কুরআন কি বাল্যবিবাহের বৈধতা দেয়?

বর্তমান বিশ্বে ইসলাম সম্পর্কে মানুষের মধ্যে যেসব ভুল ধারণা প্রচলিত আছে তার মধ্যে একটি হলো—কুরআন নাকি বাল্যবিবাহের অনুমতি দেয়। এবং এই কারণে অনেক অমুসলিম ইসলামকে একটি মধ্যযুগীয়, নিপীড়নমূলক ও অযৌক্তিক ধর্ম হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, কুরআন সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে অনেক মুসলিমও এই ভুল ধারণাকে সত্য বলে বিশ্বাস করেন এবং এর পক্ষে সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করেন।

আমাদেরকে একটি জিনিস মাথায় রাখতে হবে যে, ইসলামের একমাত্র, সম্পূর্ণ ও বিস্তারিত উৎস হলো পবিত্র কুরআন (৬:১৪১-১৪২)। কুরআনকে বলা হয়েছে ‘ফুরকান’ বা ‘সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের চূড়ান্ত মানদণ্ড’ (২৫:১)। যদি কোনো মানুষের ব্যক্তিগত মতামত, প্রচলিত রীতি বা হাদিস কুরআনের শিক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তবে তা অবশ্যই বর্জনীয়। কুরআন আমাদেরকে নিজস্ব চিন্তাশক্তি ও স্বাধীন বিচারবোধ ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, হাদিস ও আলেমদের অন্ধ অনুসরণের কারণে ইসলামের সুন্দর ও পবিত্র রূপটি আজ কলঙ্কিত হয়ে গিয়েছে।

এবার মূল প্রশ্নে আসা যাক: কুরআন কি আসলে বাল্যবিবাহের বৈধতা দেয়?

এর উত্তর হলো—না, একেবারেই না। বরং কুরআন স্পষ্টভাবে বাল্যবিবাহের বিরোধিতা করে।

আসুন, কুরআনের আলোকে আমরা বিষয়টি বিশ্লেষণ করে দেখি।

কুরআন বিয়ের বয়সকে সরাসরি একজন মানুষের ‘মানসিক পরিপক্কতা’ বা ‘সঠিক বিচারবোধ’-এর সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। এই বিষয়ে সবচেয়ে স্পষ্ট আয়াতটি হলো:

[৪:৬] আর তোমরা এতিমদের পরীক্ষা করতে থাকো, যতক্ষণ না তারা বিয়ের বয়সে (বালাগুন নিকাহ) পৌঁছায়। অতঃপর যদি তোমরা তাদের মধ্যে সঠিক বিচারবুদ্ধি (রুশদ) দেখতে পাও, তবে তাদের সম্পদ তাদের কাছে হস্তান্তর করো।

এই আয়াতে কুরআন বিয়ের বয়স (বালাগুন নিকাহ) এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার মধ্যে চমৎকার একটি সমীকরণ স্থাপন করেছে। বিয়ের বয়স হলো জীবনের সেই পর্যায়, যখন একজন মানুষ নিজের ভালো-মন্দ বোঝার মতো পরিপক্কতা অর্জন করে এবং নিজের ধন-সম্পদ স্বাধীনভাবে পরিচালনা করার যোগ্যতা লাভ করে। এখন নিজেদের কাছেই প্রশ্ন করুন: ৯ বা ১২ বছরের একটি শিশুর মধ্যে কি সত্যিই নিজের সম্পত্তি বুঝে নেওয়ার মতো এবং সেগুলো যথাযথভাবে দেখভাল করার মতো পর্যাপ্ত বিচারবোধ থাকে? উত্তর হলো—না।

শৈশব ও কৈশোর হলো একটি শিশুর শিক্ষা গ্রহণ, অভিজ্ঞতা সঞ্চয় এবং নিজের ব্যক্তিত্ব বিকাশের সময়। বাল্যবিবাহ শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের এই পথকে বাধাগ্রস্ত করে। অপরিণত বয়সে তার কাঁধে সংসারের বিশাল দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া শুধু তার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যই ক্ষতিকর নয়, বরং একে এক প্রকার শিশু নির্যাতনও বলা যায়। কুরআন কখনোই এমন অন্যায়কে সমর্থন করে না।

কুরআনের দৃষ্টিতে বিবাহ কেবল একটি শারীরিক বা জৈবিক সম্পর্ক নয়; এর জন্য বিশ্বাসগত ও আদর্শিক মেলবন্ধন থাকাও জরুরি। সূরা বাকারায় আল্লাহ বলেন:

[২:২২১] আর তোমরা মুশরিক নারীদের বিয়ে করো না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে। একজন মুমিন দাসীও একজন মুশরিক নারীর চেয়ে উত্তম, যদিও সে তোমাদেরকে মুগ্ধ করে। আর তোমরা (তোমাদের নারীদের) মুশরিক পুরুষদের সাথে বিয়ে দিও না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে। একজন মুমিন দাসও একজন মুশরিক পুরুষের চেয়ে উত্তম, যদিও সে তোমাদেরকে মুগ্ধ করে।

এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, বিয়ের জন্য বর ও কনের মধ্যে ধর্মীয় বিশ্বাস এবং জীবনবোধের মিল থাকতে হবে। কিন্তু একটি ছোট্ট শিশুর মধ্যে কি ধর্মতত্ত্ব, বিশ্বাস বা সৃষ্টিকর্তা ইত্যাদি জটিল বিষয় সম্পর্কে পর্যাপ্ত ও স্বাধীন ধারণা থাকে? শিশুরা সাধারণত তাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে যা শোনে, তা-ই অন্ধভাবে বিশ্বাস করে।

কুরআন ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের জোর-জবরদস্তি সমর্থন করে না (২:২৫৬)। একটি শিশুর বেড়ে ওঠার সাথে সাথে স্বাধীনভাবে নিজ বিশ্বাস গঠনের অধিকার রয়েছে। বাল্যবিবাহ শিশুর এই স্বাধীন চিন্তা বিকাশ ও মতামত গঠনের অধিকার কেড়ে নেয়, যা পরবর্তীতে স্বামী-স্ত্রীর সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তিতে ফাটল ধরাতে পারে।

কুরআন বিয়েকে কোনো ছেলেখেলা বা শিশুসুলভ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেনি। কুরআনে বিবাহকে একটি ‘দৃঢ় অঙ্গীকার’ বা ‘কঠিন চুক্তি’ (Mithaqan Ghaliza) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে:

[৪:২১] আর তোমরা কীভাবে তা (প্রদত্ত মোহরানা) ফেরত নেবে, অথচ তোমরা একে অপরের সাথে একান্তে মিলিত হয়েছ এবং তারা তোমাদের কাছ থেকে নিয়েছিল সুদৃঢ় অঙ্গীকার (মিসাক্বান গালিযান)?

বিয়ে হলো দুজন প্রাপ্তবয়স্ক, স্বাধীন ও পরিপক্ক মানুষের মধ্যে আজীবনের জন্য দায়িত্বশীলতার একটি কঠিন চুক্তি। এই কঠিন চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার জন্য শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক—সব ধরনের পরিপক্কতা অর্জন করা অপরিহার্য। একটি শিশু কখনোই একটি চুক্তির আইনি বা সামাজিক তাৎপর্য বোঝার ক্ষমতা রাখে না। সুতরাং, একটি অপরিণত শিশুকে, যার এখনো জীবন ও বৈবাহিক সম্পর্কের ব্যাপারে পর্যাপ্ত ধারণা তৈরি হয়নি, তাকে এই ‘কঠিন অঙ্গীকার’-এর মধ্যে ঠেলে দেওয়া সরাসরি কুরআনের নির্দেশের লঙ্ঘন।

বিয়ের ক্ষেত্রে কুরআন নারীদের স্বাধীন ইচ্ছা এবং সম্মতির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেছে:

[৪:১৯] হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্য এটা বৈধ নয় যে, তোমরা জোরপূর্বক নারীদের উত্তরাধিকারী হবে। আর তোমরা তাদেরকে (অন্যত্র বিয়ে করতে) বাধা দিও না যাতে তোমরা তাদেরকে যা প্রদান করেছ তার কিছু অংশ নিয়ে নিতে পারো; যদি না তারা প্রকাশ্য অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়।

একটি নিরীহ শিশু কি নিজে থেকে বিবাহের মতো এত বড় একটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে?—কখনোই না। শিশুরা সাধারণত বাবা -মা বা সমাজের চাপে, ভয় বা প্রলোভনে প্রভাবিত হয়ে এমন পরিস্থিতির স্বীকার হয়। যেহেতু শিশুদের স্বাধীন ও পরিপক্ক সম্মতি দেওয়ার সক্ষমতা থাকে না, তাই বাল্যবিবাহ মূলত এক প্রকার ‘জোর-জবরদস্তিমূলক বিবাহ’। আর কুরআন এই ধরনের জোরপূর্বক বিবাহ ও নারীর ইচ্ছার অবমূল্যায়নকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছে।

অনেকসময় দেখা যায় হাদিসপন্থীরা তাদের অপর্যাপ্ত বুদ্ধিমত্তার কারণে সূরা তালাকের ৪ নম্বর আয়াতটি দেখিয়ে বাল্যবিবাহ জায়েজ করতে চায়। আয়াতটি হলো:

[৬৫:৪] তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যাদের আর ঋতুস্রাব হওয়ার আশা নেই, তাদের ব্যাপারে যদি তোমরা সংশয়ে থাকো, তবে তাদের ইদ্দত হবে তিন মাস; এবং তাদের ক্ষেত্রেও যাদের ঋতুস্রাব হয়নি। আর যারা গর্ভবতী, তাদের সময়সীমা হলো সন্তান প্রসব পর্যন্ত।

আয়াতটিতে আলোচনা হচ্ছে তালাকের পর একজন নারীর ইদ্দত বা বিরতিকাল পালন নিয়ে:

  • যাদের ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে গেছে কিন্তু মেনোপজ হয়েছে কিনা নিশ্চিত না তাদের জন্য ৩ মাস
  • যাদের ঋতুস্রাব হয়নি তাদের ক্ষেত্রেও ৩ মাস
  • গর্ভবতী হলে প্রসব পর্যন্ত

প্রথাগত অনুবাদক ও ব্যাখ্যাকারীরা প্রায়ই আয়াতটিতে ‘যাদের ঋতুস্রাব হয়নি’ অংশের আগে নিজেদের মনগড়া একটি শব্দ ‘এখনো’ (yet) যোগ করে দেন, যদিও কুরআনের মূল আরবি লিখায় ‘এখনো’ শব্দটির কোনো অস্তিত্ব নেই! তাদের দাবি হলো, এর দ্বারা নাবালিকা মেয়েদেরকে বোঝানো হয়েছে, যাদের ‘এখনো’ মাসিক শুরু হয়নি; অর্থাৎ, যেহেতু এই আয়াতে নাবালিকা মেয়েদের জন্য তালাকের পর ইদ্দত পালনের বিধান বর্ণিত হয়েছে, তার মানে কুরআনের দৃষ্টিতে বাল্যবিবাহ বৈধ!

তাদের দাবিটি খন্ডন করতে হলে আমাদেরকে আগে জানতে হবে ইদ্দত পালনের মূল উদ্দেশ্য কী:

[৩৩:৪৯] হে মুমিনগণ! যখন তোমরা মুমিনা নারীদের বিবাহ করো, অতঃপর তাদের স্পর্শ করার (সহবাসের) আগেই তালাক দাও, তবে তোমাদের জন্য তাদের ওপর কোনো ইদ্দত (বিরতিকাল) নেই যা তোমরা গণনা করবে।

এই আয়াত থেকে জানা যায় যে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে শারীরিক মিলন না হলে, তালাকের পর ইদ্দত পালন করতে হয় না। অর্থাৎ,ইদ্দত পালনের মূল উদ্দেশ্যই হলো নারীটি গর্ভবতী কিনা তা যাচাই করা।

আর এটা বলাই বাহুল্য যে, নাবালিকা শিশু, যাদের এখনো মাসিক শুরুই হয়নি, তাদেরতো গর্ভধারণেরই ক্ষমতা নেই। যদি, কুরআন অনুযায়ী তাদেরকে বিয়ে করা বৈধই হতো, তাহলে তালাকের পর তাদেরকেও ইদ্দত পালনের কোন নির্দেশ দেওয়া হতো না। সুতরাং, ৬৫:৪ আয়াতে যেসকল নারীকে ইদ্দত পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তারা সকলেই ছিলেন প্রাপ্তবয়স্ক, গর্ভধারণে সক্ষম, এবং তাদের সবারই বিয়ের পর স্বামীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে।

৬৫:৪ আয়াতটির আলোচনা শুরুই হয়েছে তালাকপ্রাপ্তা ‘প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের’ ইদ্দত পালনের নিয়ম নিয়ে: প্রথমে বলা হয়েছে তাদের কথা, বয়সজনিত কারণে যাদের মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে, তবে মেনোপজের ব্যাপারটি নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। এরপর বলা হয়েছে তাদের কথা, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া সত্ত্বেও যাদের শারীরিক বা হরমোনাল কোন কারণে কখনো মাসিক হয়নি (চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে ‘অ্যামেনোরিয়া’ / Amenorrhea বলা হয়)।

অর্থাৎ, যেসকল প্রাপ্তবয়স্ক (গর্ভধারণে সক্ষম) নারী অ্যামেনোরিয়াতে আক্রান্ত, যার ফলে তাদের মাসিক হয় না, তাদের কথাই এখানে বলা হচ্ছে। এখানে শিশুদের প্রসঙ্গ টেনে আনা একেবারেই অবান্তর। আয়াতটির পুরো প্রেক্ষাপট প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের বিবাহ-বিচ্ছেদ নিয়ে। এই আয়াতে বাল্যবিবাহের পক্ষে বিন্দুমাত্র কোনো ইঙ্গিত নেই।

কুরআনের আয়াতগুলো নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে চিন্তা-ভাবনা করলে এটি দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ইসলামে বাল্যবিবাহের কোনো স্থান নেই। এটি আল্লাহর অনুমোদিত কোনো বিধান নয়, বরং এটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ও মানুষের তৈরি কিছু ভুল ব্যাখ্যার ফসল।

একটি শিশুর শৈশব কেড়ে নিয়ে তাকে বিবাহ নামক কঠিন চুক্তিতে বাধ্য করা কুরআনের দৃষ্টিতে একটি গর্হিত অপরাধ। যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে এই ধরনের নিপীড়নমূলক প্রথাকে সমর্থন করে, তারা মূলত কুরআনের আলো থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে।