পুরো বিশ্বের মুসলিমদের মধ্যে একটি বদ্ধমূল ধারণা প্রচলিত আছে যে, পবিত্র কুরআন স্পর্শ করতে বা পাঠ করতে হলে অবশ্যই ওযু অবস্থায় থাকতে হবে। কিন্তু আমরা যদি কুরআনের নিজস্ব বক্তব্য বিশ্লেষণ করি, তবে দেখা যায়—কুরআন পাঠ বা স্পর্শ করার জন্য ওযু কোনো আবশ্যিক শর্ত নয়।
১. ওযুর বিধান ও তার সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্র
কুরআনে ওযুর নিয়ম অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, মহান আল্লাহ এই বিধানটিকে শুধু ‘সালাত’-এর সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। আল্লাহ বলেন:
“হে মুমিনগণ! যখন তোমরা সালাতের জন্য দাঁড়াবে, তখন তোমাদের মুখমণ্ডল ও হাতগুলো কনুই পর্যন্ত ধুয়ে নাও, তোমাদের মাথা এবং পাগুলো টাখনু পর্যন্ত মাসেহ করো…” (৫:৬)
এই আয়াতে আল্লাহ ওযুর হুকুম দিয়েছেন সুনির্দিষ্টভাবে সালাত আদায়ের জন্য। তিনি বলেননি যে, “যখন তোমরা কুরআন পড়বে, তখন ওযু করো”। কুরআনের বিধানদাতা হিসেবে আল্লাহ যদি চাইতেন যে কুরআন স্পর্শ করতে ওযু প্রয়োজন, তবে তিনি এই আয়াতেই বা কুরআনের অন্য কোনো স্থানে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতেন। যেখানে আল্লাহ নিজে কোনো শর্ত আরোপ করেননি, সেখানে নিজেরা কোনো নিয়ম তৈরি করে নেওয়া আল্লাহর বিধানের ওপর বাড়াবাড়ি করার শামিল।
২. সুরা আল-ওয়াকিয়ার আয়াতের প্রকৃত তাৎপর্য
যারা ওযু ছাড়া কুরআন স্পর্শ করা নিষিদ্ধ মনে করেন, তারা সাধারণত সুরা আল-ওয়াকিয়ার একটি আয়াতকে দলিল হিসেবে পেশ করেন। আয়াতটি হলো:
“নিশ্চয়ই এটি এক সম্মানিত কুরআন, যা আছে এক সুরক্ষিত কিতাবে (কিতাবিম মাকনুন); পবিত্রগণ ব্যতীত কেউ তা স্পর্শ করে না।” (৫৬:৭৭-৭৯)
এই অংশের সঠিক ব্যাখ্যা:
- সুরক্ষিত কিতাব: আয়াতে ‘কিতাবিম মাকনুন’ বা লুকায়িত/সুরক্ষিত কিতাবের কথা বলা হয়েছে। এটি আমাদের পৃথিবীতে ছাপানো কাগজের বই বা ‘মুসহাফ’ নয়। এটি সেই মূল ফলক বা ‘লওহে মাহফুজ”— যা কুরআন সহ অন্যান্য সকল আসমানি কিতাবের উৎস।
- ‘মুতাহ্হারুন’ বা পবিত্রগণ: এখানে ‘পবিত্রগণ’ বলতে শারীরিক ওযু করা কোনো মানুষকে বোঝানো হয়নি, বরং ফেরেশতাদের বোঝানো হয়েছে। এর অর্থ হলো—শয়তান বা অপবিত্র কোনো সত্তা এই উম্মুল কিতাবের ধারেকাছেও যেতে পারে না; কেবল নিষ্পাপ ফেরেশতারাই তা স্পর্শ করতে পারে।
৩. প্রযুক্তির ব্যবহার ও যুক্তি
বর্তমান যুগের অধিকাংশ আলেমই বলে থাকেন যে, মোবাইল বা কম্পিউটারে কুরআন পড়তে ওযুর প্রয়োজন নেই। এখন প্রশ্ন হলো—স্ক্রিনে কুরআন স্পর্শ করলে যদি ওযু না লাগে, তবে কাগজে ছাপা কুরআনের ক্ষেত্রে কেন লাগবে? কাগজের মুসহাফ মূলত মানুষেরই তৈরি একটি মাধ্যম, যা আল্লাহর বাণীকে ধারণ করে। তাই মাধ্যমভেদে নিয়মের এরূপ পার্থক্য করা যুক্তিযুক্ত নয়।
৪. কুরআনের সার্বজনীনতা
আল্লাহ কুরআনকে ‘হুদাল্লিন্নাস’ বা সমগ্র মানবজাতির জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এটি কেবল মুসলিমদের জন্য নয়, বরং সত্যসন্ধানী যেকোনো মানুষের জন্য উন্মুক্ত।
যদি কুরআন স্পর্শ করার জন্য ওযু বাধ্যতামূলক করা হয়, তবে একজন অমুসলিম—যিনি ওযুর নিয়ম জানেন না বা মানেন না—তিনি কীভাবে কুরআন পড়ে সত্য জানবেন? আল্লাহর বাণী মানুষের কাছে পৌঁছানোর পথে ওযুর শর্তটি একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অথচ আল্লাহ কুরআনকে করেছেন সহজবোধ্য ও অবারিত।
উপসংহার
কুরআনের আলোকে এ কথা স্পষ্ট যে, সালাত আদায়ের জন্য ওযু ফরজ হলেও কুরআন পাঠ বা স্পর্শ করার জন্য তা ফরজ নয়। কাগজের তৈরি কুরআন স্পর্শ করার জন্য ওযুর বাধ্যবাধকতা মূলত পরবর্তী সময়ে তৈরি হওয়া একটি ফিকহি ধারণামাত্র। আমরা অবশ্যই সম্মানের সাথে কুরআন পড়ব এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার চেষ্টা করব; কিন্তু ওযু না থাকলে কুরআন ছোঁয়া যাবে না—এমন অমূলক ভীতি থেকে মুক্ত থেকে আল্লাহর বাণী বোঝার দিকেই আমাদের বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত।