আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি, ‘ইতিকাফ’ মানে হলো রমজানের শেষ দশকের রাতগুলোতে মসজিদের ভেতর পর্দা টাঙিয়ে দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। কিন্তু কুরআনে কি আদৌ ‘ইতিকাফ’ নামে আলাদা কোনো ইবাদতের অস্তিত্ব আছে?
কুরআনের কোথাও সরাসরি ‘ইতিকাফ’ শব্দটি আসেনি। কুরআনে এসেছে ‘আকিফুন’ (عَاكِفُون) শব্দটি, যা ‘আকাফা’ মূল থেকে উদ্ভূত। এর আভিধানিক অর্থ—অবস্থান করা, বসবাস করা বা থেকে যাওয়া। এই শব্দগুলো কোনো বিশেষ আধ্যাত্মিক সাধনাকে বোঝায় না, বরং একটি নির্দিষ্ট স্থানের ‘বাসিন্দা হওয়া’ বা ‘বসবাস করা’কে বোঝায়।
চলুন, কুরআনের আলোকে বিষয়টির প্রকৃত ব্যাখ্যা জেনে নেয়া যাক:
১. ইব্রাহিমের নির্মিত ঘরের উদ্দেশ্য (২:১২৫)
ইব্রাহিম (আ.) বাক্কায় যে ঘরটি নির্মাণ করেছিলেন, সেটি কেবল উপাসনার জন্য ছিল না; বরং তা ছিল মানুষের জন্য এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল (Resort/Shelter)।
“আর স্মরণ করো, যখন আমি এই ঘরকে মানুষের জন্য প্রত্যাবর্তনের স্থান ও নিরাপদ (আমান) বানিয়েছিলাম; এবং (বলেছিলাম) তোমরা ইব্রাহিমের দাঁড়ানোর জায়গাকে নামাজের স্থান হিসেবে গ্রহণ করো। আর আমি ইব্রাহিম ও ইসমাইলকে আদেশ দিয়েছিলাম—তোমরা আমার ঘরকে পবিত্র করো তাদের জন্য যারা তাওয়াফ করে, যারা সেখানে অবস্থান করে (আকিফিনা) এবং যারা রুকু ও সিজদা করে।” — (২:১২৫)
লক্ষ্য করুন, ‘আকিফিনা’ মানে হলো বাসিন্দা বা অবস্থানকারী। প্রাচীনকালে মানুষ বিপদে পড়ে বা আশ্রয়ের খোঁজে এই পবিত্র ঘরে এসে উঠত। এটি ছিল মানুষের জন্য এক অভয়ারণ্য ও সামাজিক মিলনকেন্দ্র।
২. বাসিন্দা এবং দর্শনার্থী (২২:২৫)
কুরআন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ‘আকিফ’ মানে কোনো বৈরাগী-সন্ন্যাসী নয়, বরং সাধারণ বাসিন্দা।
“নিশ্চয়ই যারা কুফরি করে এবং আল্লাহর পথ ও সেই পবিত্র মসজিদ (মসজিদুল হারাম) থেকে বাধা দেয়—যাকে আমি মানুষের জন্য সমান করেছি, সেখানকার বাসিন্দা (আকিফু) এবং বহিরাগতদের (বাদি) জন্য…” — (২২:২৫)
এই আয়াতে স্থানীয় বাসিন্দা (আকিফু) আর বাইরে থেকে আগত দর্শনার্থী (বাদি)-দের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, ‘আকিফ’ হওয়া মানে মসজিদের সীমানায় স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে অবস্থানকারী হওয়া।
৩. পারিবারিক অবস্থান ও নারী-পুরুষের উপস্থিতি (২:১৮৭)
বর্তমান যুগের মসজিদের সাথে প্রাচীন মসজিদকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। তখনকার দিনে ইবাদত ছাড়াও মসজিদ ছিল মুসাফির ও আশ্রয়প্রার্থীদের বসবাসের জায়গা। প্রচলিত ধারণা হলো ইতিকাফ মানে পরিবার ছেড়ে একা থাকা, কিন্তু কুরআনের আয়াত বলছে ভিন্ন কথা:
“…আর তোমরা পানাহার করো যতক্ষণ না ভোরের কালো রেখা থেকে সাদা রেখা তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়। অতঃপর রাত পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ করো। আর যতক্ষণ তোমরা মসজিদে অবস্থানরত (আকিফুনা ফিল-মাসাজিদ) থাকবে, ততক্ষণ তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সংগত হবে না। এগুলো আল্লাহর সীমারেখা…” — (২:১৮৭)
যদি ‘আকাফা’ মানে একাকী নির্জনবাস হতো, তবে স্ত্রী-সহবাস নিষেধ করার কোনো যৌক্তিকতা থাকতো না। কারণ নির্জনে তো স্ত্রী এমনিতেই সাথে থাকে না! এই নিষেধাজ্ঞা প্রমাণ করে যে, তৎকালীন সময়ে মানুষজন পরিবার (স্ত্রী-সন্তান) নিয়েই মসজিদের সীমানায় বা আশ্রয়ে বসবাস করত। যেহেতু মসজিদ একটি পাবলিক প্লেস এবং একইসাথে ইবাদতের জায়গা, তাই শিষ্টাচার হিসেবে সিয়ামের রাতগুলোতে সেখানে অবস্থানকালীন সময়ে ‘ঘনিষ্ঠ হওয়া’কে নিষেধ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, ‘আকিফুনা’ শব্দটি বহুবচন এবং এটি নারী-পুরুষ উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে। অর্থাৎ, সেই যুগে নারীরাও পরিবারসহ মসজিদে অবস্থান করতেন। অথচ বর্তমান যুগে সালাতের জন্যও নারীদেরকে মসজিদে জায়গা দেওয়া হয় না।
সারকথা:
কুরআন ‘ইতিকাফ’ নামে আলাদা কোনো ইবাদতের নির্দেশ দেয়নি। কুরআনের ভাষায় ‘আকাফা’ মানে হলো—আল্লাহর ঘরের নিরাপত্তায় (Security) ও আশ্রয়ে (Shelter) বসবাস করা। ইব্রাহিমের যুগে কিংবা পরবর্তী সময়েও এই ঘরগুলো ছিল নারী-পুরুষ সবার জন্য উন্মুক্ত এক আশ্রয়কেন্দ্র, যেখানে মানুষ বিপদে বা ইবাদতের প্রয়োজনে এসে অবস্থান করত।