গাযালা আল শাইবানিয়া: কুরআনের পথে শহীদ হওয়া এক নারীর গল্প

সপ্তম শতাব্দীর শেষভাগ। আরবের তপ্ত মরুভূমি আর মেসোপটেমিয়ার উর্বর জমিতে তখন উমাইয়া খিলাফতের জয়জয়কার। দামেস্কের প্রাসাদে বসে উমাইয়া শাসকরা মুসলিম বিশ্বের বিশাল অংশ শাসন করছিলেন। স্পেন থেকে সিন্ধু পর্যন্ত বিস্তৃত এই সাম্রাজ্য ছিল তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সত্তাগুলোর একটি। কিন্তু এই বাহ্যিক জৌলুসের আড়ালে ইরাকের আকাশ ছিল ভারী আর বিষণ্ণ। কুফা ও বসরার সরু গলিতে মানুষ ফিসফিসিয়ে কথা বলত—কারণ প্রকাশ্য রাজপথে শাসকের সমালোচনা করার অর্থ ছিল প্রাণ সংশয়।

ইসলামের প্রাথমিক যুগে নেতৃত্ব নির্ধারিত হতো ‘শুরা’ বা পরামর্শের ভিত্তিতে, যেখানে বংশীয় পরিচয়ের চেয়ে ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও কুরআনের প্রতি আনুগত্য ছিল প্রধান। খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগ শেষ হওয়ার পর ৬৬১ খ্রিস্টাব্দে মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান ক্ষমতায় এসে উমাইয়া বংশের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন এবং বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের সূচনা করেন।

উমাইয়া শাসনামলে আরবীয় আভিজাত্যের প্রাধান্য ছিল। তারা বিশ্বাস করত শাসনের অধিকার কেবল আরবদের, বিশেষ করে কুরাইশ বংশের। পারস্য, মেসোপটেমিয়া বা সিন্ধু অঞ্চল থেকে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন—যাদের বলা হতো ‘মাওয়ালি’ বা অনারব মুসলমান—তারা অনেক ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হতেন। সেনাবাহিনীতে তাদের পদমর্যাদা ছিল সীমিত, এবং কিছু সময়ে তাদের ওপর বাড়তি কর আরোপের ঘটনাও ঘটেছিল। যার ফলে সেই সময়টাতে ইরাকের কুফা ও বসরা নগরী হয়ে উঠেছিল উমাইয়াদের বিরুদ্ধে মুক্তচিন্তা ও বিদ্রোহের কেন্দ্র।

ঠিক এই প্রেক্ষাপটে, ইরাকের মসুল অঞ্চল থেকে আবির্ভূত হন এক দম্পতি—শাবিব ইবনে ইয়াজিদ আল শাইবানি এবং তার স্ত্রী গাযালা আল শাইবানিয়া। যারা ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছেন জালিমের বিরুদ্ধে লড়াই করা এক বিদ্রোহী সেনাপতি ও এক সাহসী নারী যোদ্ধা হিসেবে।

প্রথম অধ্যায়: পটভূমি—উমাইয়া রাজবংশের শাসন

৬৬১ খ্রিস্টাব্দে মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান ক্ষমতায় এসে উমাইয়া বংশের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি তাঁর পুত্র ইয়াজিদকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করার মাধ্যমে বংশানুক্রমিক শাসনের সূচনা করেন। বিখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন তাঁর ‘মুকাদ্দিমা’-তে এই পরিবর্তনকে ‘খিলাফত থেকে রাজতন্ত্রে’ (মুলক) রূপান্তর হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, উমাইয়ারা ধর্মীয় আদর্শের চেয়ে গোত্রীয় শক্তি বা ‘আসাবিয়্যাহ’কে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল।

