ইসলামের অন্যান্য সকল ইবাদতের মতোই মহান আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত একটি ইবাদত হলো হজ্জ, যার সকল নিয়ম-কানুন পূর্ণাঙ্গরূপে কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমানে প্রচলিত হজ্জের আচার-অনুষ্ঠানে বহু উদ্ভাবন ও কুসংস্কার যুক্ত হয়ে গেছে, যার অধিকাংশেরই কোনো কুরআনিক ভিত্তি নেই। এই পোস্টে আমরা কুরআনের আলোকে হজ্জের নিয়ম, প্রচলিত হজ্জের কুরআনবিরোধী আচার-অনুষ্ঠানসমূহ এবং আল্লাহর বিধানকে অবজ্ঞা করার পরিণতি নিয়ে আলোচনা করবো।
প্রথম অংশ: হজ্জের উদ্দেশ্য
অন্যান্য সকল ইবাদতের মতোই হজ্জ এবং এর সকল আচার-প্রথা একমাত্র আল্লাহর নামেই উৎসর্গ করতে হবে:
“বলো, ‘নিশ্চয় আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য। তাঁর কোনো শরিক নেই এবং আমাকে এরই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আর আমিই আত্মসমর্পণকারীদের প্রথম।’” —(৬:১৬২-১৬৩)
কুরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে হজ্জের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো আল্লাহকে স্মরণ করা। তাই হজ্জের প্রতিটি মূল্যবান মুহূর্ত একমাত্র আল্লাহর স্মরণে অতিবাহিত হওয়া উচিত:
“আর মানুষের মাঝে হজ্জের ঘোষণা দাও; তারা তোমার কাছে আসবে পদব্রজে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে চড়ে, তারা আসবে দূর-দূরান্তের গিরিপথ অতিক্রম করে। যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে সেই গবাদি পশুদের ওপর যা তিনি তাদের রিজিক হিসেবে দিয়েছেন।…“ —(২২:২৭-২৮)
“আর তোমরা নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহকে স্মরণ করো…” — (২:২০৩)
“অতঃপর যখন তোমরা আরাফাত থেকে প্রত্যাবর্তন করো, তখন মাশ’আরুল হারামের নিকট আল্লাহকে স্মরণ করো এবং তাঁকে স্মরণ করো যেভাবে তিনি তোমাদেরকে পথপ্রদর্শন করেছেন…” — (২:১৯৮)
“অতঃপর যখন তোমরা তোমাদের (হজ্জের) কার্যাদি সম্পন্ন করবে, তখন আল্লাহকে স্মরণ করো…” —(২:২০০)
উপরিউক্ত আয়াতগুলো থেকে প্রতীয়মান হয় যে, হজ্জের সময় যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নাম স্মরণ করা হয়, তবে সেটি উপরিউক্ত প্রত্যেকটি আয়াতের লঙ্ঘন হবে এবং সেই হজ্জ বাতিল হয়ে যাবে।
দ্বিতীয় অংশ: হজ্জের শুরু, সময়সীমা ও মাসসমূহ
১. চাঁদ দেখে হজ্জের সূচনা
“তারা তোমাকে নতুন চাঁদসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলো, এগুলো মানুষের জন্য এবং হজ্জের সময় নির্ধারণের মাধ্যম।‘…” — (২:১৮৯)
যেহেতু ইসলামি ক্যালেন্ডার চন্দ্রনির্ভর, তাই যিলহজ্জ মাসের প্রথম চাঁদ দেখার মধ্য দিয়ে হজ্জের মাস শুরু হয়। যেমন রোজা শুরু হয় রমজান মাসের চাঁদ দেখার মাধ্যমে।
২. হজ্জের সময়কাল
আল্লাহ বলেন:
“হজ্জ হয় কতিপয় নির্দিষ্ট মাসে…” —(২:১৯৭)
‘কতিপয় নির্দিষ্ট মাস’ বলতে আসলে কয়টি মাস? কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে:
“নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট মাসসমূহের গণনা বারো মাস, আল্লাহর কিতাবে (সেদিন থেকেই) যেদিন তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন; এর মধ্যে চারটি মাস হুরুম…” —(৯:৩৬)
অনেকে মনে করেন হুরুম শব্দের অর্থ হলো পবিত্র। তাদের ধারণা সঠিক নয়। কুরআনে ‘পবিত্র’ অর্থের জন্য ‘মুক্বাদ্দাস’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে (২০:১২, ৭৯:১৬, ৫:২১)।
‘হুরুম’ শব্দটি ‘হারাম’ শব্দের বহুবচন এবং উভয়েই ‘ইহরাম’ বিশেষ্য থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ ‘বিরত থাকা’। হজ্জের সময় যুদ্ধ, শিকার প্রভৃতি থেকে বিরত থাকতে হয়।
সুতরাং, কুরআনের হিসেবে হজ্জের জন্য নির্দিষ্ট মাসগুলো হলো হুরুম চারটি মাস।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আজকের মুসলিমদের মধ্যে হজ্জের যে নিয়ম প্রচলিত আছে তাতে তারা হজ্জকে শুধুমাত্র যিলহজ্জ মাসের ৮ থেকে ১৩ তারিখের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। আল্লাহ যেখানে মুমিনদেরকে হজ্জ করার জন্য চার মাস সময় বরাদ্দ দিয়েছেন, সেখানে তারা তা মাত্র পাঁচ দিনে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে !
যখনই তাদেরকে জিজ্ঞাসা হয় কেন তারা কুরআনের ২:১৯৭ আয়াতটি উপেক্ষা করছে, তখন তারা বলে – ‘কারণ হাদিসে এমনটিই বলা হয়েছে’। এটিও হাজার হাজার উদাহরণের মধ্যে একটি, যেখানে মানুষ হাদিসকে মানার জন্য কুরআনের আইনকে উপেক্ষা করে।
৩. (২:১৯৭) আয়াতের বিশ্লেষণ
“হজ্জ হয় কতিপয় নির্দিষ্ট মাসে। সুতরাং যে এই মাসগুলোতে (নিজের ওপর) হজ্জ বাধ্যতামূলক করে নিল (ফারাদা ফীহিন্না আল-হাজ্জ), তবে তার জন্য হজ্জের মধ্যে যৌন সঙ্গম, পাপাচার ও ঝগড়া-বিবাদ বৈধ নয়।” —(২:১৯৭)
আয়াতটির আরবি পাঠে “فَرَضَ فِيهِنَّ” (ফারাদা ফীহিন্না) শব্দদ্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
- ‘ফারাদা’: অর্থ ফরজ বা বাধ্যতামূলক করে নেয়া।
- ‘ফীহিন্না’: অর্থ ‘এদের মধ্যে’। এখানে ‘এদের’ বলতে নির্দিষ্ট মাসগুলোকে বোঝানো হয়েছে।
অর্থাৎ আয়াতটির সঠিক অর্থ দাঁড়ায়: “যে এই মাসগুলোর মধ্যে হজ্জ করে, সে যেন … থেকে বিরত থাকে।”
এই আয়াতটিই স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে নির্ধারিত চার মাসের মধ্যে যে কোনো সময় হজ্জ পালন করা বৈধ।
৪. ‘নির্দিষ্ট দিন’ সংক্রান্ত বিভ্রান্তি
অনেকে ২২:২৮ ও ২:২০৩ আয়াত দুটিতে ‘নির্দিষ্ট দিনসমূহ’ ও ‘নির্ধারিত দিনসমূহ’ কথাগুলোর উল্লেখ দেখিয়ে দাবি করেন যে যিলহজ্জ মাসের দশ দিনের মধ্যেই হজ্জ সম্পন্ন করতে হবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে:
১. যখন আল্লাহ হজ্জের সময়কাল সম্পর্কে বলেন, তখন তিনি ‘নির্দিষ্ট মাসগুলি’ শব্দ ব্যবহার করেন (২:১৯৭)। ২. আবার যখন তিনি মুমিনদের সম্বোধন করেন, তখন বলেন ‘নির্দিষ্ট দিনসমূহ’ বা ‘নির্ধারিত দিনসমূহ’ (আল্লাহকে স্মরণ করো নির্ধারিত দিনসমূহে – ২:২০৩)। কারণ একজন মুমিন যখন হজ্জ পালন করতে যান, তখন তিনি কয়েকদিনের জন্যই যান, পুরো চারমাস ধরে তিনি হজ্জ পালন করেন না।
রমজানের উদাহরণ: সূরা আল-বাকারাহ ২:১৮৫ আয়াতে বলা হয়েছে “রমজান মাসে রোজা রাখো”, কিন্তু ঠিক এর আগের আয়াতে (২:১৮৪) “নির্ধারিত দিনসমূহে” সিয়াম পালনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই আয়াত দেখিয়ে তো কোন হাদিসবিদ কখনো রোজাকে শুধু দশ দিনে সীমাবদ্ধ করার কথা বলেন না!
৫. চারটি ‘হুরুম’ মাস
প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, হুরুম মাসগুলো হলো: রজব, যিলক্বদ, যিলহজ্জ ও মুহররম। কিন্তু এটি কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক।
কুরআন থেকে প্রমাণিত হয়:
১. ‘যিলহজ্জ’ মাসের নাম: ‘যিলহজ্জ’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ ‘হজ্জের মাস’। সুতরাং, এ মাসেই হজ্জ শুরু হয়। আল্লাহই সবকিছুর নামকরণ করেন (২:৩১)। নাম থেকেই স্পষ্ট হয় যে যিলহজ্জ মাসেই হজ্জ শুরু হয়, তার ৫ মাস আগে নয়।
২. হজ্জের মাসগুলো ধারবাহিক: “অতঃপর যখন হুরুম মাসগুলো অতিবাহিত হয়ে যায় (ইনসালাখা), তখন মুশরিকদের যেখানেই পাও হত্যা করো…” —(৯:৫)
‘ইনসালাখা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘চামড়া বা খোসা ছাড়ানো’ – সাপের খোলস ছাড়ানো এর একটি উদাহরণ। চামড়া বা খোসা ছাড়ানোর প্রক্রিয়াটি নিরবিচ্ছিন্নভাবে ঘটে। আল্লাহ এই আয়াতে ইচ্ছাকৃতভাবেই ‘ইনসালাখা’ শব্দ ব্যবহার করে বুঝিয়েছেন যে নিষিদ্ধ চারটি মাস একটির পর একটি ধারাবাহিকবাহে আসে।
সুতরাং কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী হজ্জের চারটি মাস হলো:
১. যিলহজ্জ (১২তম মাস)
২. মুহররম (১ম মাস)
৩. সফর (২য় মাস)
৪. রবিউল আউয়াল (৩য় মাস)
তৃতীয় অংশ: কুরআনে বর্ণিত হজ্জের আচার-অনুষ্ঠান
১. হজ্জের সময় নিষিদ্ধ কাজসমূহ (ইহরাম)
ক) শিকার করা নিষিদ্ধ:
কেউ যখন হজ্জ পালনরত অবস্থায় থাকে তখন তার জন্য শিকার করা নিষিদ্ধ।
“হে মুমিনগণ, …ইহরাম অবস্থায় শিকারকে হালাল মনে করো না।…” —(৫:১)
“আর যখন তোমরা ইহরাম অবস্থা থেকে মুক্ত হও, তখন শিকার করতে পারো…” —(৫:২)
“হে মুমিনগণ! তোমরা ইহরাম অবস্থায় শিকার হত্যা করো না। আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে তা হত্যা করবে, তবে তার বিনিময় হলো অনুরূপ গবাদি পশু যা সে হত্যা করেছে।…” —(৫:৯৫)
খ) যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ:
হুরুম মাসগুলোতে কেবল আত্মরক্ষা ছাড়া সবরকমের যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ।
“তারা তোমাকে হারাম মাসে যুদ্ধ করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলো, ‘এ মাসে যুদ্ধ করা মহাপাপ।’” —(২:২১৭)
গ) যৌন সঙ্গম, পাপাচার ও ঝগড়া-বিবাদ নিষিদ্ধ:
“সুতরাং যে ব্যক্তি এই মাসগুলোতে হজ্জ করা বাধ্যতামূলক করে নিল, তবে হজ্জের সময় তার জন্য যৌন সঙ্গম, পাপাচার ও ঝগড়া-বিবাদ বৈধ নয়।…” —(২:১৯৭)
ঘ) চুল কাটা থেকে বিরত থাকা:
“আর তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্জ ও উমরাহ সম্পন্ন কর। অতঃপর যদি তোমরা বাধাপ্রাপ্ত হও, তবে যা সহজপ্রাপ্য তাই কুরবানী করো এবং কুরবানী তার নির্দিষ্ট স্থানে না পৌঁছা পর্যন্ত তোমরা মাথা মুণ্ডন করো না। …” —(২:১৯৬)
(বিঃদ্রঃ কেউ কেউ মনে করেন হজ্জ শেষে চুল কাটা বা ছোট করা আবশ্যক। কিন্তু কুরআনে শুধু হজ্জের দিনগুলোতে চুল না কাটার নির্দেশ আছে। শেষে কী করবেন তা ব্যক্তির ইচ্ছাধীন।)
একজন ব্যক্তি যতদিন ধরে হজ্জ পালন করেন, ততদিন তাকে এই কাজগুলো থেকে বিরত থাকতে হবে। তবে যুদ্ধ-বিগ্রহ থেকে বিরত থাকার নির্দেশটি পুরো চারমাস জুড়েই কার্যকর থাকে।
২. মসজিদুল হারাম ও আল্লাহর স্মরণ
মসজিদুল হারাম পরিদর্শন ও সেখানে আল্লাহর স্মরণ হজ্জের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
“অতঃপর যখন তোমরা আরাফাত থেকে প্রত্যাবর্তন কর, তখন মাশ’আরুল হারামে আল্লাহর স্মরণ করো।” —(২:১৯৮)
মক্কার মাসজিদুল হারামকেই এখানে মাশ‘আরুল হারাম বলা হয়েছে। কুরআনে একমাত্র মক্কার এই মসজিদকেই ‘হারাম’ নামে অভিহিত করা হয়েছে।
আয়াতটি থেকে আরেকটি ব্যাপার স্পষ্ট হয়, সেটি হলো আরাফাতে অবস্থান ও সেখানে ইবাদত প্রাচীন আরবে প্রচলিত একটি রীতি ছিল। পরবর্তীতে আল্লাহ এটিকে মুমিনদের জন্যও বৈধ করেছেন।
৩. সাফা ও মারওয়া পরিভ্রমণ
“নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং যে ব্যক্তি এ ঘরের হজ্জ বা উমরাহ সম্পন্ন করে, তার জন্য এ দুটির মাঝে পরিভ্রমণ করাতে কোনো দোষ নেই।” —(২:১৫৮)
আয়াতটিতে বলা হয়েছে পাহাড় দুটি প্রদক্ষিণ করায় কোন দোষ নেই, যা থেকে বোঝা যায় সাফা-মারওয়ার পরিদর্শনও প্রাচীন আরবে প্রচলিত একটি রীতি ছিল, এবং পরবর্তীতেও আল্লাহ মুমিনদেরকে এই রীতি বজায় রাখার অনুমতি দিয়েছেন। তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়।
৪. পশু কুরবানী
পশু কুরবানী হজ্জের ইবাদতগুলোর মধ্যে একটি।
“আর উটগুলোকে আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত করেছি; তোমাদের জন্য তাতে রয়েছে কল্যাণ।” —(২২:৩৬)
এই কুরবানী আর পৌত্তলিক দেবতাদের উদ্দেশ্যে পশু বলি দেওয়া এক জিনিস নয়। আল্লাহ বলেন:
“এগুলোর গোশত এবং রক্ত আল্লাহর কাছে কখনোই পৌঁছায় না; বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।” —(২২:৩৭)
কুরবানীর গোশত খাওয়া ও অভাবগ্রস্তকে খাওয়ানোর নির্দেশ:
“অতঃপর যখন সেগুলো কাত হয়ে পড়ে যায়, তখন তোমরা তা থেকে আহার করো এবং আহার করাও ধৈর্যশীল অভাবগ্রস্ত ও সাহায্যপ্রার্থীদেরকে…” —(২২:৩৬)
কুরবানীর পশুর গলায় মালা পরানোর প্রাচীন আরব রীতিটিও কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে:
“আল্লাহ হারাম ঘর কাবাকে মানুষের ধারক বা স্তম্ভ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন এবং নিষিদ্ধ মাসসমূহকে, আর উৎসর্গকৃত পশুকে ও গলায় মালা পরানো পশুগুলোকেও।…” —(৫:৯৭)
