হাদিস না থাকলে আমরা কীভাবে জানতাম কুরআন সংরক্ষিত হয়েছে কিনা?

যারা কুরআনের বিরুদ্ধে গিয়ে মানব-রচিত বিধানের পক্ষে ওকালতি করে, তাদের খুব কমন একটি যুক্তি হলো: “হাদিস ছাড়া কুরআনের সত্যতা প্রমাণ করা অসম্ভব।”

তাদেরকে একটি সহজ প্রশ্ন করতে চাই – আপনারা যখন কোনো অমুসলিমকে ইসলামের দাওয়াত দেন, তখন তার হাতে কুরআন তুলে দেন নাকি বুখারি শরীফ?—অবশ্যই কুরআন। কারণ আপনারা ভালো করেই জানেন, কোনো অমুসলিমকে বুখারি শরীফ পড়তে দিলে সে আর জীবনেও ইসলাম গ্রহণ করবে না। এভাবে শুধুমাত্র কুরআন দেখিয়ে একজন অমুসলিমকে মুসলিম বানানোর পর আপনারা তার ওপর শত-শত, হাজার-হাজার হাদিস-ফিকাহ আর ফতোয়ার বোঝা চাপিয়ে দেন।

এখানে আমাদের প্রশ্ন হলো—হাদিস ছাড়া কুরআন বোঝা যদি অসম্ভবই হয়, তাহলে কীভাবে হাদিসের সাহায্য ছাড়াই শুধুমাত্র কুরআন পড়ে অমুসলিমরা ইসলাম গ্রহণ করে?

বাস্তবতা হলো, একজন অমুসলিম কুরআন পড়ার পর নিজে থেকেই বুঝে নেন যে এটি সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে আগত। তারপর তিনি এই কিতাব যার ওপর নাযিল হয়েছে, অর্থাৎ মুহাম্মদ-এর ওপর ঈমান আনেন। অপরদিকে আমরা যারা জন্মগত মুসলিম, তারা সাধারণত আগে মুহাম্মদ ও তাঁর নবুয়তের কাহিনি শুনি, তারপর তাঁর ওপর নাযিলকৃত কিতাবের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করি।

প্রকৃত সত্য হলো—কুরআন একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ কিতাব। এটিকে আল্লাহর বাণী হিসেবে প্রমাণ করার জন্য দ্বিতীয় কোনো উৎসের প্রয়োজন হয় না। বরং মানব রচিত হাদিসগুলোই বারবার কুরআনের বিশুদ্ধতা ও প্রামাণিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এসেছে। যে কারণে দেখা যায়, প্রকৃত ঈমানদারদের নিকট হাদিসের প্রয়োজনীয়তা না থাকলেও কুফফারদের নিকট হাদিসগুলো খুবই জনপ্রিয়।

নিচে কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া হলো যে কীভাবে মানবরচিত হাদিসগুলো কুরআনের সংরক্ষণ ও সত্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে:

  • ব্যভিচারীকে রজম (পাথর মেরে হত্যা) করার আয়াত এবং প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে দশবার বুকের দুধ পান করিয়ে মাহরাম বানানোর আয়াত কুরআনের অংশ ছিল। কিন্তু নবীর মৃত্যুর পর আয়েশার অসতর্কতায় একটি ছাগল এসে সেই আয়াতগুলো খেয়ে ফেলে। (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস ১৯৪৪)
  • নবী একবার কুরাইশদের সামনে কুরআন তিলাওয়াত করার সময় সুরা আন-নাজমের মাঝখানে লাত, উজ্জা ও মানাত দেবীর সুপারিশ করার ক্ষমতা আছে স্বীকার করে কিছু আয়াত পাঠ করে ফেলেন। পরে জিবরীল এসে তাঁকে সংশোধন করে দেন। ইতিহাসে এটি “কিসসাতুল গারানীক” বা “স্যাটানিক ভার্সেস” নামে পরিচিত। (তারিখ আল-তাবারী, খণ্ড ৬)
  • খলিফা উসমান কুরআনের অতিরিক্ত কপিগুলো পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। (সহীহ বুখারী ৪৯৮৭)
  • কুরআনের অংশ হিসেবে, প্রথমে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে দশবার স্তন্যপান করিয়ে মাহরাম বানানোর একটি আয়াত নাযিল হয়। পরে তা রহিত করে দিয়ে পাঁচবার স্তন্যপান করিয়ে মাহরাম বানানোর আরেকটি আয়াত নাযিল হয়। কিন্তু কুরআনে এই দুটি আয়াতের কোনোটিই খুঁজে পাওয়া যায় না। (সহীহ মুসলিম ১৪৫২a)
  • কুরআনে সুরা বারাআত (সুরা তাওবা)-এর সমান দৈর্ঘ্যের আরেকটি সুরা ছিল, কিন্তু তার একটি লাইন ছাড়া বাকি পুরো অংশ সবাই ভুলে গেছে। (সহীহ মুসলিম ১০৫০)
  • কুরআনের অংশ হিসেবে মুসাব্বিহাত সুরাগুলোর মতো আরেকটি সুরা পাঠ করা হতো। (মুসাব্বিহাত বলতে সেই সুরাগুলোকে বোঝায় যেগুলো ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘সাব্বাহা’ বা ‘ইউসাব্বিহু’ দিয়ে শুরু হয়—যেমন সুরা হাদীদ, হাশর, সাফ, জুমু‘আ, তাগাবুন, আ‘লা ইত্যাদি)। কিন্তু পরবর্তীতে সেই সুরাটির দুটি বিচ্ছিন্ন আয়াত বাদে বাকি পুরো অংশ সবাই ভুলে গিয়েছিল। (সহীহ মুসলিম ১০৫০)
  • বি’রে মাউনার শহীদদের ওপর আল্লাহর সন্তুষ্টির ঘোষণা দিয়ে নবীর ওপর একটি আয়াত নাযিল হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে তার তিলাওয়াত রহিত হয়ে যায়। (সহীহ বুখারী ২৮১৪, ৪০৯৫; সহীহ মুসলিম ৬৭৭a)

কুরআনের মতো শাশ্বত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি কিতাবের বিশুদ্ধতা প্রমাণ করতে গোঁজামিল ও অন্তর্দ্বন্দ্বে পরিপূর্ণ হাদিস মানতে হবে—এমন কথা তারাই বলে যাদেরকে আল্লাহ বিবেক-বুদ্ধি থেকে বঞ্চিত করে রেখেছেন; এবং এই ধরনের ব্যক্তিদের ওপর আল্লাহ অপবিত্রতা চাপিয়ে দিয়েছেন (১০:১০০)। আল্লাহ যেন আমাদেরকে তাদের মতো হওয়া থেকে হিফাযত করেন।