হাদিসে বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর ঐতিহাসিক ব্যবচ্ছেদ

কুরআনে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে কিয়ামতের জ্ঞান কেবল আল্লাহরই কাছে নিহিত: “লোকেরা আপনাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে; বলুন, এর জ্ঞান তো কেবল আল্লাহরই কাছে” (সূরা আহযাব: ৬৩)। অথচ হাদিস গ্রন্থগুলোতে কিয়ামতের অসংখ্য ‘আলামত’ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে—যা কুরআনের এই স্পষ্ট ঘোষণার সাথে সাংঘর্ষিক।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ‘কিয়ামতের আলামত’-সংক্রান্ত অধিকাংশ হাদিসই প্রকৃতপক্ষে পরবর্তী যুগের বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা অথবা বিভিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনার সাধারণ পর্যবেক্ষণ মাত্র। বাস্তবতা হলো হাদিসগুলো সংকলিত হয়েছে নবীর মৃত্যুর ২০০-২৫০ বছর পর। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা দেখতে পাই যে কিছু নির্দিষ্ট ঘটনা ঘটে যাওয়ার অনেক পরে সেগুলোকে ভবিষ্যদ্বাণীরূপে হাদিসগ্রন্থগুলোতে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে এমন ঘটনার ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে যে ঘটনা আসলে প্রাচীনকাল থেকেই সর্বযুগেই নিয়মিতভাবে ঘটে আসছে। এছাড়াও হাদিস গ্রন্থে পরস্পর সাংঘর্ষিক অনেক ভবিষ্যদ্বাণীর বর্ণনাও পাওয়া যায়। আবার এমনও অনেক ভবিষ্যদ্বাণী পাওয়া যায় যেগুলো সুস্পষ্টভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। আমরা যদি নিরপেক্ষভাবে ইসলামের ইতিহাস বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখতে পাই এই ভবিষ্যদ্বাণী সংক্রান্ত হাদিসগুলোর অধিকাংশই তৈরি করা হয়েছিল তৎকালীন বিভিন্ন রাজনৈতিক, গোষ্ঠীগত ও মতাদর্শিক এজেন্ডাকে সামনে রেখে।

১. খোরাসানের কালো পতাকাবাহী দল

হাদিস: সুনান ইবনে মাজাহ (হাদিস নং ৪০৮৪) এবং মুসনাদ আহমাদ (হাদিস নং ২২৩৭)-এ বলা হয়েছে, যখন খোরাসানের দিক থেকে কালো পতাকাবাহী দল আসবে, তখন বরফের ওপর হামাগুড়ি দিয়ে হলেও তাদের সাথে যোগ দিতে বলা হয়েছে, কারণ তাদের মধ্যে আল্লাহর খলিফা মাহদী থাকবে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: সাধারণ মানুষ এই হাদিসটি পড়ে বিশ্বাস করে যে, শেষ জামানায় খোরাসান (বর্তমান আফগানিস্তান ও তৎসংলগ্ন এলাকা) থেকে একটি ইসলামী সৈন্যদল কালো পতাকা নিয়ে বের হবে এবং তারা বিশ্বজুড়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করবে। অনেক আধুনিক তরুণ এই দলটিকে ইমাম মাহদীর দল হিসেবে স্বপ্ন দেখে। কিন্তু ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, হাদিসটি ছিল সুনির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার ফসল। ১৩২ হিজরিতে (৭৫০ খ্রিস্টাব্দ) উমাইয়াদের বিরুদ্ধে আব্বাসীয়রা যখন বিদ্রোহ করে, তখন সেই বিপ্লবের প্রধান সেনাপতি ছিলেন আবু মুসলিম খোরাসানি। তার বাহিনীর প্রতীক ছিল কালো পতাকা এবং তারা খোরাসান থেকেই যাত্রা শুরু করেছিল। আব্বাসীয়রা নিজেদের ক্ষমতা দখলের আন্দোলনকে ধর্মীয় বৈধতা দেওয়ার জন্য এই ভবিষ্যদ্বাণীটি প্রচার করে। এই ঐতিহাসিক ঘটনার প্রায় ১০০-১৫০ বছর পর যখন হাদিস গ্রন্থগুলো সংকলিত হয়, ততদিনে তৎকালীন শাসকের রাজনৈতিক এজেন্ডায় তৈরি হওয়া এই কথাগুলো নবীজির হাদিস হিসেবেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল।

২. মাহদীর নাম হবে নবীর নামে

হাদিস: সুনান আবু দাউদ (হাদিস নং ৪২৮২) এবং তিরমিজি (হাদিস নং ২২৩০) তে উল্লেখ আছে, দুনিয়া ধ্বংস হবে না যতক্ষণ না নবীর পরিবারের একজন মানুষ আরবের শাসক হয়, যার নাম নবীর নামের সাথে এবং যার পিতার নাম নবীর পিতার নামের সাথে মিলে যাবে (অর্থাৎ মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ)।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: মুসলিমরা বিশ্বাস করে যে, শেষ জামানায় মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ নামক এক মহান নেতার আবির্ভাব ঘটবে যিনি হবেন প্রতিশ্রুত মাহদী এবং তিনি পৃথিবীতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন। প্রকৃতপক্ষে এই হাদিসটির উৎপত্তিও একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক সংঘাতের ফলাফল। ১৪৫ হিজরিতে (৭৬২ খ্রিস্টাব্দ) আব্বাসীয় খলিফা আল-মানসুরের বিরুদ্ধে মদিনায় হযরত আলীর বংশধররা এক বিশাল বিদ্রোহ করে। এই বিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিলেন মুহাম্মদ নামক এক ব্যক্তি, যার পিতার নামও ছিল আব্দুল্লাহ (যিনি ইতিহাসে ‘আন-নাফস আজ-জাকিয়াহ’ নামেও পরিচিত)। তার সমর্থকরা সাধারণ মানুষকে নিজেদের দলে টানতে এবং তাকে ‘মাহদী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে এই হাদিসটি তৈরি করে প্রচার করেছিল। যদিও আব্বাসীয় বাহিনীর হাতে তিনি নির্মমভাবে নিহত হন এবং তার বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়, কিন্তু তার সমর্থকদের বানানো এই “ভবিষ্যদ্বাণী” পরবর্তীতে হাদিস সংকলনের যুগে হাদিসের কিতাবগুলোতে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায়।

