কুরআনকে একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান ও আল্লাহর নির্ভুল বাণী হিসেবে যারা মান্য করেন, তাদের কাছে উত্তরাধিকার বণ্টনের আয়াতের হিসাব নিয়ে একটি প্রশ্ন প্রায়ই আসে। ইসলাম-বিরোধী সমালোচকদের একটি অত্যন্ত পরিচিত অভিযোগ হলো— কুরআনের উত্তরাধিকার বণ্টনের আয়াতে গাণিতিক ভুল রয়েছে! সূরা নিসার ১১ ও ১২ নম্বর আয়াতে বর্ণিত সম্পদের ভগ্নাংশগুলো একত্রে যোগ করলে কয়েকটি বিশেষ ক্ষেত্রে তা ১-এর চেয়ে বেশি (বা ১০০% এর বেশি) হয়ে যায়। কিন্তু সত্যিই কি কুরআনে কোনো গাণিতিক ত্রুটি আছে? নাকি এটি শুধুমাত্র মানবসৃষ্ট ভুল ব্যাখ্যার ফল? আসুন, বিষয়টি বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা যাক।
মূল সমস্যাটি কোথায়?
[৪:১১ আয়াতের প্রচলিত অনুবাদ]
“আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের (উত্তরাধিকার) সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন: এক পুত্রের অংশ দুই কন্যার অংশের সমান। কিন্তু যদি কেবল কন্যাই থাকে তবে দুইয়ের অধিক কন্যার জন্য পরিত্যক্ত সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩), আর যদি কন্যা কেবল একজন হয়, তবে তার জন্য অর্ধেক (১/২)। আর মৃতের পিতা-মাতার প্রত্যেকের জন্য পরিত্যক্ত সম্পত্তির ছয়ভাগের একভাগ (১/৬), যদি তার সন্তান থাকে। কিন্তু যদি তার সন্তান না থাকে এবং কেবল পিতা-মাতাই উত্তরাধিকারী হয়, তবে তার মায়ের জন্য তিনভাগের একভাগ (১/৩)। আর যদি তার ভাই-বোন থাকে, তবে তার মায়ের জন্য ছয়ভাগের একভাগ (১/৬)। এ সবই সে যা ওসিয়ত করে গেছে তা পালন করার এবং ঋণ পরিশোধ করার পর। তোমাদের পিতা ও সন্তানদের মধ্যে উপকারের দিক থেকে কে তোমাদের বেশি নিকটবর্তী, তা তোমরা জানো না। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত বিধান। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।”
কুরআনের উত্তরাধিকার আইনে (ওসিয়ত পূরণ ও ঋণ পরিশোধের পর) বিভিন্ন উত্তরাধিকারীদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু ভগ্নাংশ উল্লেখ করা হয়েছে। সমস্যাটি তখনই দেখা দেয়, যখন প্রচলিত নিয়মে হিসাব করতে গিয়ে দেখা যায় ভগ্নাংশের যোগফল ১ অতিক্রম করেছে।
একটি উদাহরণ দেখা যাক: ধরা যাক, একজন ব্যক্তি মারা গেলেন এবং তিনি উত্তরাধিকারী হিসেবে রেখে গেলেন ৩ জন কন্যা, স্ত্রী এবং পিতামাতা (বাবা ও মা উভয়েই জীবিত)। প্রচলিত অনুবাদ অনুযায়ী সূরা নিসার ৪:১১ ও ৪:১২ আয়াতের ভিত্তিতে তাদের অংশ হয়:
- ৩ কন্যার অংশ: ২/৩
- পিতার অংশ: ১/৬
- মাতার অংশ: ১/৬
- স্ত্রীর অংশ: ১/৮
এখন আমরা যদি এই ভগ্নাংশগুলোর সাধারণ হর (Common denominator) বের করে যোগ করি:
- ৩ কন্যার অংশ = ২/৩ = ১৬/২৪
- পিতার অংশ = ১/৬ = ৪/২৪
- মাতার অংশ = ১/৬ = ৪/২৪
- স্ত্রীর অংশ = ১/৮ = ৩/২৪
মোট যোগফল = ১৬/২৪ + ৪/২৪ + ৪/২৪ + ৩/২৪ = (১৬+৪+৪+৩)/২৪ = ২৭/২৪
যা ১-এর চেয়ে বড় (অর্থাৎ ১.১২৫ বা ১১২.৫%)! কিন্তু মোট সম্পদ তো আর ১০০% এর বেশি হতে পারে না। তাহলে এই অতিরিক্ত সম্পদ কোথা থেকে আসবে?
প্রথাগত সমাধান এবং তার সমালোচনা
এই গাণিতিক সমস্যাটি সমাধান করার জন্য প্রথাগত আলেমগণ ‘আউল’ (Awl) নামক একটি নীতির উদ্ভাবন করেছেন। এই নীতি অনুযায়ী, যখনই মোট অংশ ১-এর বেশি হয়ে যায়, তখন প্রত্যেকের অংশ থেকে আনুপাতিক হারে কিছু পরিমাণ সম্পদ কমিয়ে দেওয়া হয়, যাতে যোগফল ১০০% বা ১-এর মধ্যে থাকে। উপরের উদাহরণে হর ২৪-এর জায়গায় ২৭ ধরে সবাইকে সম্পদ বণ্টন করা হয়।
কিন্তু কুরআনের মানদণ্ডে এই ‘আউল’ নীতিটি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, ‘আউল’-এর কোনো উল্লেখ কুরআনের কোথাও নেই। ইসলাম-বিরোধীরা ঠিক এই সুযোগটিই কাজে লাগান; তারা বলেন— “‘আউল’ হলো সৃষ্টিকর্তার ভুল সংশোধন করার জন্য মানুষের তৈরি একটি আইন!” পরম প্রজ্ঞাময় আল্লাহ কি গাণিতিক হিসেবে ভুল করতে পারেন? কখনোই নয়।
কুরআনিক সমাধান: একটি নির্ভুল দৃষ্টিকোণ
এই সমস্যার চমৎকার সমাধান লুকিয়ে আছে সূরা নিসার ৪:১১ আয়াতের একটি শব্দের সঠিক অনুবাদের মধ্যে। আসুন প্রথমে সংশ্লিষ্ট আয়াতের সঠিক অনুবাদ দেখে নিই:
[৪:১১ আয়াতের সঠিক অনুবাদ]
“আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের (উত্তরাধিকার) সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন: এক পুত্রের অংশ দুই কন্যার অংশের সমান। কিন্তু যদি কেবল নারীই থাকে তবে দুইয়ের অধিক কন্যার জন্য পরিত্যক্ত সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩), আর যদি কন্যা কেবল একজন হয়, তবে তার জন্য অর্ধেক (১/২)। আর মৃতের পিতা-মাতার প্রত্যেকের জন্য পরিত্যক্ত সম্পত্তির ছয়ভাগের একভাগ (১/৬), যদি তার সন্তান থাকে। কিন্তু যদি তার সন্তান না থাকে এবং কেবল পিতা-মাতাই উত্তরাধিকারী হয়, তবে তার মায়ের জন্য তিনভাগের একভাগ (১/৩)। আর যদি তার ভাই-বোন থাকে, তবে তার মায়ের জন্য ছয়ভাগের একভাগ (১/৬)। এ সবই সে যা ওসিয়ত করে গেছে তা পালন করার এবং ঋণ পরিশোধ করার পর। তোমাদের পিতা ও সন্তানদের মধ্যে উপকারের দিক থেকে কে তোমাদের বেশি নিকটবর্তী, তা তোমরা জানো না। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত বিধান। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।”
ব্যাখ্যা ও সমাধান
প্রচলিত অনুবাদগুলোতে ৪:১১ আয়াতের “فَإِن كُنَّ نِسَاءً” (ফা-ইন কুন্না নিসা-আন) অংশটির অর্থ করা হয় “যদি তারা কেবল কন্যা সন্তান হয়”। কিন্তু বাক্যটিতে ব্যবহৃত মূল আরবি শব্দটি হলো ‘নিসা’ (نساء), যার প্রধান অর্থ হলো ‘নারী’। অনুবাদটি যদি এভাবে করা হয় যে, “উত্তরাধিকারীরা যদি কেবলই নারী হয়” (অর্থাৎ যদি কোনো পুরুষ উত্তরাধিকারী না থাকে), তবে পুরো হিসাবটির চিত্র বদলে যায়।
এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, কন্যাদের জন্য ২/৩ বা ১/২-এর নিয়মটি কেবল তখনই প্রযোজ্য হবে, যখন মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের মধ্যে শুধুমাত্র নারীই অবশিষ্ট থাকবেন (যেমন- মা, কন্যা, স্ত্রী, বোন ইত্যাদি)। কিন্তু উত্তরাধিকারীদের মধ্যে যদি একজনও পুরুষ (যেমন- পিতা বা পুত্র) থাকেন, তবে কন্যাদের জন্য ওই ২/৩ বা ১/২-এর নিয়মটি আর প্রযোজ্য হবে না।
তাহলে বণ্টন কীভাবে হবে?
যখন উত্তরাধিকারীদের মধ্যে পুরুষ অংশীদার থাকেন, তখন সর্বপ্রথম পিতামাতা বা স্বামী/স্ত্রীর নির্দিষ্ট ভগ্নাংশগুলো (যা ৪:১১ ও ৪:১২ তে সরাসরি দেওয়া আছে) দিয়ে দেওয়া হবে। এরপর যে সম্পদটুকু অবশিষ্ট থাকবে, তা সন্তানদের মাঝে (অর্থাৎ পুত্র এবং কন্যাদের মাঝে) বণ্টন করা হবে।
আগের উদাহরণটি আবার মিলিয়ে দেখা যাক। মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীরা হলেন: ৩ কন্যা, স্ত্রী, পিতা এবং মাতা। এখানে যেহেতু ‘পিতা’ একজন পুরুষ উত্তরাধিকারী হিসেবে উপস্থিত আছেন, তাই কন্যাদের জন্য সরাসরি ২/৩ অংশ বরাদ্দ করার নিয়মটি খাটবে না। বণ্টনটি হবে এভাবে:
- পিতা পাবেন: ১/৬
- মাতা পাবেন: ১/৬
- স্ত্রী পাবেন: ১/৮
এদের মোট অংশ = (৪/২৪ + ৪/২৪ + ৩/২৪) = ১১/২৪
এবার মোট সম্পদ ১ (বা সম্পূর্ণ) থেকে এই ১১/২৪ অংশ বাদ দিলে অবশিষ্ট থাকে = ১৩/২৪ অংশ।
ভালোভাবে লক্ষ্য করলে দেখবেন, কুরআনের কোথাও (৪:১১ বা ৪:১২ এ) পুত্রসন্তানদের জন্য কোনো ভগ্নাংশ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়নি, শুধু বলা হয়েছে পুত্রের অংশ হবে কন্যাদের দ্বিগুণ। অনুরূপভাবে কন্যাদের জন্যও কোনো ভগ্নাংশ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়নি (কেবল একটি বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া – যখন উত্তরাধিকারীদের মধ্যে কোনো পুরুষ থাকে না)। এর মানেই হলো, পিতামাতা, ভাই-বোন ও স্ত্রীর অংশ দেওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকবে, সেগুলোই সন্তানরা পাবে। যেহেতু এখানে কোনো পুত্র সন্তান নেই, তাই অবশিষ্ট এই ১৩/২৪ অংশ ৩ কন্যা নিজেদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে নেবে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে কুরআনের উত্তরাধিকার বণ্টন শতভাগ নিখুঁত এবং এখানে ভগ্নাংশের যোগফল কখনই ১ অতিক্রম করে না। ফলে মানবসৃষ্ট ‘আউল’ নামক কোনো নিয়মেরও প্রয়োজন পড়ে না। কুরআনে কোনো গাণিতিক ভুল নেই; ভুল ছিল মানুষের ব্যাখ্যা ও অনুবাদে। যখনই আমরা প্রথাগত চিন্তার বাইরে এসে কেবল কুরআনের আয়াতের সঠিক অর্থের প্রতি মনোযোগ দিই, তখনই সব জটিলতার অবসান ঘটে। আর এটিই প্রমাণ করে যে, আল-কুরআন সর্বশক্তিমান ও প্রজ্ঞাময় আল্লাহর এক নির্ভুল গাণিতিক ও আইনি বিধান।