পবিত্র কুরআনের ৯ নং সূরা (আত-তাওবাহ)-এর ২৯ নং আয়াতটি বহু শতাব্দী ধরে ভুল ব্যাখ্যা এবং বিকৃতির শিকার হয়ে আসছে। ইসলামবিদ্বেষীরা এই আয়াতটি দেখিয়ে দাবি করে যে, ধর্মের কারণে মুসলিমরা অমুসলিমদের ওপর একটি বাড়তি করের বোঝা চাপিয়ে দেয়।
এই প্রবন্ধে আমরা কুরআন-কেন্দ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে ৯:২৯ আয়াতটির বিশ্লেষণ করব, এর প্রকৃত অর্থ ও প্রেক্ষাপট তুলে ধরব, এবং প্রচলিত ভুল ব্যাখ্যার পেছনের কারণগুলো চিহ্নিত করব।
৯:২৯ আয়াতের অনুবাদ
প্রথমে আয়াতটির কয়েকটি প্রচলিত অনুবাদ তুলে ধরা যাক:
প্রচলিত অনুবাদসমূহ
ইউসুফ আলী: “তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাস করে না, এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা নিষিদ্ধ করেছেন তা নিষিদ্ধ বলে গণ্য করে না, এবং সত্য ধর্মকে স্বীকার করে না, (এমনকি যদি তারা) আহলে কিতাবদের অন্তর্ভুক্তও হয়, যতক্ষণ না তারা স্বেচ্ছায় আনুগত্যের সাথে জিযিয়া (Jizya) প্রদান করে এবং নিজেদেরকে পরাভূত বলে অনুভব করে।”
পিকথল: “যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে তাদের মধ্য থেকে এমন লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাস করে না, এবং আল্লাহ তাঁর রাসূলের দ্বারা যা নিষিদ্ধ করেছেন তা নিষিদ্ধ করে না, এবং সত্য ধর্ম অনুসরণ করে না, যতক্ষণ না তারা অবনত হয়ে স্বেচ্ছায় কর (tribute) প্রদান করে।”
শাকির: “তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো যারা আল্লাহতে বিশ্বাস করে না, এবং শেষ দিবসেও না, এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা নিষিদ্ধ করেছেন তারা তা নিষিদ্ধ করে না, এবং সত্য ধর্ম অনুসরণ করে না, তাদের মধ্য হতে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে, যতক্ষণ না তারা শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ ট্যাক্স (tax) প্রদান করে এবং তারা বশ্যতার অবস্থায় থাকে।”
কুরআনবাদী (রিফর্মিস্ট) অনুবাদ
এদিপ ও লায়েথ: “Fight those who do not acknowledge God nor the Last day from among the people who received the book; they do not forbid what God and His messenger have forbidden, and they do not uphold the system of truth; until they pay the reparation, in humility.”
