(মূল লেখা – এদিপ ইউকসেল)
ইসলাম বিরোধী, নাস্তিক এবং খ্রিস্টান মিশনারিদের খুব কমন একটি অভিযোগ হলো, “কুরআনের ৪:৩৪ আয়াতে স্ত্রীদেরকে মারধর করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে; সুতরাং ইসলাম একটি পুরুষতান্ত্রিক ও নারীবিদ্বেষী ধর্ম।”
ব্যক্তিগতভাবে, আমি যখনই এই আয়াতটি পড়তাম, আমার বিবেকে বাধত। আমি ভাবতাম, পরম প্রজ্ঞাময় আল্লাহ কীভাবে আমাদের নারীদের গায়ে হাত তোলার নির্দেশ দিতে পারেন? যখন আল্লাহ কুরআনের অন্য আয়াতে (৩০:২১) বলেন যে, তিনি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ‘ভালোবাসা ও দয়া’ (Love and Mercy) সৃষ্টি করেছেন যাতে তারা একে অপরের নিকট প্রশান্তি পায়।
[৩০:২১] “তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতে সৃষ্টি করেছেন সঙ্গিনীদের, যাতে তোমরা তাদের নিকট প্রশান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন…”
স্পষ্টতই, এই পরস্পরবিরোধী বার্তাটি কুরআনের অনুবাদকদেরকেও বিভ্রান্ত করেছে। এজন্যই দেখা যায় অনেক অনুবাদক ৪:৩৪ আয়াতে ‘প্রহার’ শব্দের পর ব্র্যাকেটে ‘(মৃদু)’ বা ‘(lightly)’ শব্দটি যোগ করেছেন।
কিন্তু এভাবে জোড়াতালি দিয়ে সমস্যাটির সঠিক সমাধান হয় না।
১. ‘দারাবা’: আরবি ভাষার বহুমাত্রিক শব্দ
অধিকাংশ অনুবাদক ৪:৩৪ আয়াতে সবচেয়ে বড় ভুলটি করেছেন “ফাদরিবুহুন্না” শব্দটিতে। এর প্রচলিত অনুবাদ করা হয়—“তাদেরকে প্রহার কর”।
শব্দটি এসেছে “দারাবা” মূল থেকে। আপনি যদি কোনো আরবি অভিধান খুলে দেখেন, তবে দেখবেন ‘দারাবা’ শব্দের অর্থের তালিকাটি অনেক লম্বা। বলা চলে, আরবি ভাষায় ‘দারাবা’ শব্দটি সর্বাধিক ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বহন করে।
কুরআনের ভেতরেই এই শব্দটি অনেকগুলো অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে:
১. ভ্রমণ করা বা বের হওয়া (To travel/get out):
– ৩:১৫৬, ৪:১০১, ৩৮:৪৪, ৭৩:২০, ২:২৭৩
২. আঘাত করা (শারীরিক) (To strike):
– ২:৬০, ৭৩; ৭:১৬০; ৮:১২; ২০:৭৭; ২৪:৩১; ২৬:৬৩; ৩৭:৯৩; ৪৭:৪
৩. প্রহার করা (To beat):
– ৮:৫০, ৪৭:২৭।
৪. স্থাপন করা (To set up):
– ৪৩:৫৮, ৫৭:১৩
৫. উপমা বা দৃষ্টান্ত দেওয়া (To give examples):
– ১৪:২৪, ৪৫; ১৬:৭৫, ৭৬, ১১২; ১৮:৩২, ৪৫; ২৪:৩৫; ৩০:২৮, ৫৮; ৩৬:৭৮; ৩৯:২৭, ২৯; ৪৩:১৭; ৫৯:২১; ৬৬:১০, ১১।
৬. সরিয়ে নেওয়া বা উপেক্ষা করা (To take away/ignore):
– ৪৩:৫।
৭. নিন্দা করা (To condemn):
– ২:৬১।
৮. সিলগালা করা বা আবৃত করা (To seal/draw over):
– ১৮:১১।
৯. ঢেকে রাখা (To cover):
– ২৪:৩১।
১০. ব্যাখ্যা করা বা বর্ণনা করা (To explain):
– ১৩:১৭।
কুরআনের বাইরেও এই শব্দের আরও কিছু অর্থ আছে, যেমন: টাকা ছাপানো, সংখ্যা গুণ করা, কাজ থামিয়ে দেয়া — ইত্যাদি ক্ষেত্রেও ক্রিয়া হিসেবে ‘দারাবা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, কীভাবে একটি শব্দের এতগুলো অর্থ হতে পারে?
আপনারা ইংরেজি ভাষায় স্ট্রাইক (Strike) শব্দটির বিভিন্ন অনুবাদ দেখুন।
ওয়েবস্টার ডিকশনারি (Webster’s Dictionary) অনুযায়ী, ইংরেজি “Strike” শব্দটির অন্তত ১৪টি ভিন্ন অর্থ রয়েছে। যেমন:
- আঘাত করা, কোনো কিছুর সঙ্গে জোরে লাগানো (hit / strike against)
- আগুন জ্বালানো, প্রজ্বলিত করা (ignite)
- (সাপের ক্ষেত্রে) কামড়ানো (bite – of a snake)
- (গাছের ক্ষেত্রে) শিকড় ধরা বা শিকড় গজানো ((cause to) take root – of plants)
- আক্রমণ করা (attack)
- (মাছ) বড়শিতে আটকানো (hook – fish)
- (ঘড়ির ঘণ্টা ইত্যাদি) সময় জানানোর জন্য শব্দ করা (sound time – bell/clock)
- প্রভাবিত করা (affect)
- পৌঁছানো, এসে পড়া (arrive at / come upon)
- মনে উদয় হওয়া, মনে প্রবেশ করা (enter the mind of)
- আবিষ্কার করা (সোনা, তেল ইত্যাদি) (discover – gold, oil, etc.)
- খুলে ফেলা, অপসারণ করা (dismantle / remove)
- মুদ্রা তৈরি করা (make / mint a coin)
- দাবি আদায়ের উদ্দেশ্যে কাজ বন্ধ করা, ধর্মঘট করা (cease work as protest / go on strike)
একই শব্দ “Strike”-এর অর্থ যেমন ‘কাউকে আঘাত করা’ হতে পারে, ঠিক তেমনই এর অর্থ ‘কাজ বন্ধ করে দেওয়া’ বা ‘নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া’ও হতে পারে।
একইভাবে ইংরেজি “Beat” শব্দটিরও অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন অর্থ আছে। ওয়েবস্টার ডিকশনারি অনুযায়ী, “Beat” শব্দটির অন্তত ৮টি অর্থ রয়েছে। যেমন:
- বারবার আঘাত করা (strike repeatedly)
- পরাজিত বা পরাস্ত করা (overcome)
- ছাড়িয়ে যাওয়া বা অতিক্রম করা (surpass)
- সজোরে নাড়ানো বা ফেটানো (stir vigorously with striking action)
- (পাখির ক্ষেত্রে) ডানা ঝাপটানো (flap – wings)
- হাঁটার মাধ্যমে পথ তৈরি করা (make, wear – path)
- স্পন্দিত হওয়া বা ধুকপুক করা (throb)
- বাতাসের প্রতিকূলে পাল তোলা বা অগ্রসর হওয়া (sail against wind)
সবচেয়ে মজার উদাহরণ হলো, ইংরেজিতে যখন আমরা রাগের মাথায় কাউকে বলি—”Beat it”, তখন আমরা আসলে কী বোঝাই? আমরা কি তাকে বলি, “নিজেকে প্রহার কর”? অবশ্যই না! এর অর্থ হলো—”দূর হও” বা “বেরিয়ে যাও” (Get out)।
আরবিতেও ঠিক তাই। যখন ৪:৩৪ আয়াতে স্বামীদের বলা হচ্ছে “ইদরিবু” (দারাবা থেকে), তখন এর অর্থ ‘প্রহার করা’ না হয়ে “তাদেরকে আলাদা করে দাও” বা “তাদেরকে বের করে দাও” (Strike them out / Get out) হওয়াই যুক্তিসংগত।
২. সঠিক অর্থ কোনটি আমরা কীভাবে বুঝব?
বহু-অর্থবোধক শব্দগুলোর ক্ষেত্রে সঠিক অর্থটি বেছে নিতে হয় প্রসঙ্গ (Context) এবং কমন সেন্স কাজে লাগিয়ে। ভুল অর্থ বেছে নিলে কুরআনের বাণী হাস্যকর হয়ে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, নীচের আয়াতই লক্ষ্য করুন:
[১৩:১৭] “আল্লাহ এভাবেই সত্য ও মিথ্যার ‘দারাবা’ করেন।”
এখানে যদি আমরা ‘দারাবা’র অর্থ ‘মারধর’ ধরি, তবে আয়াতটির অনুবাদ দাঁড়াবে: “আল্লাহ সত্য ও মিথ্যাকে প্রহার করেন”—যা সম্পূর্ণ অবাস্তব।
সঠিক অনুবাদ হলো: “আল্লাহ সত্য ও মিথ্যার দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেন।”
৩. (৪:৩৪) আয়াতের ব্যাখ্যা
এখন আমরা (৪:৩৪) আয়াতে ফিরে আসি। এই আয়াতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো “নুশুয”। প্রচলিত অনুবাদে এর অর্থ “অবাধ্যতা” করা হয়।
কিন্তু আয়াতের শুরুতে আমরা দেখতে পাই আল্লাহ বলেছেন: “পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে হিফাযাতকারিনী”—এই কথাটি নারীদের সতীত্ব ও বৈবাহিক বিশ্বস্ততার দিকে ইঙ্গিত দেয়।
সুতরাং, “নুশুয” মানে সাধারণ অবাধ্যতা নয় (যেমন রান্না না করা বা দেরি করা ইত্যাদি), বরং এর অর্থ হলো—অবিশ্বস্ততা, ফ্লার্ট করা বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের দিকে ঝুঁকে পড়া (Marital Disloyalty)।
প্রমাণ হিসেবে ৪:১২৮ আয়াতের কথা বলা যায়, যেখানে স্বামীদের “নুশুয”-এর কথা বলা হয়েছে। সেখানে সাধারণত এর অর্থ করা হয় ‘উপেক্ষা করা’—স্বামীদের বেলায় তারা “নুশুয” এর অর্থ ‘অবাধ্যতা’ করেনি!