আয়াতটি সে সময়ের আরবের একটি প্রচলিত প্রথার দিকে ইঙ্গিত করছে। লোকেরা যখন দূর-দূরান্ত থেকে কুরবানীর পশু মক্কায় নিয়ে যেত, তখন তারা পশুর গলায় একটি বিশেষ চিহ্ন বা মালা পরিয়ে দিত। এই চিহ্নের মাধ্যমে বোঝা যেত যে পশুটি কুরবানীর উদ্দেশ্যে এবং এটি হজ্জের সময় মাসজিদুল হারামে নিবেদিত। কুরআন এই প্রথাকে বাতিল করে দেয়নি – তবে শর্ত হলো এটি যেন শিরক বা জাহিলিয়াতের কোনো কুসংস্কারের অংশ না হয়, বরং আল্লাহর স্মরণ ও আনুগত্যের মাধ্যম হয়। পশুর গলায় মালা বা চিহ্ন দেওয়া হোক আর না হোক, মূল বিষয় হলো অন্তরের তাকওয়া। মালাটি শুধু একটি বাহ্যিক চিহ্ন, যা সে সময়ের প্রেক্ষাপটে অর্থবহ ছিল।
৫. সহজ কুরবানী
যারা উমরাহ থেকে হজ্জে উপনীত হতে চায়, তাদেরকে তাদের সাধ্যমতো কিছু একটা কুরবানী করতে হবে। কেউ যদি তা করতে অসমর্থ হয় তবে তাকে এর পরিবর্তে রোজা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
“আর তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্জ ও উমরাহ সম্পন্ন কর। অতঃপর যদি তোমরা বাধাপ্রাপ্ত হও, তবে যা সহজপ্রাপ্য তাই কুরবানী করো এবং কুরবানী তার নির্দিষ্ট স্থানে না পৌঁছা পর্যন্ত তোমরা মাথা মুণ্ডন করো না। কিন্তু তোমাদের মধ্যে কেউ যদি রোগগ্রস্ত হয় অথবা মাথায় কষ্ট থাকে, তাহলে সে সিয়াম অথবা সাদাকাহ অথবা কুরবানী দ্বারা ওর বিনিময় দিবে, অতঃপর যখন তোমরা নিরাপদ হও তখন যে ব্যক্তি উমরাহ থেকে হজ্জের সুবিধা নিতে চায় সে যা সহজপ্রাপ্য তা-ই উৎসর্গ করবে। কিন্তু কেউ যদি তা প্রাপ্ত না হয় তাহলে হজ্জের সময় তিন দিন এবং যখন তোমরা প্রত্যাবর্তিত হও তখন সাত দিন সিয়াম পালন করবে – এই হলো পূর্ণ দশটি; এটি তারই জন্য – যার পরিবার মসজিদুল হারামে উপস্থিত নেই…” —(২:১৯৬)
কুরআনে উল্লেখ নেই যে ‘সহজপ্রাপ্য কুরবানী’টি কোন বস্তু দিয়ে করতে হবে। তাই এই কুরবানী দরিদ্রদেরকে অর্থ, বস্ত্র বা খাদ্যদ্রব্য ইত্যাদি দিয়েও হতে পারে।
আর যার সামর্থ্য নেই, সে মোট দশদিন রোজা রাখবে:
- হজ্জের সময় তিন দিন
- বাড়ি ফিরে আরো সাতদিন
মনে রাখতে হবে, উমরাহ থেকে হজ্জে উপনীত হওয়ার সময় কুরবানী (অসমর্থ হলে সিয়াম পালন)-এর বিধানটি শুধু তাদের জন্যই প্রযোজ্য যাদের পরিবার মক্কায় বসবাস করে না।
উপরে উল্লিখিত আচার-অনুষ্ঠানগুলো সম্পন্ন করলেই কুরআনে বর্ণিত হজ্জ পালন হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
চতুর্থ অংশ: কুরআনে বর্ণিত উমরাহর নিয়ম
হজ্জের আচার-অনুষ্ঠানের তালিকার ২ ও ৩ নং নিয়মগুলোই উমরাহ পালনের নিয়ম।
- মসজিদুল হারাম পরিদর্শন ও আল্লাহর স্মরণ
- সাফা-মারওয়া পরিভ্রমণ
শুধু হজ্জের চারটি মাস বাদে বছরের বাকি যেকোনো দিন উমরাহ পালন করা যায়, যেহেতু উমরাহ হুরুম মাসগুলোর বাইরে সম্পাদন করতে হয়, তাই এর জন্য ইহরাম (নিষেধাজ্ঞার বিধানগুলো) প্রযোজ্য নয়। ইহরাম শুধু হজ্জের চার মাসের সাথে সম্পৃক্ত।
পঞ্চম অংশ: প্রচলিত হজ্জের কুরআনবিরোধী নিয়ম-কানুনসমূহ
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, হজ্জ ও উমরাহতে এমন বহু নব-উদ্ভাবিত আচার প্রবেশ করেছে, যেগুলোর কোনো কুরআনিক ভিত্তি নেই। অথচ আল্লাহ বলেন:
“তবে কি আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো বিচারক অনুসন্ধান করবো? অথচ তিনিই তোমাদের প্রতি বিস্তারিত কিতাব অবতীর্ণ করেছেন।” —(৬:১১৪)
“আর আমি আপনার ওপর কিতাব নাজিল করেছি যা প্রত্যেক বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যা, আর এটি মুসলিমদের জন্য পথনির্দেশ, রহমত ও সুসংবাদ।” —(১৬:৮৯)
এখন প্রশ্ন হলো: যদি কুরআন পূর্ণাঙ্গই হয়, তবে যে সব আচার কুরআনে নেই, সেগুলো কি আল্লাহ কর্তৃক অনুমোদিত?