উমাইয়া শাসনামলে আরবীয় আভিজাত্যের প্রাধান্য ছিল। তারা বিশ্বাস করত শাসনের অধিকার কেবল আরবদের, বিশেষ করে কুরাইশ বংশের। অনারব মুসলিমরা সম্রাজ্যের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে গণ্য হতেন। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, এই বৈষম্য পরবর্তীকালে উমাইয়া শাসনের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ইরাকের কুফা ও বসরা ছিল বিভিন্ন গোত্র ও অঞ্চলের মানুষের মিলনস্থল। সেখানে মুক্তচিন্তা ও সমালোচনার পরিবেশ গড়ে উঠেছিল। উমাইয়া খলিফারা এই অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে রাখতে সেখানে কঠোর স্বভাবের গভর্নরদের নিয়োগ দিতেন। মানুষের বাকস্বাধীনতা ছিল সীমিত, এবং শাসন-বিরোধী মতামত প্রকাশ করা ছিল বিপজ্জনক। তবুও প্রতিবাদের ধারা কখনো সম্পূর্ণ দমিত হয়ে যায়নি।

দ্বিতীয় অধ্যায়: হাজ্জাজ বিন ইউসুফ—এক নিষ্ঠুর শাসকের উপাখ্যান

হাজ্জাজ বিন ইউসুফ আল-সাকাফির জন্ম ৬৬১ খ্রিস্টাব্দে তায়েফের এক দরিদ্র পরিবারে। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি শিক্ষকতা করতেন। তাঁর অসাধারণ বাগ্মিতা, প্রখর বুদ্ধি এবং কঠোর চরিত্র তাঁকে উমাইয়া দরবারে দ্রুত খলিফা আব্দুল মালিকের প্রিয়পাত্র করে তোলে। ৬৯২ খ্রিস্টাব্দে তিনি হিজাজের গভর্নর নিযুক্ত হন এবং ৬৯৪ খ্রিস্টাব্দে ইরাক ও পূর্বাঞ্চলের গভর্নর পদে উন্নীত হন।

৬৯৪ খ্রিস্টাব্দে হাজ্জাজ যখন প্রথমবার কুফায় পৌঁছান, তিনি মিম্বরে দাঁড়িয়ে এক ভাষণ দেন যা ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে আছে। আল-তাবারির বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি বলেন:

  • “হে ইরাকবাসী! আমি তোমাদের কাঁধের ওপর এমন সব মাথা দেখতে পাচ্ছি যা পাকা ফসলের মতো ঝুলে আছে। আর আমিই সেই কাস্তে যা দিয়ে ওগুলো কাটা হবে!”

এই ভাষণটি হাজ্জাজের কঠোর চরিত্রের প্রতীক হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেয়েছে। তিনি আরও ঘোষণা করেন যে তিনি এমন শাসক যার হৃদয় পাথরের মতো কঠিন, এবং তিনি বিদ্রোহ বা অশান্তি বরদাশত করবেন না।

৬৯২ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া খলিফা আব্দুল মালিক হাজ্জাজকে পাঠান মক্কায় আশ্রয় নেওয়া প্রতিদ্বন্দ্বী আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়েরকে দমন করতে। আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের ছিলেন ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর-এর নাতি। তিনি উমাইয়া শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন এবং নিজেকে মুসলিম বিশ্বের প্রকৃত খলিফা বলে ঘোষণা করেছিলেন। মক্কা, মদিনা ও হেজাজের অধিকাংশ মানুষ তার পক্ষে ছিল।

হাজ্জাজ প্রাথমিকভাবে প্রায় দুই হাজার সিরিয়ান সৈন্য নিয়ে মক্কা অবরোধ করেন। তিনি মক্কার উঁচু পাহাড় ‘আবু কুবায়স’-এর ওপর ক্যাটাপল্ট স্থাপন করেন এবং কাবা শরীফের দিকে পাথর নিক্ষেপ শুরু করেন। ঐতিহাসিক সূত্র মতে, হজের পবিত্র দিনগুলোতেও এই আক্রমণ বন্ধ ছিল না।

অবরোধের চরম পর্যায়ে ইবনে যুবায়েরের বেশিরভাগ সঙ্গীরা একে একে তাকে ছেড়ে চলে যান। তখন তিনি তার বৃদ্ধা মা আসমা বিনতে আবু বকর-এর কাছে পরামর্শ চান। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, তার মা তাকে বলেন:

