নূহ-এর প্লাবন কি বিশ্বব্যাপী হয়েছিলো না একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল?

অনেক মানুষের মধ্যে একটি সাধারণ বিশ্বাস প্রচলিত আছে যে, নূহের প্লাবন পুরো পৃথিবীজুড়ে হয়েছিল এবং পৃথিবীর প্রতিটি অংশ পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই ধারণাটি কি কোরআনের বক্তব্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ? নাকি এটি ইহুদি-খ্রিস্টানদের ধর্ম থেকে আসা একটি ভুল ধারণা? কোরআনের আলোকে নূহের মহাপ্লাবনের ঘটনাটি বিশ্লেষণ করা যাক:

এই বিতর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো আরবি শব্দ ‘আল-আরদ’ (الأرض)-এর অনুবাদ। নূহ তার অবাধ্য জাতির জন্য বদদোয়া করে বলেছিলেন:
“হে আমার পালনকর্তা! আপনি ‘আরদ’-এর (যমিনের) বুকে কোনো কাফিরকে অবশিষ্ট রাখবেন না।” (৭১:২৬)

প্রচলিত অনুবাদে অনেক সময় একে ‘পুরো পৃথিবী’ ধরা হয়। কিন্তু কোরআনের পরিভাষায় ‘আরদ’ শব্দটি সর্বদা পৃথিবী গ্রহ (Planet Earth) বোঝায় না, বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি নির্দিষ্ট ‘ভূখণ্ড’, ‘দেশ’ বা ‘জনপদ’ ইত্যাদি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।

  • দেশ অর্থে: ফেরাউনের সর্দাররা মূসার সম্পর্কে বলেছিল, “সে কি তোমাকে তোমাদের ‘আরদ’ (দেশ) থেকে বের করে দিতে চায়?” (৭:১১০)। এখানে ‘আরদ’ মানে নিশ্চই পুরো পৃথিবী নয়, বরং মিশরের ভূখণ্ড।
  • অঞ্চল অর্থে: রোমানরা পরাজিত হয়েছে, নিকটবর্তী ‘আরদ’-এ (অঞ্চলে/ভূখণ্ডে)।” (৩০:২-৩)
  • এলাকা অর্থে: ইউসুফের ভাইয়েরা বলেছিল, “তাকে হত্যা কর অথবা কোনো ‘আরদ’-এ (অজানা ভূখণ্ডে) ফেলে আসো।” (১২:৯)
  • জমি অর্থে: সূরা বাকারায় বলা হয়েছে, “এমন গাভী যা ‘আরদ’ (জমি) চাষ করায় অভ্যস্ত নয়।” (২:৭১)

অতএব বলা যায়, নূহ যখন কাফিরদের ধ্বংস চাইলেন, তখন তিনি ‘আরদ’ বলতে সেই নির্দিষ্ট জনপদকে বুঝিয়েছিলেন যেখানে তাঁর কওম বসবাস করত এবং যেখানে তিনি ৯৫০ বছর ধরে সঠিক পথের দাওয়াত দিয়েছিলেন।

কোরআনে আল্লাহর শাস্তির একটি চিরন্তন মূলনীতি (সুন্নাতুল্লাহ) ঘোষণা করা হয়েছে। সেটি হলো—সতর্ককারী ছাড়া কোনো শাস্তি নেই।

“আর আমি কোনো রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দেই না।” (১৭:১৫)

“আর আপনার পালনকর্তা জনপদগুলোকে ধ্বংস করেন না, যতক্ষণ না তার কেন্দ্রে রাসূল প্রেরণ করেন… এবং আমি জনপদসমূহকে ধ্বংস করি না যতক্ষণ না তার বাসিন্দারা জুলুম করে।” (২৮:৫৯)

নূহ নবী প্রেরিত হয়েছিলেন শুধুমাত্র তাঁর নিজ সম্প্রদায়ের কাছে (“ইন্না আরসালনা নূহান ইলা ক্বওমিহি” — ৭১:১)। সেই সময়ে পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তে যদি কোনো মানববসতি থেকেও থাকে, তবে তাদের কাছে নূহ-এর বাণী পৌঁছায়নি। যেই জাতি সতর্কবার্তাই পায়নি, তাদেরকে ডুবিয়ে মারা আল্লাহর ন্যায়বিচার-এর সম্পূর্ণ পরিপন্থী। সুতরাং, প্লাবনটি কেবল সেই ভৌগোলিক সীমানাতেই হয়েছিল যেখানে নূহ-এর সতর্কবাণী পৌঁছেছিল।

প্লাবনটি যে হিমালয় বা এভারেস্টের মতো উঁচু পাহাড় ডুবিয়ে পুরো বিশ্বকে গ্রাস করেছিল—এই ধারণাটি মূলত বাইবেলের ‘বুক অফ জেনেসিস’ থেকে এসেছে।
“জলরাশি ভূপৃষ্ঠে অত্যন্ত প্রবল হলো এবং আকাশের নিচের সমস্ত উঁচু পাহাড় ঢেকে গেল… জল পাহাড়ের চূড়া থেকে পনেরো হাত উপরে উঠল।” (Genesis 7:19-20)

কোরআনের বার্তা:
কোরআনকে আল্লাহ পূর্ববর্তী কিতাবের সত্যায়নকারী ও তদারককারী বানিয়েছেন (৫:৪৮)। বাইবেলে বর্ণিত ‘বৈশ্বিক’ প্লাবনের ধারণাটি কোরআন সমর্থন করেনি।
“আর নূহের সম্প্রদায় যখন রাসূলদের প্রতি মিথ্যারোপ করল তখন আমি তাদেরকে নিমজ্জিত করলাম…” (২৫:৩৭)