৩. আম্মার ইবনে ইয়াসিরের মৃত্যু

হাদিস: সহিহ বুখারি, হাদিস নং ২৮১২ অনুসারে, রাসুল (সা.) আম্মার ইবনে ইয়াসিরকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন যে, একটি বিদ্রোহী দল তাকে হত্যা করবে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ৩৭ হিজরিতে (৬৫৭ খ্রিস্টাব্দ) সিফফিনের যুদ্ধে মুসলিমরা আলী এবং মুয়াবিয়ার পক্ষে দুটি বড় দলে বিভক্ত হয়ে যায়। আম্মার ইবনে ইয়াসির আলীর পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে নিহত হন। যুদ্ধরত অবস্থায় আলীর সমর্থকরা মুয়াবিয়ার দলকে “বিদ্রোহী” প্রমাণ করার জন্য এই কথাটি মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে প্রচার করে। মূলত যুদ্ধের ময়দানে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল এবং নিজেদের দলকে সত্যের পথে প্রমাণ করার জন্য কথাটি রাসুলের নামে যুক্ত করা হয়েছিল, যা হাদিস সংকলনের যুগে (প্রায় ২০০ বছর পর) প্রামাণ্য রূপ পায়। তাই এটি কোনো ভবিষ্যদ্বাণী হতে পারে না, বরং এটি হলো মুসলিমদের মধ্যে গৃহযুদ্ধের ফলে সৃষ্টি হওয়া রাজনৈতিক মেরুকরণের দলিল।

৪. তুর্কিদের সাথে যুদ্ধ

হাদিস: সহিহ বুখারি (হাদিস নং ২৯২৮)-তে বলা হয়েছে, কিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না মুসলিমরা এমন এক জাতির সাথে যুদ্ধ করে যাদের জুতো হবে পশমের, চোখ হবে ছোট, নাক হবে চ্যাপ্টা ও মুখমণ্ডল হবে পেটানো ঢালের মতো।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: আধুনিক স্কলাররা এটিকে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মুসলিম বিশ্বের ওপর মোঙ্গল বা তাতার আক্রমণের ভবিষ্যদ্বাণী বলে দাবি করেন। কিন্তু ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, উমাইয়া খিলাফতের সময়ই (হিজরি প্রথম শতকের শেষে এবং দ্বিতীয় শতকে) আরবরা ট্রান্সঅক্সিয়ানা বা মধ্য এশিয়ায় অভিযান চালায় এবং সেখানে তুর্কি উপজাতিদের সাথে ক্রমাগত যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এই তুর্কি যাযাবরদের শারীরিক গঠনই ছিল ছোট চোখ ও চ্যাপ্টা নাকের। নবম শতাব্দীতে ইমাম বুখারি যখন হাদিস সংকলন করছেন, তারও ১০০-১৫০ বছর আগে থেকেই আরবরা এই জাতির সাথে যুদ্ধ করে আসছিল। সুতরাং, এটি মোটেও ভবিষ্যতের কোনো খবর ছিল না, বরং তাদের সমসাময়িক যুদ্ধের অভিজ্ঞতারই একটি বাস্তব প্রতিফলন ছিল।

৫. বসরা আক্রমণ: কান্তুরা গোত্রের অভিযান

হাদিস: সুনান আবু দাউদ (হাদিস নং: ৪৩০৬) সহ বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে, চওড়া মুখমণ্ডল ও ছোট চোখবিশিষ্ট ‘বনু কান্তুরা’ দজলা নদীর তীরে বা বসরার নিকটবর্তী অঞ্চলে অবতরণ করবে। অতঃপর তারা মুসলিমদের শহর বসরা আক্রমণ করবে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: এই হাদিসটিকেও অনেকসময় ত্রয়োদশ শতকে মঙ্গলদের বাগদাদ আক্রমণের ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে চালানো হয়। যদিও হাদিসে উল্লেখিত শহরটি হলো বসরা, বাগদাদ নয়। হাদিস সংকলনের যুগে আব্বাসীয় খিলাফতকাল এবং তার পূর্বেও বসরা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। সে সময় তুর্কি দাস ও সৈন্যদের সামরিক প্রভাব ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল এবং তুর্কি যাযাবরদের বিভিন্ন অঞ্চলে অতর্কিত হামলা চালানোর ঐতিহাসিক বাস্তবতা বিদ্যমান ছিল। ৮৬১ থেকে ৮৭০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে বলা হয় “Anarchy at Samarra” বা সামাররার নৈরাজ্য। এ সময় তুর্কি সৈন্যরা নিজেদের ইচ্ছা মতো খলিফাদের হত্যা করত, সিংহাসনে বসত এবং সাধারণ মানুষের ওপর চরম নিপীড়ন চালাত। তুর্কি বাহিনীর এই দৌরাত্ম্য, বসরার মতো শহরগুলোতে তাদের লুটতরাজ এবং সাধারণ আরবদের অসহায়ত্বের বাস্তব চিত্রটিই হাদিসে ‘বনু কান্তুরার আক্রমণ’ হিসেবে উঠে এসেছে। আব্বাসীয় খিলাফতের পতনের যুগে তুর্কি মামলুক বাহিনীর দ্বারা সৃষ্ট রাজনৈতিক ও সামরিক নৈরাজ্যকে ব্যাখ্যা করার জন্যই তৎকালীন সমাজে এই কথাগুলো রাসুল-এর নামে প্রচারিত হয়েছিল এবং পরে তা হাদিস গ্রন্থে স্থান পায়।