বাংলা অনুবাদ: “কিতাবপ্রাপ্তদের মধ্য থেকে যারা আল্লাহ এবং শেষ দিবসকে স্বীকার করে না তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো; আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল যা নিষিদ্ধ করেছেন তারা তা নিষিদ্ধ করে না, এবং তারা সত্যের ব্যবস্থাকে সমুন্নত রাখে না; যতক্ষণ না তারা ক্ষতিপূরণ (reparation) প্রদান করে বিনম্রভাবে।”
জিযিয়া (جِزْيَة) শব্দের বিশ্লেষণ
আলোচ্য আয়াতটির ভুল বোঝাবুঝির কেন্দ্রবিন্দু হলো আরবি শব্দ جِزْيَة (জিযিয়া)। প্রচলিত ব্যাখ্যায় এটিকে “অমুসলিমদের ওপর আরোপিত কর” হিসেবে অনুবাদ করা হয়। কিন্তু কুরআনের ভাষাতত্ত্ব ও শব্দের প্রকৃত অর্থ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শব্দটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ বহন করে।
জিযিয়া শব্দের ব্যুৎপত্তি ও কুরআনে ব্যবহার
জিযিয়া শব্দটি মূল ধাতু ج-ز-ي (জা-যা-য়া) থেকে এসেছে, যার অর্থ “প্রতিদান দেওয়া”, “ক্ষতিপূরণ দেওয়া” বা “বিনিময় দেওয়া”। এই ধাতুর বিভিন্ন রূপ (যেমন: জাযা, ইউজযা) কুরআনের বিভিন্ন স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর অর্থ হয় “প্রতিফল” বা “বিনিময়”:
- ৩৪:১৭ – “আমি তাদেরকে তাদের অকৃতজ্ঞতার প্রতিফল (جَزَيْنَاهُمْ) দিয়েছি।”
- ৫৩:৪১ – “অতঃপর তাকে পূর্ণ প্রতিফল (الْجَزَاءَ) দেওয়া হবে।”
- ৪৫:২২ – “…যাতে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার উপার্জনের বিনিময় (تُجْزَىٰ) দেওয়া হয়।”
কুরআনের কোথাও জিযিয়া শব্দ দ্বারা “ধর্মীয় কর” বোঝানো হয়নি। এটি পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে উমাইয়া ও আব্বাসীয় শাসকদের সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডার অংশ হিসেবে উদ্ভাবিত একটি অর্থ।
জিযিয়ার প্রকৃত অর্থ
৯:২৯ আয়াতে জিযিয়া বলতে মূলত যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ (war reparation) বোঝানো হয়েছে। যখন কোন দল মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ চালায় এবং যুদ্ধ শুরু করে, তখন যুদ্ধ শেষে তারা মুসলিমদেরকে যে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকে, সেটিই হলো জিযিয়া। এটি অমুসলিমদের ওপর আরোপিত কোনো স্থায়ী বা চলমান কর নয়, বরং একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে আরোপিত জরিমানা।
আয়াতের প্রসঙ্গ: হুনাইনের যুদ্ধ
৯:২৯ আয়াতটির প্রকৃত অর্থ বুঝতে হলে এর আগের ও পরের আয়াতগুলোর ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা জরুরি। সূরা আত-তাওবাহ্-র এই অংশে আল্লাহ পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছেন:
- ৯:২৫-২৬ আয়াত: এখানে আল্লাহ মুমিনদের হুনাইনের যুদ্ধের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। যেখানে সংখ্যায় অধিক হওয়া সত্ত্বেও মুসলিমরা প্রথমে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে আল্লাহর বিশেষ সাহায্যে তারা জয়ী হয়। এটি মূলত মুমিনদের আল্লাহর ওপর ভরসা রাখার শিক্ষা দেয়।
- ৯:২৮ আয়াত: এই আয়াতে পবিত্র কাবার মর্যাদা রক্ষায় মুশরিকদের সেখানে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়।
- ৯:২৯ আয়াত: এরপরই আসে কিতাবপ্রাপ্তদের মধ্যে যারা শত্রুভাবাপন্ন, তাদের প্রসঙ্গে নির্দেশনা।
কুরআনের মৌলিক নীতির সঙ্গে বিরোধ
৯:২৯ আয়াতের প্রচলিত অনুবাদকে সঠিক ধরে নিলে তা কুরআনের অনেকগুলো মৌলিক নীতির সাথে সাংঘর্ষিক হয়:
১. ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই
“দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই; সত্য পথ মিথ্যা পথ থেকে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে।” (২:২৫৬)
যদি জিযিয়া একটি ধর্মীয় কর হয় যা অমুসলিমদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা একপ্রকার ধর্মীয় জবরদস্তিতে পরিণত হয়—যা ২:২৫৬ আয়াতের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
২. বিশ্বাসের স্বাধীনতা
“তোমার প্রতিপালক চাইলে পৃথিবীতে যারা আছে তারা সকলেই ঈমান আনত। তবে কি তুমি মুমিন হওয়ার জন্য মানুষের ওপর জবরদস্তি করবে?” (১০:৯৯)
“সত্য তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এসেছে; সুতরাং যার ইচ্ছা বিশ্বাস করুক এবং যার ইচ্ছা প্রত্যাখ্যান করুক।” (১৮:২৯)
ধর্মের ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্রের জনগণকে শ্রেণিবিভক্ত করে একটি বিশেষ শ্রেণির ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা—তাদেরকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করার সমতুল্য—যা কুরআন স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছে।
৩. সদাচরণ ও ন্যায়বিচারের আহ্বান
“ধর্মের কারণে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে স্বদেশ থেকে বহিষ্কার করেনি, তাদের সাথে সৌজন্য ব্যবহার ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।” (৬০:৮)
কুরআনে শুধুমাত্র যুদ্ধরত প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সব অমুসলিমের বিরুদ্ধে নয়।
৪. শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান
“আর তোমরা আল্লাহর পথে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, কিন্তু সীমা লঙ্ঘন করো না।” (২:১৯০)
“যদি তারা শান্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে তুমিও শান্তির দিকে ঝুঁকবে।” (৮:৬১)
যুদ্ধ হবে কেবল আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে, এবং অমুসলিম প্রতিপক্ষ যদি শান্তির আহ্বান জানায় তাহলে তা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে।
উপসংহার
৯:২৯ আয়াতটি বহু শতাব্দী ধরে ভুল ব্যাখ্যার শিকার হয়েছে এবং ইসলামের শত্রুরা এই ভুল ব্যাখ্যাকে কাজে লাগিয়ে ইসলামকে একটি “সহিংস ধর্ম” হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ পেয়েছে। কুরআনের ভাষাতত্ত্ব ও মৌলিক নীতির আলোকে আমরা দেখতে পাই যে:
১. জিযিয়া কোনো স্থায়ী কর নয়: এটি যুদ্ধ-পরবর্তী একটি সাময়িক ক্ষতিপূরণ। কুরআনের ভাষায় জা-যা-য়া ধাতুর সব ব্যবহারই “প্রতিদান” বা “ক্ষতিপূরণ” অর্থে।
২. শুধু আগ্রাসী শক্তির জন্য প্রযোজ্য: এটি কেবল তাদের ওপর প্রযোজ্য যারা যুদ্ধ বা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল, সকল অমুসলিমের জন্য নয়।
৩. সাম্রাজ্যবাদী প্রভাবের ফল: উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমলে রাষ্ট্র পরিচালনার বিশাল খরচের জন্য এই শব্দটিকে একটি স্থায়ী ‘ট্যাক্স সিস্টেমে’ রূপান্তর করা হয়, যা কুরআনের মূল চেতনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
৪. কুরআনের মৌলিক নীতির সাথে সামঞ্জস্য: জিযিয়াকে ‘যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ’ হিসেবে ধরলে তা ধর্মীয় স্বাধীনতা (২:২৫৬), বিশ্বাসের স্বাধীনতা (১০:৯৯; ১৮:২৯), ন্যায়বিচার (৬০:৮) ও শান্তি প্রতিষ্ঠার (৮:৬১) কুরআনিক নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
সকলের উচিত পবিত্র কুরআনের আয়াতগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে না পড়ে এর প্রসঙ্গ এবং বিশ্বজনীন ন্যায়বিচারের প্রেক্ষাপটে পড়া, অতঃপর সেগুলোর মর্মার্থ বোঝার চেষ্টা করা।
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর জন্য সাক্ষী হয়ে ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকো। কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদের ন্যায়বিচার করতে বাধা না দেয়। ন্যায়বিচার করো, এটাই তাকওয়ার বেশি নিকটবর্তী।” (৫:৮)
এটাই ইসলামের প্রকৃত বার্তা—শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানবতার ঐক্য।