এ প্রসঙ্গে অনেকে বলেন যে, “নবী মুহাম্মাদ এই আচার পালন করতেন, তাই আমরাও এগুলো পালন করি।”
তার মানে কি নবী কুরআনের বাইরে গিয়ে নিজের বানানো বিধি-বিধানও পালন করতেন? কিন্তু কুরআনে তো আল্লাহ নবীকে উদ্দেশ্য করে বলছেন:
“বলো, ‘আমি তো রাসুলদের মধ্যে নতুন কেউ নই। আমি জানি না আমার সাথে কী করা হবে আর তোমাদের সাথেও বা কী করা হবে। আমার প্রতি যা প্রত্যাদেশ হয়, আমি কেবল তারই অনুসরণ করি। আর আমি তো একজন স্পষ্ট সতর্ককারী মাত্র।’” —(৪৬:৯)
নিচে হজ্জ ও উমরাহতে যোগ হওয়া কিছু বড় বড় উদ্ভাবন সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:
১. হজ্জের সময়কে ৫ দিনে সীমাবদ্ধ করে ফেলা (যিলহজ্জের ৮-১৩ তারিখ)
ইতিপূর্বেই প্রমাণ করা হয়েছে যে আল্লাহ হজ্জের জন্য চার মাস সময় নির্ধারণ করেছেন। কিন্তু মানুষ তা মাত্র পাঁচ দিনে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। স্পষ্টতই এটি কুরআনের আইনের লঙ্ঘন।
২. কাবাঘরের চতুর্দিকে ৭ পাক দেওয়া
কাবাঘরের চারপাশে চক্রাকারে ঘোরা বা ৭ পাক দেওয়া – এর কোনটিই কুরআনে বর্ণিত বিধান নয়। কুরআনে কেবল মাশ’আরুল হারামে আল্লাহকে স্মরণ করার কথা বলা হয়েছে (২:১৯৮)। অর্থাৎ, মসজিদুল হারামে গমন এবং সেখানে আল্লাহকে স্মরণ করা বা আল্লাহর ইবাদত করাই যথেষ্ট।
কুরআনে ইব্রাহিমের সেই প্রাচীন গৃহটি তাওয়াফ করা হতো বলে উল্লেখ করা হয়েছে (২:১২৫, ২২:২৬, ২২:২৯), যেটির অবস্থান ছিল বাক্কায়। এখানে তাওয়াফ মানে এই নয় যে, লোকজন ইব্রাহিমের সেই ঘরের চারপাশে বৃত্তাকারে ঘুরতো। তাওয়াফ শব্দটি ‘ত্বোয়া-ফা’ মূল থেকে এসেছে, যার সরল অর্থ হলো পরিভ্রমণ করা/ঘোরাফেরা করা/আসা-যাওয়া করা/to roam ইত্যাদি।
২৪:৫৮ আয়াত থেকে তাওয়াফ শব্দের সঠিক অর্থটি পাওয়া যায় “তারা তোমাদের কাছে আসা-যাওয়া/যাতায়াত করে (তাওয়াফুনা আ’লাইকুম)”।
অনুরূপভাবে কুরআন যখন বলছে সাফা-মারওয়ার মধ্যে তাওয়াফ করায় কোন দোষ নেই (২:১৫৮), তখন বস্তুত হজ্জ পালনকারীদেরকে এ দুটি স্থানের মধ্যে যাতায়াত বা পরিভ্রমণ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কুরআন কখনোই বলেনি সাফা থেকে মারওয়া আবার মারওয়া থেকে সাফা – এভাবে ৭ বার আসা-যাওয়া করতে।
৩. হজ্জের পোশাক
প্রচলিত ধারণা হলো হজ্জের সময় পুরুষদের জন্য দু’টুকরো সাদা, সেলাইবিহীন কাপড় পরা আবশ্যক। এমনকি তাদেরকে কাপড় দুটি বেঁধে রাখার জন্য সেইফটি পিন ব্যবহারেরও অনুমতি দেওয়া হয় না। অথচ কুরআনে এর কোনো নির্দেশ নেই। বরং আল্লাহ বলেন:
“হে আদম সন্তান, তোমরা প্রত্যেক মাসজিদে তোমাদের সাজসজ্জা গ্রহণ করো।” —(৭:৩১)
‘প্রত্যেক মাসজিদ’-এর মধ্যে মাসজিদুল হারামও অন্তর্ভুক্ত। সুন্দর পোশাক পরিধান করা ইবাদতের সময় একটি সুন্দর ও উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করে। বরং, মসজিদে এমন সাদা কাপড় পরিধান বাধ্যতামূলক করা কুরআনের এই নির্দেশের পরিপন্থী।
তারা এই সাদা পোশাক পরিধানকে ‘ইহরাম’ এর অংশ বলে মনে করে। তাদের দাবি এই ধরনের পোশাক পরিধান তাদেরকে বিলাসী ও আড়ম্বরপূর্ণ কাজ-কর্ম থেকে বিরত রাখে! অথচ আল্লাহর ইবাদত হওয়া উচিত ছিল আনন্দমুখর ও জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে।
তারা আরও দাবি করে যে এভাবে সবাই এক পোশাক পরলে তা ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান ঘুচিয়ে দেয়! এই যুক্তি তো তারা কখনো জুম্মার সালাতের বেলায় প্রয়োগ করে না। জুম্মার দিনেতো যার যেই পোশাক আছে সে তাই পরে সালাতে অংশ নেয়। বরং, হজ্জের সময় বাধ্যতামূলক ভাবে এই দু’টুকরো সাদা কাপড় কেনা অনেকসময় অনেক দরিদ্র ব্যক্তির জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
‘ইহরাম’ শব্দের সরল অর্থ হলো ‘বিরত থাকা’। হজ্জের সময় যে বিষয়গুলো (যুদ্ধ, শিকার, যৌনতা, চুল না কাটা ইত্যাদি) থেকে বিরত থাকতে হবে কুরআনে সেগুলো স্পষ্টভাবেই উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআনের কোথাও ইহরামের অংশ হিসেবে এভাবে বিপজ্জনকভাবে স্বল্প পোশাক পরিধান করার নির্দেশ দেওয়া হয়নি।
শয়তানের কাজ হলো মানুষকে অশ্লীলতার দিকে ধাবিত করা। শয়তান হজ্জের সময় পুরুষদেরকে শুধু অন্তর্বাস পরা থেকেই বিরত রাখেনি, বরং ওই তথাকথিত ইহরামের কাপড় ঠিকমতো আটকে রাখার জন্য পিন ব্যবহার থেকেও তাদেরকে বিরত রাখতে সমর্থ হয়েছে। যার ফলে প্রায়ই হজ্জের সময় অনেক পুরুষকে দেখা যায় অসতর্কতাবশত হাজার হাজার নারী-শিশু ও পুরুষের সামনে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র হয়ে যেতে!