৬. কনস্ট্যান্টিনোপল (ইস্তাম্বুল) বিজয়

হাদিস: সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৯২০ এ বলা হয়েছে, কিয়ামতের আগে মুসলিমরা কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয় করবে কোনো অস্ত্র বা তলোয়ার ব্যবহার না করেই; তারা শুধু “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এবং “আল্লাহু আকবার” বলবে, আর শহরের দেয়াল ধসে পড়বে, এবং এরপরই দাজ্জাল আসবে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: অনেকেই মনে করেন ১৪৫৩ সালে সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ কর্তৃক ইস্তাম্বুল বিজয় ছিল এই হাদিসের আংশিক বাস্তবায়ন, এবং ভবিষ্যতে হয়তো আবারও এই শহরে কোনো অলৌকিক বিজয় অর্জিত হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, উমাইয়া খিলাফতের শুরু থেকেই কনস্ট্যান্টিনোপল দখল করা ছিল মুসলিমদের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। ৬৭৪-৬৭৮ খ্রিস্টাব্দে এবং ৭১৭-৭১৮ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়ারা সর্বশক্তি দিয়ে দুইবার শহরটি অবরোধ করেও বাইজেন্টাইনদের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। বাইজেন্টাইনদের গ্রিক ফায়ার এবং বুলগেরিয়ান সৈন্যদের আক্রমণে উমাইয়াদের নৌবাহিনী ও সেনাবাহিনী ধ্বংস হয়ে যায়। লাখো মুসলিম সৈন্য অনাহার ও মহামারিতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। পরপর দুটি বিশাল সামরিক বিপর্যয়ের পর সৈন্যদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে এবং নিজেদের সামরিক ব্যর্থতার হতাশা কাটাতে তৎকালীন সময়ে শেষ জামানার রূপকথার আশ্রয় নেওয়া হয়। প্রচার করা হয় যে, কষ্ট করে যুদ্ধ করতে হবে না, শুধু তাকবির দিলেই জাদুর মতো দেয়াল ধসে পড়বে। বাস্তবতা হলো, ১৪৫৩ সালে অটোমানরা যখন শহরটি দখল করে, তখন তা কোনো “তাকবির” দিয়ে জাদুকরীভাবে জয় করা হয়নি, বরং যুগের সবচেয়ে অত্যাধুনিক কামান ব্যবহার করে দেয়াল ধ্বংস করা হয়েছিল, এবং এই যুদ্ধে প্রচুর রক্তপাতও হয়েছিল। তাছাড়া, বিজয়ের পর দাজ্জাল আসা বা কিয়ামত হওয়া—কোনোটিই ঘটেনি। এর থেকেই বোঝা যায় হাদিসটি উমাইয়াদের ছিল চরম হতাশা থেকে জন্ম নেওয়া একটি রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রোপাগান্ডা।

৭. হিজাজের অগ্ন্যুৎপাত

হাদিস: সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৭১১৮ তে উল্লেখ আছে, কিয়ামত হবে না যতক্ষণ না হিজাজ (মক্কা-মদিনা অঞ্চল) থেকে এমন এক আগুন বের হবে, যা সিরিয়ার বুসরা শহরের উটগুলোর গলা আলোকিত করে দেবে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: আধুনিক স্কলাররা মনে করেন ১২৫৬ খ্রিস্টাব্দে মদিনার অদূরে ঘটে যাওয়া আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতই হলো সেই প্রতিশ্রুত অলৌকিক আগুন, যা হাদিসের নির্ভুল প্রমাণ। কিন্তু বাস্তবতা হলো ভূতাত্ত্বিকভাবে মদিনা শহরটি একটি আগ্নেয়গিরি অঞ্চলের (Volcanic field বা হাররাহ) ওপর অবস্থিত। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ৬৪০ খ্রিস্টাব্দের দিকে (খলিফা ওমরের শাসনামলে) মদিনার নিকটবর্তী হাররাত উওয়াইরিদ অঞ্চলে একটি ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাত হয়েছিল, যা তৎকালীন বেদুঈনরা স্বচক্ষে দেখেছিল। অর্থাৎ, রাসুল এর ওফাতের মাত্র কয়েক বছর পরই স্থানীয়রা এই প্রাকৃতিক দুর্যোগটি দেখেছিল। মদিনার মানুষ খুব ভালো করেই জানত যে তারা একটি আগ্নেয়গিরিপ্রবণ এলাকার ওপর বসবাস করছে এবং সেখানে মাটি ফুঁড়ে আগুন বের হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক। পরবর্তীতে যখন হাদিস সংকলন করা হয়, তখন ৬৪০ খ্রিস্টাব্দের এই চেনা অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনাটিকেই “কিয়ামতের আলামত” বা ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। ১২৫৬ খ্রিস্টাব্দে যখন সেখানে পুনরায় ‘হাররাত রাহাত’-এ অগ্ন্যুৎপাত হয়, তখন ইমাম নববীর মতো স্কলাররা ভেবেছিলেন ভবিষ্যদ্বাণী মিলে গেছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি কোনো গায়েবী ভবিষ্যদ্বাণী ছিল না, বরং মদিনার ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের কারণে ঘটা একটি সাধারণ প্রাকৃতিক চক্রের লিখিত রূপমাত্র।

৮. জেরুজালেম বিজয়, মহামারী ও ধন-সম্পদ

হাদিস: সহীহ বুখারীর ৩১৭৬ নং হাদিসে আওফ ইবন মালিক থেকে বর্ণিত, কিয়ামতের পূর্বের ৬টি আলামত হলো: ১. তাঁর মৃত্যু, ২. বায়তুল মুকাদ্দাস (জেরুজালেম) বিজয়, ৩. বকরির মহামারীর মতো এক মহামারী, ৪. সম্পদের প্রাচুর্য, ৫. এমন ফিতনা যা আরবের প্রতিটি ঘরে প্রবেশ করবে, এবং ৬. বনু আসফারের (রোমান/বাইজেন্টাইন) সাথে চুক্তি ও যুদ্ধ।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: আধুনিক যুগের অনেক মুসলিম এই হাদিসটিকে ইসলামের ভবিষ্যৎ বিজয়ের এক নিখুঁত অলৌকিক ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে মনে করেন। কিন্তু ইতিহাসের টাইমলাইন মেলালে দেখা যায়, এই সবগুলো ঘটনা হাদিস সংকলনের বহু আগেই ঘটে গিয়েছিল। ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে খলিফা ওমর-এর আমলে জেরুজালেম বিজয় সম্পন্ন হয়। ঠিক তার দুই বছর পর, ৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে সিরিয়ার ‘আমওয়াস’-এ এক ভয়াবহ প্লেগ বা মহামারী দেখা দেয়, যাতে আবু উবায়দাসহ হাজার হাজার সাহাবী মারা যান। খলিফা ওমর ও ওসমানের শাসনামলে (৬৩৪-৬৫৬ খ্রি.) ব্যাপক বিজয়ের ফলে গনিমত হিসেবে আরবে সম্পদের পাহাড় জমে যায়। আর ‘ফিতনা’ বলতে মূলত ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে খলিফা ওসমান-এর হত্যাকাণ্ডের পর শুরু হওয়া ইসলামের “প্রথম ফিতনা” বা প্রথম গৃহযুদ্ধকে বোঝানো হয়, যা আরবের প্রতিটি ঘরে বিভেদ তৈরি করেছিল। ইমাম বুখারী যখন ৯ম শতাব্দীতে এই হাদিসটি সংকলন করছেন, ততদিনে এই ঘটনাগুলো ২০০ বছরের পুরনো ইতিহাস!

