ভালো কাজ করলে নাস্তিকরা কি জান্নাতে যেতে পারবে?

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—যদি কোনো নাস্তিক বা অবিশ্বাসী ব্যক্তি জীবনে প্রচুর ভালো কাজ করেন এবং মানুষের উপকার করেন তবে কি তিনি জান্নাতে যেতে পারবেন? আল্লাহ যদি দয়াময় ও ন্যায়বিচারক হন, তবে তিনি কেন একজন ভালো মানুষকে শুধু তার অবিশ্বাসের কারণে জান্নাত থেকে বঞ্চিত করবেন?

কুরআন ও যুক্তি দিয়ে আমরা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করবো।

প্রথমত, ভালো কাজ করা বা মানুষের উপকার করা কোনো অতিপ্রাকৃত বা অস্বাভাবিক বিষয় নয়। আল্লাহ তা’য়ালা মানুষের নফস বা আত্মাকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন, যাতে সে স্বভাবগতভাবেই ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে পারে। তাই একজন মানুষ হিসেবে ভালো কাজ করাটা আমাদের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই পড়ে। কুরআনে আল্লাহ বলেন:

“শপথ মানুষের আত্মার এবং যিনি একে সুঠাম করেছেন। অতঃপর তিনি তাকে তার পাপ ও পুণ্য সম্পর্কে জ্ঞান দান করেছেন। নিশ্চয়ই সে-ই সফলকাম হয়েছে, যে তার আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে। এবং সে-ই ব্যর্থ হয়েছে, যে তাকে কলুষিত করেছে।” [৯১:৭-১০]

সুতরাং, একজন নাস্তিক যখন ভালো কাজ করে, তখন সে মূলত মানুষ হিসেবে তার সহজাত বৈশিষ্ট্যেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। কিন্তু একজন মানুষ যখন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বে অবিশ্বাস করে, এবং সত্য প্রকাশিত হওয়ার পরও তা প্রত্যাখ্যান করে তখন সেটা স্রষ্টার প্রতি ঔদ্ধত্য প্রদর্শন ছাড়া আর কিছুই নয়।

আল্লাহ তা’য়ালা অযথা আসমান-যমিন সৃষ্টি করেননি।
আকাশ, পৃথিবী এবং এ দুয়ের মধ্যবর্তী কোনো কিছুই আমি খেলাচ্ছলে সৃষ্টি করিনি। আমি যদি ক্রীড়া-কৌতুক করতে চাইতাম, তবে তা আমি আমার নিজের কাছ থেকেই করতাম; যদি আমাকে তা করতেই হতো। বরং আমি সত্য দিয়ে মিথ্যার ওপর আঘাত হানি, ফলে তা মিথ্যার মস্তক চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় এবং মিথ্যা তাৎক্ষণিকভাবে বিলুপ্ত হয়। আর তোমরা (আল্লাহ সম্পর্কে) যা বলছ, তার জন্য তোমাদের দুর্ভোগ! [২১:১৬-১৮]

স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাসহীন মানুষদের জীবন কার্যত অর্থহীন। তাদের কাছে মানুষ ও জীবজগত কেবল বহু শতাব্দীর বিবর্তনে তৈরি হওয়া কতিপয় প্রাণহীন জৈব-রাসায়নিক বস্তু। জীবনের একটা পর্যায়ে গিয়ে তাদের মনে হয় – আসলে এই জীবনের উদ্দেশ্য কী বা লক্ষ্য কী। যার কারণে নাস্তিকদের মধ্যে ডিপ্রেশন ও আত্মহত্যার প্রবণতাও বেশি দেখা যায়।

কুরআনের দৃষ্টিতে কেউ না জানার কারণে ভুল ধর্ম বা ভুল বিশ্বাস লালন করলে তাকে কাফির বলা যায় না। কিন্তু একজন ব্যক্তির নিকট যখন সত্য প্রকাশিত হয়, তারপরও হঠকারিতার বশবর্তী হয়ে সে তা অস্বীকার করে তখন সে অবিশ্বাসী বা কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। ইন্টারনেট, স্যাটেলাইট ও স্মার্টফোনের এই যুগে কেউ সঠিক ও সত্য জানা থেকে বঞ্চিত থাকবে এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তাই আজ যারা কুরআনের প্রকৃত সত্য জানার পরেও তা অস্বীকার করছে তা কেবল তাদের গোঁড়ামি ও অহংকারের বহিঃপ্রকাশ।

সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস সমাজে শৃঙ্খলা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে। সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করে নিজের খেয়ালখুশি মতো জীবনযাপন করা মূলত সত্যের বিরুদ্ধে এক ধরনের বিদ্রোহ। যিনি আপনাকে এই জীবন ও ভালো কাজ করার সামর্থ্য দিয়েছেন, তাঁকে অস্বীকার করার চেয়ে বড় অপরাধ আর কিছু হতে পারে না।

কুরআন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, আল্লাহ এবং পরকালের প্রতি বিশ্বাস ছাড়া করা সমস্ত ভালো কাজ বাতিল বলে গণ্য হবে। যদিও চূড়ান্ত বিচার কেবল আল্লাহর হাতে এবং তিনিই অন্তরের প্রকৃত খবর ভালো জানেন, তবুও কুরআনের আয়াত অনুযায়ী, পরকালে বিশ্বাস ব্যতীত কাজের কোনো ওজন থাকবে না।

১. “আর তোমাদের মধ্য থেকে যে তার দ্বীন থেকে ফিরে যাবে এবং কাফির অবস্থায় মারা যাবে, দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের আমলসমূহ নিষ্ফল হয়ে যাবে। আর তারাই জাহান্নামের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে।” —[২:২১৭]

২. “আর যারা আমার আয়াতসমূহ ও আখিরাতের সাক্ষাতকে অস্বীকার করে, তাদের আমলসমূহ নিষ্ফল হয়ে যায়। তারা যা করত, তা ছাড়া অন্য কিছুর প্রতিফল কি তাদের দেওয়া হবে?” —[৭:১৪৭]

৩. “যারা তাদের রবকে অস্বীকার করে, তাদের দৃষ্টান্ত হলো, তাদের আমলসমূহ ছাইয়ের মতো; ঝড়ের দিনে বাতাস যাকে প্রবল বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়। তারা যা অর্জন করেছে, তার কিছুই তারা নিজেদের আয়ত্তে রাখতে পারে না। এটাই চরম পথভ্রষ্টতা।” —[১৪:১৮]

৪. “এরাই তারা, যারা তাদের রবের আয়াতসমূহ এবং তাঁর সাথে সাক্ষাতকে অস্বীকার করেছে। ফলে তাদের আমলসমূহ নিষ্ফল হয়ে গেছে। তাই কিয়ামতের দিন আমি তাদের (আমলের) জন্য কোনো ওজন নির্ধারণ করব না।” —[১৮:১০৫]

সারসংক্ষেপ: আল্লাহ তা’য়ালা মানুষকে স্বভাবগতভাবেই ভালো ও মন্দের পার্থক্য করার সক্ষমতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। একজন মানুষ ভালো কাজ করবে—এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু যিনি এই জীবন, বিবেক এবং ভালো কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন, সেই স্রষ্টাকে অস্বীকার করা হলো চরম অকৃতজ্ঞতা। কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী, পরকালে জান্নাত পাওয়ার প্রধান শর্ত হলো সৃষ্টিকর্তার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস (ঈমান) এবং তাঁর প্রতি সমর্পিত হওয়া। স্রষ্টাকে অস্বীকার করে কেবল ভালো কাজ করা জান্নাতে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।