  • “যদি তুমি সত্যের ওপর থাকো, তবে সম্মানের সাথে মৃত্যুবরণ করো। কিন্তু যদি দুনিয়ার লালসায় লড়ে থাকো, তবে তুমি এক নিকৃষ্ট দাস।”

ইবনে যুবায়ের কাবার চত্বরে যুদ্ধ করতে করতে নিহত হন। তার মৃত্যুর পর হাজ্জাজ তার মৃতদেহ থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করে তা দামেস্কে উমাইয়া খলিফার নিকট পাঠায়, আর তার দেহ ক্রুশবিদ্ধ করে মক্কার সামনে ঝুলিয়ে রাখা হয়—একটি ঘটনা যা পরবর্তীকালে হাজ্জাজের প্রতি মানুষের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। কিছুদিন পর খলিফা অনুমতি দিলে ইবনে যুবায়েরের মৃতদেহ নামিয়ে দাফন করা হয়।

তৃতীয় অধ্যায়: উমাইয়াদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহসমূহ

উমাইয়া শাসনের শুরু থেকেই তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আকারে অসন্তোষ প্রকাশ পেতে থাকে। এর মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিদ্রোহ হলো:

কারবালার যুদ্ধ (৬৮০ খ্রি.) : নবী মুহাম্মদ-এর দৌহিত্র হুসাইন ইবনে আলি উমাইয়া খলিফা ইয়াজিদের বংশানুক্রমিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। ফোরাত নদীর তীরে কারবালার প্রান্তরে তাঁর ছোট দলটিকে অবরুদ্ধ করে নিহত করা হয়। এই ঘটনা উমাইয়াদের প্রতি গভীর ক্ষোভ সৃষ্টি করে এবং পরবর্তী অনেক বিদ্রোহের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।

তাওওয়াবিনের বিদ্রোহ (৬৮৪-৬৮৫ খ্রি.) : হুসাইনের শাহাদাতের পর কুফাবাসীরা অপরাধবোধ থেকে সুলাইমান ইবনে সুরদের নেতৃত্বে বিদ্রোহ করে। তারা নিজেদের ‘তাওওয়াবিন’ (তওবাকারী) বলে। সামরিকভাবে পরাজিত হলেও এই বিদ্রোহ ছিল উমাইয়াদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অন্তরে জমা ক্ষোভের প্রমাণ।

মুখতার আল-সাকাফির বিদ্রোহ (৬৮৫-৬৮৭ খ্রি.) : কুফায় মুখতার বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তার আন্দোলনের বিশেষ দিক ছিল অনারব মুসলমানদের আরবদের সমান মর্যাদা দেওয়ার ঘোষণা।

ইবনে আশআসের বিদ্রোহ (প্রায় ৭০০-৭০১ খ্রি.) : এটি ছিল উমাইয়াদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সামরিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। বিদ্রোহে ইরাকি সৈন্য, অভিজাত গোষ্ঠী এবং ‘কুররা’ (কুরআন পাঠক) নামে পরিচিত ধার্মিক ব্যক্তিরা যোগ দিয়েছিলেন। হাজ্জাজ এই বিদ্রোহ কঠোরভাবে দমন করেন।

ঐতিহাসিক এম. এ. শাবানের মতে, এসব বিদ্রোহের পেছনে ধর্মীয় মতভেদের পাশাপাশি রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ইরাক-সিরিয়া ক্ষমতা সংগ্রামের জটিল কারণ কাজ করেছিল।

চতুর্থ অধ্যায়: খারিজি আন্দোলন—শাবিবিয়াদের স্থান

‘খারিজি’ শব্দের অর্থ ‘যারা বেরিয়ে গেছে’। ৬৫৭ খ্রিস্টাব্দে সিফফিনের যুদ্ধে হযরত আলী ও মুআবিয়ার মধ্যে রাজনৈতিক মীমাংসার চেষ্টা হলে একদল সৈন্য এই মধ্যস্থতা মেনে নিতে অস্বীকার করে এবং আলাদা হয়ে যায়। তাদের স্লোগান ছিল—“লা হুকমা ইল্লা লিল্লাহ” (আল্লাহর বিধান ছাড়া আর কারো হুকুম চলবে না)।

খারিজিরা কখনো একক সুসংগঠিত দল ছিল না; বরং বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত ছিল। ইতিহাসে তাদের চারটি প্রধান শাখার কথা জানা যায়:

আযারিকা (চরমপন্থী) : তাদের সাথে ধর্মীয় বিষয়ে একমত নয় এমন লোকদের তারা কাফির ও হত্যাযোগ্য মনে করত।

নাজদাত (কট্টরপন্থী) : তারা আযারিকাদের তুলনায় কিছুটা কম উগ্রপন্থী ছিল।

ইবাদিয়া (উদারপন্থী) : তারা ছিল অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও মধ্যপন্থী। আজও তাদের একটি অংশ ওমানে শান্তিতে বসবাস করছে।

সুফরিয়া (প্রগতিশীল) : শাবিব ও গাযালার দল ‘শাবিবিয়া’রা এই ধারার অন্তর্ভুক্ত ছিল।

খারিজিদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল, তারা সবকিছুর ওপর কুরআনকে প্রাধান্য দিতো। সন্দেহযুক্ত হওয়ায় অধিকাংশ (বা প্রায় সব) হাদিস পরিত্যাগ করতো। তারা বংশ বা গোত্রের ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্ধারণের বিরোধী ছিল। সকল মুসলমান—আরব হোক বা অনারব—নেতৃত্বের জন্য সমান যোগ্য বলে তারা মনে করত। এই মতাদর্শ উমাইয়া শাসনের ‘আরব আভিজাত্য’ নীতির সরাসরি বিপরীতে ছিল।

শাবিবিয়াদের মতাদর্শের কিছু দিক ছিল তৎকালীন সমাজে উল্লেখযোগ্য। মধ্যযুগীয় পণ্ডিত আব্দুল কাহির আল-বাগদাদি তাঁর ‘আল-ফারক বাইনাল ফিরাক’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে সুফরিয়া ধারার অনুসারীরা নারী নেতৃত্বকে বৈধ মনে করত।

খারিজি আন্দোলন সম্পর্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—খারিজিরা নারী-পুরুষের সমতার পক্ষে মত দিয়েছিল এবং নারীরা সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের অধিকার রাখে বলে মনে করত। কিছু খারিজি উপদল নারীদের জন্য নামাজের ইমাম হওয়ার অধিকারকেও বৈধ বলে গণ্য করত। এই চিন্তাধারাই পরবর্তীতে শাবিবিয়াদের মতাদর্শের ভিত্তি তৈরি করে।

পঞ্চম অধ্যায়: শাবিব ইবনে ইয়াজিদ—বিদ্রোহের সূচনা

শাবিব ইবনে ইয়াজিদ আল-শাইবানি জন্মেছিলেন ৬৪৬ বা ৬৪৭ খ্রিস্টাব্দে। তিনি মসুল বা পার্শ্ববর্তী সাতিদামা গ্রামে বড় হন। তিনি প্রথমে উমাইয়া সামরিক বাহিনীতে কাজ করতেন, কিন্তু পরে হাজ্জাজের কঠোর শাসন চরম আকার ধারণ করলে শাবিব বিদ্রোহের পথ বেছে নেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ আছে।

তিনি প্রথমে যোগ দেন ধর্মপ্রাণ তপস্বী সালিহ ইবনে মুসাররিহের দলে। ৬৯৫ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বরে মসুল অঞ্চলে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হয়। আল-মুদ্দাবাজ গ্রামের প্রথম যুদ্ধে সালিহ নিহত হলে শাবিব নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় ‘শাবিবিয়া’ নামে পরিচিত বিদ্রোহী বাহিনীর ইতিহাস।

