কিতাব ও হিকমাহ

পবিত্র কুরআনে বারবার ঘোষণা করা হয়েছে যে এটি বিশ্বাসীদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ, স্পষ্ট ও স্বয়ংসম্পূর্ণ কিতাব। কুরআনের একাধিক আয়াতে “কিতাব” ও “হিকমাহ” শব্দ দুটি পাশাপাশি উল্লেখিত হয়েছে। আয়াতগুলো দেখিয়ে অনেকে দাবি করেন যে কুরআনে “হিকমাহ” বলতে রাসূল-এর ব্যক্তিগত সুন্নাহ বা হাদিসকে বোঝানো হয়েছে।

এই আলোচনায় আমরা কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের আলোকে প্রমাণ করব যে, হিকমাহ হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত জ্ঞান বা প্রজ্ঞা যা কুরআনের মধ্যেই নিহিত রয়েছে।

আল্লাহ বলেন:

“আর তোমরা স্মরণ কর তোমাদের উপর আল্লাহর নিআমত এবং তোমাদের উপর কিতাব ও হিকমাহ হতে যা তিনি নাযিল করেছেন, যার মাধ্যমে (بِهِ) তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন। আর আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।“ (২:২৩১)

এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়: কিতাব ও হিকমাহ উভয়ের কথা উল্লেখ করার পর আল্লাহ একটি একবচন সর্বনাম — “যার মাধ্যমে” (بِهِ) ব্যবহার করেছেন। যদি কিতাব ও হিকমাহ দুটি পৃথক উৎস হতো — তাহলে বাক্যটিতে “যাদের মাধ্যমে” (بِهِمَا – যা একটি দ্বিবচন সর্বনাম), ব্যবহৃত হতো। এখানে একবচন ব্যবহারের মাধ্যমে আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, হিকমাহ কুরআনেরই একটি অংশ।

অপর একটি আয়াতে আল্লাহ বলেন:

“আর আল্লাহ তোমার প্রতি নাযিল করেছেন কিতাব ও হিকমাহ এবং তোমাকে শিখিয়েছেন যা তুমি জানতে না।” (৪:১১৩)

আয়াতটিতে কিতাব ও হিকমাহ উভয়কেই “নাযিলকৃত” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে — অর্থাৎ এগুলি সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। অন্যদিকে, মুহাম্মদের ব্যক্তিগত অভ্যাস ও দৈনন্দিন আচরণ (যেগুলোকে পরবর্তীকালে সুন্নাহ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে) কখনোই সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত ছিল না। এই আয়াতটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, হিকমাহ হলো অবতীর্ণ প্রজ্ঞা — কোনো মানুষের ব্যক্তিগত অভ্যাস বা আচরণ নয়।

কুরআনে আল্লাহ রাসুলকে যে সাক্ষ্য দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন:

“বলো, ‘সবচেয়ে বড় সাক্ষ্য কোনটি?’ বলো, ‘আমার ও তোমাদের মধ্যে আল্লাহই সাক্ষী। আর এই কুরআন আমার কাছে ওহী করা হয়েছে, যাতে এর মাধ্যমে আমি তোমাদের এবং যাদের কাছে এটি পৌঁছাবে, তাদের সতর্ক করতে পারি।’” (৬:১৯)

যদি নবী কুরআনের বাইরে আরও কোনো বাধ্যবাধকতামূলক ওহী (উদাহরণস্বরূপ কোনো পৃথক সুন্নাহ বা হাদিস গ্রন্থ) পেয়ে থাকতেন, তবে তা এই সাক্ষ্যের অন্তর্ভুক্ত করা হতো। কিন্তু উপরের আয়াতে আমরা দেখতে পাচ্ছি কেবল কুরআনের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে — যা প্রমাণ করে মানবজাতির জন্য মুহাম্মদের উপর নাযিলকৃত একমাত্র পথনির্দেশ ছিল আল-কুরআন।

সূরা আল-বাকারাহর ২৬৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন:

“তিনি যাকে ইচ্ছা হিকমাহ দান করেন। আর যাকে হিকমাহ দান করা হয়েছে, তাকে প্রভূত কল্যাণ দান করা হয়েছে। আর বুদ্ধিমানগণ ছাড়া কেউ উপদেশ গ্রহণ করে না।” (২:২৬৯)

এখানে আল্লাহ স্পষ্টভাবে বলছেন যে, হিকমাহ যে কাউকে দেওয়া হতে পারে — অর্থাৎ এটি কেবল নবী-রাসুলদের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। যদি হিকমাহ মানে “সুন্নাহ” হতো, তাহলে এর অর্থ দাঁড়াত যে, প্রত্যেক প্রজ্ঞাবান ব্যক্তির নিজস্ব একটি সুন্নাহ রয়েছে যা সকলকে অনুসরণ করে চলতে হবে — এটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।

আল্লাহ বারবার বলেছেন যে তাঁর বাণী অকুটিল ও সুস্পষ্ট:

“একটি আরবি কুরআন, যাতে কোনো বক্রতা নেই — যাতে তারা তাকওয়া অবলম্বন করে।” (৩৯:২৮)

যদি কুরআনের পাশাপাশি আরও একটি অতিরিক্ত সুন্নাহ অনুসরণ করা আবশ্যক হতো, তবে কুরআন নিজেই তা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করত। কিন্তু কুরআনের কোথাও এরকম কোনো নির্দেশ নেই। বরং কুরআন কেবল “আল্লাহর সুন্নাহ” (সুন্নাতুল্লাহ) সম্পর্কে কথা বলে — মুহাম্মদ বা অন্য কোনো নবীর সুন্নাহ সম্পর্কে নয়:

“তুমি আল্লাহর সুন্নাহতে কোনো পরিবর্তন পাবে না এবং আল্লাহর সুন্নাহতে কোনো বিচ্যুতিও পাবে না।” (৩৫:৪৩)

সবশেষে, রাসুলকে মানুষের মধ্যে বিচার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কেবল কুরআনের ভিত্তিতে:

“নিশ্চয়ই আমি তোমার প্রতি সত্যসহ কিতাব নাযিল করেছি, যাতে তুমি মানুষের মধ্যে বিচার করো সে অনুযায়ী যা আল্লাহ তোমাকে দেখিয়েছেন।” (৪:১০৫)

এখানে রাসুলকে কোনো অতিরিক্ত সুন্নাহ বা হাদিস দ্বারা বিচার করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। আল্লাহ যদি চাইতেন যে নবী কুরআন ছাড়াও অন্য কোনো উৎস দ্বারা বিচার করুক, তবে এ আয়াতে তা উল্লেখ করে দিতেন।

কুরআনের সর্বত্র “হিকমাহ” শব্দটি কেবল “প্রজ্ঞা” অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে — এটি কোনো নবীর ব্যক্তিগত অভ্যাস বা সুন্নাহ নয়। আরবি অভিধানগুলোও নিশ্চিত করে যে, হিকমাহ শব্দের অর্থ হলো প্রজ্ঞা, জ্ঞান ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ইত্যাদি। এই অর্থ বিকৃত করে যদি একে সুন্নাহ বা হাদিস হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, তাহলে তা হবে কুরআনের স্বচ্ছতা ও সত্যতাকে প্রত্যাখ্যান করার নামান্তর।

আল্লাহর ওহী পূর্ণাঙ্গ, ত্রুটিহীন ও বিস্তারিত। আর যারা সরল পথের সন্ধান করে তাদের জন্য পথনির্দেশ হিসেবে কুরআনই যথেষ্ট।

“আর এটিই আমার সরল পথ। সুতরাং তোমরা এরই অনুসরণ করো এবং অন্য পথসমূহ অনুসরণ করো না, তাহলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে।” (৬:১৫৩)