অধিকাংশ মানুষ মনে করেন যে ইসলামে ছবি আঁকা বা ভাস্কর্য তৈরি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ (হারাম)। কিন্তু কুরআন কী বলে? যদি আমরা কুরআনকে দ্বীনের একমাত্র মানদন্ড হিসেবে গ্রহণ করি তাহলে দেখতে পাবো যে, ভাস্কর্য বা ছবি মৌলিকভাবে কখনোই হারাম নয়; বরং তা কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, সেটাই হালাল বা হারামের বিধান নির্ধারণ করে। যদি কোনো ভাস্কর্য বা ছবিকে পূজা বা উপাসনার বস্তু বানানো হয়, তাহলে সেটি হারাম। কিন্তু তা যদি সৌন্দর্য, জ্ঞান, ইতিহাস বা শিল্পকলা ইত্যাদির অংশ হয়, তাহলে তা বৈধ।
১. ইব্রাহিম-এর ঘটনা
আল্লাহ কুরআনে বলেন:
“আর অবশ্যই আমি এর পূর্বে ইবরাহিমকে তার সঠিক পথের জ্ঞান দিয়েছিলাম এবং আমি তার সম্পর্কে ছিলাম সম্যক অবগত। যখন সে তার পিতা ও তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, ‘এই মূর্তি (তামাসিল)-গুলো কী, যাদের পূজায় তোমরা নিমগ্ন?”—(২১:৫১-৫২)
এখানে আরবি শব্দ ‘তামাসিল’ (تماثيل) ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ ভাস্কর্য বা মূর্তি। নবী ইব্রাহিম তার সম্প্রদায়ের পূজার মূর্তিগুলো সম্পর্কেই প্রশ্ন করেছেন। তিনি কখনো বলেননি যে সব ধরনের ভাস্কর্য তৈরি করা হারাম। বরং তাঁর অবস্থান ছিল সেগুলোর পূজার বিরুদ্ধে।
২. সোলায়মান-এর নির্দেশে ভাস্কর্য নির্মাণ
অন্যদিকে, কুরআনের আরেকটি আয়াতে আমরা দেখতে পাই:
“তারা (জিন জাতি) সোলায়মানের ইচ্ছানুযায়ী তার জন্য প্রাসাদ, ভাস্কৰ্য, হাউজসদৃশ বৃহদাকার পাত্ৰ এবং সুদৃঢ়ভাবে স্থাপিত ডেগ নির্মাণ করত। ‘হে দাউদ পরিবার! কৃতজ্ঞতার সাথে তোমরা কাজ করতে থাক। আর আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পই কৃতজ্ঞ!’”—(৩৪:১৩)
এখানেও একই আরবি শব্দ ‘তামাসিল’ (ভাস্কর্য) ব্যবহৃত হয়েছে। একজন নবী কিভাবে তার জিন বাহিনী দিয়ে ভাস্কর্য তৈরি করাতে পারেন, যদি সেগুলো বানানো হারামই হয়? বরং এটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহর অনুমোদনক্রমেই এই ভাস্কর্যগুলো তৈরি হয়েছিল। সেগুলো ছিল নির্মাণশিল্প ও সৌন্দর্যের অংশ, পূজার বস্তু নয়।
৩. দুই নবীর ঘটনার মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই
- ইব্রাহিম প্রশ্ন করেছেন পূজার মূর্তি সম্পর্কে → তা হারাম।
- সোলায়মান তৈরি করিয়েছেন সৌন্দর্য ও স্থাপত্যের ভাস্কর্য → তা বৈধ।
অতএব, ভাস্কর্য বা ছবি নিজে কখনো হারাম নয়; বরং সেটির পূজা বা আল্লাহর সাথে শরিক করা হারাম।
৪. ‘ভিন্ন দ্বীন’-এর যুক্তি কি কুরআনসম্মত?
অনেকে বলতে চান যে সোলায়মানের যুগে ভাস্কর্য বানানো বৈধ ছিল, কিন্তু মুহাম্মদের সময় থেকে ছবি আঁকা বা ভাস্কর্য বানানো শিরক! তাহলে তাদের দাবি অনুযায়ী ধরে নিতে হবে আল্লাহ একেক নবীর জন্য একেকরকম দ্বীন নির্ধারণ করেছিলেন। কিন্তু কুরআন সম্পূর্ণরূপে তাদের এই দাবির বিরোধিতা করে। আল্লাহ বলেন:
“তিনি তোমাদের জন্য দ্বীনের সেই বিধানই নির্ধারিত করেছেন, যার আদেশ তিনি দিয়েছিলেন নূহকে এবং যা আমি আপনার প্রতি ওহী হিসেবে পাঠিয়েছি; আর যার আদেশ দিয়েছিলাম ইবরাহিম, মূসা ও ঈসাকে— এই মর্মে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করো এবং এ বিষয়ে বিভক্ত হয়ো না।”—(৪২:১৩)
আল্লাহ আরও বলেন:
“আপনাকে কেবল তা-ই বলা হচ্ছে, যা আপনার পূর্ববর্তী রাসূলগণকে বলা হয়েছিল।”—(৪১:৪৩)
অর্থাৎ, সকল নবীর মূল দ্বীন একই। ভাস্কর্য তৈরির ব্যাপারে ভিন্ন নবীর জন্য আইন ভিন্ন হওয়ার কোনো ভিত্তি কুরআনে নেই। ‘একসময় বৈধ ছিল, পরে হারাম হয়েছে’—এটি কেবল পরবর্তী গ্রন্থগুলো (যেমন: হাদিস, তাফসীর ইত্যাদি) থেকে আসা একটি যুক্তি, যা কুরআন সমর্থন করে না।
৫. কুরআনই একমাত্র মানদণ্ড
আল্লাহ কুরআনকে বিস্তারিত ও পরিপূর্ণ গ্রন্থ বলে ঘোষণা করেছেন:
“তবে কি আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে বিচারক হিসেবে তালাশ করব? অথচ তিনিই তোমাদের প্রতি বিস্তারিত কিতাব অবতীর্ণ করেছেন।“—(৬:১১৪)
এছাড়াও আল্লাহ ঈমানদারদেরকে সতর্ক করে বলেছেন:
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ তোমাদের জন্য যেসব পবিত্র বস্তু হালাল করেছেন, সেগুলোকে তোমরা হারাম কোরো না এবং সীমালঙ্ঘন কোরো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না।”—(৫:৮৭)
আরেকটি আয়াতে আল্লাহ আরও কঠোর ভাষায় বলেন:
“তোমাদের জিহ্বা থেকে মিথ্যা উচ্চারিত হয় বলে তোমরা আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করার জন্য বলবে না যে— ‘এটি হালাল এবং এটি হারাম’। নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করে, তারা সফল হবে না।”—( ১৬:১১৬)
এমনকি স্বয়ং নবীকেও সতর্ক করা হয়েছিল যখন তিনি আল্লাহর অনুমতি ছাড়াই কোনো একটি জিনিস নিজের জন্য হারাম বানাতে চেয়েছিলেন:
“হে নবী! আল্লাহ আপনার জন্য যা হালাল করেছেন, আপনি আপনার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি লাভের আশায় তা কেন হারাম করছেন?”—( ৬৬:১)
সুতরাং যেখানে নবী নিজেও আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কিছু হারাম বানাতে পারেন না, সেখানে সাধারণ মুসলিমদের কী অধিকার আছে যে, তারা নিজেরা ছবি বা ভাস্কর্যকে হারাম ঘোষণা করবে, যখন কুরআনে এগুলোর ব্যাপারে কোনো স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা নেই?
৬. বাইবেলে সোলায়মানের ভাস্কর্যের উল্লেখ
অনেকে বলতে চান যে সোলায়মানের ভাস্কর্যগুলো জড়বস্তুর ছিল, মানুষ বা প্রাণীর ছিল না। কিন্তু কুরআনে আমরা দেখতে পাই, ইব্রাহিমের ঘটনায় দেব-দেবীর মূর্তি বোঝাতে যেই শব্দ (তামাসিল) ব্যবহৃত হয়েছে, সোলায়মানের তৈরি ভাস্কর্যের বেলায়ও ঠিক একই শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।
সোলায়মানের তৈরি মূর্তিগুলো যে মানুষ বা প্রাণীরই ছিল—তার সপক্ষে বাইবেলেও কিছু প্রমাণ পাওয়া যায়। ওল্ড টেস্টামেন্টের বর্ণনা অনুযায়ী, সোলায়মান জেরুজালেমের পবিত্র গৃহে দুটি কেরুবিমের ভাস্কর্য নির্মাণ করেছিলেন। কেরুবিম হলো এক ধরনের ডানাওয়ালা স্বর্গীয় সত্ত্বা, যাদেরকে জ্ঞানের দূত বলা হয়। সোলায়মান ভাস্কর্য দুটি টেম্পলের পবিত্রতম স্থানে রেখেছিলেন, আর তাদের ডানা পুরো ঘর জুড়ে বিস্তৃত ছিল। (2 Chronicles 3:10-13)
৭. অন্যান্য বিষয়ে হালাল-হারামের বিধান
কুরআনের এই নীতি শুধু ভাস্কর্য বা ছবির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, বরং গান, চিত্রকলা, সঙ্গীত ইত্যাদি ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। কুরআনে এগুলোর ব্যাপারে স্পষ্ট কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। যেমন:
- কথা বলা সাধারণত হালাল, কিন্তু মিথ্যা বলা হারাম (সূরা হজ্জ, ২২:৩০)।
- খাওয়া-পান করা হালাল, কিন্তু মাদকদ্রব্য হারাম (সূরা মায়িদা, ৫:৯০-৯১)।
- ছবি আঁকা সাধারণভাবে হালাল, কিন্তু যদি তা পূজা বা আল্লাহর অবমাননার উদ্দেশ্যে হয়, তাহলে হারাম।
মূল কথা: কুরআনের নির্দেশনা হলো—আল্লাহ যা নিষেধ করেননি, তা নিজে নিজে হারাম ঘোষণা করা যাবে না। কেবল সীমালংঘন (পূজা, শিরক, অশ্লীলতা ইত্যাদি) থেকে বিরত থাকতে হবে।
৮. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
কুরআনের স্পষ্ট বক্তব্য হলো:
- ভাস্কর্য বা ছবি মৌলিকভাবে কখনো হারাম নয়।
- হারাম তখনই হয়, যখন সেটি পূজা, উপাসনা বা আল্লাহর সাথে শরিক করার বস্তু হয়।
- শিল্প, স্থাপত্য, ইতিহাস, শিক্ষা, সৌন্দর্য ইত্যাদি উদ্দেশ্যে ছবি আঁকা ও ভাস্কর্য তৈরি করা বৈধ।
- কুরআনই হালাল-হারাম নির্ধারণের একমাত্র উৎস। কোনো মানুষ বা দ্বিতীয় কোনো গ্রন্থের ভিত্তিতে এমন কিছু হারাম বলা যাবে না, যা কুরআন হারাম বলেনি।
আল্লাহ কুরআনে বারবার সীমালংঘন থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন, হালাল বস্তুসমূহকে নিজেদের ইচ্ছামতো হারাম করার অনুমতি তিনি দেননি।