কুরআনে বর্ণিত বিয়ের শর্তাবলী

কুরআনে বিয়ের জন্য বেশ কয়েকটি নীতিমালা উল্লেখ করা হয়েছে:

১. বর ও কনে উভয়কেই বিয়ের বয়সে পৌঁছাতে হবে

২. মুমিনরা মুশরিক নারী-পুরুষদের বিয়ে করতে পারবে না

৩. বর ও কনের মধ্যে আন্তরিক ও দৃঢ় অঙ্গীকার থাকতে হবে

৪. বিয়ের কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে হবে

৫. বিবাহ চুক্তি (আক্বদ) সম্পাদন করতে হবে

৬. বিয়ে করতে হবে স্থায়ী বন্ধনের উদ্দেশ্যে

৭. বর তার কনেকে দেনমোহর প্রদান করবে

[৪:৬] আর ইয়াতিমদেরকে যাচাই করো যে পর্যন্ত না তারা বিয়ের বয়সে পৌঁছায়; অতঃপর তাদের মধ্যে বিচার-বুদ্ধির পরিপক্বতা দেখতে পেলে তাদের সম্পদ তাদেরকে ফিরিয়ে দাও।

এই আয়াতে স্পষ্টভাবে “বিয়ের বয়স” (বালাগুন নিকাহ)-এর কথা বলা হয়েছে এবং এর সঙ্গে “বিচার-বুদ্ধির পরিপক্বতা” (রুশদ) অর্জনের শর্ত যুক্ত করা হয়েছে।

আরবি “বালাগ” শব্দের অর্থ ‘প্রাপ্তবয়স্কতা বা পরিপক্বতা লাভ’। যেহেতু প্রত্যেক শিশু একই বয়সে শারীরিক ও মানসিক পরিপক্কতা অর্জন করে না, তাই আল্লাহ বিয়ের নির্দিষ্ট কোনো বয়স নির্ধারণ করে দেননি। বরং এটি অভিভাবক ও পরিবারের বিচক্ষণতার ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

[২:২২১] আর তোমরা মুশরিক নারীদের বিয়ে করো না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে। একজন মুমিন দাসীও একজন মুশরিক নারীর চেয়ে উত্তম, যদিও সে তোমাদেরকে মুগ্ধ করে। আর তোমরা (তোমাদের নারীদের) মুশরিক পুরুষদের সাথে বিয়ে দিও না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে। একজন মুমিন দাসও একজন মুশরিক পুরুষের চেয়ে উত্তম, যদিও সে তোমাদেরকে মুগ্ধ করে।

অপরদিকে [৫:৫] আয়াতে সচ্চরিত্রা মুমিন নারী এবং সচ্চরিত্রা আহলে কিতাব (অর্থাৎ ইহুদি ও খ্রিস্টান) নারীদের বিয়ে করার অনুমতি দেয়া হয়েছে।

এর মানে এটাই দাঁড়ায় যে, কোনো মুমিন কোনো মুশরিক বা অবিশ্বাসী নাস্তিককে বিয়ে করতে পারবে না।

[৪:২১] তোমরা কীভাবে তা (প্রদত্ত মোহরানা) ফিরিয়ে নেবে, অথচ তোমরা এক অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়েছিলে এবং তারা তোমাদের কাছ থেকে নিয়েছিল দৃঢ় অঙ্গীকার (মিসাক্বান গালিযান) ?

এই আয়াতের ”দৃঢ় অঙ্গীকার” কথাটি থেকে বোঝা যায় যে, বিয়ের সময় বর ও কনের মধ্যে গভীর ও আন্তরিক প্রতিশ্রুতি থাকা আবশ্যক।

[২:২৩৫] তোমাদের কোন পাপ নেই যদি তোমরা নারীদেরকে ইশারায় প্রস্তাব করো কিংবা মনে গোপন রাখো…… কিন্তু তাদের সাথে গোপন অঙ্গীকার কোরো না, তবে বৈধভাবে কথাবার্তা বলতে পার এবং তোমরা বিবাহ-চুক্তি সম্পাদন কোরো না যে পর্যন্ত ইদ্দত পূর্ণ না হয়।

এই আয়াতে বলা হয়েছে যে, বিয়ের বাগদান বা প্রস্তাব গোপনে বা প্রকাশ্যে—দু’ভাবেই হতে পারে। কিন্তু বিয়ে গোপনে করা যাবে না।

[২:২৩৫] আয়াতে “বিবাহ-চুক্তি সম্পাদন কোরো না” কথাটি থেকেই বোঝা যায় যে, বিয়ে শুধু মৌখিক সম্মতি বা প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করে হতে পারে না; অবশ্যই একটি লিখিত ও আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পাদন করতে হবে।

কুরআন বি্য়েকে স্থায়ী সম্পর্ক হিসেবে সাব্যস্ত করেছে। নির্দিষ্ট কিছু মেয়াদের জন্য বিয়ের কোনো সুযোগ কুরআন রাখেনি।

বিবাহ বিচ্ছেদ অর্থাৎ তালাকের জন্য কুরআন যেসব কঠিন শর্ত আরোপ করেছে, তা থেকেই এটি স্পষ্ট হয়:

– বিচ্ছেদের পূর্বে ৪ মাস অপেক্ষা (২:২২৬)
– দুই পরিবারের মধ্যে সালিশ ও মীমাংসার চেষ্টা (৪:৩৫)
– স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া যাবে না, যদি না সে স্পষ্ট অশ্লীলতায় লিপ্ত হয় (৬৫:১)
– তালাকের পর প্রাক্তন স্ত্রীকে ভরণপোষণ দেওয়া (২:২৪১)
– সন্তান থাকলে তাদের ভরণপোষণ দেওয়া (২:২৩৩)
– স্তন্যদানকারী মায়ের জন্য ২ বছর খাদ্য-বস্ত্রের ব্যবস্থা করা (২:২৩৩)

[৪:২৪] “অতএব তাদের মধ্য থেকে যাদেরকে তোমাদের পছন্দ হয়েছে, তাদেরকে নির্ধারিত দেনমোহর দিয়ে দাও।“

কুরআনে দেনমোহরের নির্দিষ্ট কোনো পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি। এটি পাত্রের সামর্থ্য অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। দেনমোহর নগদ অর্থ, উপহার বা অন্য কিছু যাই হোক না কেন, তা সরাসরি কনের হাতে পৌঁছাতে হবে। উক্ত আয়াতে ব্যবহৃত ‘আতুহুন্না’ (তাদেরকে দিয়ে দাও) কথাটি দ্বারা স্পষ্ট হয় যে দেনমোহর পাবে কনে, তার বাবা কিংবা অভিভাবক নয়।

এই সাতটি শর্ত পূরণ করলেই কুরআনের দৃষ্টিতে একটি বিবাহ বৈধ ও পবিত্র বলে গণ্য হবে ইনশাআল্লাহ।