৯. নারীদের পোশাক ও খোঁপার ফ্যাশন

হাদিস: সহীহ মুসলিমের ২১২৮ নং হাদিসে বলা হয়েছে, কিয়ামতের আগে এমন এক শ্রেণীর নারী দেখা যাবে, যাদেরকে নবী দেখেননি, তারা “পোশাক পরেও নগ্ন থাকবে” (কাসিয়াতুন আরিয়াতুন)। তাদের মাথার চুলের অবস্থা হবে উটের কুঁজের মতো।

ঐতিহাসিক বাস্তবতা: বর্তমান যুগে এই হাদিসটি প্রায়শই নারীদের আধুনিক, বডি-ফিটিং বা পশ্চিমা পোশাকের সাথে মিলিয়ে ‘কিয়ামতের আলামত’ হিসেবে প্রচার করা হয়। এমনকি সাধারণ শাড়ি বা ওড়না ছাড়া কোনো পোশাক পরলেও অনেক সময় নারীদের এই হাদিস শুনিয়ে জাহান্নামের ভয় দেখানো হয়।

কিন্তু ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতায় পুরুষদের মতো নারীদেরও স্বল্প পোশাক পরা অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি বিষয় ছিল। এটি কোনো নির্দিষ্ট যুগের বা ধর্মের অবক্ষয় ছিল না, বরং আবহাওয়া, সংস্কৃতি ও সহজ চলাচলের প্রতিফলন ছিল। প্রাচীন মিশরের গরম আবহাওয়ায় নারীরা অত্যন্ত হালকা লিনেন কাপড়ের পোশাক পরতেন। সাধারণ নারী থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত—অনেকেরই পোশাকে পেট, পিঠ বা শরীরের উপরিভাগ উন্মুক্ত থাকত। একইভাবে প্রাচীন ভারতের অজন্তা-ইলোরার ভাস্কর্যগুলোতে দেখা যায়, নারীরা শাড়ি বা ধুতির মতো পোশাক পরতেন এবং তাদের পেট ও কোমর অনাবৃত থাকতো। অর্থাৎ, নারীদের শরীরের বিভিন্ন অংশ উন্মুক্ত রাখার এই ইতিহাস আধুনিক যুগের নয়, বরং হাজার হাজার বছর ধরেই প্রচলিত ছিল। অথচ হাদিসে দাবি করা হচ্ছে, নারীদের এমন পোশাক কেবল কিয়ামতের আগেই দেখা যাবে!

এমনকি ইসলামপূর্ব আরবেও পোশাক সংস্কৃতি সম্পূর্ণ আবৃত ছিল না। প্রাক-ইসলামী আরবের নারীরা ‘দিরা’ নামক এক ধরনের লম্বা টিউনিক পরতেন। এই জামার গলার দিকের কাটা অংশটি বেশ প্রশস্ত ও গভীর হতো, যা নারীদের বক্ষদেশের উপরিভাগকে উন্মুক্ত রাখত। এছাড়া পার্শ্ববর্তী পারস্য সাম্রাজ্যের নারীরাও পেট এবং পিঠ উন্মুক্ত রাখা অত্যন্ত পাতলা পোশাক পরতেন, যা আরবদের কাছে মোটেও অপরিচিত ছিল না। এখন প্রশ্ন হলো—হাদিসে বলা হয়েছে, “এমন নারীদের নবী কখনো দেখেননি”, অথচ নবীর যুগেই খোদ আরব ও নিকটবর্তী অঞ্চলের নারীদের মধ্যেই এরূপ রিভিলিং পোশাক পরার প্রচলন ছিল।

মূলত ইসলাম গ্রহণের পরও আরবের সব নারীর পোশাক রাতারাতি পাল্টে যায়নি। পোশাকের ধরন মূলত সাংস্কৃতিক, যা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়। উমাইয়া যুগে যখন মুসলিম সাম্রাজ্য বিস্তৃত হতে শুরু করে, তখন থেকেই মুসলিম সমাজে পারস্য ও বাইজেন্টাইন সংস্কৃতির বিপুল প্রভাব পড়তে থাকে। পরবর্তীতে আব্বাসীয় খিলাফতের সময় বসরা, কুফা বা বাগদাদের মতো শহরগুলোর অভিজাত মুসলিম নারীরা পারস্যের প্রভাবে অত্যন্ত খোলামেলা ও বিলাসবহুল ফ্যাশনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন।

মধ্যযুগীয় ইসলামি পোশাকের ওপর লেখা প্রখ্যাত গবেষক ইয়েদিদা স্টিলম্যান এবং দশম শতাব্দীর পণ্ডিত ইবনে আল-ওয়াশশার ‘কিতাবুল মুওয়াশশা’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, সেসময় বাগদাদের মুসলিম নারীরা অত্যন্ত দামী, পাতলা ও স্বচ্ছ সিল্কের কাপড় পরতেন। এই কাপড় এতোটাই সূক্ষ্ম ছিল যে, তার ভেতর দিয়ে নারীদের ত্বকের রঙ, পেট এবং শরীরের গঠন স্পষ্ট দেখা যেত। ইবনে আল-ওয়াশশা আরও উল্লেখ করেন, বাগদাদের মুসলিম নারীরা তাদের পোশাকের উপর শক্ত করে ‘মিনতাকা’ (কোমরবন্ধনী) বাঁধতেন, যা তাদের শরীরের গঠন স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলতো।

আবুল ফারাজ আল-ইস্পাহানির ঐতিহাসিক বিশ্বকোষ ‘কিতাব আল-আগানি’-তে বাগদাদের গায়িকা ও অভিজাত নারীদের যে বর্ণনা পাওয়া যায়, সেখানে দেখা যায় তারা ডিপকাট (গলার নিচের অংশ উন্মুক্ত থাকে এমন) পোশাক পরতেন যাতে গলার হার দৃশ্যমান থাকে এবং আর্মলেট (বাহুতে পরিহিত একধরনের অলংকার) দৃশ্যমান রাখতে তারা স্বচ্ছ ওপেনস্লিভ পোশাক পরতেন। অর্থাৎ, নারীরা শরীরের যেসব অংশে অলংকার ব্যবহার করতেন, সেসব অংশ দৃশ্যমান রাখাটা খুবই সাধারণ বিষয় ছিল। সুতরাং, বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা থেকে দেখা যাচ্ছে হাদিস সংকলনের পূর্বযুগেই মুসলিম নারীদের মধ্যে এমন রিভিলিং ও বডি-ফিটিং পোশাক পরাটা আভিজাত্য এবং সৌন্দর্যের মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল।