লক্ষ্য করুন, কোরআন এখানে ‘সমগ্র মানবজাতি’ বলেনি, বলেছে ‘ক্বওমে নূহ’ বা নূহের সম্প্রদায়। বাইবেলের বর্ণনায় যে মিথোলজিক্যাল অতিরঞ্জন ছিল, কোরআন তা বাদ দিয়ে ঘটনাটিকে তার ঐতিহাসিক ও যৌক্তিক সীমানায় ফিরিয়ে এনেছে।

[১১:৪২] আর তা পাহাড়সম ঢেউয়ের মধ্যে তাদেরকে নিয়ে চলতে লাগল এবং নূহ তার পুত্রকে ডাক দিল, আর সে ছিল আলাদা স্থানে- ‘হে আমার পুত্র, আমাদের সাথে আরোহণ কর এবং কাফিরদের সাথে থেকো না’।

[১১:৪৩] সে (পুত্র) বলল, ‘অচিরেই আমি একটি পাহাড়ে আশ্রয় নেব, যা আমাকে পানি থেকে রক্ষা করবে’। সে (নূহ) বলল, ‘যার প্রতি আল্লাহ দয়া করেছেন সে ছাড়া আজ আল্লাহর আদেশ থেকে কোন রক্ষাকারী নেই’। এরপর তাদের উভয়ের মধ্যে ঢেউ অন্তরায় হয়ে গেল। অতঃপর সে নিমজ্জিতদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।

ছেলেটি চোখের সামনে বিশাল ঢেউ দেখছিল, কিন্তু তবুও সে মনে করেছিল পাহাড়ের চূড়ায় উঠলে সে বেঁচে যাবে। যদি বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী পানি পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গগুলোও ডুবিয়ে দিত, তবে ছেলের পাহাড়ে আশ্রয় নেওয়ার কথা ভাবাই ছিল অবান্তর।

কোরআনে বলা হয়েছে, “ঢেউগুলো ছিল পাহাড়ের মতো” (১১:৪২)। এটি নির্দেশ করে যে, এটি ছিল একটি প্রলয়ংকরী জলোচ্ছ্বাস বা ফ্ল্যাশ ফ্লাড, যা উপত্যকা ভাসিয়ে পাহাড়ের নির্দিষ্ট উচ্চতা পর্যন্ত উঠেছিল, কিন্তু পৃথিবীর সমস্ত পর্বত ডুবিয়ে দেয়নি।

বন্যা শুরু হওয়ার আগে প্রাণীদেরকে নৌকায় তুলে নেওয়ার জন্য নূহকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল ।

“তাতে (নৌকায়) তুলে নাও প্রত্যেক প্রকারের এক এক জোড়া…” (১১:৪০)

এখানে ব্যবহৃত ‘মিন কুল্লিন’ (প্রত্যেক/সব) শব্দটি নিয়ে অনেকে বিভ্রান্ত হন। তারা ভাবেন এর দ্বারা পৃথিবীর প্রতিটি প্রজাতিকে বোঝানো হয়েছে। কিন্তু কোরআনের ভাষায় ‘কুল’ শব্দটি সব সময় ‘সার্বজনীন সব’ বোঝায় না, বরং ‘প্রাসঙ্গিক সব’ বোঝায়

সাবার রানী সম্পর্কে কোরআন বলছে: “তাকে সবকিছু (কুল্লি শাই’ইন) দেওয়া হয়েছিল।” (২৭:২৩)

এর মানে কি রানীর কাছে আইফোন, মহাকাশ যান বা আণবিক বোমা ছিল?—না। এর মানে হলো, একজন রানীর রাজত্ব চালানোর জন্য যা যা প্রয়োজন তার ‘সবকিছু’ তার কাছে ছিল।

একইভাবে, নূহ-এর ঘটনার ক্ষেত্রে ‘প্রত্যেক জোড়া’ মানে হলো—সেই নির্দিষ্ট অঞ্চলের ‘গবাদি পশু’ এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য যে প্রজাতিগুলো প্রয়োজন সেগুলোর জোড়া, যাতে পানি নেমে যাওয়ার পর নূহ-এর অনুসারীরা পুনরায় জীবনযাত্রা শুরু করতে পারেন।

আরেকটি প্রচলিত ধারণা হলো, নূহের প্লাবনের পর পৃথিবীর সব মানুষ মারা গিয়েছিল, তাই আমরা সবাই নূহের বংশধর। কুরআনে আল্লাহ বনী ইসরাঈল জাতিকে নূহ ও তার সঙ্গীদের বংশধর হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

“তাদের বংশধর! যাদেরকে আমি নূহের সাথে (নৌকায়) বহন করেছিলাম।” (১৭:৩)

এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, নূহ একা ছিলেন না, তাঁর সাথে বিশ্বাসী একটি দলও ছিল। প্লাবনের পর সেই অঞ্চলে যারা বেঁচে ছিলেন, তাদের মাধ্যমেই পরবর্তীতে সেখানে সভ্যতার বিস্তার ঘটে। এবং পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে যদি মানুষ বেঁচে থাকে তাদেরও বংশবিস্তার হয়েছে। সুতরাং নূহ মানবজাতির দ্বিতীয় পিতা নন।

কোরআনের আয়াতগুলোর সামগ্রিক আলোচনার ভিত্তিতে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে: নূহ-এর প্লাবন বৈশ্বিক ছিল না, বরং তা নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। এবং এটি কেবল নূহ-এর অবাধ্য কওমকে ধ্বংস করার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি শাস্তি ছিল।