কিন্তু “নুশুয” এর অর্থ যদি আমরা “অবিশ্বস্ততা” বা “Disloyalty” করি, তাহলে তা স্বামী-স্ত্রী উভয়ের ক্ষেত্রেই খাটে।
৪. একটি যৌক্তিক ও কুরআনিক সমাধান
যখন একজন স্ত্রীর মধ্যে অবিশ্বস্ততার বা পরকীয়ার লক্ষণ (Nushuz) দেখা যায়, তখন আল্লাহ স্বামীদেরকে ধাপে ধাপে এই সমস্যা সমাধানের নির্দেশ দিয়েছেন:
১. উপদেশ দাও: প্রথমে তাকে বুঝিয়ে বলো।
২. শয্যা ত্যাগ কর: যদি সে না শোনে, তবে বিছানা আলাদা করে দাও। এটি একটি মানসিক চাপ এবং সতর্কবার্তা।
৩. আলাদা করে দাও (Strike them out): যদি সে এরপরও অনৈতিকতা চালিয়ে যায়, তবে তাকে ঘর থেকে বের করে দাও বা তোমরা আলাদা হয়ে যাও (Separation)।
কেন এই অর্থটি যৌক্তিক?
একজন নারী যদি পরকীয়ায় লিপ্ত হয়, তাকে মারধর করলে কি ভালোবাসা ফিরে আসবে? নাকি পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে?
বরং তাকে আলাদা করে দিলে (Separation) সে তার ভুল বুঝতে পারে, অথবা এটি বিচ্ছেদের (Divorce) পূর্বপ্রস্তুতি হতে পারে। এটিই যৌক্তিক এবং কুরআনিক সমাধান।
৫. ৪:৩৪ আয়াতের শুদ্ধতর অনুবাদ
[৪:৩৪] “পুরুষরা নারীদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দায়িত্বশীল—এ কারণে যে আল্লাহ তাদের মধ্যে কতককে কতকের ওপর যোগত্যা দিয়েছেন এবং এ কারণে যে তারা (পুরুষরা) নিজেদের সম্পদ হতে ব্যয় করে। সৎ নারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এতে সম্মত থাকে এবং লোকচক্ষুর অন্তরালেও আল্লাহ যা রক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছেন, তা রক্ষা করে। আর যেসব নারীর কাছ থেকে তোমরা ‘নুশুয’ (অবিশ্বস্ততার) আশঙ্কা কর, প্রথমে তাদেরকে উপদেশ দাও; তারপর শয্যায় তাদের থেকে দূরে থাকো; তারপর (প্রয়োজন হলে) তাদেরকে আলাদা করে দাও (strike them out)। অতঃপর যদি তারা তোমাদের কথা মেনে নেয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে আর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বোচ্চ, মহান।“
উপসংহার
- আল্লাহ স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে ‘ভালোবাসা ও দয়া’ (Mawaddah & Rahmah) নির্ধারণ করেছেন (৩০:২১)। স্ত্রীকে আঘাত করা কখনোই দয়ার বহিঃপ্রকাশ হতে পারে না।
- সূরা নিসার ১৯ নং আয়াতে পুরুষদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে স্ত্রীদের সাথে “ভদ্রভাবে” (bil-ma’ruf) জীবনযাপন করতে। স্ত্রীকে প্রহার করা কোনো ভদ্র আচরণের সংজ্ঞায় পড়ে না।
- কিছু কিছু আলেম দাবি করে যে, স্ত্রী যদি ব্যভিচার করে তবেই তাকে প্রহার করা যাবে। কিন্তু এই ব্যাখ্যা কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক। কুরআনে ব্যভিচারের শাস্তি নির্দিষ্ট করা আছে (১০০ বেত্রাঘাত – সূরা নূর ২৪:২)। যদি স্বামী তাকে ঘরে মারধর করে, আবার প্রশাসন তাকে ১০০ বেত্রাঘাত করে, তবে একই অপরাধে সে দুইবার শাস্তি পাবে – যা কখনোই ন্যায়বিচার হতে পারে না।
কুরআনের ভাষাগত বিশ্লেষণ, শব্দের সঠিক প্রয়োগ এবং ইসলামের সামগ্রিক উদারতা শিক্ষা এটাই ইঙ্গিত করে যে— কুরআন স্ত্রীদের প্রহার করার নির্দেশ দেয়নি। বরং, দাম্পত্য কলহের চূড়ান্ত পর্যায়ে ‘আলাদা হয়ে যাওয়া’ বা ‘বিচ্ছেদ’ই হলো সঠিক সমাধান।