হাদিসে বর্ণিত “উটের কুঁজ” বিষয়টিও কোনো গায়েবি ভবিষ্যদ্বাণী ছিল না। আব্বাসীয় খলিফা আল-মাহদীর কন্যা রাজকুমারী উলাইয়া বিনতে আল-মাহদীর কপালে একটি দাগ ছিল। সেই দাগ ঢাকার জন্য তিনি ‘বুকি’ নামক রেশমি প্যাড, সুগন্ধি ও কৃত্রিম চুল ব্যবহার করে মাথার সামনের দিকের চুলগুলোকে অনেক উঁচুতে গম্বুজের মতো বাঁধতে শুরু করেন। ইতিহাসে এই ফ্যাশনটি ‘আল-উলাইয়্যিয়া’ স্টাইল নামে পরিচিতি পায়। রাজকুমারীর এই স্টাইলটি বাগদাদের উচ্চবিত্ত নারীদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। মহিলারা যখন মাথার একদম ওপরে বাঁধা এই বিশাল উঁচু খোঁপা নিয়ে হাঁটতেন, তখন তা উটের পিঠের জোড়া কুঁজের মতোই হেলেদুলে উঠত। রাজপ্রাসাদের এই নতুন ফ্যাশনটিকেই হাদিসে হুবহু “উটের কুঁজ” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

এই বিবর্তনশীল ফ্যাশনের বিরুদ্ধেই মূলত রক্ষণশীল আলেমদের তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল। মরক্কোর প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ফাতেমা মেরনিসি তার ‘The Veil and the Male Elite’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে নারীরা জনজীবনে অনেক স্বাধীন ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে মরুভূমির কঠোর ও সাধারণ জীবনযাপন থেকে আসা রক্ষণশীল আলেমরা হঠাৎ গড়ে ওঠা শহরের এই বিলাসবহুল ফ্যাশন মেনে নিতে পারেননি। “পোশাক পরেও নগ্ন” থাকার হাদিসটি মূলত আব্বাসীয় যুগে মুসলিম নারীদের বিলাসবহুল ও খোলামেলা ফ্যাশনের প্রতি রক্ষণশীল আলেমদের তীব্র অসন্তোষের একটি লিখিত রূপ। পোশাকের “শালীনতা” কোনো স্থির বিষয় নয়; এটি সময়, স্থান, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সাথে পরিবর্তিত হয়। হাদিসের এই বর্ণনাটি নারীবিদ্বেষ বা ফ্যাশনের প্রতি আক্রোশের একটি ঐতিহাসিক দলিল, যা পরবর্তীতে কিয়ামতের আলামত হিসেবে সমাজের সাধারণ নারীদের নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে পরিণত হয়।

১০. বাদ্যযন্ত্রের প্রসার

হাদিস: সহীহ বুখারীর ৫৫৯০ নং হাদিসে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে এমন একদল মানুষ আসবে যারা ব্যভিচার, রেশমি পোশাক, মদ এবং বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: অনেক মুসলিম হাদিসটিকে বর্তমান যুগের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি বা পপ কালচারের ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে ধরে নেয়। কিন্তু এটি মূলত ছিল উমাইয়া ও বিশেষ করে আব্বাসীয় খিলাফতের রাজদরবারের বিনোদন সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একটি মতাদর্শিক অবস্থান। ৮ম ও ৯ম শতাব্দীতে বাগদাদ, বসরা ও দামেস্কের রাজপ্রাসাদগুলো গান ও বাদ্যযন্ত্রে (যেমন: উদ, বীণা) মুখরিত থাকত। খলিফা ও অভিজাত শ্রেণী বিনোদনে মত্ত হয়ে পড়েছিলেন। ‘কিতাব আল-আগানি’ পড়লে দেখা যায় সে যুগে কীভাবে বাদ্যযন্ত্র সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছিল। আর উমাইয়া ও আব্বাসীয় রাজপ্রাসাদে মদপান বা রেশমি পোশাক পরা খুবই সাধারণ বিষয় ছিল। তৎকালীন আলেম সমাজ এই সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তারা এই আকস্মিক বিনোদন ও বাদ্যযন্ত্রের বিস্তারকে ঠেকাতে এবং একে অনৈসলামিক প্রমাণ করতে একে “কিয়ামতের আলামত” ও “হারাম” ঘোষণা করে হাদিস প্রচার করেন। এটি ভবিষ্যতের কোনো খবর ছিল না, বরং সমসাময়িক রাজকীয় সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একটি ধর্মীয় প্রতিরোধ ছিল।

১১. হাদিস অস্বীকার ও ‘কুরআনই যথেষ্ট’ মনে করা

হাদিস: সুনান আবু দাউদ (৪৬০৪) ও তিরমিজি (২৬৬৪)-তে বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি আরামদায়ক আসনে হেলান দিয়ে বসবে এবং বলবে, “আমাদের ও তোমাদের জন্য আল্লাহর কিতাবই যথেষ্ট, কেবল এতে যা হালাল তা মানব আর যা হারাম তা বর্জন করব।” অতঃপর রাসুল সবাইকে সাবধান করে দিয়ে বলেন, তিনি যা হারাম ঘোষণা করেছেন তা আল্লাহ কর্তৃক হারাম করার মতোই।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: বর্তমান যুগে অনেকেই মনে করেন এটি ১৯শ-২০শ শতকের আধুনিক ‘কুরআন অনলি’ বা ‘কুরানিস্ট’ আন্দোলনের ভবিষ্যদ্বাণী। কিন্তু এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। হিজরি ২য় ও ৩য় শতাব্দীতে (৮ম-৯ম খ্রি.) ইসলামি বিশ্বে ‘আহলুল কালাম’ বা যুক্তিবাদীদের (যেমন: মুতাযিলা) উত্থান ঘটে। তারা অনেক হাদিসের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং কেবল কুরআনকে দ্বীনের ভিত্তি হিসেবে ধরার কথা বলেন। এর বিপরীতে ইমাম শাফিইর মতো আলেমরা হাদিসকে আইনের দ্বিতীয় অকাট্য উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক লড়াই শুরু করেন। এছাড়াও মুতাযিলাদের বহু আগে খোলাফায়ে রাশেদিন, খারেজি সম্প্রদায় এবং ইমাম আবু হানিফার প্রথমদিককার অনুসারীরাও ছিলেন কুরআন-কেন্দ্রিক ও হাদিস বিরোধী। ইমাম শাফিই এবং তার অনুসারী হাদিস সংকলকদের এই মতাদর্শিক লড়াইকে বৈধতা দেওয়ার জন্যই এই হাদিসটি তৈরি করা হয়। যুক্তিবাদীদের পরাস্ত করতে এবং হাদিস অস্বীকারকারীদের আগেই ‘পথভ্রষ্ট’ প্রমাণ করার জন্য এই কথাগুলোকে রাসুলের ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে হাদিসের কিতাবে সংকলন করা হয়। তাছাড়া হাদিসটিতে বলা হয়েছে, রাসুল যা হারাম করেন তা আল্লাহ হারাম করার মতোই, যা সরাসরি কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক একটি ধারণা (সূরা ৬৬, আয়াত ১)।

১২. বেদুইনদের উঁচু ভবন নির্মাণের প্রতিযোগিতা

হাদিস: সহীহ মুসলিমের ৮ নং হাদিসে (জিবরীলের হাদিস) বলা হয়েছে, খালিপায় ও বস্ত্রহীন মেষপালকরা যখন উঁচু ভবন নির্মাণের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে, তখন তা হবে কিয়ামতের আলামত।

ঐতিহাসিক বাস্তবতা: আধুনিক অ্যাপোলজিস্টরা একে দুবাইয়ের ‘বুর্জ খলিফা’ বা মক্কার ‘ক্লক টাওয়ার’ নির্মাণের ভবিষ্যদ্বাণী বলে দাবি করেন। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, দরিদ্র যাযাবরদের ধনী হয়ে দালানকোঠা বানানো একটি চিরন্তন ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। ইসলাম আসার বহু আগেই ইয়েমেনে আরবরা ২০ তলা উঁচু ‘গুমদান রাজপ্রাসাদ’ নির্মাণ করেছিল। অর্থাৎ, উঁচু ভবন নির্মাণের ইতিহাস আরবদের মধ্যে ইসলামের আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। এছাড়াও ৭ম শতকে ইসলামি বিজয়ের পর যখন দরিদ্র বেদুইন আরবরা পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের বিপুল ধনসম্পদ লাভ করল, তখন তারা দামেস্ক, বাগদাদ, কর্ডোবায় রাতারাতি বিশাল সব প্রাসাদ ও উঁচু স্থাপনা তৈরি করা শুরু করে। এটি সমাজবিজ্ঞানের একটি সাধারণ সূত্র—ক্ষমতা ও সম্পদের স্থানান্তর ঘটলে যাযাবর জাতিগুলো দ্রুত নগরায়ন করে ও আভিজাত্য দেখাতে বড় ভবন বানায়। হাদিস সংকলনের যুগে যখন মরুভূমির আরবরা বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী হয়ে প্রাসাদ নির্মাণের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, তখন ওই সমসাময়িক আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনকেই হাদিসে রূপক ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়।

১৩. ভূমিকম্প ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় বৃদ্ধি

হাদিস: সহীহ বুখারীর ১০৩৬ নং হাদিসে আছে, কিয়ামত আসবে না যতক্ষণ না ভূমিকম্পের আধিক্য দেখা দেয়।

বাস্তবতা: বর্তমানের অনেক মানুষ সামান্য ভূমিকম্প হলেই একে কিয়ামতের আলামত মনে করে। কিন্তু পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস প্রমাণ করে যে, ভূমিকম্প বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ সব যুগেই প্রায় সমান মাত্রায় ছিল। মধ্যপ্রাচ্য, ইরান বা সিরিয়া অঞ্চল এমনিতেই টেকটোনিক প্লেটের ফাটলে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে প্রাচীনকাল থেকেই নিয়মিত ভূমিকম্প হতো। যেকোনো যুগের মানুষই দুর্যোগের সময় মনে করে যে, তাদের সময়েই সবচেয়ে বেশি দুর্যোগ হচ্ছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা বা মহামারী ও ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় মানুষের মনে “পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে” এমন এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করে। মনোবিজ্ঞানে একে “বার্নাম ইফেক্ট” বলা হয়। এই চিরন্তন মানসিক ভীতি থেকেই এমন সাধারণ ঘটনাগুলো ভবিষ্যদ্বাণী আকারে হাদিসে স্থান পেয়েছে।

১৪. আরব মরুভূমি সবুজ ও চারণভূমিতে পরিণত হওয়া

হাদিস: সহীহ মুসলিমের একটি হাদিসে (১৫৭ নং) বলা হয়েছে, কিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না আরবের মাঠ ঘাট চারণভূমি ও নদী-নালায় পরিণত হয় (বা ফিরে যায়)।

ঐতিহাসিক বাস্তবতা: আধুনিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে আজ থেকে প্রায় ৫ থেকে ৯ হাজার বছর আগে আরব মরুভূমি আজকের মতো শুষ্ক ছিল না। সে সময় আরবের বুকে বিশাল সব হ্রদ ও নদী ছিল এবং সেখানে হাতি, জলহস্তী ও কুমিরের মতো প্রাণীরা বাস করত। তাই আলোচ্য হাদিসটিকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক অলৌকিকতা বা প্রাচীন জলবায়ু (Paleoclimate) সম্পর্কে নবীজির গায়েবি জ্ঞান হিসেবে প্রচার করা হয়। কিন্তু এর মূলে রয়েছে একটি অনুবাদের কারসাজি।

হাদিসে ব্যবহৃত মূল আরবি শব্দটি হলো ‘তাঊদ’ (تَعُودَ), যার দুটি অর্থ হতে পারে: ‘পরিণত হওয়া’ (become) অথবা ‘ফিরে যাওয়া’ (revert)। ঐতিহাসিকভাবে বিখ্যাত আব্দুল হামিদ সিদ্দিকীর হাদিসের ইংরেজি অনুবাদে একে “becomes” (পরিণত হওয়া) হিসেবেই অনুবাদ করা হয়েছিল। এবং আগের যুগের ইমামরা হাদিসটির অত্যন্ত সাধারণ অর্থ করতেন যে—ভবিষ্যতে আরবে সেচ ব্যবস্থা বা কৃষিকাজের উন্নতি হবে। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে একে বৈজ্ঞানিক ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে প্রমাণের জন্য ‘reverts’ অর্থের ওপর জোর দেওয়া শুরু হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ২০২০ সালে বিখ্যাত হাদিস ওয়েবসাইট SUNNAH.COM কোনো ঘোষণা ছাড়াই তাদের সাইটে মূল অনুবাদের “becomes” শব্দটি পরিবর্তন করে “reverts” বসিয়ে দেয়। উদ্দেশ্য ছিল তৎকালীন দাওয়াতি প্রজেক্টগুলোর (যেমন IERA-এর ‘Forbidden Prophecies’ বই) দাবির সাথে হাদিসটিকে মেলানো এবং একটি ‘ম্যানুফ্যাকচার্ড মিরাকল’ তৈরি করা।

যদি আমরা তর্কের খাতিরে ‘ফিরে যাওয়া’ (reverts) অর্থটিও মেনে নিই, তবুও এটি প্রমাণ করে না যে আরবরা আধুনিক বিজ্ঞানের আগে তাদের অঞ্চলের অতীত সম্পর্কে কিছুই জানত না।

