কুরআন থেকে ইসরা ও মিরাজ

নবিজির মিরাজ বা রাত্রিভ্রমণ সংক্রান্ত যেসকল ঘটনা আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে তার প্রায় পুরোটাই হাদিসের কিতাব থেকে নেয়া, যেই হাদিসগুলো সংকলিত হয়েছিল নবীর যুগের ২০০-২৫০ বছর পর। প্রচলিত হাদিস অনুযায়ী, হিজরতের ১ বছর আগে এক রাতে, জিবরীল এসে নবীকে সশরীরে মক্কা থেকে জেরুজালেম নিয়ে যান। অতঃপর বোরাক নামক গাধাসদৃশ এক প্রাণীর উপর চড়িয়ে নবীকে জেরুজালেম থেকে উর্ধ-জগতে নিয়ে যাওয়া হয়। মক্কা থেকে জেরুজালেম ভ্রমণের অংশটি ‘ইসরা’ এবং জেরুজালেম থেকে স্বর্গভ্রমণের অংশটি ‘মিরাজ’ নামে পরিচিত।

কুরানে নবিজির রাত্রিভ্রমণ সম্পর্কে অল্প কিছু কথা বলা আছে:

[১৭:০১] পবিত্র ও মহীয়ান তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে (মুহাম্মদকে) রাতের বেলা ভ্রমণ করিয়েছেন মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার চারপাশকে আমি কল্যাণময় করেছি। তাকে আমার নিদর্শনাবলী দেখানোর জন্য, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।

[৫৩:১৩] নিশ্চই সে (মুহাম্মদ) তাকে (জিবরীলকে) আরেকবার দেখেছিল
[৫৩:১৪] সিদরাতুল মুনতাহা (শেষসীমার বরই গাছ)-এর নিকট
[৫৩:১৫] যার নিকটে জান্নাতুল মা’ওয়া অবস্থিত
[৫৩:১৬] যখন কুল গাছটিকে যা আচ্ছাদিত করার তা আচ্ছাদিত করেছিল
[৫৩:১৭] তার (মুহাম্মদের) দৃষ্টি বিভ্রম হয়নি, এবং সীমাও অতিক্রম করেনি
[৫৩:১৮] নিশ্চই সে তার প্রতিপালকের বড় বড় নিদর্শন দেখেছিল।

কুরআনের উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়:

১. প্রথমত, কুরআনে কোথাও ‘মিরাজ’ শব্দটি উল্লেখ করা হয়নি। দ্বিতীয়ত, ঘটনাটি সশরীরে ঘটেছে তারও কোনো প্রমাণ নেই। বরং, ১৭:৯৩ আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মানুষ হিসেবে সশরীরে আসমানে আরোহণ নবীর পক্ষে সম্ভব নয় (আরও দেখুন ৬:৩৫)। এবং, যেহেতু ১৭:০১-এ বলা হয়েছে ঘটনাটি রাতের বেলা ঘটেছে, তা থেকে এটাই প্রমাণ হয় যে নবিজি যখন ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলে তখন স্বপ্নের মধ্যে তাঁকে মসজিদ-আল-আক্বসায় নিয়ে যাওয়া হয়।

২. ১৭:০১ আয়াতে “আ’বদিহি” (তাঁর বান্দা) বলতে মুহাম্মদকেই বোঝানো হয়েছে। কুরআনের অন্যান্য আয়াতে মুহাম্মদকে আ’বদিহি (তাঁর বান্দা) বলে অভিহিত করা হয়েছে, যেমন ২:২৩, ৮:৪১, ১৮:০১, ২৫:০১, ৩৯:৩৬, ৫৩:১০, ৫৭:০৯, ৭২:১৯। ১৮ এবং ২৫ নং সুরা দুটিও একইভাবে শুরু হয়েছে।

৩. নবীর যুগে জেরুজালেমে ‘আল-আক্বসা’ নামে কোনো মসজিদ ছিল না। কুরানে খ্রিস্টান ও ইহুদিদের ধর্মীয় উপাসনালয় চার্চ এবং সিনাগগ বোঝাতে ভিন্ন ভিন্ন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে (২২:৪০)। বর্তমানে আমরা জেরুজালেমে ‘আল-আক্বসা’ নামে যে মসজিদ দেখতে পাই সেটি তৈরি হয়েছিল উমাইয়া খলিফা আব্দুল মালিক এর নির্দেশে, নবীর যুগের প্রায় ৬০ বছর পরে। তার চেয়ে বড় কথা হলো, জেরুজালেমে কি আসলেই কল্যাণময় এমন কিছু আছে যে আল্লাহ তাঁর নিদর্শন দেখানোর জন্য নবীকে সেখানে নিয়ে যাবেন? বরং জেরুজালেমের ইতিহাস সেই প্রাচীনকাল থেকেই রক্তপাত আর যুদ্ধ-বিগ্রহে জর্জরিত।

৪. আল-আক্বসা শব্দের আক্ষরিক অনুবাদ হলো – ‘দূরতম সিজদার স্থান’। ‘আক্বসা’ শব্দটি ‘দূরবর্তী’ শব্দের সুপারলেটিভ ডিগ্রি। অর্থাৎ আক্বসা মানে হলে ‘সর্বাধিক দূরবর্তী’। কিন্তু মক্কা থেকে জেরুজালেমের দূরত্ব ১০০০ মাইলেরও কম। তাই ১৭:০১ আয়াতে বর্ণিত মসজিদটি জেরুজালেমের মসজিদ হতে পারে না। বরং, উক্ত আয়াতে ‘মসজিদুল-আক্বসা’ বলতে সপ্তম আকাশে অবস্থিত মসজিদকে বোঝানো হয়েছে, যেটি আমাদের পৃথিবী থেকে সর্বাধিক দূরবর্তী।

