বর্তমান মুসলিম সমাজে একটি দুঃখজনক প্রবণতা হলো, খুব সহজেই একে অন্যের ওপর ‘কাফির’ বা ‘মুরতাদ’-এর ফতোয়া চাপিয়ে দেওয়া। অনেক সময় দলগত মতবাদের অমিল হলেই একে অপরকে ‘কাফির’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। অথচ কুরআনে ‘কুফর’ শব্দটিকে একটি বিশেষ ও গভীর অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। কেবল ইসলাম না মানলেই সেটা কুফর হয়ে যায় না, বরং কুফর সংঘটিত হয় সত্য সুস্পষ্টরূপে প্রকাশিত হওয়ার পর তা অস্বীকার করলে।
‘কুফর’ শব্দের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ
আরবি ভাষায় ‘কুফর’ (کفر) শব্দের মূল অর্থ হলো ‘ঢেকে ফেলা’, ‘গোপন করা’ বা ‘আচ্ছন্ন করা’ ইত্যাদি। ইসলামী পরিভাষায়, যখন স্পষ্ট সত্য মানুষের কাছে পূর্ণরূপে উপস্থাপিত হয়, কিন্তু সে তা জেনেশুনে ঢেকে দেয়, অস্বীকার করে এবং তা গ্রহণ না করে, তখন তাকে ‘কুফর’ বলে।
এডওয়ার্ড লেনের আরবি অভিধানেও ‘কুফর’-এর অর্থ ‘সত্য গোপন করা’ বা ‘আচ্ছন্ন করা’ হিসেবে উল্লেখিত হয়েছে। অর্থাৎ, কুরআনের পরিভাষায় কুফর হচ্ছে প্রমাণ সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও সত্য প্রত্যাখ্যান করা।
কুফর কেবল অবিশ্বাস নয়
অনেকে মনে করেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ বা ইসলামে বিশ্বাস করে না, সে-ই কাফির। কিন্তু কুরআন এই ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে। ইবলিস (শয়তান) আল্লাহতে বিশ্বাসী ছিল। সে আল্লাহর আদেশ জেনেও অহংকারবশত তা অমান্য করেছিল। অতঃপর কুরআন তাকে ‘কাফির’ বলে আখ্যায়িত করেছে:
[২:৩৪] “আর যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম, ‘আদমকে সেজদা করো’, তখন ইবলিস ছাড়া সবাই সেজদা করল; সে অস্বীকার করল ও অহংকার করল এবং সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলো।”
ইবলিস আল্লাহকে চিনত, তাঁকে ভয় করত, এমনকি মানুষকে কুফরিতে লিপ্ত করার পরও শয়তান বলে যে সে আল্লাহকে ভয় করে (৫৯:১৬)। তবুও সে কাফির। এটি প্রমাণ করে যে, ‘কুফর’ কেবল আল্লাহকে অস্বীকার করা নয়; বরং স্পষ্ট সত্য জেনেও তা প্রত্যাখ্যান করাই কুফর।
নবী-রাসুল ও সুস্পষ্ট প্রমাণ প্রেরণ
আল্লাহ কখনোই কোনো জাতিকে সুস্পষ্ট প্রমাণ ও সতর্কবার্তা প্রেরণ করা ছাড়া ধ্বংস করেননি। কুরআনে বারবার বলা হয়েছে যে, নবী-রাসুলদের দায়িত্ব ছিল স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেওয়া:
[৬:৪৮-৪৯] আমি রাসুলদের কেবল সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবেই প্রেরণ করি। অতএব, যারা ঈমান আনে ও নিজেদের সংশোধন করে নেয়, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না। আর যারা আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে, তাদের অবাধ্যতার কারণে শাস্তি তাদের স্পর্শ করবে।”
নবী নিজেও কোনো ব্যক্তির অন্তরের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে জানতেন না। আল্লাহ বলেন:
[৯:১০১] “তোমাদের আশেপাশে থাকা মরুবাসী আরবদের মধ্যে কিছু মুনাফিক রয়েছে এবং মদিনাবাসীদের মধ্যেও। তারা কপটতায় সিদ্ধ। আপনি তাদের চেনেন না, আমি তাদের চিনি। আমি তাদের দুইবার শাস্তি দেব, তারপর তারা মহা-শাস্তির দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে।”
সত্য প্রকাশিত হওয়ার পর তা প্রত্যাখ্যান করা কুফর
আল্লাহর একটি সুন্নত হলো, তিনি কোনো সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেন না যতক্ষণ না তাদের কাছে সত্যের বাণী পূর্ণরূপে পৌঁছায় এবং সবকিছু বুঝেও গোঁড়ামি বা অহংকারবশত তারা তা প্রত্যাখ্যান করে। কেবল অজ্ঞতা বা অসম্পূর্ণ জ্ঞানের কারণেই কেউ কাফির হয়ে যায় না।
[২৮:৫৯] “আপনার প্রতিপালক জনপদসমূহকে ধ্বংস করেন না, যতক্ষণ না তার কেন্দ্রে কোনো রাসূল পাঠান যিনি তাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করেন। আর আমি জনপদসমূহকে তখনই ধ্বংস করি, যখন তার অধিবাসীরা জুলুমকারী হয়।”
[৬:১৩১] “এটি এজন্য যে, আপনার প্রতিপালক কোনো জনপদকে জুলুমের কারণে ধ্বংস করেন না, যতক্ষণ না তার অধিবাসীদের সতর্ক করা হয়।”
এখানে স্পষ্ট যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি আসে তখনই, যখন সত্য স্পষ্ট হওয়ার পরও মানুষ জেনেশুনে তা প্রত্যাখ্যান করে।
সকল মুশরিকই কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাফির?
