কুরআনকে আল্লাহ কোনো ক্যালেন্ডার বানাননি যে তা দিন বা মাসের নাম তালিকাভুক্ত করবে। যে তথ্য মানুষের কাছে ঐতিহাসিকভাবেই পরিচিত (যেমন: সপ্তাহের ৭ দিনের নাম বা বছরের ১২ মাসের নাম), আল্লাহ তা পুনরায় কুরআনে বলার প্রয়োজন মনে করেননি। তবে ধর্মীয় বিধি-বিধান পালনের জন্য প্রয়োজনীয় সকল তথ্য আল্লাহ কুরআনে যথাযথভাবেই দিয়েছেন।
নামসমূহ কে নির্ধারণ করেন?
কুরআন অনুযায়ী, সবকিছুর নাম আল্লাহ নিজেই নির্ধারণ করেছেন এবং মানুষকে সেগুলো শিখিয়েছেন। মারিয়াম বা নবী যাকারিয়া জানতেন না তাদের সন্তানদের নাম কী হবে, আল্লাহই তা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন (৩:৪৫ ও ১৯:৭)।
[২:৩১] আর তিনি আদমকে সমস্ত নাম শিক্ষা দিলেন তারপর তা ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করলেন। অতঃপর বললেন, ‘তোমরা আমাকে এগুলোর নাম জানাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও’।
এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, মাসের নামগুলোও আল্লাহর পক্ষ থেকেই নির্ধারিত। সেই হিসেবেই আরবি ১২তম মাসের নাম ‘জিলহজ্জ’ (Dhu Al-Hijjah), যার অর্থই হলো ‘হজ্জের মাস’। অর্থাৎ, এই মাসটি দিয়েই হজ্জের মৌসুম শুরু হয়।
হজ্জের চারটি মাস (হুরুম) কোনগুলো?
কুরআনে হজ্জের জন্য চার মাস সময় দেয়া হয়েছে এবং সেগুলো বর্ষপঞ্জিকায় ধারাবাহিকভাবে বা ক্রমানুসারে আসে সেই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
[৯:৫] অতঃপর যখন হুরুম (নিষিদ্ধ) মাসগুলো ‘ইনসালাখা’ হয়ে যাবে, তখন মুশরিকদের যেখানেই পাবে হত্যা করো।
‘ইনসালাখা’ শব্দের অর্থ হলো চামড়া বা খোসা ছাড়ানো, যা একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়াকে বোঝায়। অর্থাৎ, চামড়া বা খোসা যেমন একটানে উঠে আসে, সেরূপ হজ্জের ৪টি মাসও একটির পর একটি ধারাবাহিকভাবে আসে।
যেহেতু ‘জিলহজ্জ’ (ক্যালেন্ডারের ১২তম মাস) হলো হজ্জের প্রথম মাস এবং মাসগুলো ধারাবাহিক, সেহেতু হজ্জের ৪টি মাস হলো: জিলহজ্জ, মুহররম, সফর এবং রবিউল আউয়াল (আরবি ক্যালেন্ডারের ১২, ১, ২ এবং ৩ নম্বর মাস)।
রবিউল আউয়াল কেন ৪র্থ মাস: ‘রবি’ শব্দটি আরবি মূল ‘আরবা’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘চার’। কুরআনেও এই মূল শব্দটি ‘চার’ সংখ্যাটি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে (১৮:২২, ৫৮:৭)।
আরবি ক্যালেন্ডারে রবিউল আউয়াল (প্রথম রবি) ও রবিউস সানি (দ্বিতীয় রবি) নামে দুটি মাস রয়েছে। রবিউস সানি ক্যালেন্ডারের চতুর্থ মাস, সে হিসেবে এর নামে রবি থাকাটা ঠিক আছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো রবিউল আউয়াল ক্যালেন্ডারের তৃতীয় মাস হওয়া সত্ত্বেও এর নামে ‘রবি’ শব্দটি আছে, যেটি আবার জিলহজ্জ মাসের পর চতুর্থ মাস। এই ব্যাপারটিই প্রমাণ করে হজ্জের মাসগুলো হলো জিলহজ্জ থেকে রবিউল আউয়াল পর্যন্ত।
প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা
রমজান কি হজ্জের মাসগুলোর একটি: অনেকে মনে করেন রমজান হজ্জের মাসগুলোর একটি। কিন্তু কুরআন এই দাবি নাকচ করে দেয়:
- হজ্জের রোজা: যারা হজ্জে কুরবানী করতে পারে না, তাদের হজ্জের সময় ৩টি রোজা রাখতে হয় (২:১৯৬)। যদি হজ্জ রমজানে হতো, তবে মানুষ অলরেডি রোজা থাকতো, আলাদা করে ৩টি রোজা রাখার নির্দেশ অর্থহীন হয়ে যেত।
- oসহজ দ্বীন: আল্লাহ বলেন, তিনি দ্বীনের মধ্যে কষ্ট আরোপ করেননি (২২:৭৮)। রমজানের দীর্ঘ উপবাসের সাথে হজ্জের কঠোর পরিশ্রম যোগ করলে মুমিনদের জন্য তা অত্যন্ত কষ্টদায়ক হয়ে যেতো, যা আল্লাহর নীতির পরিপন্থী।
জিলহজ্জ কি হজ্জের শেষ মাস: অনেকে মনে করেন বছরের শেষ মাস বলেই জিলহজ্জ হলো হজ্জের শেষ মাস। কিন্তু জিলহজ্জ শব্দের অর্থই হলো হজ্জের মাস, যা স্বভাবতই এর সূচনাকে নির্দেশ করে। তাছাড়া ৯:২৮ আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বছর শেষ হওয়ার সাথে হজ্জ শেষ হওয়াকে মেলানো ঠিক নয়।