পবিত্র কুরআনের ২৪ নং সূরা আন-নূরের ৩০ নং আয়াতে বিশ্বাসী পুরুষদেরকে এবং ৩১ নং আয়াতে বিশ্বাসী নারীদেরকে তাদের দৃষ্টি অবনত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
[২৪:৩০] “মুমিন পুরুষদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে।…”
[২৪:৩১] “আর মুমিন নারীদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে।…”
অনেকেই এই নির্দেশের অর্থ ভুলভাবে গ্রহণ করে—তারা মনে করে এই আয়াতগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ নারী-পুরুষের মধ্যে যেকোনো ধরনের দেখা-সাক্ষাৎ বা কথোপকথন নিষিদ্ধ করেছেন।
কিন্তু কুরআনের আরও অনেকগুলো আয়াত থেকে এটি স্পষ্ট হয় যে এখানে দৃষ্টি অবনত রাখার প্রকৃত অর্থ হলো: বিপরীত লিঙ্গের দিকে কামনা-বাসনা বা কুপ্রবৃত্তির দৃষ্টিতে না তাকানো।
১. মূসা নবীর সাথে শুয়াইবের কন্যাদের সাক্ষাৎ
[২৮:২৩] “যখন তিনি মাদইয়ানের কূপের কাছে পৌঁছলেন, সেখানে একদল লোককে পশুদের পানি পান করাতে দেখলেন এবং তাদের পেছনে দেখলেন দুইজন নারীকে, যারা তাদের পশুগুলোকে আগলে রাখছিল। তিনি বললেন, ‘তোমাদের সমস্যা কী?’ তারা বলল, ‘রাখালরা তাদের পশুদের সরিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত আমরা পানি পান করাতে পারি না। আর আমাদের পিতা অতি বৃদ্ধ।’”
[২৮:২৫] “অতঃপর নারীদ্বয়ের একজন লজ্জাবনত চরণে তাঁর কাছে এল এবং বলল, ‘আমার পিতা আপনাকে ডাকছেন, যাতে তিনি আমাদের পশুদের পানি পান করানোর বিনিময় আপনাকে দিতে পারেন।’ অতঃপর মূসা যখন তাঁর কাছে এসে সব ঘটনা বর্ণনা করলেন, তখন তিনি বললেন, ‘ভয় কোরো না, তুমি জালিম সম্প্রদায়ের কবল থেকে মুক্তি পেয়েছ।’”
এখানে আমরা দেখতে পাই যে মূসা নবী সরাসরি দু’জন অপরিচিত নারীর সাথে কথা বলেছেন (নারী দুজন ছিলেন শুয়াইবের কন্যা), তাদের সমস্যার কথা জিজ্ঞেস করেছেন এবং পরে তাদের একজন তাঁর সাথে আবারও কথা বলতে এসেছেন। যদি পুরুষের জন্য নারীর সাথে কথা বলা নিষিদ্ধ হতো, তাহলে একজন নবী এমনটি করতেন না।
২. যাকারিয়া ও মরিয়ম-এর সম্পর্ক
[৩:৩৭] “অতঃপর তার পালনকর্তা তাকে সুন্দরভাবে গ্রহণ করলেন এবং তাকে উত্তম রূপে লালন-পালন করলেন। আর তাকে (মরিয়মকে) যাকারিয়ার তত্ত্বাবধানে দিলেন। যখনই যাকারিয়া তার কক্ষে প্রবেশ করতেন, তখনই তার কাছে খাবার দেখতে পেতেন। তিনি বললেন, ‘হে মারইয়াম, এসব তুমি কোথায় পেলে?’ তিনি বললেন, ‘এসব আল্লাহর পক্ষ থেকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অপরিমিত রিযিক দান করেন।’”
যাকারিয়া ছিলেন একজন পুরুষ নবী, অপরদিকে মরিয়ম ছিলেন একজন নারী। তবুও যাকারিয়া নিয়মিত তার কক্ষে যাতায়াত করতেন এবং কথাবার্তা বলতেন। এটি প্রমাণ করে যে প্রয়োজনে ও নির্ধারিত সীমার মধ্যে নারী-পুরুষের যোগাযোগ ও দেখা-সাক্ষাৎ সম্পূর্ণ বৈধ।
৩. একসঙ্গে খাওয়ার অনুমতি