আমাদের সমাজে প্রচলিত একটি ধারণা হলো, যেকোনো মুশরিক (প্রতিমাপূজারী) কাফির। কিন্তু কুরআন এই ধারণার স্পষ্ট ব্যতিক্রম তুলে ধরে। আল্লাহ মুশরিকদের সম্পর্কে বলেন:
[৯:৬] “আর মুশরিকদের মধ্যে কেউ যদি আপনার কাছে আশ্রয় চায়, তবে তাকে আশ্রয় দিন যাতে সে আল্লাহর বাণী শুনতে পায়। তারপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিন। এটি এজন্য যে, তারা এমন এক সম্প্রদায় যারা জানে না।”
এই আয়াতটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বলা হচ্ছে, মুশরিক ব্যক্তি যদি সত্য না জেনে থাকে, তবে তার জন্য আল্লাহর বাণী শোনার সুযোগ তৈরি করতে হবে। এর মানে, যে হিন্দু বা অন্য ধর্মাবলম্বী স্পষ্টভাবে ইসলামের দাওয়াত পায়নি বা যথাযথভাবে সত্য উপলব্ধি করার সুযোগ পায়নি, আল্লাহর কাছে তার অবস্থান হয়তো সেই ব্যক্তির চেয়েও ভালো, যে ইসলামের নাম নিয়েও শিরক করে বা সত্য জেনেও তা প্রত্যাখ্যান করে।
সকল অমুসলিম কাফির নয়
[৯৮:০৬] “নিশ্চয়ই আহলে কিতাব ও মুশরিকদের মধ্যে যারা কুফরি করেছে, তারা জাহান্নামের আগুনে চিরকাল থাকবে। তারাই হলো সৃষ্টির নিকৃষ্টতম।”
আয়াতটি থেকে বোঝা যায় যে আহলে কিতাব, মুশরিক বা অমুসলিমদের একটি অংশ কাফির, তাদের সকলেই কাফির নয়।
কুফর থেকে ঈমানে ফেরা এবং আবার কুফরে ফেরা
মানুষের মধ্যে বিশ্বাস ও অবিশ্বাস একটি চলমান প্রক্রিয়া হতে পারে। কেউ কেউ ঈমান আনে, আবার কুফরে ফিরে যায়, আবার ঈমান আনে। এদের ব্যাপারে চূড়ান্ত বিচার কেবল আল্লাহর হাতে। একজন মানুষ কখনোই অন্য মানুষের অন্তরের অবস্থা পুরোপুরি জানতে পারে না।
তবে বারংবার কুফরিতে লিপ্ত হলে এবং কুফরির দিকেই বাড়াবাড়ি করলে আল্লাহ তাকে আর সঠিক পথে পরিচালিত করেন না।
[৪:১৩৭] “নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে, তারপর কুফরি করেছে, আবার ঈমান এনেছে এবং আবার কুফরি করেছে, এরপর তাদের কুফরি আরও বেড়ে গিয়েছে—আল্লাহ তাদের ক্ষমা করবেন না এবং তাদের সরল পথ দেখাবেন না।”
কখন হৃদয়ে মোহর পড়ে?
কুরআনের একাধিক জায়গায় বলা হয়েছে, আল্লাহ কাফিরদের হৃদয়ে মোহর লাগিয়ে দেন। কিন্তু এটি কি আল্লাহর একক সিদ্ধান্ত, নাকি মানুষের কর্মের ফল?