৪. মীকাত
মীকাত হলো এমন একটি নির্দিষ্ট স্থান যেখান থেকে হজ্জযাত্রীদের ইহরাম বস্ত্র পরিধান করতে হয়, আর এই কাজটিকে তারা ‘ইহরাম বাঁধা’ বলে। এরপর তাদেরকে হজ্জ বা উমরাহ পালন শুরু করতে হয়। আর যারা মীকাতের স্থানগুলোর চেয়েও মক্কার বেশি নিকটে বাস করে তাদের ইহরাম বাঁধতে হয় নিজ ঘর থেকে যাত্রা করার সময়।
এটা বলাই বাহুল্য যে, কুরআনে হজ্জ বস্ত্র পরিধান বা মীকাত কোনোটিরই কোনো উল্লেখ নেই। কুরআনে বর্ণিত আল্লাহর বিধান অনুযায়ী, হজ্জ শুরু করতে চাইলে একজন ব্যক্তি মাসজিদুল হারামে প্রবেশের সময় থেকেই ইহরাম অবস্থায় থাকবেন। এরজন্য মানচিত্রের নির্দিষ্ট কোন স্থান নির্ধারণের কোনো প্রয়োজন নেই।
৫. কালো পাথর (হাজরে আসওয়াদ)
কুরআনে সর্বত্র স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে পাথর বা প্রতিমা পূজা থেকে বিরত থাকতে হবে। অথচ মুসলিমরা কাবাঘরের এক কোণে রাখা কালো রঙের কয়েকটি পাথরের টুকরাকে (যেটিকে হাজরে আসওয়াদ বলা হয়) পবিত্র মনে করে এবং একে চুম্বন, স্পর্শ করা এবং সেটিকে সামনে রেখে হাত তোলাকে ইবাদত মনে করে। আবার অনেকে বরকত লাভের আশায় কাবাঘরের দেয়ালে নিজেদের শরীর ঘষতে থাকে। এই কাজগুলো সুস্পষ্ট শিরক। আল্লাহ বলেন:
“বলো,‘তোমরা কি আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুর ইবাদত করো, যার তোমাদের কোনো ক্ষতি বা উপকার করার ক্ষমতা নেই?’” —(৫:৭৬)
কুরআনের কোথাও হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথরের কোন উল্লেখ নেই। হাদিসে কালো পাথর সম্পর্কে নানা কাহিনী বর্ণিত হয়েছে, যেমন – ইব্রাহিমের সময় এই পাথর জান্নাত থেকে আসে এবং রাসূল এই পাথরে চুম্বন করেছেন! কিন্তু এই বর্ণনাগুলো কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক এবং স্পষ্টতই রাসূলের প্রতি অপবাদ। রাসূল কেবলই কুরআনের নির্দেশ অনুসরণ করতেন, কুরআনবিরোধী কোনো কাজ করতেন না।
৬. জমজমের পানি
হজ্জযাত্রীদের শিরকি কর্মকান্ড শুধু কালো পাথর নিয়ে কুসংস্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শয়তান মানুষের মধ্যে এমন এমন বস্তুর পূজা করার প্রবণতা সৃষ্টি করেছে যেগুলো মানুষের কোন উপকার বা ক্ষতি করতে পারে না। এরকমই আরেকটি কুসংস্কার হলো জমজম কূপের পানি, যেটি মসজিদুল হারামের ভেতর পাওয়া যায়। লোকজন মনে করে এই পানি পবিত্র এবং এর রোগ নিরাময় ক্ষমতা আছে! অথচ কুরআনে এর কোনো উল্লেখ নেই। এই ঘটনার উৎস বাইবেলে বর্ণিত সেই কাহিনী, যেখানে বলা হয়, হাজারাহ যখন ইসমাইলের জন্য পানি খুঁজতে দুই পাহাড়ের মধ্যে ছুটাছুটি করছিলেন তখন সৃষ্টিকর্তা দয়াপরবশ হয়ে একটি ঝর্ণাধারা সৃষ্টি করে দেন, যা থেকে তিনি ও ইসমাইল পানি পান করেন (জেনেসিস ২১:১৪-২১)।
হাদিস রচয়িতারা বাইবেলের কাহিনী কপি করে তা মক্কার পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু এখানে একটা সমস্যা আছে, বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী ঘটনাটি ঘটেছে জেরুজালেমের দক্ষিণে, গাযা ও মৃত সাগরের মাঝামাঝি ‘বিয়ার-শেবা’ নামক স্থানে। এলাকাটির অবস্থান মক্কা থেকে বহুদূরে!
