মুসলিমদের মধ্যে বহুল প্রচলিত একটি বিশ্বাস হলো মক্কায় অবস্থিত কাবা ঘরটির নির্মাতা ছিলেন নবী ইব্রাহিম এবং ‘বাক্কা’ ও ‘মক্কা’ একই স্থানের দুটি ভিন্ন নাম। তবে কুরআনে এমন কোন অকাট্য ইঙ্গিত পাওয়া যায় না যা প্রমাণ করে ইব্রাহিমের বাক্কা নগরীই বর্তমান সৌদি আরবের মক্কা। বরং, ইব্রাহিম ও ইসমাইলের নির্মিত ঘর এবং মক্কার কাবাকে কুরআনে ভিন্ন ভিন্ন পরিভাষায় সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
১. মক্কা ও বাক্কা: শব্দতাত্ত্বিক ভিন্নতা
কুরআনে ‘মক্কা’ এবং ‘বাক্কা’ শব্দ দুটি ঠিক একবার করে এসেছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, নবী মুহাম্মাদ-এর সময়কালীন রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপটে আল্লাহ ‘মক্কা’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন:
“আর তিনিই মক্কা উপত্যকায় তাদের হাত তোমাদের থেকে এবং তোমাদের হাত তাদের থেকে নিবৃত্ত রেখেছেন, তাদের ওপর তোমাদেরকে বিজয়ী করার পর…” (৪৮:২৪)
অপরদিকে, ইব্রাহিম নির্মিত ইবাদতগাহের বর্ণনায় কুরআন ‘মক্কা’র পরিবর্তে সুনির্দিষ্টভাবে ‘বাক্কা’ শব্দটি ব্যবহার করেছে:
“নিশ্চয়ই মানবজাতির জন্য প্রথম যে ঘরটি নির্মিত হয়েছিল, তা বাক্কায় ; যা বরকতময় (মুবারাকান) এবং বিশ্বজগতের জন্য পথপ্রদর্শক।” (৩:৯৬)
সুরা আলে ইমরানের ৯৩-৯৯ আয়াতগুলোর প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আল্লাহ এখানে মূলত আহলে কিতাবদের উদ্দেশ্য করে কথা বলছেন। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, তৎকালীন আরবের কিতাবীরা ‘বাক্কা’ এলাকাটির সাথে পরিচিত ছিল। হিব্রু বাইবেলেও (Psalm 84:6) ‘বাকা উপত্যকা’ (Valley of Baca)-নামক একটি পবিত্র স্থানের উল্লেখ পাওয়া যায়।
যদি মক্কা ও বাক্কা একই স্থান হতো, তবে একই স্থানের জন্য কুরআনে দুটি ভিন্ন নাম ব্যবহারের কোনো যৌক্তিকতা ছিল না।
২. ইব্রাহিমের ঘর এবং মক্কার কাবা: নামকরণের পার্থক্য
কুরআনের আয়াতগুলো ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ইব্রাহিম ও ইসমাইল যে ঘরটি নির্মাণ করেছিলেন, সেটির ক্ষেত্রে কুরআন কখনোই ‘মাসজিদুল হারাম’, ‘কাবা’ অথবা ‘হারাম’ ইত্যাদি শব্দগুলো ব্যবহার করেনি। ‘হারাম’ (নিষিদ্ধ/সংরক্ষিত) বিশেষণটি কেবল মক্কার ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
মক্কা ও কাবা বোঝাতে কুরআনে যে শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়েছে:
- মাসজিদুল হারাম (Sacred Mosque): ২:১৪৪, ২:২১৭, ৫:২, ৮:৩৪, ৯:৭, ৯:১৯, ৯:২৮, ১৭:১, ২২:২৫, ৪৮:২৫, ৪৮:২৭
- কাবা (Kaaba): ৫:৯৫, ৫:৯৭
- বাইতুল হারাম (Sacred House): ৫:২, ৫:৯৭
- বাইত (The House): ৮:৩৫, ২:১৫৮
অন্যদিকে, ইব্রাহিম-এর ইবাদতগাহের বর্ণনায় কুরআন সবসময় ‘বাইত’ (ঘর) শব্দটি ব্যবহার করলেও এর সাথে কখনোই সরাসরি ‘হারাম’ শব্দটি যুক্ত করেনি। বরং একে ‘প্রাচীন’ বা ‘প্রথম’ ঘর হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে:
- আওয়ালা বাইত (First House): ৩:৯৬
- বাইতুল আতিক (Ancient House): ২২:২৯, ২২:৩৩
- বাইতিকা মুহাররম (আপনার সংরক্ষিত ঘর): ১৪:৩৭ (এখানে ‘মুহাররম’ শব্দটি ইব্রাহিমের দোয়ায় সম্মানার্থে এসেছে, যা মক্কার প্রেক্ষাপট থেকে আলাদা)
- বাইতুল মামুর (Frequented House): ৫২:৪
- বাইত (The House): ২২:২৬, ২:১২৫, ২:১২৭
এই পার্থক্যগুলো নির্দেশ করে ইব্রাহিমের তৈরি ঘরটি ‘বাক্কা’ নামক যে স্থানে ছিল, তা মক্কা থেকে ভিন্ন। আর মক্কার ‘কাবা’ হলো বর্তমান কিবলা যা পরবর্তীতে মুসলিমদের জন্য নির্ধারিত হয়েছে।
৩. ‘বরকতময় অঞ্চল’
কুরআনে ‘বরকত’ বা ‘বারাকনা’ শব্দটি সবসময় ইব্রাহিম ও তার পরবর্তী নবীদের ইতিহাস বিজড়িত অঞ্চলগুলোর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। মক্কা বা হেজাজ অঞ্চলের ক্ষেত্রে কুরআন কখনোই এই শব্দটি ব্যবহার করেনি।
- ইব্রাহিম ও লুত-এর ক্ষেত্রে: “আর আমি তাকে (ইব্রাহিম) ও লুতকে উদ্ধার করে নিয়ে গেলাম এমন এক ভূখণ্ডে, যেখানে আমি বিশ্ববাসীর জন্য বরকত দিয়েছি (বারাকনা)।” (২১:৭১)
- বাক্কায় নির্মিত প্রথম ঘরের ক্ষেত্রে: “নিশ্চয়ই মানবজাতির জন্য প্রথম যে ঘরটি নির্মিত হয়েছিল, তা বাক্কায় ; যা বরকতময় (মুবারাকান)…” (৩:৯৬)
এখানে বাক্কার ঘরকে সরাসরি বরকতময় বলা হয়েছে, যা ২১:৭১ আয়াতের সেই বরকতময় ভূমির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
- সুলাইমান-এর ক্ষেত্রে: ” আর আমি সুলাইমানের জন্য অনুগত করে দিয়েছিলাম প্রবল বায়ুকে, যা তার আদেশে প্রবাহিত হতো সেই ভূমির দিকে, যেখানে আমি বরকত দিয়েছি (বারাকনা)।” (২১:৮১)
- বনী ইসরাইলের ক্ষেত্রে: “আর যেই জাতিকে দুর্বল মনে করা হতো, তাদেরকে আমি সেই দেশের পূর্ব ও পশ্চিমের উত্তরাধিকারী করলাম যেখানে আমি বরকত দিয়েছি (বারাকনা)।” (৭:১৩৭)
এই আয়াতগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কুরআনের পরিভাষায় ‘বরকতময় ভূমি’ বলতে সর্বদা লেভান্ট অঞ্চল (জর্ডান, ফিলিস্তিন, শাম ইত্যাদি)-কে নির্দেশ করা হয়েছে। মক্কার ক্ষেত্রে কুরআন ‘হারাম’ বা ‘পবিত্র’ শব্দটি ব্যবহার করলেও কখনো ‘মুবারাক’ বা ‘বারাকনা’ শব্দগুলো ব্যবহার করেনি। এটি একটি শক্তিশালী প্রমাণ যে ইব্রাহিমের সেই ইবাদতগৃহটি মক্কায় ছিল না।
৪. ইব্রাহিমের হজ্জের ঘোষণা এবং ইস্রাঈলী নবীদের ইতিহাস
আল্লাহ ইব্রাহিমকে মানবজাতির উদ্দেশ্যে হজ্জের ঘোষণা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন:
“ আর যখন আমি ইবরাহীমের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম সেই গৃহের স্থান (এবং বলেছিলাম): আমার সাথে কোন শরীক স্থির করনা এবং আমার গৃহকে পবিত্র রেখ তাদের জন্য যারা তাওয়াফ করে এবং যারা দন্ডায়মান থাকে, রুকু করে ও সাজদাহ করে। আর মানুষের মধ্যে হজ্জের ঘোষণা দাও। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে চড়ে দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে।” (২২:২৬-২৭)