হাজার বছর ধরে মরুভূমিতে বসবাসকারী বেদুইনরা বিশাল বিশাল শুষ্ক নদীর খাত বা ‘ওয়াদি’ দেখত। একটি শুষ্ক খাতের গঠন দেখেই সাধারণ যুক্তিতে যে কেউ বুঝতে পারে যে, এখানে একসময় নদী প্রবাহিত হতো। এটি বোঝার জন্য আধুনিক ভূতাত্ত্বিক হওয়ার প্রয়োজন নেই।

এছাড়াও মরুভূমিতে হঠাৎ প্রবল বৃষ্টিপাত হলে সেই ওয়াদিগুলো সাময়িকভাবে পানিতে ভরে সবুজ হয়ে যেত। শুষ্ক মরুভূমি কীভাবে পানিতে ভরে সবুজ হতে পারে, তা বেদুইনদের নিজস্ব চোখেই দেখা বাস্তব অভিজ্ঞতা ছিল।

উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমলে খাল খনন করে সেচ ব্যবস্থা ও সুবিশাল উদ্যান তৈরির রেওয়াজ ছিল। উমাইয়াকালীন ‘মরু-দুর্গ’তে বিশাল জলাধার, বাঁধ এবং পারস্যের প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃত্রিম সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে মরুভূমির বুকে সুবিশাল বাগান বা ‘হায়র’ তৈরি করা হতো। আব্বাসীয় আমলের ‘দর্ব জুবাইদা’ প্রকল্পের অধীনে পুরো মরুভূমি জুড়ে শত শত মাইলব্যাপী কৃত্রিম পানির কূপ, ভূগর্ভস্থ নালা এবং বিশাল সব ওয়াটার পুল বা ‘বির্কা’ তৈরি করা হয়। এর ফলে শুষ্ক মরুভূমির স্টেশনগুলো সবুজের মরূদ্যানে পরিণত হয়েছিল। তাই শুষ্ক ভূমিকে মানুষের চেষ্টায় সবুজ করার ধারণাটিও তৎকালীন মানুষের চিন্তার বাইরে ছিল না।

এছাড়াও আরবের জাহেলী যুগের বিখ্যাত সব কবিদের কবিতা বা ‘মুয়াল্লাকা’তে (যেমন কবি ইমরুল কায়েসের কবিতা) মরুভূমির তীব্র বৃষ্টি বা ‘সায়ল’ (Flash flood) এবং এর ফলে শুকনো ওয়াদিগুলো সাময়িকভাবে নদী হয়ে ওঠার নিখুঁত বর্ণনা রয়েছে। বেদুইনরা নিজের চোখে দেখত কীভাবে বৃষ্টির পর শুকনো বালির নিচ থেকে সুপ্ত বীজ গজিয়ে পুরো উপত্যকা সবুজ চারণভূমিতে পরিণত হতো। তাই আরবের বুকে নদী থাকা বা ভূমি সবুজ হওয়া তাদের কাছে কোনো অলৌকিক বিজ্ঞান ছিল না, বরং তাদের চিরচেনা বাস্তব অভিজ্ঞতা ছিল।

এছাড়াও সম্প্রতি জানা যায় যে এখন থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগে (১৬শ-১৭শ শতকে) আরবের বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বর্তমানের চেয়ে প্রায় ৫ গুণ বেশি ছিল, যার ফলে আরবের উত্তরাঞ্চল সাভানা অঞ্চলের মতো সবুজ ঘাস ও বন্যপ্রাণীতে (সিংহ, চিতাবাঘ, নেকড়ে) ভরপুর ছিল। অর্থাৎ বিভিন্ন যুগে আরবের ভূ-প্রকৃতি সবুজ থেকে মরুভূমি হওয়া আবার মরুভূমি থেকে সবুজ হওয়ার পর্যায়ক্রমিক ঘটনাগুলো খুবই সাধারণ বিষয় ছিল।

১৫. নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি ও পুরুষের সংখ্যা হ্রাস

হাদিস: সহীহ বুখারীর ৮১ নং হাদিসে কিয়ামতের আলামত হিসেবে বলা হয়েছে, পুরুষের সংখ্যা কমে যাবে এবং নারীর সংখ্যা এত বাড়বে যে, ৫০ জন নারীর বিপরীতে ১ জন পুরুষ থাকবে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: অনেকেই মনে করেন এটি শেষ যুগে কোনো জন্মগত ত্রুটি বা আধুনিক বিশ্বযুদ্ধের ফলে পুরুষ কমে যাওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী। কিন্তু এটি মূলত ইসলামি সাম্রাজ্য বিস্তারের শুরুর দিকের একটি জনমিতিক (Demographic) বাস্তবতা। ৭ম ও ৮ম শতাব্দীতে মুসলিমরা বাইজেন্টাইন ও পারস্য সাম্রাজ্যের সাথে একটানা মহাযুদ্ধে লিপ্ত ছিল। প্রাচীনকালের এসব মুখোমুখি যুদ্ধে লাখ লাখ পুরুষ মারা যেত। ফলে মদিনা, কুফা বা সিরিয়ার মতো শহরগুলোতে যুদ্ধবিধবা নারী এবং বিজিত অঞ্চলগুলো থেকে আসা নারীদের সংখ্যা পুরুষের তুলনায় বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল। ক্রমাগত যুদ্ধবিগ্রহের কারণে সমাজে সৃষ্ট এই সাময়িক জনমিতিক ভারসাম্যহীনতা তৎকালীন আরবের এক চরম বাস্তবতা ছিল। এই যুদ্ধবিধ্বস্ত সমাজের ডেমোগ্রাফিক চিত্রটিকেই হাদিস সংকলনের যুগে কিয়ামতের আলামত বা ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে লেখা হয়েছিল।

১৬. দাজ্জালের পরিচয় ও আত্মপ্রকাশের স্থান

হাদিস: সহীহ বুখারী (হাদিস নং ১৩৫৪) ও সহীহ মুসলিম (হাদিস নং ২৯৩০)-এ ইবনে সাইয়াদ নামক মদিনার এক ইহুদি বালকের কথা বলা হয়েছে, যাকে স্বয়ং নবীজি (সা.) ও ওমর (রা.) দাজ্জাল বলে সন্দেহ করতেন। অন্যদিকে, সহীহ মুসলিমের বিখ্যাত ‘জাসসাসা’ হাদিসে (হাদিস নং ২৯৪২) ফাতেমা বিনতে কায়স থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, সাহাবী তামিম আদ-দারী সমুদ্র সফরে গিয়ে এক অজানা দ্বীপে এক অদ্ভুত লোমশ প্রাণী (জাসসাসা) ও শিকলবন্দী এক দৈত্যকে দেখেন, যে নিজেকে দাজ্জাল বলে দাবি করে।

