কুরআনে মৃতদেহ সৎকারের মৌলিক পদ্ধতি হিসেবে ‘দাফন’ বা সমাহিত করার উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। মানব ইতিহাসের প্রথম মৃত্যুর ঘটনার মাধ্যমেই আল্লাহ মানুষকে এই পদ্ধতি শিখিয়েছেন। কাবিল যখন তার ভাই হাবিলকে হত্যা করে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে, তখন আল্লাহ একটি কাক পাঠানোর মাধ্যমে তাকে মৃতদেহ সমাহিত করার উপায় শিক্ষা দেন।
[৫:৩১] “অতঃপর আল্লাহ একটি কাক পাঠালেন, যা মাটিতে আঁচড়াতে লাগল, যাতে সে তাকে দেখাতে পারে কীভাবে তার ভাইয়ের মৃতদেহ গোপন করা যায়। সে বলল, ‘হায় আফসোস! আমি কি এই কাকটির মতোও হতে পারলাম না, যাতে আমার ভাইয়ের মৃতদেহটি ঢেকে রাখতে পারি?’ অতঃপর সে অনুতপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হলো।”
এই আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, মৃতদেহ মাটিতে সমাহিত করা বা দাফন করাই হলো আল্লাহ কর্তৃক অনুমোদিত সবচেয়ে প্রাকৃতিক ও স্বভাবজাত সৎকার পদ্ধতি।
কুরআনে ‘জানাজার সালাত’ নামক আলাদা কোনো সালাতের বিধান বর্ণনা করা হয়নি। কুরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘সালাত’ বা নামাজের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো আল্লাহকে স্মরণ করা। এটি কোনো মানুষের জন্য বা মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে অর্পণ করার মতো ইবাদত নয়:
[২০:১৪] “নিশ্চয়ই আমিই আল্লাহ, আমি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। অতএব আমারই ইবাদত করো এবং আমার স্মরণে সালাত কায়েম করো।”
[৬:১৬২] “বলো, ‘নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু—আল্লাহর জন্য যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক।’”
এই আয়াত দুটি প্রমাণ করে যে, সালাত কেবল আল্লাহর জন্য নিবেদিত। মৃত ব্যক্তির জন্য আলাদা কোনো জানাজার ‘সালাত’ বা নামাজের ভিত্তি কুরআনে পাওয়া যায় না।
অনেকে সূরা আত-তাওবার ৮৪ নম্বর আয়াত দেখিয়ে কুরআনে জানাজার নামাজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে চান। আয়াতটিতে বলা হয়েছে:
[৯:৮৪] “আর তাদের (মুনাফিকদের) মধ্যে যে কেউ মারা যাক না কেন, তুমি কখনো তার প্রতি সমর্থন প্রকাশ করবে না (ওয়ালা তুসাল্লি আলা আহাদিম মিনহুম মাতা আবাদান) এবং তার কবরের পাশে দাঁড়াবে না। নিশ্চয়ই তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি অবিশ্বাস পোষণ করেছে এবং পাপাচারী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে।”
আমাদের একটি জিনিস জানা থাকা প্রয়োজন যে—কুরআনিক ব্যাকরণে ‘সালাত’ শব্দের পর যখন ‘আলা'(عَلَىٰ) অনুসর্গ বসে (অর্থাৎ ‘সাল্লি আলা’), তখন তার অর্থ আর প্রথাগত ‘নামাজ পড়া’ থাকে না। তখন এর অর্থ হয় “সমর্থন করা” বা “সহযোগিতা করা”। কুরআনের অন্যান্য আয়াতে এই শব্দের ব্যবহার দেখলে এটি পরিষ্কার বোঝা যায়:
[৩৩:৫৬] “নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীকে সমর্থন করেন (ইউসল্লুনা আ’লান নাবিইয়ি)। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাকে সমর্থন করো (সাল্লু আলাইহি)…”(এখানে আল্লাহ ও ফেরেশতারা নবীর জন্য নামাজ পড়েন না, বরং তাঁকে সমর্থন ও সাহায্য করেন। মুমিনদেরও বলা হয়েছে জীবিত অবস্থায় নবীকে সমর্থন জানাতে।)
[৩৩:৪৩] “তিনিই সেই সত্তা, যিনি তোমাদের সমর্থন জানান (ইউসাল্লি আলাইকুম) এবং তাঁর ফেরেশতাগণও, তোমাদের অন্ধকার থেকে আলোতে বের করে আনার জন্য।”
[৯:১০৩] “তাদের ধনসম্পদ থেকে সদাকা গ্রহণ করো, যার মাধ্যমে তুমি তাদের পবিত্র ও পরিশোধিত করবে; এবং তাদের সমর্থন করো (ওয়া সাল্লি আলাইহিম)। নিশ্চয়ই তোমার সমর্থন (সালাওয়াতাকা) তাদের জন্য প্রশান্তি স্বরূপ।”
এখান থেকে বোঝা যায় যে, ৯:৮৪ আয়াতে আসলে মুনাফিকদের জন্য নামাজ পড়তে নিষেধ করা হয়নি; বরং বলা হয়েছে— কোনো সত্যত্যাগী বা পাপাচারী মারা গেলে নবী যেন তার প্রতি কোনো প্রকার সামাজিক সম্মান বা সমর্থন প্রকাশ না করেন এবং তার দাফনস্থলে গিয়ে না দাঁড়ান।
সবশেষে, প্রিয়জনের মৃত্যুর মতো বেদনাদায়ক মুহূর্তে মুমিনদের প্রধান দায়িত্ব হলো ধৈর্য ধারণ করা এবং পরম করুণাময়ের প্রতি সমর্পিত হওয়া:
[২:১৫৬] “যাদের ওপর কোনো বিপদ পতিত হলে তারা বলে: ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী’ (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।”
কুরআনের সার্বিক নির্দেশনার আলোকে মৃত্যু পরবর্তী আমাদের মূল করণীয়গুলো হলো:
- বিপদ বা শোকের মুহূর্তে ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পাঠের মাধ্যমে আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট থাকা।
- মৃতদেহকে মাটিতে সমাহিত করা (যা সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষকে শেখানো হয়েছে)।
- শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো, তাদের পাশে থাকা ও সহায়তা করা।
- সালাত হতে হবে একান্তই আল্লাহর উদ্দেশ্যে; মৃত ব্যক্তির জন্য আলাদা কোনো নামাজ পড়ার বাধ্যবাধকতা কুরআনে দেওয়া হয়নি।