আর-রহমান নামের প্রকৃত অর্থ

কুরআনের শুরুতেই যে চারটি শব্দ রয়েছে (বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম), সেখানে মহান আল্লাহর দুটি সুন্দর নাম উল্লেখ করা হয়েছে – ‘আর-রহমান’ এবং ‘আর-রহিম’। ‘আর-রহিম’ অর্থ হলো ‘দয়ালু’ বা ‘মেহেরবান’। তবে কুরআনে ‘পরম দয়ালু’ বা ‘দয়ালুদের শ্রেষ্ঠ’ বোঝাতে মূলত ‘আরহামুর রাহিমিন’ কথাটি ব্যবহৃত হয়েছে (৭:১৫১, ১২:৬৪, ১২:৯২, ২১:৮৩)।

অন্যদিকে, ‘আর-রহমান’ নামের অনুবাদ নিয়ে বেশ অসামঞ্জস্যতা দেখা যায়। এর বিভিন্ন অনুবাদের মধ্যে রয়েছে: দয়াময়, করুণাময়, কল্যাণময় ইত্যাদি। দয়া, করুণা বা কল্যাণ – এই শব্দগুলো মূলত নম্রতা বা কোমলতার সাথে সম্পর্কিত। কিন্তু আমরা যদি কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে ‘আর-রহমান’ নামের ব্যবহার গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করি, তবে দেখতে পাব যে এই নামটি করুণা বা দয়া নয় বরং আল্লাহর ‘অসীম ক্ষমতা’ এবং ‘পরাক্রম’-কে নির্দেশ করে।

১. “মরিয়াম বলল, ‘আমি তোমার থেকে আর-রহমানের আশ্রয় প্রার্থনা করছি, যদি তুমি মুত্তাকী হও’।” (১৯:১৮)

এখানে মরিয়ম তাঁর সামনে উপস্থিত এক অপরিচিত ব্যক্তি থেকে সুরক্ষা চেয়েছিলেন। একজন দয়ালু বা করুণাময় সত্তার চেয়ে একজন সর্বশক্তিমান সত্তার নিকট আশ্রয় চাওয়াটাই এখানে বেশি যুক্তিযুক্ত।

২. “‘হে আমার পিতা, আমি আশংকা করছি যে, আর-রহমানের শাস্তি তোমাকে স্পর্শ করবে, ফলে তুমি শয়তানের সঙ্গী হয়ে যাবে।’” (১৯:৪৫)

নবী ইব্রাহিম তাঁর মূর্তিপূজক পিতাকে সতর্ক করতে চেয়েছিলেন এবং ‘আর-রহমান’-এর শাস্তির ভয় দেখিয়েছিলেন। কঠিন শাস্তি প্রদান কোনো ‘দয়ালু’ সত্তার কাজ হতে পারে না, বরং এটি ‘সর্বশক্তিমান’ সত্তার কাজ হিসেবেই অধিক মানানসই।

৩. “তুমি তো কেবল তাকেই সতর্ক করবে যে উপদেশ মেনে চলে এবং না দেখেও আর-রহমানকে ভয় করে।” (৩৬:১১)

সাধারণত ভয় বা ভীতি কোনো দয়ালু সত্তার প্রতি আসে না, বরং তা আসে মহান আল্লাহর অসীম ক্ষমতা ও পরাক্রমের কারণে।

৪. “যে না দেখেই আর-রহমানকে ভয় করত এবং বিনীত হৃদয়ে উপস্থিত হত।” (৫০:৩৩)

এই আয়াতটিও মহান আল্লাহর পরাক্রমের প্রতি ভয়ের বিষয়টি নির্দেশ করে।

৫. “আর তারা বলে,‘আর-রহমান সন্তান গ্রহণ করেছেন।’ অবশ্যই তোমরা এক জঘন্য বিষয়ের অবতারণা করেছ। যাতে আকাশসমূহ বিদীর্ণ হওয়ার, পৃথিবী খন্ড বিখন্ড হওয়ার আর পর্বতমালা চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে পতিত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। কারণ তারা আর-রহমানের সন্তান আছে বলে দাবী করে। অথচ সন্তান গ্রহণ করা আর-রহমানের জন্য শোভনীয় নয়।” (১৯:৮৮-৯২)

এই আয়াতগুলোতে ‘আর-রহমান’ নামটি তিনবার ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহর পরাক্রম বা ভয়ের চোটে আকাশ-পৃথিবী ও পাহাড় ধ্বংস হওয়ার উপক্রম হয়। এই প্রচণ্ড ভীতি প্রদর্শন দয়া বা করুণার বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি অসীম শক্তি ও ক্ষমতার নিদর্শন।

৬. “যদি আর-রহমান আমার কোন ক্ষতি করার ইচ্ছা করেন, তাহলে তাদের সুপারিশ আমার কোন কাজে আসবে না এবং তারা আমাকে উদ্ধারও করতে পারবে না” (৩৬:২৩)

ক্ষতি সাধন করা ‘দয়ালু’ বা ‘করুণাময়’ শব্দের সাথে মানানসই হতে পারে না। কিন্তু বান্দার ওপর পরীক্ষা বা কষ্ট আরোপ করা সর্বশক্তিমান আল্লাহর ইচ্ছার সাথে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ।

৭. “নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে এমন কেউ নেই যে আর-রহমান-এর কাছে দাস হিসেবে উপস্থিত হবে না।” (১৯:৯৩)

সর্বশক্তিমান আল্লাহর সামনে উপস্থিতি কেবল পূর্ণ বশ্যতা বা দাসত্বের মাধ্যমেই হতে পারে। এটি তাঁর অসীম ক্ষমতা ও পরাক্রমের কারণে।

৮. “সেদিন তারা আহ্বানকারীর অনুসরণ করবে, এর কোন এদিক সেদিক হবে না এবং আর-রহমানের সামনে সকল আওয়াজ স্তব্ধ হয়ে যাবে। তাই মৃদু গুঞ্জন ছাড়া তুমি কিছুই শুনতে পাবে না।” (২০:১০৮)

আল্লাহর পরাক্রম বা ক্ষমতাই সমস্ত আওয়াজকে স্তব্ধ করে দিতে পারে।

৯. “আর-রহমান ছাড়া তোমাদের এমন কোনো সৈন্যবাহিনী আছে কি, যারা তোমাদেরকে সাহায্য করবে?” (৬৭:২০)

এখানে সৈন্য বা শক্তির কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, কেবল শক্তি বা ক্ষমতার গুণাবলীই সর্বোত্তম সুরক্ষা ও সাহায্য প্রদান করতে পারে।

১০. বলো, “কে তোমাদের রাত ও দিনে আর-রহমান থেকে রক্ষা করবে?” (২১:৪২)

এখানে প্রশ্ন হলো, কোনো দয়ালু সত্তার কাছ থেকে কি সুরক্ষার প্রয়োজন হয়? নাকি সর্বশক্তিমান ও পরাক্রমশালী সত্তার পাকড়াও থেকে বাঁচার জন্যই সুরক্ষার প্রয়োজন বেশি?

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে আমরা দেখতে পাই, কুরআনে আর-রহমান শব্দের অর্থ দয়াময় বা করুণাময় হতে পারে না, বরং রহমান নামের অর্থ হয় সর্বশক্তিমান (Almighty).