শাবিব ছিলেন একজন সাহসী যোদ্ধা ও দক্ষ সেনাপতি। আধুনিক ইতিহাসবিদ কার্ল ভিলহেল্ম জেটারস্টিন তাঁকে “নির্ভীক গেরিলা নেতা” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি ছোট দল নিয়ে গেরিলা কৌশলে উমাইয়া বাহিনীকে বারবার পরাজিত করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে শাবিবিয়া বাহিনী ইরাকে উমাইয়া শাসনের জন্য এক গুরুতর হুমকিতে পরিণত হয়।

ষষ্ঠ অধ্যায়: গাযালা আল শাইবানিয়া

গাযালা আল-শাইবানিয়া ছিলেন শাবিব ইবনে ইয়াজিদের স্ত্রী। নারী হয়েও সামরিকক্ষেত্রে তার কীর্তি এতটাই অসাধারণ ছিল যে আল-তাবারি, ইবনে খাল্লিকান প্রমুখ ঐতিহাসিকরা তাকে নিয়ে লিখেছেন।

গাযালা ছিলেন এক সাহসী নারী যোদ্ধা। তিনি ঘোড়ার পিঠে চড়ে যুদ্ধের ময়দানে সক্রিয় ছিলেন—একটি বিষয় যা তৎকালীন সমাজে ছিল বিরল। আল-তাবারি ও ইবনে খাল্লিকানের বর্ণনায় গাযালার নাম এসেছে বিদ্রোহী বাহিনীর এক শক্তিমান যোদ্ধা হিসেবে।

গাযালা শুধু যুদ্ধে অংশগ্রহণই করেননি, তিনি সৈন্য পরিচালনাও করতেন। তিনি সৈন্যদের নেতৃত্ব দিতেন এবং রণকৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। কিছু বর্ণনা অনুযায়ী, তার সাথে শাবিবের মাও যুদ্ধে অংশ নিতেন—একটি পরিবারের তিন সদস্য একসাথে অত্যাচারী শাসনের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন।

শাবিবিয়ার বাহিনীতে গাযালার উপস্থিতি সৈন্যদের মনোবল বাড়িয়ে দিত—কারণ সৈন্যরা দেখত একজন নারীও যদি এত ত্যাগ স্বীকার করতে পারেন, তবে পুরুষদের পিছিয়ে থাকার কোন সুযোগ নেই।

সপ্তম অধ্যায়: শাবিবিয়াদের নারী নেতৃত্বের মতাদর্শ

শাবিবিয়াদের সবচেয়ে বৈপ্লবিক দিক ছিল নারী নেতৃত্বের প্রতি তাদের মনোভাব। ইতিহাসের অন্যান্য অধিকাংশ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর তুলনায় শাবিবিয়ারা নারীদের নেতৃত্বের ক্ষেত্রে অসাধারণ উদারতা দেখিয়েছিল।

তারা নারীদের গভর্নর বা শাসনকর্তা হওয়ার অধিকারকে বৈধ বলে সমর্থন করত। নাজাহ ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এক গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে: “শাবিবিয়াদের মধ্যে নারী গভর্নরের বৈধতা উত্থাপনের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যা এই গোষ্ঠীটিকে খারিজি ধারার অন্যান্য শাখা থেকে আলাদা করেছে”।

ইতালীয় উইকিপিডিয়ার বর্ণনা অনুযায়ী, “শাবিবিয়াদের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল নারীর রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব গ্রহণ করা। তাদের চিন্তাধারার একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ছিল যে—সেরা মুসলমান কে হবে তা নির্ধারণে বর্ণ, আইনি অবস্থা বা লিঙ্গের ভিত্তিতে কোনো বাধা থাকবে না; কেবল নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বই মাপকাঠি হবে”।

খারিজি আন্দোলনের নারী বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে লেখা এক সমালোচনামূলক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে, খারিজিরা নারীদের সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের অধিকার সমর্থন করত এবং কিছু উপদল নারী ইমাম হওয়ার অধিকারও স্বীকার করত। শাবিবিয়ারা ছিল এই চিন্তাধারার সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ।

আল-বাগদাদির ‘আল-ফারক বাইনাল ফিরাক’ গ্রন্থেও উল্লেখ আছে যে শাবিবিয়ারা মনে করত, যদি কোনো নারী যোগ্য হন এবং শত্রু দমনে সক্ষম হন, তাহলে তার ইমামত বা খিলাফত বৈধ। তারা কেবল তত্ত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না—গাযালার নেতৃত্বে তারা এটি বাস্তবায়নও করে দেখিয়েছিল।

শাবিবিয়াদের এই মতাদর্শ তৎকালীন সমাজে এক যুগান্তকারী অবস্থান ছিল। সপ্তম শতাব্দীতে, উমাইয়া শাসনামলে যখন নারীদেরকে হেরেমে বন্দি করার চেষ্টা চলছিল, তখন শাবিবিয়ারা ঘোষণা করেছিল যে যোগ্যতা থাকলে একজন নারীও সমাজের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব দিতে পারেন, এমনকি মুসলিম বিশ্বের খলিফাও হতে পারেন।

অষ্টম অধ্যায়: শাবিবিয়াদের রণকৌশল

শাবিব ও গাযালার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বাহিনী ‘শাবিবিয়া’ নামে পরিচিত। তারা সংখ্যায় ছিল অল্প—কয়েকশ থেকে হাজারের কম। অথচ তাদের বিরুদ্ধে উমাইয়া বাহিনী ছিল বহুগুণ বড়। এই বিপুল সংখ্যাগত বৈষম্য সত্ত্বেও শাবিবিয়ারা একাধিক যুদ্ধে জয়লাভ করেছিল। তাদের সাফল্যের রহস্য ছিল রণকৌশলে।

যেখানে উমাইয়ারা বিশাল পদাতিক বাহিনী ও ভারী বর্মের ওপর নির্ভর করত, সেখানে শাবিবিয়ারা নির্ভর করত গতি, অকস্মাৎ আক্রমণ ও নিখুঁত লক্ষ্যভেদের ওপর। তারা ছিল অশ্বারোহী গেরিলা যোদ্ধা। তারা রাতের আঁধারে বা ভোরের আলোয় আক্রমণ চালাত এবং শত্রু সংগঠিত হওয়ার আগেই সরে যেত।

আল-তাবারি ও ইবনুল আসিরের বর্ণনায় শাবিবিয়াদের বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সামরিক সাফল্যের কথা পাওয়া যায়:

মসুলের প্রথম সংঘর্ষ (৬৯৫ খ্রি.) : অল্প সংখ্যক যোদ্ধা নিয়ে তারা বহুগুণ বড় উমাইয়া বাহিনীকে পরাজিত করে। এই বিজয় শাবিবিয়াদের নাম ছড়িয়ে দেয় এবং আরও অনেক বিদ্রোহী তাদের সাথে যোগ দেয়।

রুধবারের যুদ্ধ (৬৯৬ খ্রি.) : ২০০ জন যোদ্ধা নিয়ে তারা উমাইয়া সেনাপতি আত্তাব বিন ওয়ারাকার বাহিনীকে পরাজিত করে। আত্তাব নিহত হন এবং উমাইয়া বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়।

মাদায়েন অভিযান : প্রায় ৬০০ জন যোদ্ধা নিয়ে তারা প্রাচীন পারস্যের রাজধানী মাদায়েন দখল করে। এটি উমাইয়া খিলাফতের জন্য ছিল এক বিরাট চপেটাঘাত।

কুফার সীমান্ত যুদ্ধ : উমাইয়া বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করা হয়। কুফা ছিল ইরাকের প্রধান সামরিক ঘাঁটি, এবং শাবিবিয়াদের পক্ষে এই শহরের জন্য হুমকি সৃষ্টি করা একটি বড় অর্জন ছিল।