বাস্তবতা: সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে দাজ্জাল কোনো এক দ্বীপে বন্দি আছে এবং শেষ জামানায় বের হবে। কিন্তু একই সাথে সহীহ হাদিস বলছে দাজ্জাল রাসুলের যুগেই মদিনায় ‘ইবনে সাইয়াদ’ হিসেবে মুক্ত অবস্থায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল! এটি একটি চরম সাংঘর্ষিক বর্ণনা। মূলত মদিনার তৎকালীন ইহুদি ও মুসলিমদের মধ্যকার মানসিক উত্তেজনা ও সন্দেহ থেকে ইবনে সাইয়াদকে নিয়ে গুজবের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে, সিরিয়া ও ইরাক বিজয়ের পর খ্রিষ্টানদের শেষ জামানার মিথগুলো (যেমন: এন্টিক্রাইস্ট) যখন মুসলিম সমাজে প্রবেশ করে, তখন তামিম আদ-দারীর মতো কনভার্টেড মুসলিমদের মাধ্যমে ‘জাসসাসা’ বা দ্বীপের শিকলবন্দী দৈত্যের মিথটি তৈরি হয়। হিজরি ২য়-৩য় শতকে হাদিস সংকলনের সময় মুহাদ্দিসরা এই দুটি বিপরীতমুখী বর্ণনাই তাদের হাদিসগ্রন্থগুলোতে অন্তর্ভুক্ত করে নেন।

১৭. দাজ্জালের কোন চোখ কানা

হাদিস: সহীহ বুখারীর ৩৪৩৯ নং হাদিসে বলা হয়েছে তার “ডান চোখ” কানা আবার সহীহ মুসলিমের ২৯৩৩ নং হাদিসে বলা হয়েছে তার “বাম চোখ” কানা।

বিশ্লেষণ: হাদিসের এই অসামঞ্জস্যতাগুলোই প্রমাণ করে যে, কিয়ামতের হাদিসগুলো কোনো সুনির্দিষ্ট ঐশী জ্ঞান ছিল না, বরং এগুলো ছিল লোকমুখে প্রচলিত হয়ে যাওয়া বিভিন্ন ভীতিকর গল্পেরই ভিন্ন ভিন্ন রূপ।

১৮. ঈসার অবতরণ ও দাজ্জাল বধের স্থান

হাদিস: সহীহ মুসলিমের ২৯৩৭ নং হাদিসে বলা হয়েছে ঈসা দামেস্কের পূর্ব দিকের ‘সাদা মিনারে’ অবতরণ করবেন। অন্যদিকে ইবনে মাজাহ (৪০৭৭), মুসনাদে আহমদ ও অন্যান্য কিছু বর্ণনায় বলা হয়েছে তিনি জেরুজালেমে অবতরণ করবেন। দাজ্জালকে হত্যার স্থান হিসেবে ফিলিস্তিনের ‘লুদ’ নামক গেটের কথা বলা হয়েছে।

ঐতিহাসিক বাস্তবতা: খ্রিষ্টানদের ‘সেকেন্ড কামিং অফ ক্রাইস্ট’ বা যিশুর দ্বিতীয় আগমনের ধারণাটি সরাসরি এখানে প্রতিফলিত হয়েছে। উমাইয়া খিলাফতের রাজধানী ছিল দামেস্ক। তাই উমাইয়া যুগে নিজেদের শহরকে মহিমান্বিত করতে এবং রাজনৈতিক বৈধতা দিতে ঈসার দামেস্কে অবতরণের হাদিসটি তৈরি করা হয়। অন্যদিকে, ইহুদি-খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বে জেরুজালেমের গুরুত্ব অনেক বেশি হওয়ায় আরেকটি গোষ্ঠী সেখানে ঈসার অবতরণের কথা প্রচার করে। দাজ্জাল হত্যার স্থান ‘লুদ’ মূলত ফিলিস্তিনের একটি প্রাচীন শহর, যা বাইজেন্টাইন খ্রিষ্টানদের কাছে ‘সেন্ট জর্জ’ (যিনি ড্রাগন বধ করেছিলেন বলে খ্রিষ্টান মিথ রয়েছে)-এর জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত ছিল। খ্রিষ্টানদের এই সেন্ট জর্জের ড্রাগন বধের মিথটিই ইসলামি রূপ পেয়ে ঈসা কর্তৃক দাজ্জাল বধের ঘটনা হিসেবে হাদিসে স্থান পেয়েছে।

১৯. যুবকের বৃদ্ধ হওয়ার আগেই কিয়ামত হওয়া

হাদিস: সহীহ মুসলিমের ২৯৫৩ নং হাদিসে আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-কে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি পাশে বসা আনসারদের এক বালকের দিকে ইশারা করে বলেন, “এই ছেলেটি বৃদ্ধ হওয়ার আগেই কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে।”

বাস্তবতা: হাদিস অনুযায়ী ওই ছেলেটি মারা যাওয়ার আগেই কিয়ামত হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তা হয়নি। হাদিসের এই স্পষ্ট ব্যর্থতাকে ঢাকার জন্য পরবর্তী যুগের মুহাদ্দিসরা বলেন যে, এখানে ‘কিয়ামত’ বলতে পৃথিবীর ধ্বংস নয়, বরং ওই প্রশ্নকারী ব্যক্তির ‘নিজস্ব মৃত্যু’ বা ‘ব্যক্তিগত কিয়ামত’ বোঝানো হয়েছে। কিন্তু হাদিসের ভাষা ও প্রেক্ষাপট স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে তৎকালীন জীবিত প্রজন্মের জীবদ্দশাতেই শেষ সময় চলে আসবে এমন ইঙ্গিতই হাদিসটিতে দেওয়া হয়েছিল।

উপরিউক্ত বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয় যে, ‘কিয়ামতের আলামত’ নামে পরিচিত অধিকাংশ হাদিসই প্রকৃতপক্ষে পরবর্তীকালের রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা, সামাজিক পরিস্থিতির প্রতিফলন, সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের বিরুদ্ধে ধর্মীয় প্রতিক্রিয়া অথবা প্রাকৃতিক ঘটনার সাধারণ পর্যবেক্ষণ মাত্র। এগুলোকে ঐশী ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে না দেখে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা উচিত, যা বিভিন্ন যুগের মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে।