায়:
- ইবনে হিব্বান (মৃত্যু ৯৬৫ খ্রি.) – বই: সহীহ ইবনে হিব্বান– মুতাওয়াতির হাদিসের সংখ্যা ০টি
- ইবনে আল সালাহ (মৃত্যু ১২৩৬ খ্রি.) – বই: মুকাদ্দিমা– মুতাওয়াতির হাদিসের সংখ্যা ১টি
- আল সুয়ুতি (মৃত্যু ১৫০৫ খ্রি.) – বই: আল আযহার আল মুতানাসিরা – মুতাওয়াতির হাদিসের সংখ্যা ১১২টি
- সালিহ ইবনে মাহদি আল মাক্ববালি (মৃত্যু ১৬৯৬ খ্রি.) – বই: আল মাসাবিহ – মুতাওয়াতির হাদিসের সংখ্যা ১৫৬টি
- মুহাম্মদ ইবনে জাফর আল কাত্তানি (মৃত্যু ১৯২৭ খ্রি.) – বই: নাযম আল মুতানাসির – মুতাওয়াতির হাদিসের সংখ্যা ৩১০টি
মুতাওয়াতির হাদিসের সংখ্যা ও সংজ্ঞা নিয়ে হাদিসী আলেমদের এরূপ মতবিরোধ কেবল হাদিস শাস্ত্রের অন্তঃসারশূন্যতাকেই ফুটিয়ে তোলে।
প্রত্যাখ্যাত মুতাওয়াতির হাদিসসমূহ
মজার ব্যাপার হলো, যেসব হাদিসকে মুতাওয়াতির হিসেবে গণ্য করা হয়, সেগুলোর অনেকগুলোও বিভিন্ন সুন্নি আলেম বা মাযহাব দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। নিচে কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া হলো:
১. শয়তানি আয়াতের কাহিনী
ইসলামি ইতিহাসের একটি আলোচিত ও বিতর্কিত ঘটনা হলো “শয়তানি আয়াত”-এর কাহিনী। কাহিনীটি হলো একবার রাসুল (সা.) কুরআন তিলাওয়াত করার সময় লাত, উজ্জা ও মানাত দেবীর সুপারিশের ব্যাপারটি স্বীকার করে কিছু আয়াত পাঠ করে ফেলেন, পরবর্তীতে যা তিনি শয়তানের প্ররোচনা বলে প্রত্যাহার করে নেন। ঘটনাটি প্রায় ১৫টি পৃথক সূত্রে, সহীহ সনদসহ, তাবারি ও ইবনে ইসহাকের মতো প্রাচীন ইতিহাসবিদদের গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইবনে তাইমিয়া তাঁর মাজমু আল-ফাতাওয়া গ্রন্থে বলেছেন, “সালাফ বা পূর্ববর্তী আলেমগণ সম্মিলিতভাবে শয়তানি আয়াত-এর ঘটনাটিকে সত্য বলে মনে করতেন।” কিন্তু আধুনিক সুন্নি আলেমরা এই বর্ণনাটি প্রত্যাখ্যান করেন, যদিও এর সনদ অত্যন্ত শক্তিশালী, কারণ তাদের মতে এই ঘটনাটি নবীর নিষ্পাপত্ব (ইসমা)-এর ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক।
২. সালাতে বিসমিল্লাহ পাঠ
সুরা ফাতিহা নিজে মুতাওয়াতির হলেও, বিসমিল্লাহ (“বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম”) সম্পর্কে সুন্নি মাযহাবগুলোর মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য রয়েছে:
- মালিকি মাযহাব এবং কিছু হানাফি পণ্ডিত এর মতে ‘বিসমিল্লাহ’ সুরা ফাতিহার অংশ নয়।
- শাফেয়ি মাযহাব মনে করে ‘বিসমিল্লাহ’ সুরা ফাতিহার একটি অংশ।
- হাম্বলি মাযহাব এ ব্যাপারে দ্বিধাবিভক্ত।
এই কারণে দেখা যায় মালিকিরা সূরা ফাতিহার শুরুতে বিসমিল্লাহ পড়ে না, শাফিঈরা শব্দ করে বিসমিল্লাহ পড়ে আর অন্যদিকে হানাফি ও হাম্বলিরা এটি নিঃশব্দে পড়ে।
