ইব্রাহিম কি হাজারাহ ও ইসমাইলকে মরুভূমিতে নিঃসঙ্গ অবস্থায় রেখে এসেছিলেন?

প্রচলিত ইসলামি সাহিত্যে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় গল্প হলো— নবী ইব্রাহিম তার স্ত্রী হাজারাহ এবং শিশুপুত্র ইসমাইলকে মক্কার এক জনমানবহীন মরুভূমিতে একাকী রেখে এসেছিলেন। কিন্তু আমরা যদি শুধুমাত্র কুরআনের দিকে তাকাই এবং কুরানকেন্দ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলো বিশ্লেষণ করি, তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি চিত্র ফুটে ওঠে।

কুরআনে ‘হাজারাহ’ নামটি একবারও উল্লেখ করা হয়নি। একইভাবে, ইসমাইল-কে শিশু অবস্থায় মরুভূমিতে একা ফেলে আসার কোনো বর্ণনাও কুরআনে নেই। এই পুরো গল্পটি মূলত বাইবেল এবং পরবর্তীকালের বিভিন্ন হাদিস ও তাফসির গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত। আমাদের জন্য সত্য-মিথ্যার চূড়ান্ত মাপকাঠি হলো কুরআন। যে কাহিনী কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক, তা আমাদের নিকট গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

যারা ইসমাইল-কে শিশু অবস্থায় মরুভূমিতে ফেলে আসার দাবি করেন, তারা মূলত সূরা ইব্রাহিমের ৩৭ নম্বর আয়াতটিকে দলিল হিসেবে পেশ করেন। অথচ এই আয়াতের শব্দগুলোই তাদের দাবির বিরোধিতা করে।

“হে আমাদের প্রতিপালক! আমি আমার বংশধরদের একটি অংশকে তোমার পবিত্র ঘরের সন্নিকটে চাষাবাদের অযোগ্য এক উপত্যকায় বসবাস করিয়েছি; হে আমাদের প্রতিপালক! যাতে তারা সালাত কায়েম করে। অতএব আপনি কিছু মানুষের অন্তর তাদের প্রতি অনুরাগী করে দিন এবং তাদেরকে ফল-ফলাদি দিয়ে জীবিকা দান করুন, যাতে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।”—(১৪:৩৭)

  • ‘আসকানতু’ (আমি বসবাস করিয়েছি): উক্ত আয়াতে দেখা যায় ইব্রাহিম এখানে ‘পরিত্যাগ করা’ বা ‘ফেলে আসা’ শব্দটি ব্যবহার করেননি। তিনি ‘আসকানতু’ (বসতি স্থাপন করানো) শব্দটি ব্যবহার করেছেন, যা একটি পরিকল্পিত ও স্থায়ী বসতি স্থাপনের ইঙ্গিত দেয়।
  • ‘গাইরি যি যারয়িন’ (চাষাবাদের অযোগ্য): এর অর্থ এলাকাটি কৃষি কাজের উপযোগী ছিল না। এর মানে এই নয় যে এলাকাটি জনমানবহীন মরুভূমি ছিল।
  • এলাকাটি জনশূন্য ছিল না: ইব্রাহিম দোয়া করেছিলেন যেন ‘কিছু মানুষের অন্তর’ তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়। যদি সেখানে কোনো মানুষের অস্তিত্বই না থাকত বা এলাকাটি যদি পুরোপুরি জনবিচ্ছিন্ন হতো, তবে এই দোয়ার কোনো যৌক্তিকতা থাকত না। এটি প্রমাণ করে যে, সেখানে ইতোমধ্যে লোকালয় বা মানববসতীর আস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল।

এই পয়েন্টটি প্রচলিত গল্পের ভিত্তিহীনতা প্রমাণের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি, কারণ এটি প্রচলিত ইতিহাসের টাইমলাইনকে পুরোপুরি ওলটপালট করে দেয়।

