‘হদ’ বলতে কী বোঝায় এবং এর বাস্তবায়নের ডাক কতটা প্রাসঙ্গিক?

প্রশ্ন: বর্তমান সময়ে আমরা প্রায়ই ‘হদ’ বা ‘হুদুদ-আল্লাহ’ (Hudood Allah) শব্দগুলো শুনতে পাই। বিশেষ করে যারা শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠার পক্ষপাতী তারা প্রায়ই সমাজে “হদ” কায়েম বা বাস্তবায়নের ডাক দেন। এই বিষয়ে কুরআন কী বলে বিস্তারিত জানতে চাই।

উত্তর: আজকাল মুসলিম সমাজে ‘হদ’ এবং ‘হুদুদ-আল্লাহ’ শব্দগুলো যে অর্থে ব্যবহৃত হয়, তা কুরআনে বর্ণিত অর্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বর্তমানে প্রায়ই দাবি করা হয় যে, এই শব্দগুলোর অর্থ হলো— বড় বড় পাপের জন্য আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত ‘শাস্তি’। আর এ কারণেই অনেকে জোর দিয়ে বলেন যে, অপরাধীদের ওপর অবশ্যই এই ‘হদ’ (শাস্তি) প্রয়োগ করতে হবে। কিন্তু কুরআনের আলোকে এটিই কি এই শব্দগুলোর সঠিক অর্থ? এর উত্তর হলো— না!

কুরআনে ব্যবহৃত ‘হুদুদ’ (Hudood) শব্দটি হলো ‘হদ’ (Hadd) শব্দের বহুবচন। কুরআনে এর অর্থ কোনোভাবেই “শাস্তি” হয় না! বরং এর প্রকৃত অর্থ হলো “আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা” (Limits set by God), যা অতিক্রম না করার জন্য সকল মুমিনকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে।

এই অর্থটিকে আরও স্পষ্ট করার জন্য কুরআন থেকে কয়েকটি উদাহরণ দেখা যাক:

প্রথম উদাহরণ:

কুরআনের সূরা আন-নিসার ১২ নম্বর আয়াতে (৪:১২) উত্তরাধিকার সংক্রান্ত কিছু আইনের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। সেখানে স্বামী-স্ত্রী, পুত্র-কন্যা, মা, ভাই-বোন প্রমুখের সম্পদের অংশ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এই আইনগুলোর বর্ণনার ঠিক পরেই আমরা দেখতে পাই:

[৪:১৩-১৪] “এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা (হুদুদ)। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে, আল্লাহ তাকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার তলদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত হয়; সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। আর এটিই মহা সাফল্য। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য হবে এবং তাঁর নির্ধারিত সীমা (হুদুদ) লঙ্ঘন করবে, আল্লাহ তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন; সেখানে সে চিরকাল থাকবে এবং তার জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর শাস্তি।”

লক্ষ করুন, ৪:১২ আয়াতে বর্ণিত উত্তরাধিকার আইনগুলোর ঠিক পরেই বলা হয়েছে, “এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা।” ৪:১৪ আয়াতেও একই কথার পুনরাবৃত্তি হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, ৪:১২ আয়াতে কি এমন কোনো শাস্তির কথা বলা হয়েছে যাকে ‘হুদুদ’ বলে আখ্যায়িত করা যায়? উত্তর হলো— না! সেখানে আমরা কেবল আল্লাহর নির্ধারিত কিছু আইন (উত্তরাধিকার বন্টন সংক্রান্ত) দেখতে পাই, যে সীমাগুলো অতিক্রম না করার জন্য আল্লাহ মুমিনদেরকে সতর্ক করেছেন। আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করা অবশ্যই একটি পাপ এবং এর জন্য আল্লাহর কাছে শাস্তি পেতে হবে। কিন্তু এই আয়াতগুলোতে কোনোভাবেই মানুষের মাধ্যমে প্রয়োগযোগ্য কোনো শাস্তির কথা বলা হয়নি।

দ্বিতীয় উদাহরণ:

[৬৫:১] “হে নবী! তোমরা যখন নারীদেরকে তালাক দাও, তখন তাদের ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে তালাক দিও এবং ইদ্দতের হিসেব রেখো। আর তোমাদের রব আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা তাদেরকে তাদের ঘর থেকে বের করে দিও না এবং তারাও যেন বের না হয়, যদি না তারা স্পষ্ট কোনো অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়। আর এগুলোই হচ্ছে আল্লাহর নির্ধারিত সীমা (হুদুদ)। যে ব্যক্তি আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করে, সে মূলত নিজের ওপরই জুলুম করে। তুমি জানো না, হয়তো আল্লাহ এরপর কোনো নতুন উপায় বের করে দেবেন।”

সূরা তালাকের প্রথম আয়াতে তালাক সংক্রান্ত বেশ কিছু আইন দেওয়া হয়েছে, বিশেষ করে ইদ্দত পূরণ এবং তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে তার বাড়ি থেকে বের করে না দেওয়ার সুরক্ষামূলক আইন। এই আইনগুলো বর্ণনা করার পরপরই আল্লাহ আবারও তাঁর ‘হুদুদ’ বা ‘সীমা’ লঙ্ঘন করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন।

এখানেও যদি আমরা লক্ষ্য করি, ৬৫:১ আয়াতে কি এমন কোনো শাস্তির কথা উল্লেখ আছে যাকে ‘হুদুদ’ বলা যেতে পারে? আবারও এর উত্তর হলো— না। এখানে আমরা কেবল আল্লাহর নির্ধারিত কিছু সীমানা বা বিধি-নিষেধ দেখতে পাই, যা কোনোভাবেই লঙ্ঘন করা উচিত নয়।

কুরআনে আরও এমন অনেক আয়াত রয়েছে, যেগুলো একই উপসংহার প্রতিষ্ঠিত করে। আর তা হলো— ‘হুদুদ’ শব্দটি মানুষের ওপর প্রয়োগযোগ্য কোনো শাস্তি নির্দেশ করে না, বরং এটি হলো আল্লাহর বেঁধে দেওয়া সীমা বা বিধি-নিষেধ, যা অতিক্রম করা থেকে মানুষকে বিরত থাকতে হবে।

কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো মুসলিম সমাজে, ‘হুদুদ-আল্লাহ’ শব্দটিকে যে শুধু ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে তা নয়, বরং শরিয়া আইন বাস্তবায়নের নামে মুসলিম দেশগুলোতে  যেসব অযাচিত শাস্তি বাস্তবায়ন হতে দেখা যায়, সেগুলোর অধিকাংশেরই কোনো ভিত্তি বা অনুমোদন কুরআনে পাওয়া যায় না! তথাকথিত “শরিয়া আইন” থেকে উদ্ভূত এসব শাস্তির সিংহভাগের সাথেই পবিত্র কুরআনের কোনো সম্পর্ক নেই।