শাবিবিয়াদের সাফল্যের আরেকটি কারণ ছিল নারী যোদ্ধাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। গবেষক মোহাম্মদ আলেসা তাঁর গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেছেন: “খারিজিদের সাধারণভাবে এবং বিশেষ করে শাবিবিয়াদের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। শাবিব একা নন; তাঁর দলে আরও একজন সেনাপতি ছিলেন, যার বীরত্বের গান ইতিহাসবিদরা গেয়েছেন। এই সহনেতা কোন পুরুষ ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন তারই স্ত্রী, গাযালা আল শাইবানিয়া।”

নবম অধ্যায়: কুফা অভিযান ও হাজ্জাজের পলায়ন

৬৯৬ খ্রিস্টাব্দটি ছিল শাবিব ও গাযালার বিদ্রোহের চূড়ান্ত পর্যায়। এই বছরেই তারা তাদের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান পরিচালনা করে—কুফা দখলের অভিযান। কুফা ছিল ইরাকের রাজনৈতিক ও সামরিক কেন্দ্র এবং হাজ্জাজের শাসনের মূল ঘাঁটি। এই শহর দখল করতে পারলে উমাইয়া শাসনের কেন্দ্রেই আঘাত হানা সম্ভব হতো।

গাযালার নেতৃত্বে শাবিবিয়া বাহিনী কুফার দিকে অগ্রসর হয়। পথিমধ্যে তারা উমাইয়া বাহিনীর একাধিক প্রতিরোধ ভেঙে দিয়ে এগিয়ে যায়। গাযালা নিজে সৈন্যদের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। এই আক্রমণের মুখে হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ—সেই হাজ্জাজ যার নামে ইরাকের মানুষ কাঁপত, যিনি কাবার দিকে পাথর ছুড়েছিলেন—কুফার সুরক্ষিত রাজপ্রাসাদে (দারুল ইমারা) গিয়ে আত্মগোপন করেন। প্রাসাদের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এই ঘটনা ছিল অভূতপূর্ব। উমাইয়া সাম্রাজ্যের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সেনাপতি একজন নারীর সামরিক অভিযানের সামনে পালিয়ে গেলেন। লেইলা আহমেদ তাঁর ‘Women and Gender in Islam’ গ্রন্থে এই ঘটনার উল্লেখ করেছেন এবং এটিকে গাযালার বীরত্বের একটি অসাধারণ উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

এই ঘটনার পর ইরাকি কবি ইমরান ইবনে হিত্তান হাজ্জাজকে লক্ষ্য করে একটি ব্যাঙ্গাত্মক কবিতা রচনা করেন: ”তুমি তো সাধারণ সময়ে আমার সামনে সিংহের বেশে থাকো, কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে উটপাখির মতো ভীরু—কেন তুমি গাযালার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বেরিয়ে এলে না?—তোমার হৃদয় কি পাখির ডানায় ভর দিয়ে উড়ে চলে গেছে?”

গাযালা কুফার যুদ্ধের আগে একটি মানত করেছিলেন—যদি তিনি কুফা জয় করতে পারেন, তবে তিনি কুফার জামে মসজিদে দাঁড়িয়ে কুরআনের দীর্ঘতম দুটি সূরা তিলাওয়াত করে নামাজ আদায় করবেন। বিখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে খাল্লিকান তার ‘ওয়াফায়াতুল আইয়ান’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন—যুদ্ধ জয়ের পর গাযালা পূর্ণ সামরিক পোশাকে কুফার জামে মসজিদে প্রবেশ করেন এবং তার মানত অনুযায়ী কুরআনের দীর্ঘতম দুটি সূরা ‘আল-বাকারা’ ও ‘আলে ইমরান’ তিলাওয়াত করেন।

দশম অধ্যায়: হাজ্জাজের পাল্টা আক্রমণ

কুফা থেকে পালিয়ে হাজ্জাজ দামেস্কে খলিফা আব্দুল মালিকের কাছে জরুরি সাহায্য চান। খলিফা তার সাহায্যে অতিরিক্ত সিরিয়ান সৈন্য পাঠান। এবারের উমাইয়া বাহিনী ছিল বিশাল ও শক্তিশালী। কুফার উপকণ্ঠে দুই বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। সংখ্যায় শাবিবিয়াদের তুলনায় হাজ্জাজের বাহিনী ছিল কয়েকগুণ বেশি। হাজ্জাজ জানতেন সরাসরি তলোয়ার যুদ্ধে শাবিবিয়াদের হারানো কঠিন; তাই তিনি দূর থেকে তীর নিক্ষেপের কৌশল অবলম্বন করেন।

শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধে গাযালা আল শাইবানিয়া শহীদ হন। শাবিবিয়ারা পিছু হটতে বাধ্য হয়।

ঐতিহাসিক সূত্র মতে, যুদ্ধ শেষে হাজ্জাজের এক সৈন্য গাযালার মৃতদেহ থেকে তার মাথা বিচ্ছিন্ন করে হাজ্জাজের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য রওনা হয়। এই সংবাদ পেয়ে শাবিব এক ঘোড়সওয়ার পাঠিয়ে সেই সৈন্যকে হত্যা করেন এবং তার স্ত্রীর মাথাটি উদ্ধার করতে সমর্থ হন। পরে তিনি তার স্ত্রীর মৃতদেহ যথাযথভাবে দাফনের ব্যবস্থা করেন।

একাদশ অধ্যায়: শাবিবিয়াদের পরিণতি

গাযালার মৃত্যুর পর শাবিবিয়ারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। এরপর তার স্বামী শাবিব আরও প্রায় এক বছর ধরে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যান। তিনি ছোট দল নিয়ে গেরিলা লড়াই চালান, কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অভাবে বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ে।

৬৯৭ বা ৬৯৮ খ্রিস্টাব্দে আহওয়াজ অঞ্চলের দুজায়েল নামক খাল পার হওয়ার সময় শাবিবের ঘোড়া পিছলে যায়। ভারী বর্ম পরিহিত থাকায় তিনি সাঁতরে তীরে উঠতে পারেননি এবং ডুবে মারা যান।

শাবিবের মৃত্যুর সাথে সাথে শাবিবিয়া আন্দোলনের প্রধান অংশ ভেঙে পড়ে। যদিও তারা বিক্ষিপ্ত ভাবে পরবর্তী আরও কয়েকদশক ধরে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ অব্যাহত রাখে।

দ্বাদশ অধ্যায়: শেষ ইতিহাস

গাযালা ও শাবিবিয়াদের বিদ্রোহ দমিত হলেও উমাইয়া খিলাফতের শিকড়ে ফাটল ধরেছিল। অনারব মুসলমানদের প্রতি বৈষম্য, করের বোঝা এবং শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতা ধীরে ধীরে একটি বৃহৎ বিরোধী শক্তি গড়ে তোলে।

শেষ পর্যন্ত খোরাসান (বর্তমান ইরান-আফগানিস্তান) থেকে আব্বাসীয় বিপ্লব শুরু হয়। আব্বাসীয় পরিবারের নেতৃত্বে এবং সেনাপতি আবু মুসলিমের হাতে উমাইয়া শাসনের অবসান ঘটে। জাব নদীর যুদ্ধে শেষ উমাইয়া খলিফা মারওয়ান দ্বিতীয় পরাজিত ও নিহত হন। আব্বাসীয়রা উমাইয়া পরিবারের প্রায় সকল সদস্যকে হত্যা করে; কেবল আব্দুর রহমান নামক একজন উমাইয়া রাজপুত্র স্পেনে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন এবং সেখানে কর্ডোবার আমিরাত প্রতিষ্ঠা করেন।

আব্বাসীয়রা ক্ষমতায় আসার পর বাগদাদ হয়ে ওঠে বিজ্ঞান, দর্শন ও সংস্কৃতির কেন্দ্র। আল-খোয়ারিজমি, ইবনে সিনা ও আল-বেরুনির মতো বিজ্ঞানীরা এই যুগের ফসল। আর সেই স্বর্ণযুগের নেতৃত্বে ছিল মুতাযিলা সম্প্রদায়, যারা যুক্তিবাদ ও কুরআনকে দ্বীনের সর্বোচ্চ মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করত।