ক. ঘরটি তখন বিদ্যমান ছিল: ১৪:৩৭ আয়াতে ইব্রাহিম বলছেন, “তোমার পবিত্র ঘরের কাছে (ইন্দা বাইতিকা মুহাররাম)”। অর্থাৎ যখন ইব্রাহিম তাঁর বংশধরদের একটি অংশকে সেখানে বসবাস করাচ্ছিলেন, তখন ইবাদতের ঘরটি ইতোমধ্যে নির্মিত অবস্থায় সেখানে ছিল।

খ. ঘরটির নির্মাণকাজে ইসমাইলের অংশগ্রহণ ছিল: কুরআন স্পষ্ট করে বলেছে কারা এই ঘরটি তৈরি করেছিলেন:
“আর স্মরণ করো, যখন ইব্রাহিম ও ইসমাইল সেই ঘরের ভিত্তি উত্তোলন করছিল (এবং বলছিল): ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের পক্ষ থেকে এটি কবুল করো; নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ’।”—(২:১২৭)
এই আয়াত অনুযায়ী ইব্রাহিম ও ইসমাইল দুজনে মিলে ঘরটি নির্মাণ করেছিলেন। ঘরের ভিত্তি স্থাপন করা, পাথর বহন করা এবং দেওয়াল তোলার মতো ভারী শারীরিক পরিশ্রম করা কোনো দুগ্ধপোষ্য শিশুর পক্ষে সম্ভব নয়। এর অর্থ হলো, ইব্রাহিম যখন তার বংশধরদের একটি অংশকে ঘরটির নিকটে বসবাস করাচ্ছিলেন তখন ইসমাইল একজন কিশোর বা প্রাপ্তবয়স্ক যুবক ছিলেন।

গ. প্রচলিত গল্পের অসামঞ্জস্যতা: প্রচলিত গল্পে বলা হয়—প্রথমে শিশু ইসমাইলকে মরুভূমিতে ফেলে আসা হয়, তারপর বহু বছর পর ইব্রাহিম ফিরে এসে ইসমাইলকে সাথে নিয়ে ঘরটি তৈরি করেন। কিন্তু কুরআনের ১৪:৩৭ আয়াতে দেখা যাচ্ছে, ইব্রাহিম যখন তাঁর পরিবারের জন্য সেখানে বসতি স্থাপন করছিলেন, তখন ঘরটি ইতোমধ্যে তৈরি অবস্থায় ছিল (যা ২:১২৭ অনুযায়ী ইব্রাহিম ও ইসমাইল দুজন মিলে আগেই তৈরি করেছিলেন)।

সুতরাং, কুরআনের টাইমলাইন অনুযায়ী, ইসমাইল ঘর তৈরির সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি তখন আর শিশু ছিলেন না। ঘর তৈরি শেষ হওয়ার পরেই ইব্রাহিম তাঁর বংশধরদের একটি অংশকে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করে দিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন।

কুরআন বলছে: “নিশ্চয়ই মানবজাতির জন্য প্রথম যে ঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা বাক্কায় ; যা বরকতময় এবং বিশ্বজগতের জন্য পথপ্রদর্শক।”—(৩:৯৬)

কুরআনে বর্ণিত ‘বাক্কা’ এবং বর্তমান সৌদি আরবের ‘মক্কা’ কোনভাবেই এক স্থান নয়। ইব্রাহিম-এর সেই ইবাদতগৃহটি ছিল বাক্কায়। যেহেতু বর্তমান মক্কার কাবার সাথে ইব্রাহিমের সেই ঘরের কোন ভৌগোলিক সংযোগ নেই, তাই হাজারাহ ও ইসমাইলকে বর্তমান মক্কার মরুভূমিতে ফেলে আসার কাহিনীটি ভৌগোলিকভাবেও কুরআনের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

কুরআনের অকাট্য আয়াতগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইব্রাহিম কখনোই তাঁর পরিবারের সদস্যদেরকে অসহায় অবস্থায় কোনো মরুভূমিতে ফেলে আসেননি। বরং তিনি তাঁর পরিবারের একটি অংশকে পবিত্র স্থানে বসতি স্থাপন করিয়েছিলেন।