পবিত্র কুরআনের সূরা কাহাফ-এর ৬৫ থেকে ৮২ নম্বর আয়াত পাঠ করলে আমরা আল্লাহর এমন এক বিশেষ ‘বান্দার’ সন্ধান পাই, যিনি মুসা নবীর সাথে পথ চলেছেন, কথা বলেছেন এবং তাঁকে প্রজ্ঞা ও বিশেষ জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন। তবে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, পুরো কুরআনের কোথাও তাঁর নাম কিংবা প্রকৃত পরিচয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। নিচে প্রাসঙ্গিক আয়াতগুলো তুলে ধরা হলো:
সূরা কাহাফ (১৮:৬৫-৮২)
৬৫. “অতঃপর তারা আমার বান্দাদের মধ্যে এমন একজনের দেখা পেলেন, যাকে আমি আমার পক্ষ থেকে রহমত দান করেছিলাম এবং আমার পক্ষ থেকে বিশেষ জ্ঞান (ইলমে লাদুন্নি) শিক্ষা দিয়েছিলাম।”
৬৬. মুসা তাকে বললেন, “সঠিক পথের যে জ্ঞান আপনাকে শেখানো হয়েছে, তা থেকে আমাকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য আমি কি আপনার অনুসরণ করতে পারি?”
৬৭. তিনি বললেন, “আপনি আমার সাথে ধৈর্য ধরে থাকতে পারবেন না।”
৬৮. “আর যে বিষয় আপনার জ্ঞানের পরিধির বাইরে, তা নিয়ে আপনি ধৈর্য ধরবেনই বা কীভাবে?”
৬৯. মুসা বললেন, “আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন এবং আমি আপনার কোনো আদেশ অমান্য করব না।”
৭০. তিনি বললেন, “যদি আপনি আমার অনুসরণ করেনই, তবে আমাকে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করবেন না, যতক্ষণ না আমি নিজেই আপনার কাছে সে বিষয়ে আলোচনা করি।”
৭১. তারপর তারা চলতে লাগলেন। যখন তারা নৌকায় আরোহণ করলেন, তখন তিনি (সেই ব্যক্তি) তাতে একটি ছিদ্র করে দিলেন। মুসা বললেন, “আপনি কি আরোহীদের ডুবিয়ে দেওয়ার জন্য এতে ছিদ্র করলেন? আপনি তো এক ভয়াবহ কাজ করলেন!”
৭২. তিনি বললেন, “আমি কি বলিনি যে, আপনি আমার সাথে ধৈর্য ধরে থাকতে পারবেন না?”
৭৩. মুসা বললেন, “আমার ভুলের জন্য আমাকে অপরাধী করবেন না এবং আমার এই কাজে আমার ওপর বেশি কড়াকড়ি করবেন না।”
৭৪. তারপর তারা আবার চলতে লাগলেন, যতক্ষণ না এক কিশোরের সাথে তাদের দেখা হলো এবং তিনি তাকে হত্যা করলেন। মুসা বললেন, “আপনি কি এক নিষ্পাপ জীবন সংহার করলেন, যে কাউকে হত্যা করেনি? আপনি তো এক গুরুতর অন্যায় কাজ করলেন!”
৭৫. তিনি বললেন, “আমি কি আপনাকে বলিনি যে, আপনি আমার সাথে ধৈর্য ধরে থাকতে পারবেন না?”
৭৬. মুসা বললেন, “এরপর যদি আমি আপনাকে আর কোনো প্রশ্ন করি, তবে আপনি আমাকে আর সাথে রাখবেন না; তখন আপনি আমার পক্ষ থেকে ওজর (বিদায় নেওয়ার উপযুক্ত কারণ) পেয়ে যাবেন।”
৭৭. এরপর তারা আবার চলতে লাগলেন এবং এক জনপদের অধিবাসীদের কাছে পৌঁছে তাদের কাছে খাবার চাইলেন। কিন্তু তারা মেহমানদারি করতে অস্বীকার করল। সেখানে তারা একটি প্রাচীর দেখতে পেলেন যা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল, তিনি সেটি সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিলেন। মুসা বললেন, “আপনি চাইলে তো এর জন্য পারিশ্রমিক নিতে পারতেন।”
৭৮. তিনি বললেন, “এটাই আমার ও আপনার মধ্যে বিচ্ছেদের সময়। এখন আমি আপনাকে সেই বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা বলে দিচ্ছি, যেগুলোতে আপনি ধৈর্য ধরতে পারেননি।”
৭৯. “নৌকাটির বিষয় হলো—এটি ছিল কয়েকজন দরিদ্র মানুষের যারা সমুদ্রে কাজ করত। আমি সেটিকে ত্রুটিযুক্ত করতে চেয়েছিলাম, কারণ তাদের সামনেই ছিল এক রাজা, যে জোরপূর্বক প্রতিটি (ভালো) নৌকা কেড়ে নিচ্ছিল।”
৮০. “আর কিশোরটির বিষয় হলো—তার বাবা-মা ছিলেন মুমিন। আমাদের আশঙ্কা হলো যে, সে অবাধ্যতা ও কুফরির মাধ্যমে তাদের কষ্ট দেবে।”
৮১. “তাই আমরা চাইলাম, তাদের প্রতিপালক যেন তাকে সরিয়ে তার পরিবর্তে এমন এক সন্তান দান করেন যে হবে অধিক পবিত্র ও দয়ালু।”
৮২. “সবশেষে প্রাচীরটির বিষয়—এটি ছিল নগরের দুই এতিম বালকের। এর নিচে ছিল তাদের জন্য গচ্ছিত এক গুপ্তধন এবং তাদের পিতা ছিলেন একজন নেককার মানুষ। তাই আপনার প্রতিপালক চাইলেন যে, তারা প্রাপ্তবয়স্ক হোক এবং নিজেদের গুপ্তধন উদ্ধার করুক। এটি আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এক বিশেষ রহমত। আমি নিজের ইচ্ছায় এসব কিছুই করিনি। যে বিষয়গুলোতে আপনি ধৈর্য ধরতে পারেননি, এটিই হলো তার ব্যাখ্যা।”
এই বিশেষ বান্দার প্রকৃত পরিচয়
অধিকাংশ আলেম মনে করেন, এই ব্যক্তিটি ছিলেন ‘খিজির’। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ‘খিজির’ নামটি তারা কোথায় পেলেন? নিশ্চিতভাবেই কুরআন থেকে নয়। বরং যখন আমরা কুরআনের আয়াতগুলো গভীরভাবে গবেষণা করি, তখন এমন কিছু শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া যায় যা নির্দেশ করে যে—এই বিশেষ ‘বান্দা’ কোনো মানুষ ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন আল্লাহর প্রেরিত একজন ফেরেশতা।
এই দাবির পেছনে প্রধান যুক্তিগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. ‘বান্দা’ শব্দের ব্যাপকতা
কুরআনের ১৮:৬৫ আয়াতে আল্লাহ তাঁকে “আমার বান্দাদের মধ্যে একজন” (আবাদান মিন ইবাদিনা) বলে সম্বোধন করেছেন। কুরআনের পরিভাষায় ‘বান্দা’ মানেই শুধু মানুষ নয়; বরং আসমান ও জমিনের সকল সৃষ্টিই আল্লাহর বান্দা। যেমন সূরা মারইয়ামের ৯৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
“আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যে আর-রহমানের কাছে বান্দা হিসেবে উপস্থিত হবে না।” (১৯:৯৩)
২. কিশোরের প্রাণ সংহার: হত্যা না জীবনের সমাপ্তি?
