যারা বলে কুরআনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হাদিসগুলো মানতে হবে

(মূল লেখা: hadithcriticblog.com)

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম প্রচলিত হাদিস শাস্ত্র এবং শিয়া ও সুন্নি ধর্মতত্ত্বের ত্রুটিগুলো বুঝতে পারছে, এবং তাদের পূর্বপুরুষদের দ্বীন ছেড়ে ‘একমাত্র কুরআন’ – মতবাদ গ্রহণ করছে। তবে এই ধারার পাশাপাশি আরো একটি ধারার উত্থান দেখা যাচ্ছে – যারা মনে করে সমস্ত হাদিস ফেলে দেওয়া যাবে না। কুরআনের মানদণ্ডে হাদিসগুলোকে যাচাই করে দেখতে হবে এবং যেসকল হাদিস কুরআন বিরোধী নয় সেগুলো মানা যাবে।

আপাতদৃষ্টিতে তাদের এই মতবাদ যৌক্তিক মনে হলেও, এই মতবাদ বেশ কিছু স্ববিরোধিতা এবং সমস্যার জন্ম দেয়। মূলত তাদের এই মতাদর্শ প্রচলিত হাদিস মূল্যায়নের পদ্ধতিকে নির্ভরযোগ্য করার পরিবর্তে বরং আরও অকার্যকর করে তুলতে পারে।

‘কুরআনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হাদিসগুলো মানা যাবে’ -এই মতবাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো – হাদিসের বিশুদ্ধতা নির্ভর করে তাদের যার যার ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার উপর।

উদাহরণস্বরূপ: যারা ধর্মত্যাগী বা মুরতাদকে মৃত্যুদন্ড দেওয়ার বিপক্ষে তারা এই আয়াতটি সামনে আনেন: “দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই”(২:২৫৬)।

অন্যদিকে যারা মুরতাদ হত্যার হাদিসগুলো বিশুদ্ধ মনে করেন তারা সামনে আনেন সূরা মায়েদার ৩৩ নং আয়াতটি।

অর্থাৎ, একই হাদিস কারো নিকট গ্রহণযোগ্য আবার কারো নিকট জাল শুধুমাত্র কুরআনের ব্যাখ্যায় পার্থক্য থাকার কারণে।

এই মতবাদ অনুযায়ী একজন ব্যক্তি যেরকম বিশ্বাস লালন করে, তার নিকট কুরআনের ব্যাখ্যা ঠিক সেরকমই হয়। তারপর তার নিজস্ব ব্যাখ্যার সাথে মিললে তারা হাদিসকে সহীহ বলে রায় দেয়।

ধরুন, একজন ব্যক্তি ভুলবশত বিশ্বাস করেন যে—’আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট পুরো ভারতবর্ষ (এমনকি বাংলাও) জয় করেছিলেন’ (যদিও ঐতিহাসিকভাবে তিনি কেবল ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত পর্যন্ত এসেছিলেন)। এখন যদি সেই ব্যক্তি একটি জাল বা ভিত্তিহীন প্রাচীন নথি পান যেখানে লেখা আছে— “আলেকজান্ডার বাংলার রাজাকে পরাজিত করে বাংলা দখল করেছিলেন”, তবে তিনি ভাববেন: এটি তো আমার ঐতিহাসিক জ্ঞানের সাথেই মিলে যাচ্ছে যে আলেকজান্ডার পুরো ভারত জয় করেছিলেন; সুতরাং, এই দলিলটি অবশ্যই খাঁটি এবং বিশুদ্ধ! কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তার মূল বিশ্বাসটিই ভুল ছিল, তাই তার দলিলের সত্যতা যাচাইটিও ভুল হবে।

পরিমাপের ফিতাতেই যদি সমস্যা থাকে, তবে ফলাফলতো ভুলই আসবে।

আমাদের ফেসবুক, ইউটিউব এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইটগুলো থেকে বহুবার প্রমাণ করা হয়েছে যে প্রচলিত হাদিস যাচাইয়ের মূলনীতিগুলো কেন পুরোপুরিভাবে কার্যকর নয়। তবুও, সুন্নি এবং শিয়ারা অন্তত হাদিসের ঐতিহাসিক সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা করে। হাদিসের সনদ, মতন, রাবী সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে তারা হাদিসকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করে।

অন্যদিকে, যারা বলে আমরা শুধু কুরআনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হাদিসগুলো মানি, তারা হাদিস যাচাইয়ের এই কঠিন পদ্ধতিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে। অর্থাৎ, একটি হাদিস আসলেই রাসুলের পক্ষ থেকে এসেছে কিনা তার কোনো ঐতিহাসিক দলিল তাদের কাছে থাকে না।

ফলস্বরূপ, নবীর যুগের ২০০, ৪০০ এমনকি ৬০০ বছর পরে তৈরি করা হাদিসকেও তারা সহীহ বলে মেনে নেয় যদি তা কুরআনের সাথে মিলে যায়। এই মতবাদের ভয়াবহ দিকটি হলো – যে কেউ যেকোনো সময় দয়া, দানশীলতা, উদারতা ও নৈতিক আচরণ নিয়ে নবীর নামে হাদিস বানিয়ে ছড়িয়ে দিতে পারে, কারণ এগুলো কুরআনের কোনো ফিল্টারে আটকাবে না। যারা কুরআনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হাদিসগুলো মানতে হবে বলে দাবি করে – তাদের ধর্মতত্ত্বে এই জালিয়াতিগুলো ধরার কোনো উপায় নেই!

যারা মনে করে যেসকল হাদিস কুরআনের সাথে মিলে যায় সেগুলো প্রকৃতপক্ষেই নবীর বাণী, তারা মূলত সেই কথাগুলোর উপর নবুয়তি কর্তৃত্ব আরোপ করছে, কোনোরূপ ঐতিহাসিক দলিল-প্রমাণ ছাড়াই।

অন্যদিকে তারা যদি মনে করে হাদিসগুলো নবীর পক্ষ থেকে এসেছে কিনা সেই ব্যাপারে তারা সন্দিহান- তবে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে তারা ধর্মীয় আলোচনায় কেন হাদিসগুলোকে টেনে আনছে?

আল্লাহ কি কুরআনে বললেননি: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিক অনুমান থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই কিছু কিছু অনুমানতো পাপ।“(৪৯:১২) ?

আমরা যখন কোনো সুন্নি বা শিয়া ধর্মাবলম্বীকে জিজ্ঞাসা করি: সহীহ হাদিসের সংখ্যা কত বা হাসান হাদিসের সংখ্যা কত – তখন তারা কখনোই সঠিক উত্তরটি দিতে পারে না। যারা মনে করেন কুরআনের সাথে মিললেই হাদিস গ্রহণযোগ্য – তারাও ঠিক একই ফাঁদে পা দিয়েছেন। তাদেরকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় গ্রহণযোগ্য হাদিসের সংখ্যা কত বা কতগুলো হাদিস কুরআনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ তবে তারাও এর কোনো সঠিক উত্তর দিতে পারবেন না।

সর্বোপরি, আল্লাহ যদি কুরআনকেই পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন হিসেবে ঘোষণা করেন, তবে কুরআনের বাইরে ধর্ম খোঁজার আর কি প্রয়োজনীয়তা থাকতে পারে?

[১৬:৮৯] “আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনা, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ।“