উত্তর হলো, এটি মানুষের নিজরই পথভ্রষ্টতার ফল। যখন কোনো ব্যক্তি বারবার সত্য দেখেও তা প্রত্যাখ্যান করে এবং নিজের ভ্রান্ত পথে অটল থাকে, তখন আল্লাহ তাকে তার পছন্দের পরিণতিই দিয়ে দেন।
[২:৬-৭] নিশ্চয়ই যারা কুফরি করেছে, আপনি তাদের সতর্ক করুন বা না করুন—উভয়ই তাদের জন্য সমান; তারা ঈমান আনবে না। আল্লাহ তাদের হৃদয়ে এবং তাদের কানে মোহর মেরে দিয়েছেন, আর তাদের চোখের ওপর রয়েছে আবরণ; তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।”
আল্লাহ এখানে বলছেন যে, তারা নিজেরাই সত্য গ্রহণে অনাগ্রহী ছিল বলেই তাদের হৃদয় মোহর করে দেওয়া হয়েছে।
[৭:১০১] “এই জনপদগুলোর কিছু সংবাদ আমি আপনাকে বর্ণনা করছি। তাদের কাছে তাদের রাসূলগণ স্পষ্ট প্রমাণাদিসহ এসেছিলেন; কিন্তু আগে যা তারা অস্বীকার করেছিল, তাতে তারা ঈমান আনার মতো ছিল না। এভাবেই আল্লাহ কাফিরদের হৃদয়ে মোহর মেরে দেন।”
পূর্ববর্তী জাতিদের সবাই ধ্বংস হয়ে যায়নি
অনেকে মনে করেন, অতীতে যে সম্প্রদায়ের ওপরই শাস্তি এসেছে, সে সম্প্রদায়ের সকলেই ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু কুরআন থেকে দেখা যায়, সেই সব সম্প্রদায়ের শুধু পাপাচারী ও অত্যাচারী অংশটিই ধ্বংস হয়েছে। অন্যদিকে, সেই সম্প্রদায়ের যারা ঈমান এনেছিল এবং যারা অসৎকর্মে বাধা দিতো তারা আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা পেয়েছিল।
[১১:৫৮] “অতঃপর যখন আমার নির্দেশ এলো, তখন আমি হুদ ও তার সাথে যারা ঈমান এনেছিল, তাদের আমার বিশেষ রহমতে রক্ষা করলাম এবং তাদের এক কঠিন শাস্তি থেকে মুক্তি দিলাম।”
[৭:১৬৫] “তারপর যখন তারা সেই উপদেশ ভুলে গেল যা তাদের দেওয়া হয়েছিল, তখন আমি তাদের রক্ষা করলাম যারা মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করত; আর যারা জুলুম করেছিল, তাদের আমি কঠোর শাস্তি দিলাম, কারণ তারা নাফরমানি করছিল।”
এ থেকে বোঝা যায়, শাস্তিপ্রাপ্ত সম্প্রদায়ের সবাই কাফির নয়; বরং শাস্তি আসে কেবল তাদের ওপর, যারা স্পষ্ট সত্য জেনেও তা প্রত্যাখ্যান করে এবং পাপাচারে লিপ্ত থাকে।
স্বাধীন ইচ্ছা ও কুফর
মানুষ স্বাধীন ইচ্ছার অধিকারী। আল্লাহ তাকে সত্য-মিথ্যার জ্ঞান দিয়েছেন। অতঃপর সত্য গ্রহণ করা বা না করা সম্পূর্ণ মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। আল্লাহ কাউকে জোর করে ঈমান আনান না। যখন কোনো ব্যক্তি বুঝে-শুনেও বারবার সত্য প্রত্যাখ্যান করে, তখনই আল্লাহ তার হৃদয় মোহর করে দেন—এটি একধরনের ‘শাস্তি’ যেখানে মানুষ নিজের পছন্দের মাধ্যমেই নিজেকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে নেয়।
[১৮:২৯] “আর বলুন, ‘সত্য তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আগত’। অতএব যার ইচ্ছা সে ঈমান আনুক এবং যার ইচ্ছা সে কুফরি করুক।“
উপসংহার
কুরআনের আলোকে ‘কুফর’ বলতে বোঝায় সত্য স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তা জেনেশুনে অস্বীকার করা। এটি কেবল অমুসলিম বা অন্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য প্রযোজ্য কোনো শব্দ নয়। বরং এটি একটি ‘অবস্থা’—যা অর্জিত হয় ব্যক্তির নিজস্ব পছন্দ ও প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে।
আমাদের উচিত, কাউকে সহজে ‘কাফির’ আখ্যা না দেওয়া। কারণ অন্তরের অবস্থা কেবল আল্লাহ জানেন। কোনো ব্যক্তি যদি পূর্ণরূপে সত্য খুঁজে না পেয়ে থাকে, বা জিজ্ঞাসু অবস্থায় থাকে, তবে সে ‘কাফির’ নয়। বরং আমাদের কর্তব্য হলো, তার নিকট সত্য পৌঁছে দেওয়া এবং তার বিচার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া।
(৪:১৩৭) আয়াতটি পড়লে বোঝা যায়, ঈমান ও কুফরের মধ্যে মানুষ বারবার ঘুরপাক খেতে পারে। কেবল আল্লাহই জানেন, কার শেষ পরিণতি কী হবে।
তাই ফতোয়া দেওয়ার আগে বা অন্যকে কাফির ঘোষণার আগে আমাদের কুরআনের এই গভীর বার্তাটি বোঝা জরুরি। আল্লাহ বলেন:
[৪:৯৪] “হে মুমিনগণ! তোমরা যখন আল্লাহর পথে যাত্রা করবে, তখন ভালোভাবে যাচাই করে নেবে। কেউ তোমাদের সালাম দিলে পার্থিব জীবনের সম্পদের আশায় তাকে বলো না যে, ‘তুমি মুমিন নও’।“
