রমজান মাসে রোজা রাখা আল্লাহ আমাদের জন্য ফরজ করেছেন। কিন্তু কুরআনের কিছু আয়াত পড়ে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে: রোজা কি পুরো মাসই রাখতে হবে, নাকি কয়েকটি দিন রাখলেই যথেষ্ট? বিশেষ করে সূরা আল-বাকারার ১৮৪ নম্বর আয়াতে “আইয়ামান মা’দূদাত” বা “নির্দিষ্ট কয়েকটি দিন” কথাটি বলা হয়েছে—এতে কি প্রমাণিত হয় যে পুরো মাসের পরিবর্তে অল্প কিছু দিন রোজা রাখলেই চলবে?
আসুন, আমরা ব্যাপারটি কুরআন পর্যালোচনা করেই জেনে নিই।
প্রথমে আয়াতগুলো দেখা যাক
সূরা আল-বাকারায় আল্লাহ বলেন:
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করো।” (২:১৮৩)
“নির্দিষ্ট কয়েকটি দিনের জন্য (আইয়ামান মা’দূদাত)। তবে তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ হবে অথবা সফরে থাকবে, সে অন্য দিন থেকে ঐ সংখ্যা পূরণ করবে। আর যারা সামর্থ্য রাখে না, তাদের উপর ফিদয়া—একজন মিসকীনকে খাওয়ানো। যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় ভালো কাজ করবে, তা তার জন্য উত্তম। আর রোজা রাখাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।” (২:১৮৪)
এখানে যেহেতু “নির্দিষ্ট কয়েকটি দিন” বলা হয়েছে, তাই কেউ কেউ ভাবেন, এর মানে হয়তো কয়েকটা দিন রোজা রাখলেই হবে। সত্যিই কি তাই?
একটি সাধারণ উদাহরণ দিয়ে বোঝা যাক
একজন মানুষ তার স্ত্রীর সঙ্গে ৩০ বছর সুখে কাটিয়েছেন। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি বন্ধুকে বললেন, “আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলো আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে কাটিয়েছি।”
এখানে তিনি “দিনগুলো” বলতে ৩০ বছরের কথা বুঝিয়েছেন। কেউ কি বলবে যে তারা কেবল কয়েকটা দিন একসঙ্গে ছিলেন? অবশ্যই না। বড় সময়কে তার ছোট ইউনিট দিয়ে বর্ণনা করা খুবই স্বাভাবিক। একটি সপ্তাহকে আমরা “কয়েকটা দিন” বলতে পারি, একটি মাসকেও “কয়েকটা দিন” বলা যায়, এমনকি একটি বছরকেও।
কুরআনের আরেকটি উদাহরণ
ব্যাপারটি আরও স্পষ্ট হয় যখন আমরা দেখি কুরআন নিজেই অনন্তকালকে “দিন” বলে উল্লেখ করেছে:
“শান্তিতে প্রবেশ করো এতে; এটি অনন্তকালের দিন।” (৫০:৩৪)
অনন্তকাল তো একটি দিনের চেয়ে অনেক অনেক বড়! তবুও আল্লাহ একে “দিন” বলেছেন। ঠিক তেমনি রমজান মাস (২৯ বা ৩০ দিন)-কে “নির্দিষ্ট কয়েকটি দিন” বলা হয়েছে, কারণ মাস তো দিন দিয়েই গঠিত।
সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ: আয়াত ২:১৮৫
“রমজান মাস—যে মাসে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে মানুষের হিদায়াতের জন্য এবং হিদায়াতের স্পষ্ট প্রমাণ ও সত্য-মিথ্যার মানদণ্ডস্বরূপ। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে এই মাস পাবে, সে যেন এটি সাওম করে (ফালইয়াসুমহু)। আর যে অসুস্থ অথবা সফরে থাকবে, সে অন্য দিন থেকে ঐ সংখ্যা পূরণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ চান, কঠিন চান না—যাতে তোমরা সংখ্যা পূরণ করো এবং আল্লাহ তোমাদের হিদায়াত দান করেছেন বলে তাঁর মহিমা কীর্তন করো এবং যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।” (২:১৮৫)
এখানে আরবি শব্দ “ফালইয়াসুমহু” খুব গুরুত্বপূর্ণ।
- ফাল = সুতরাং
- ইয়াসুম = সাওম করবে/রোজা রাখবে
- হু = এটি
“হু” শব্দটি সরাসরি তার আগে উল্লেখিত “রমজান মাস”-কে নির্দেশ করে। অর্থাৎ, “সে যেন এটি (সম্পূর্ণ মাস) রোজা রাখে।” যদি শুধু মাসের কিছু দিন রোজা রাখার কথা হতো, তাহলে বলা হতো “ফিহি” (তার মধ্যে) সাওম করে। কিন্তু কুরআনে বলা হয়েছে “হু”—যেটি পুরো মাসকেই নির্দেশ করে। মাসের অল্প কয়েকটা দিন রোজা রাখলে কখনোই বলা যায় না যে “মাসটি সাওম করা হয়েছে।”
উপসংহার
কুরআনের এই আয়াতগুলো একত্রে পড়লে স্পষ্ট হয়ে যায় যে রমজান মাস পেলে আমাদের পুরো মাস রোজা রাখতে হবে। “নির্দিষ্ট কয়েকটি দিন” বলতে রমজানের পূর্ণ দিনগুলোই বোঝানো হয়েছে। অসুস্থতা বা সফরের কারণে যদি কোনো দিন রোজা ছুটে যায়, তাহলে পরবর্তীতে তা পূরণ করে নিতে হবে।