[২৪:৬১] “…তোমরা আহার করবে তোমাদের ঘরে, তোমাদের পিতাদের ঘরে, তোমাদের মাতাদের ঘরে, তোমাদের ভাইদের ঘরে, তোমাদের বোনদের ঘরে, তোমাদের চাচাদের ঘরে, তোমাদের ফুফুদের ঘরে, তোমাদের মামাদের ঘরে, তোমাদের খালাদের ঘরে অথবা সেই সব ঘরে যার চাবি তোমাদের অধিকারে আছে অথবা তোমাদের বন্ধুদের ঘরে। তোমাদের জন্য কোনো দোষ নেই যে, তোমরা একসাথে খাবে বা পৃথকভাবে।…“
এই আয়াতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে পুরুষ ও নারী (বন্ধু হিসেবে) একসাথে খেতে পারে (আরবি ভাষায় তোমরা/তোমাদের ইত্যাদি বহুবচন নারী-পুরুষ উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে)। যদি নারী-পুরুষের সব ধরনের মিথস্ক্রিয়া নিষিদ্ধ হতো, তাহলে কুরআনে তাদেরকে একসঙ্গে খাওয়ার অনুমতি দেওয়া হতো না।
৪. সকলকে সালাম প্রদানের নির্দেশ
[৬:৫৪] “আর যখন তারা তোমার কাছে আসে, যারা আমার আয়াতসমূহে বিশ্বাস করে, তখন তুমি বলো: ‘তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক (সালামুন আলাইকুম)।’…”
এ আয়াতে আল্লাহ মুহাম্মদ-কে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, বিশ্বাসীদের মধ্যে যারাই তাঁর কাছে আসবে (নারী বা পুরুষ যেই হোক না কেন), তাদের সবাইকে যেন তিনি সালাম দেন। এখানে লিঙ্গভেদে সালাম বা অভিবাদনের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয়নি।
কামনার দৃষ্টি থেকে বিরত থাকা
মানুষ হিসেবে আমরা কেউই জৈবিক কামনা-বাসনা থেকে মুক্ত নই। তবে আমাদের উচিত এই মানবীয় প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং যদি কখনো বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা। যেমনটি করেছিলেন নবী ইউসুফ:
[১২:৩৩] “তিনি বললেন, ‘হে আমার পালনকর্তা! তারা (রাজপ্রাসাদের নারীরা) আমাকে যার দিকে আহ্বান করছে, তার চেয়ে কারাগার আমার কাছে বেশি প্রিয়। আর আপনি যদি তাদের চক্রান্ত আমার থেকে সরিয়ে না নেন, তবে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ব এবং মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।’”
কুরআনের সামগ্রিক আলোচনা থেকে আমরা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি যে দৃষ্টি অবনত রাখার উদ্দেশ্য হলো হৃদয়ের কুমন্ত্রণা ও কামনা-বাসনা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা। অর্থাৎ যদি কারও মনে কোনো কুচিন্তা আসে বা কামনার ভাব জাগ্রত হয়, তখন সে যেন তার দৃষ্টি সরিয়ে নেয় এবং নিজেকে সংযত করে।
কুরআনের মূল উদ্দেশ্য নারী ও পুরুষের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব তৈরি করা নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও নৈতিক সীমানা বজায় রেখে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণ করা।
[৯:৭১] “আর বিশ্বাসী পুরুষ ও বিশ্বাসী নারীরা একে অপরের মিত্র (আওলিয়া)। তারা সৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎকাজে নিষেধ করে, সালাত কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। এরাই তারা, যাদের ওপর আল্লাহ অচিরেই দয়া করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।”