ইব্রাহিম-এর পর ইসহাক, ইয়াকুব, ইউসুফ, মুসা, হারুন, দাউদ, সুলাইমান এবং ঈসার মতো অনেক নবীর ঘটনাবলি কুরআনে এসেছে। কিন্তু লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো—হজ্জের ঘোষণা ইব্রাহিমের সময় থেকেই ঘোষিত হওয়া সত্ত্বেও কোনো ইস্রাঈলী নবী কখনো আরবের মক্কায় হজ্জ করতে এসেছিলেন বলে কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই বা কুরআনেও এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায় না। ইব্রাহিমের তৈরি ঘরটি যদি মক্কায়ই হতো তাহলে ইব্রাহিম এবং তাঁর পরবর্তী নবীগণের হেজাজ বা মক্কায় আসার ঐতিহাসিক প্রমাণ থাকতো।
৫. পেট্রা ও বাক্কা: একটি ঐতিহাসিক সম্ভাবনা
অনেক গবেষক ও ঐতিহাসিক মনে করেন জর্ডানের প্রাচীন নগরী পেট্রা (Petra) হতে পারে কুরআনে বর্ণিত সেই বাক্কা। কুরআন অনুযায়ী, ইব্রাহিম ও লুত একই সময় একই অঞ্চলে হিজরত করেছিলেন (২১:৭১)। যেহেতু কওমে লুত-এর ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকাটি জর্ডান উপত্যকায় (মৃত সাগর/ডেড সী সংলগ্ন অঞ্চলে) অবস্থিত, সেহেতু ইব্রাহিমের বাক্কা নগরীটিও জর্ডান বা তার কাছাকাছি অঞ্চলে থাকাটাই যুক্তিযুক্ত। পেট্রার ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রাচীন কেনানীয় সভ্যতার ইতিহাস এই ধারণাকে সমর্থন করে। তবে অবশ্যই আল্লাহ এ বিষয়ে সর্বাধিক অবগত। আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না পেট্রাই কি কুরআনে বর্ণিত সেই বাক্কা নগরী কিনা। আপাতত আমাদের দায়িত্ব হলো কুরআনের শব্দচয়ন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা।
৬. মক্কার কাবা: একত্ববাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা
কুরআনে মক্কার কাবা বা মাসজিদুল হারামকে পরবর্তী প্রজন্মের মানুষদের জন্য একটি ‘কিয়াম’ (প্রতিষ্ঠান বা ভিত্তি) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে (৫:৯৭) এবং একে মুসলিমদের জন্য কিবলা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে (২:১৪৪)। এবং এর মাধ্যমে ইব্রাহিম-এর হারিয়ে যাওয়া একত্ববাদী রীতিগুলো মক্কায় পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
তবে মক্কায় অবস্থিত সেই কিউব বা ঘনকাকৃতির ঘর, যেটিকে কুরআনে ‘কাবা’ বলা হয়েছে- সেটি কে বা কারা তৈরি করেছেন এই ব্যাপারে কুরআনে কোন ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি। তাছাড়া, কাবাঘর নির্মাণের ইতিহাস সম্পর্কিত কোন নিরপেক্ষ দলিল-প্রমাণও আমাদের নিকট নেই। তাই মক্কায় অবস্থিত কাবাঘরটি কে প্রথম তৈরি করেছিলেন এই ব্যাপারে ঐতিহাসিকগণ এখনো নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারেননি।
উপসংহার
কুরআনের আয়াতগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে এটি স্পষ্ট হয় যে:
১. মক্কা এবং বাক্কা ভিন্ন দুটি ভৌগোলিক স্থানের নাম।
২. ইব্রাহিম ও লুত হিজরত করে সেই বরকতময় ভূখন্ডে গিয়েছিলেন।
৩. ইব্রাহিমের তৈরি ঘরটি ছিল বাক্কায়, যা হয়তো তৎকালীন আহলে কিতাবদের নিকট সুপরিচিত ছিল।
৪. পরবর্তীতে মক্কার কাবাকে আল্লাহর নির্দেশে মুসলিমদের জন্য নতুন ও চূড়ান্ত কিবলা হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে।