অমুসলিমদের সাথে বন্ধুত্ব

[৩:২৮] “মুমিনরা যেন মুমিনদের পরিবর্তে কাফিরদেরকে মিত্র(আওলিয়া) না বানায়।“

[৫:৫১] “হে ঈমানদারগণ, তোমরা ইহুদি এবং খ্রিস্টানদেরকে মিত্র(আওলিয়া) হিসেবে গ্রহণ কোরোনা। তাদের কেউ কেউ একে অপরের বন্ধু।“

অনেকসময়, উক্ত আয়াত দুটি দেখিয়ে দাবি করা হয় কোনো মুসলিম কোনো অমুসলিম বা ভিন্নধর্মালম্বীকে অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে পারবে না। কিন্তু কুরআনের শুধুমাত্র একটি আয়াত পড়ে এভাবে ফতোয়া দিয়ে দেয়া কোনোভাবেই সঠিক নয়। ওই আয়াতের আগে পরে কী লেখা আছে সেগুলোও পড়তে হয়। এবং, ওই টপিক রিলেটেড কুরআনে যতগুলো আয়াত আছে, সবগুলো মিলিয়ে এরপর একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়।

আল্লাহ যেখানে আহলে কিতাবের নারীদের বিয়ে করা বৈধ করেছেন সেখানে একজন সাধারণ আহলে-কিতাবের সাথে বন্ধুত্ব করা যাবে না -এমনটা হতে পারে না।

[৫:৫] “আজ তোমাদের জন্য বৈধ করা হলো সকল ভাল বস্তু; আর যাদেরকে কিতাব প্রদান করা হয়েছে, তাদের খাবার তোমাদের জন্য বৈধ এবং তোমাদের খাবার তাদের জন্য বৈধ। আর (বৈধ করা হলো) বিশ্বাসী সচ্চরিত্রা নারীদের এবং তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে (ইহুদি ও খ্রিস্টান), তাদের সচ্চরিত্রা নারীদের, যখন তোমরা তাদেরকে মোহরানা প্রদান করো বিবাহকারী হিসেবে।“

একজন অমুসলিমকে মিত্র/আওলিয়া হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না কেবল তখনই,যখন সে ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী হয় এবং ইসলাম ও মুসলিমদেরকে নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রুপ করে। এই ব্যাপারটিও আল্লাহ সুরা মায়েদায় স্পষ্ট করে দিয়েছেন।

[৫:৫৭] “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে যারা তোমাদের দ্বীনকে হাসি-তামাসা ও খেলার বস্তু মনে করে তাদেরকে এবং কাফিরদেরকে মিত্র (আওলিয়া) রূপে গ্রহণ করো না। আর আল্লাহকে ভয় কর যদি তোমরা মুমিন হও।“

প্রকৃতপক্ষে,কুরআনের কোথাও সাধারণ বন্ধু বোঝাতে আওলিয়া শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি। কুরআনে যত জায়গায় আওলিয়া শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে তার সকল ক্ষেত্রেই একটি রাজনৈতিক সংঘাত বা প্রতিকূল পরিস্থিতির ইঙ্গিত রয়েছে। [৩:২৮] আয়াতে বলা হয়েছে ‘মুমিনদের পরিবর্তে কাফিরদেরকে মিত্র না বানাতে’। একজন ঈমানদার স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মুমিনদের বাদ দিয়ে শুধুমাত্র কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব করছে এমনটা কি কখনো হতে পারে? অর্থাৎ আয়াতের ভাষ্য থেকে এটা স্পষ্ট যে আওলিয়া শব্দটি এখানে ‘সাধারণ বন্ধু’ না বুঝিয়ে ‘রাজনৈতিক মিত্র’/’Political ally’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

কুরআনে বন্ধু বা সঙ্গী বোঝাতে আরো অনেক শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন:

  • খলিল (অন্তরঙ্গ বন্ধু) [৪:১২৫]
  • রফিক (সঙ্গী) [৪:৬৯]
  • ক্বারিন (অন্তরঙ্গ সঙ্গী) [৪৩:৩৬]
  • সাহিব (সাথী) [১২:৩৯]

কিন্তু, কুরআনে যত জায়গায় আল্লাহ ইহুদি-খ্রিস্টান ও কাফিরদের সাথে মিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধ হতে নিষেধ করেছেন সকল ক্ষেত্রেই শুধুমাত্র ‘আওলিয়া’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এবং সকল ক্ষেত্রেই ‘আওলিয়া’ শব্দের সঠিক অর্থ হয় রাজনৈতিক মিত্র/অভিভাবক/রক্ষাকর্তা প্রভৃতি।

আরো একটা বিষয় এখানে ক্লিয়ার থাকা দরকার যে, ভিন্নধর্মালম্বী মানেই কাফির নয়। ইহুদি-খ্রিস্টানদের মধ্যে যারা সৃষ্টিকর্তা ও কিতাবে বিশ্বাস করে তারাও মুসলিম(সমর্পণকারী)[২৮:৫২-৫৩]। কুরআনে সরাসরি ‘কাফির’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে সাধারণত তাদের ক্ষেত্রে যারা সত্যটা বুঝতে পারার পরেও আল্লাহর বাণী অস্বীকার করেছে [২:৩৪, ২:২১৭]।

যাদের সাথে ইসলাম ও মুসলিমদের কোনো শত্রুতা নেই তাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করায় কোনো অসুবিধা নেই।

[৬০:৮] “দীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেনি, আর তোমাদেরকে তোমাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয়নি তাদের সঙ্গে সদয় ব্যবহার করতে আর ন্যায়নিষ্ঠ আচরণ করতে আল্লাহ নিষেধ করেন না। নিশ্চই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদেরকে ভালবাসেন।“