৫. ৫৩:১৩-১৪ আয়াত অনুযায়ী নবী জিবরীলকে দ্বিতীয় বার দেখেছিলেন শেষ সীমানার কুল বৃক্ষ (সিদরাতুল মুনাতাহা)-এর নিকটে। প্রথমবার দেখেছিলেন, যখন জিবরীল প্রথম নবীর নিকট ওহী নিয়ে এসেছিলেন (৫৩:১-১২)। অর্থাৎ, নবী তাঁর জীবদ্দশায় জিবরীলকে মাত্র দু’বার তার আসল রূপে দেখেছিল। কিন্তু হাদিসে মিরাজের যেই কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে, সেখানে আমরা দেখতে পাই জিবরীল নবীকে সশরীরে মক্কা থেকে জেরুজালেম এবং জেরুজালেম থেকে উর্ধাকাশে নিয়ে যান। তার মানে, হাদিস অনুযায়ী জিবরীল এই যাত্রার শুরু থেকেই নবীর সাথে ছিলেন – যেটি কুরান-৫৩:১৩ আয়াতের সাথে সাংঘর্ষিক।

৬. হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, পূর্ববর্তী নবী-রাসুলগণ জেরুজালেমে মুহাম্মদের পেছনে নামাজ পড়েন। তারপর আবার নবী মুহাম্মদ, বিভিন্ন আসমানে গিয়ে একেকজন নবীর সাথে পুনরায় সাক্ষাৎ করেন। ব্যাপারটি অদ্ভুত এবং অযৌক্তিক। তাঁরা মুহাম্মদের আগেই উপরে চলে গেলেন কীভাবে? তাছাড়াও, নবী মুহাম্মদ যে বিভিন্ন আসমানে গিয়েছেন এমন কথা কুরানে বলা হয়নি।

৭. এছাড়াও হাদিসের বর্ণনা মতে নবী মিরাজে গিয়ে জান্নাত-জাহান্নামও দেখে এসেছেন। জাহান্নামিদের বিভিন্ন প্রকার শাস্তি পেতে দেখে এসেছেন। একই সাথে মিরাজের ঘটনার মধ্যেই নারীদের জন্য চরম অবমাননাকর সেই হাদিসটি বর্ণনা করা হয়েছে, যে – জাহান্নামিদের অধিকাংশই নারী! অথচ কুরান বলে নবীকে আল্লাহ নিয়ে গিয়েছিলেন শুধুমাত্র তাঁর কিছু নিদর্শন দেখানোর জন্য। ভবিষ্যত কিংবা কে জান্নাতে যাবে, কে জাহান্নামে যাবে দেখানোর জন্য নয়। কুরান থেকে এটাও পরিষ্কার যে পরকালে কার সাথে কি ঘটবে সেই ব্যাপারে নবী কিছুই জানতেন না।
[৪৬:০৯] বলুন, ‘আমি রাসুলদের মধ্যে নতুন নই। আর আমি জানি না, আমার ও তোমাদের ব্যাপারে কী করা হবে; আমি আমার প্রতি যা ওহী করা হয় শুধু তারই অনুসরণ করি। আর আমি তো এক স্পষ্ট সতর্ককারী মাত্ৰ।‘

সারসংক্ষেপ:

  • কোনো এক রাতে নবী যখন ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন তখন তাঁকে স্বপ্নের মধ্যে মসজিদুল-হারাম (মক্কা) থেকে সপ্তম আকাশের মসজিদুল-আক্বসা (দূরতম মসজিদ)-এ নিয়ে যাওয়া হয়, যাতে আল্লাহ তাঁকে কিছু নিদর্শন দেখাতে পারেন।
  • সেই স্বপ্নে তিনি জিবরীলকেও দেখতে পান, সিদরাতুল-মুনতাহার নিকটে, যার নিকটে জান্নাতুল মাওয়া অবস্থিত।
  • নবীকে এই স্বপ্ন/vision দেখানোর উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে পরীক্ষা করা (১৭:৬০)। অর্থাৎ, লোকজন নবীর কথা বিশ্বাস করে কিনা তা যাচাই করা।
    [১৭:৬০] আর যে দৃশ্য (রু’ইয়া) আমি তোমাকে দেখিয়েছি তা কেবল মানুষের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ।
    কুরানে আরো ৩ টি ঘটনার ক্ষেত্রে রু’ইয়া শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছ: ইউসুফ(১২:৫,১২:১০০), রাজা(১২:৪৩) ও ইব্রাহিম(৩৭:১০২)। এবং এর প্রতিটি ক্ষেত্রেই রু’ইয়া শব্দটি স্বপ্ন/vision বোঝায়। এর থেকে পুনরায় নিশ্চিত হওয়া যায় যে নবিজির ইসরার ঘটনাটি স্বপ্নের মধ্যে ঘটেছিল।

এর বাইরে হাদিসে যেসব আজগুবি কথা বর্ণনা করা আছে, যেমন – নবীর হৃৎপিন্ড খুলে পরিষ্কার করা, পাখাওয়ালা গাধা সদৃশ জন্তু ‘বোরাক’, সশরীরে আসমানে যাওয়া, জান্নাত-জাহান্নাম দেখা, কিংবা নামাজের ওয়াক্ত-সংখ্যা নিয়ে আল্লাহর সাথে দর-কষাকষি এগুলো সবই বানোয়াট। এবং, এগুলোর কোনো কুরানিক ভিত্তি নেই।