৩. রাফউল ইয়াদাইন (নামাজে হাত উঠানো)
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মতো প্রসিদ্ধ গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, রাসুল (সা.) নামাজের শুরুতে, রুকুতে যাওয়ার আগে, রুকু থেকে ওঠার পর এবং প্রথম দুই রাকাতের পর দাঁড়ানোর সময় কাঁধ পর্যন্ত হাত উঠাতেন। কিন্তু হানাফি মাযহাবের নিয়ম হলো শুধু প্রথম তাকবিরের সময় হাত উঠানো, পরবর্তী সময়ে তারা আর হাত উঠান না। অর্থাৎ, একটি ‘মুতাওয়াতির’ বা ‘প্রায় মুতাওয়াতির’ আমলকে তারা গ্রহণ করেননি।
৪. রান্না করা খাবার খেয়ে ওযু করা
অসংখ্য সহিহ হাদিসে বর্ণিত আছে যে, আগুনের তাপে রান্না করা কোন খাবার খেলে পুনরায় ওযু করতে হবে। উম্মে হাবিবা (রা.) থেকে বর্ণিত এই হাদিসটির সনদ সুন্নি মানদণ্ডে অত্যন্ত শক্তিশালী। হাদিসটি ‘মুতাওয়াতির’ পর্যায়ের হলেও বর্তমান যুগের মুসলিমরা এটি মানেন না। কারণ পরবর্তী আলেমগণ এটিকে ‘মানসুখ’ (রহিত) বলে দাবি করেছেন, যদিও এটি রহিত হওয়ার ব্যাপারে সরাসরি কোনো স্পষ্ট হাদিস নেই। কেউ কেউ আবার দাবি করেন এই হাদিসে ‘ওজু’ বলতে সাধারণভাবে হাত-মুখ ধোয়াকে (সফরতি ওজু) বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, একই বর্ণনাকে কেউ রহিত বলে দাবি করেছেন, আবার কেউ অর্থগতভাবে পরিবর্তন করে গ্রহণ করেছেন।
ইবনে তাইমিয়া ও ইবনে আবদুল ওয়াহহাবের অবস্থান
সুন্নি আলেমদের মধ্যেই যে ‘মুতাওয়াতির’ হাদিসের ওপর অনাস্থা বিদ্যমান, এর অন্যতম বড় উদাহরণ হলেন ইবনে তাইমিয়া ও মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব।
ইবনে তাইমিয়া তার ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় বহু ‘মুতাওয়াতির’ বর্ণনাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন । যেমন—আবু তালিবের জন্য নবীর সুপারিশ সংক্রান্ত হাদিসগুলো ব্যাপকভাবে বর্ণিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি সেগুলো প্রত্যাখ্যান করেন। একইভাবে নবীর কবর জিয়ারতের বর্ণনাগুলো প্রসিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও তিনি সেগুলোকে বিদ‘আত বলে আখ্যায়িত করেন।
ইবনে আবদুল ওয়াহহাব আরও কঠোর অবস্থান নেন। তিনি বলেন, একটি হাদিসের সনদ যত শক্তিশালীই হোক না কেন, যদি তার বক্তব্য তাওহীদের পরিপন্থী হয়, তবে তা প্রত্যাখ্যানযোগ্য। তার এই নীতি কবর প্রণামী, মৃতের উসিলায় কল্যাণ কামনা ইত্যাদির সমর্থনে ব্যবহৃত বহু ‘মুতাওয়াতির’ হাদিসকে বাতিল করে দেয়।
প্রশ্ন হলো, কোনো হাদিস ‘মুতাওয়াতির’ হলেই যদি তা সত্যের নিশ্চয়তা দেয়, তাহলে কীভাবে ইবনে তাইমিয়া ও ইবনে আবদুল ওয়াহহাবের মতো কঠোর সুন্নি আলেমগণ সেগুলোকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন?
সনদের সংখ্যাধিক্য ও নির্ভরযোগ্যতা
মুতাওয়াতির বর্ণনার সঠিকতার পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো—এর সনদের সংখ্যাধিক্য। কিন্তু আহমাদ আল-গুমারী সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন যে, অসংখ্য সনদ থাকা মানেই সত্যতা নয়। “জ্ঞান অর্জন করা ফরজ” এই বিষয়ক হাদিসের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হাদিসটিকে কেউ মুতাওয়াতির, কেউ সহীহ, কেউ হাসান, আবার কেউ জঈফ বলেছেন। কিন্তু এর অধিকাংশ সনদেই মিথ্যাবাদী বর্ণনাকারী রয়েছে। তিনি বলেন, জালিয়াতরা প্রায়ই জনপ্রিয় কোনো বক্তব্যের বৈধতা দেওয়ার জন্য বানোয়াট সব সনদ তৈরি করে, যাতে সেটিকে মুতাওয়াতির বা গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো সনদের সংখ্যাধিক্য কখনোই নির্ভরযোগ্যতার নিশ্চয়তা দেয় না।
খ্রিস্টানদের পাল্টা যুক্তি
‘মুতাওয়াতির’ ধারণাটির আরেকটি সমস্যা হলো—এটি অমুসলিমদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায় না, বরং তারাই এটিকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
খ্রিস্টানরা বলে যে, যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়া ও পুনরুত্থানের ঘটনা তাদের ইতিহাসে ‘মুতাওয়াতির’ পর্যায়ের। যদি মুতাওয়াতিরই সত্যতার একমাত্র মানদণ্ড হয়, তাহলে মুসলিমদের তা মেনে নেওয়া উচিত, অথচ তারা তা মানে না।
একইভাবে বাইবেলের সংরক্ষণের প্রশ্নে মুসলিমরা বলে যে, বাইবেল পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু বাইবেলের সংক্রমণও যে বিপুল সংখ্যক লিখিত ও মৌখিক সূত্রে শত শত বছর ধরে হয়েছে, তা অস্বীকার করা যায় না। তাহলে মুসলিমরা কেন একই ‘মুতাওয়াতির’ মানদণ্ড বাইবেলের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন না? এটাই প্রমাণ করে যে ধর্মীয় পন্ডিতগণ ‘মুতাওয়াতির’- এর যুক্তিটি ব্যবহার করেন নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী, ধর্মীয় প্রয়োজনের তাগিদে।
মুতাওয়াতির মানেই কি সত্যতা?
ধরা যাক, কোনো একটি তথ্য বিপুল সংখ্যক মানুষ বিশ্বাস করে। এর মানেই কি তথ্যটি নিশ্চিত সত্য? ইতিহাস ও আধুনিক মনোবিজ্ঞান বারবার বলছে—না।
- প্রিস্টার জনের কাল্পনিক রাজ্য: শত শত বছর ধরে ইউরোপের মানুষ বিশ্বাস করত এশিয়ায় ‘প্রিস্টার জন’ নামে এক মহান খ্রিস্টান রাজা আছেন। কিন্তু বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্বই ছিলনা।
- নেপোলিয়নের উচ্চতা: সবাই জানে নেপোলিয়ন উচ্চতায় খাটো ছিলেন, কিন্তু আসলে তার উচ্চতা অন্যান্য সাধারণ মানুষদের সমানই ছিলেন। ব্রিটিশরা তাকে ছোট করতে এই গুজব ছড়িয়েছিল।
- চীনের মহাপ্রাচীর: এমনকি অনেক বইতেও লেখা আছে যে মহাকাশ থেকে চীনের প্রাচীর দেখা যায়, কিন্তু মহাকাশচারীরা জানিয়েছেন এই দাবি সত্য নয়।
এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে, বিপুল সংখ্যক লোকের বিশ্বাস বা বর্ণনা কোনো বিষয়কে চিরন্তন সত্যে পরিণত করে না। মানুষের স্মৃতি, বর্ণনায় পক্ষপাতিত্ব, তথ্যের বিকৃতি, এমনকি ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা সংযোজন—সব মিলিয়ে মুতাওয়াতিরের ‘সুনিশ্চিত সত্য’ হওয়ার ধারণাটি জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে যথেষ্ট দুর্বল।
উপসংহার
মুতাওয়াতির হাদিসের ধারণাটি অনেকটা মরীচিকার মতো। এর মৌলিক সংজ্ঞা এতটাই কঠিন যে কোনো হাদিসই তা পুরোপুরি পূরণ করতে পারে না। আবার এই সংজ্ঞা শিথিল করলে তা এতটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে যে, একই হাদিস একজনের কাছে ‘মুতাওয়াতির’ তো অন্যজনের কাছে ‘জঈফ’। সব মিলিয়ে, তথাকথিত ‘মুতাওয়াতির’ হাদিসগুলো নিয়ে স্বয়ং সুন্নি আলেম ও মাযহাবগুলোর মধ্যেই প্রবল মতপার্থক্য বিদ্যমান, যা এদের তথাকথিত ‘সত্যতা’র দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।