মুসার সেই সঙ্গী কিশোরটিকে হত্যা করেছিলেন। এই ঘটনাটি তাঁর পরিচয় নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ কখনোই কোনো মানুষকে ‘অন্যায়ভাবে’ হত্যার নির্দেশ দেন না। কুরআনের বিধান অনুযায়ী, বিচারিক প্রক্রিয়া বা আত্মরক্ষা ছাড়া জীবন কেড়ে নেওয়া নিষিদ্ধ:
“আল্লাহ যার জীবন সংহার নিষিদ্ধ করেছেন, যথার্থ কারণ (ন্যায়বিচার) ছাড়া তাকে হত্যা করো না।” (৬:১৫১)
সেই কিশোরটি কোনো যুদ্ধে লিপ্ত ছিল না কিংবা সে কাউকে হত্যাও করেনি। একজন মানুষের পক্ষে এমন কোনো নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করা সরাসরি আল্লাহর আইনের লঙ্ঘন। কিন্তু ফেরেশতাদের দায়িত্বই হলো আল্লাহর নির্দেশে প্রাণ হরণ করা। সূরা সাজদাহ-তে বলা হয়েছে:
“বলুন, তোমাদের জন্য নিযুক্ত মৃত্যুর ফেরেশতা তোমাদের প্রাণ হরণ করবে…” (৩২:১১)
অর্থাৎ, ফেরেশতা যখন কারো প্রাণ নেয়, তখন সেটি ‘খুন’ নয় বরং তা মহান আল্লাহর হুকুমে জীবনের পূর্বনির্ধারিত সমাপ্তি। কিশোরটির ক্ষেত্রেও একই বিষয় ঘটেছে। কিশোরটি কোনো পাপ করার আগেই তার জীবনের সমাপ্তি টানা হয়েছে যাতে তার মুমিন বাবা-মা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। মুসা প্রথমে বুঝতে পারেননি যে তিনি একজন ফেরেশতার সাথে আছেন, তাই তিনি একে ‘অন্যায় হত্যা’ বলে ভুল করেছিলেন।
৩. অদৃশ্যের জ্ঞান ও আকস্মিক প্রস্থান
এই বিশেষ বান্দার এমন কিছু জ্ঞান ছিল (ভবিষ্যতে কী ঘটবে) যা একমাত্র আল্লাহ এবং তাঁর মনোনীত বিশেষ দূতেরাই জানতে পারেন। এছাড়া, এই ঘটনার পর পুরো কুরআনে মুসার জীবনে এই ব্যক্তির আর কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না। যদি তিনি কোনো সাধারণ মানুষ বা নবী হতেন, তবে তাঁর প্রভাব বা পরবর্তী জীবনের কিছু বিবরণ থাকত।
বরং তাঁর ভূমিকা ছিল ঠিক সেই ফেরেশতাদের মতো, যারা ইব্রাহিমের কাছে মেহমান হয়ে এসেছিলেন এবং লুত-এর কওমকে ধ্বংস করার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন শেষে তাঁরা যেমন অদৃশ্য হয়ে যান, মুসার সঙ্গী হওয়া এই ব্যক্তিটিও তাঁর মিশন শেষ করে বিদায় নেন।
উপসংহার
১৮:৮২ আয়াতের শেষে ব্যক্তিটি নিজেই বলেছেন, “আমি নিজের ইচ্ছায় এসব কিছুই করিনি।” এটি প্রমাণ করে যে তিনি সরাসরি আল্লাহর আদেশের অধীন ছিলেন—ঠিক যেমন ফেরেশতারা আল্লাহর আদেশের বিন্দুমাত্র অবাধ্য হয় না। সুতরাং কুরআনিক প্রেক্ষাপট ও যুক্তি বিচার করলে দেখা যায়, মুসার সঙ্গী হওয়া সেই রহস্যময় ব্যক্তিটি ছিলেন একজন ফেরেশতা, যাকে কোন একটি বিশেষ মিশনের জন্য পাঠানো হয়েছিল।