এটা পরিষ্কার যে, কুরআনে নেই এমন কোনো বস্তুকে পবিত্র বা অলৌকিক উপকারী ক্ষমতাসম্পন্ন মনে করা শিরকের অন্তর্ভুক্ত, হোক সেটা কালো পাথর কিংবা জমজম। তাছাড়া এই কর্মকান্ডগুলো সরাসরি ৫:৭৬ ও ২১:৬৬ আয়াতের সাথে সাংঘর্ষিক; একজন প্রকৃত ঈমানদার মসজিদুল হারামে আসে কেবল আল্লাহকে স্মরণ করতে আর তাঁর ইবাদত করতে, কোন শিরকি কর্মকান্ডে লিপ্ত হতে নয়।
৭. শয়তানকে পাথর মারা
শয়তানকে পাথর মারা হজ্জের একটি অংশ বলে মনে করা হয়। কিন্তু কুরআনে এ বিষয়ে কোনো নির্দেশ নেই। বরং পাথর নিক্ষেপের কথা কুরআনে এসেছে মুশরিদের আচরণ হিসেবে (১১:৯১, ১৮:২০, ১৯:৪৬, ৩৬:১৮)।
ইতিহাসবিদ আল-আরাজির মতে, পাথর নিক্ষেপের এই আচারের উৎস হলো ইবরাহিম-এর হজ্জ যাত্রা। বর্ণনায় বলা হয়, যখন ইবরাহীম মিনা থেকে বের হন, তখন শয়তান তার কাছে উপস্থিত হয়। তখন জিবরীল ইবরাহিমের কাছে এসে বলেন, “একে পাথর নিক্ষেপ করুন!” তখন ইবরাহিম শয়তানের ওপর পাথর নিক্ষেপ করেন এবং এতে শয়তান অদৃশ্য হয়ে যায়।
হাদিসের অনুসারীরা যেহেতু পাথর নিক্ষেপের আচারের জন্য কুরআনের কোনো ভিত্তি খুঁজে পান না, তাই তারা ‘রাজীম’ শব্দটির সঙ্গে এই আচারকে যুক্ত করার চেষ্টা করেন। আল্লাহ বলেন:
“তিনি (আল্লাহ) বললেন, ‘অতএব তুমি এখান থেকে বের হয়ে যাও, কারণ নিশ্চয়ই তুমি বিতাড়িত (রাজীম)।’” —(৩৮:৭৭) ও (১৫:৩৪)
‘রাজীম’ শব্দের অর্থ কেবল ‘বিতাড়িত’। একে বিকৃত করে ‘পাথর নিক্ষেপিত’ অর্থ দেওয়া হয়েছে, যাতে তাদের এই উদ্ভট রীতিকে কুরআন অনুমোদিত বলে চালানো যায়।
কিছু হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, ওই তিনটি স্তম্ভের কোনটিতে যতবার পাথর নিক্ষেপ করা হয়, ততবার শয়তান ব্যাথা পায়! মনে হয় যেন শয়তান তাদের পাথরের আঘাত খাওয়ার জন্য ওই দেয়ালগুলোতে বসে থাকে! আসলে তাদের এসব কাজকর্ম শয়তানকে শুধু খুশিই করে—যে তাদেরকে হজ্জের মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত করে এসমস্ত পৌত্তলিক কার্মকান্ডে লিপ্ত করতে পেরেছে।
৮. প্রতিনিধি পাঠিয়ে হজ্জ করানো
অনেকে মৃত আত্মীয়ের পক্ষ থেকে হজ্জ করেন। অথচ কুরআন বলে:
“মানুষের জন্য রয়েছে কেবল তা-ই, যা সে চেষ্টা করে।” —(৫৩:৩৯)
কেউ অন্যের পক্ষে হজ্জ করলে তা কুরআনের সরাসরি লঙ্ঘন। রাসূল কখনো এমন আদেশ দিতে পারেন না যা কুরআনের বিপরীত।
৯. উমরাহতে ইহরাম!
ইহরাম শুধু হজ্জের চার মাসের সাথে সম্পৃক্ত। উমরাহ যেহেতু এই মাস গুলোর বাইরে করা হয়, তাই এক্ষেত্রে ইহরামের (নিষেধাজ্ঞার বিধানগুলো পালনের) প্রয়োজন নেই। কিন্তু বর্তমানে উমরাহ করলেও ইহরাম বাঁধা হয়, যা কুরআনের নির্দেশনার বাইরে।
১০. নারীদের জন্য ‘মাহরাম’-এর বাধ্যবাধকতা
নারীদের হজ্জের জন্য মাহরাম (পিতা, ভাই, পুত্র ইত্যাদি) সঙ্গে নেওয়া বাধ্যতামূলক মনে করা হয়। কুরআনে এ ধরনের কোনো বিধান নেই। এটি পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতির উদ্ভাবন এবং নারীদেরকে আল্লাহর পৃথিবীতে ভ্রমণ ও তাঁর ইবাদত থেকে বিরত রাখার জন্য শয়তানের একটি প্রচেষ্টা। মহান আল্লাহ কাউকে ইবাদতের জন্য অন্যের অনুমতি বা সঙ্গীর ওপর নির্ভরশীল করেননি।
১১. ঋতুকালীন নারীদের ইবাদত থেকে বিরত রাখা
অনেক মুসলিম সমাজে ঋতুকালীন নারীকে নামাজ পড়তে, রোজা রাখতে, মাসজিদে যেতে নিষেধ করা হয়। এমনকি হজ্জের সময়ও তাদেরকে কিছু আচার থেকে বিরত রাখা হয়। অথচ কুরআনে শুধু ঋতুকালীন যৌন সম্পর্ক নিষিদ্ধ করা হয়েছে (২:২২২)। আল্লাহর তৈরি একটি স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়ার কারণে নারীদেরকে ইবাদত থেকে বঞ্চিত করার কোনো কুরআনিক ভিত্তি নেই। এটি রাসূলের নামে মিথ্যা আরোপের আরো একটি উদাহরণ।
১২. মদিনায় নবীর কবর জিয়ারত
অনেকে হজ্জের অংশ হিসেবে মদিনায় গিয়ে কবর জিয়ারত করেন এবং মাসজিদে নববীকে ‘দ্বিতীয় হারাম মসজিদ’ বলে মনে করেন। অথচ কুরআনে একটিমাত্র মসজিদকেই ‘হারাম’ বলা হয়েছে (মক্কার মসজিদুল হারাম)। কুরআনের নির্দেশ হলো:
“আর নিশ্চয়ই মসজিদসমূহ আল্লাহরই জন্য। সুতরাং তোমরা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে ডেকো না।” —(৭২:১৮)
রাসূল তাঁর নিজের কবরকে ইবাদতের কেন্দ্র বানাননি। হজ্জের অংশ হিসেবে কবর জিয়ারত করা শিরক এবং কুরআন বিরোধী।
১৩. অন্যান্য ভ্রান্ত ধারণা
- হজ্জ ইসলামের নবম বছর ফরজ হয়েছিল: এই ধারণাটি ভুল। কুরআনে (২২:২৬-২৭) বলাই আছে, আল্লাহ ইবরাহিমকে হজ্জের ঘোষণা দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। অর্থাৎ, এটি পূর্ব থেকেই ফরজ ছিল।
- হজ্জ করলে সব পাপ মুছে যায়: কুরআনে এমন কথা বলা নেই। বরং, কাউকে ক্ষমা করা বা না করা বিষয়টি সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছাধীন। রাসূল নিজেই বলেছেন, “আমি জানি না আমার সাথে কী হবে” (৪৬:৯)। তিনি যদি সব পাপ মাফের নিশ্চয়তা দিতে পারতেন, তবে তা কুরআনের বর্ণনার সাথে সাংঘর্ষিক হতো।
ষষ্ঠ অংশ: আল্লাহর বিধান পরিত্যাগের পরিণাম
আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত হজ্জের নিয়মগুলো বাদ দিয়ে মানুষের তৈরি নিয়ম-কানুন অনুসরণ করার কারণে মানুষ নিজেদের ওপর যেসব অকল্যাণ ও বিপদ ডেকে এনেছে তার কয়েকটি উদাহরণ এখানে দেওয়া হলো:
১. লক্ষাধিক মুসলিমের ইবাদত থেকে বঞ্চিত হওয়া: হজ্জের সময় মাত্র ১০ দিনে সীমিত করে ফেলায় বছরে প্রায় ২-৩ কোটি মুসলিম ভিসা পান না। অথচ চার মাসব্যাপী হজ্জ হলে অনেক বেশি সংখ্যক মানুষ সুযোগ পেতেন।
২. প্রাণহানি: অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে হজ্জে প্রতি বছর পদদলিত হয়ে অসংখ্য মানুষ মারা যায়। অগ্নিকান্ড ও অন্যান্য প্রাণঘাতি দুর্ঘটনাও ঘটতে দেখা যায়। বিশেষ করে শয়তানকে পাথর মারার স্থানে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে। যারা কুরআনবিরোধী কাজ করে, আল্লাহর পক্ষ থেকে এটি তাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা।
৩. ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর অর্থ আত্মসাৎ: সীমিত সংখ্যক কোটা ও একচেটিয়া ব্যবসায়িক সুযোগের কারণে হজ্জ এজেন্সিগুলো হজ্জের মৌসুমে যাত্রীদের কাছ থেকে প্রচুর অর্থ আত্মসাৎ করে। আল্লাহর ইবাদতকে তারা ব্যবসার পণ্য বানিয়ে ফেলেছে।
৪. পশুর মাংসের অপচয়: প্রচলিত হজ্জে অল্প কয়েকদিনেই বিপুল সংখ্যক পশু কুরবানী করা হয়, যার পুরোটা খাওয়া বা বিতরণ করা সম্ভব হয় না। প্রচুর পরিমাণে কুরাবানীর মাংস ফেলে দেওয়া হয় অথবা নষ্ট হয়ে যায়। চার মাসব্যাপী হজ্জ হলে মাংস বিতরণ ও সংরক্ষণ করা সহজ হতো।
৫. মানসিক শান্তির অভাব: অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে ইবাদতের শান্তি ও মনোযোগের পরিবেশ নষ্ট হয়।
৬. নারীদের ওপর অবিচার: মাহরামের বাধ্যবাধকতার কারণে বহু নারী হজ্জ থেকে বঞ্চিত হয়, যাদের কোন মাহরাম নেই, মাহরাম অমুসলিম বা কোন কারণে মাহরাম যাদেরকে হজ্জের অনুমতি দেয়নি।
৭. রোগের বিস্তার: অত্যধিক ভিড়ের কারণে যেসকল লোক অনুন্নত দেশগুলো থেকে আসে তাদের থেকে সহজেই সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশংকা থাকে। ১৯৮৭ সালে হজ্জ থেকে মেনিনজাইটিসের সংক্রমণ শুরু হয়, যেটি পরবর্তীতে বৈশ্বিক মহামারীতে রূপ নেয়।
৮. চুরি-ছিনতাই: ভিড়ের মধ্যে প্রায়ই পকেটমার ও চোরদের উপদ্রব বৃদ্ধি পেতে দেখা। উদাহরণস্বরূপ ২০১০ সালে ৩২১ জন হজ্জযাত্রী পকেটমারের শিকার হয়েছিলেন।
শেষ কথা
কুরআনের নির্দেশনা অত্যন্ত সুস্পষ্ট: হজ্জ চারটি নির্দিষ্ট মাসে (যিলহজ্জ, মুহররম, সফর, রবিউল আউয়াল) পালন করতে হবে, যার উদ্দেশ্য একমাত্র আল্লাহর স্মরণ। হজ্জের সকল আচার-অনুষ্ঠান কুরআনে পরিপূর্ণভাবে বর্ণিত হয়েছে। দুঃখজনকভাবে, বহু মানবসৃষ্ট উদ্ভাবন ও কুসংস্কার ইবাদতটিকে মানুষের জন্য অত্যন্ত জটিল ও কষ্টকর করে তুলেছে।
একজন সত্যিকারের মুমিনের কর্তব্য হলো কুরআনের নির্দেশনার প্রতি আত্মসমর্পণ করা এবং মানবসৃষ্ট যেকোনো উদ্ভাবন, যার কোনো কুরআনিক ভিত্তি নেই তা পরিহার করা। হজ্জের প্রকৃত শিক্ষা হলো তাওহীদ, আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস ও তাঁরই ইবাদতে আত্মনিয়োগ। আসুন আমরা কুরআনের নির্দেশনা মেনে হজ্জ পালন করি এবং আল্লাহর বিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রদর্শন করি।
আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আ’লামিন – সমস্ত প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।