কুরআন-ভিত্তিক তালাকের পদ্ধতি

কুরআনে তালাককে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে সমঝোতার সর্বোচ্চ চেষ্টা করার উপদেশ দেওয়া হয়েছে।

কুরআনে তালাকের যে পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে তা একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া এবং এর অনেকগুলো ধাপ রয়েছে:

সমঝোতার সর্বোচ্চ চেষ্টা: স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে দুই পরিবার থেকে দু’জন ব্যক্তিকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিয়োগ করতে হবে, যাতে তারা দুজনের মধ্যে সমঝোতা করিয়ে দেয়। (সূরা আন-নিসা ৪:৩৫)

ইলা’ বা শপথের ক্ষেত্রে ৪ মাসের অপেক্ষা: স্বামী যদি শপথ করেন যে তিনি তার স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক করবেন না, তাহলে ৪ মাসের বিরতিকাল শুরু হয়। এই ৪ মাসের মধ্যে যদি স্বামী ও স্ত্রী মিলিত হয়ে যায় তাহলে তাদের বিবাহ-বন্ধন অটুট থাকবে এবং নতুন করে বিয়ের প্রয়োজন হবে না। আর যদি ৪ মাসেও সম্পর্ক ঠিক না হয় তাহলে ১ম তালাক কার্যকর হয়ে যাবে। (সূরা আল-বাকারা ২:২২৬-২২৭)

প্রথম তালাক (প্রত্যাহারযোগ্য): যদি সমঝোতার সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় তবে স্বামী প্রথম তালাক ঘোষণা করতে পারেন। এরপর স্ত্রীকে ইদ্দত পালন করতে হবে (সাধারণ অবস্থায় ৩ মাস, গর্ভবতী হলে প্রসব পর্যন্ত)। (সূরা আল-বাকারা ২:২২৮; সূরা আত-তালাক ৬৫:৪)

প্রথম ইদ্দতকাল:

  • এসময় স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া যাবে না, তার ভরণপোষণ দিতে হবে। (সূরা আত-তালাক ৬৫:১, ৬৫:৬)
  • স্বামী চাইলে ইদ্দতের ৩ মাসের মধ্যে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারেন (এই ক্ষেত্রে নতুন করে বিয়ের প্রয়োজন হবে না)। (সূরা আল-বাকারা ২:২২৮)
  • আর যদি ৩ মাসের মধ্যে ফিরিয়ে না নেন, তবে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়ে যাবে। অতঃপর স্ত্রী চাইলে অন্য কোথাও বিয়ে করতে পারেন। অথবা, তারা যদি নিজেরা পুনরায় একত্র হতে চান তবে তাদের নতুন করে বিয়ে করতে হবে। (সূরা আল-বাকারা ২:২৩২)
  • ইদ্দতের ৩ মাসের মধ্যে সমঝোতা হোক কিংবা সমঝোতা ছাড়াই ৩ মাস অতিবাহিত হয়ে যাক, উভয় ক্ষেত্রেই দুইজন ন্যায়পরায়ণ লোককে সাক্ষী রাখতে হবে। (সূরা আত-তালাক ৬৫:২)

দ্বিতীয় তালাক (প্রত্যাহারযোগ্য): দ্বিতীয়বার বিয়ে করার পর যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পুনরায় বিবাদ হয়, তাহলে স্বামী দ্বিতীয় তালাক ঘোষণা করতে পারেন। এক্ষেত্রেও স্ত্রীকে পুনরায় ৩ মাসের ইদ্দতকাল পালন করতে হবে।

দ্বিতীয় ইদ্দতকালে:

  • একই নিয়ম: স্ত্রীকে বাড়িতে রাখা, ভরণপোষণ দেয়া, ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ।
  • ইদ্দতের ৩ মাসের মধ্যে মিলন কিংবা মিলন ছাড়াই ৩ মাস অতিক্রম – যাই হোক, দুইজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে সাক্ষী রাখতে হবে। (সূরা আত-তালাক ৬৫:২)

দ্বিতীয় ইদ্দতের ৩ মাসের মধ্যে ফিরিয়ে না নিলে: বিবাহ স্থায়ীভাবে বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এটাই চূড়ান্ত বিবাহ-বিচ্ছেদ। আর ফিরে আসার সুযোগ থাকে না (তৃতীয় তালাক বলতে কিছু নেই)। তারা পুনরায় বিয়ে করতে চাইলে শর্ত থাকে স্ত্রীর অন্যত্র বিয়ে হতে হবে এবং সেখান থেকে তালাকপ্রাপ্তা হতে হবে। (সূরা আল-বাকারা ২:২২৯-২৩০)

বিশেষ নোট:

১. কুরআনে একসাথে তিন তালাকের কোনো বিধান নেই। তালাকের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় ধাপে ধাপে, ইদ্দতসহ এবং এরমধ্যে সমঝতার অনেক সুযোগ থাকে। রাগের মাথায় বা একসাথে একাধিক তালাক দেওয়া কুরআনসম্মত নয়। তালাকের পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে সাধারণত ৬-১০ মাস সময় লেগে যায়।

২. পুরুষদের যেরূপ তালাক দেওয়ার অধিকার আছে, নারীদেরও অনুরূপ তালাক দেওয়ার অধিকার আছে (২:২২৮)। স্ত্রী স্বামীকে তালাক দেওয়ার ক্ষেত্রে স্ত্রী চাইলে তার মোহরানার কিছু অংশ ফিরিয়ে দিতে পারেন (সূরা আল-বাকারা ২:২২৯)।

৩. কোনো নারী যদি তার স্বামীর থেকে দুর্ব্যবহার বা অবহেলার আশঙ্কা করেন তাহলে তিনি আইনানুগভাবে বিচ্ছেদের ব্যবস্থা নিতে পারেন (সূরা আন-নিসা ৪:১২৮)।

৪. কোনো নারীর স্বামী মারা গেলে তাকে ইদ্দত পালন করতে হবে ৪ মাস ১০ দিন। এই সময় অতিবাহিত হলে ঐ নারী পুনরায় বিয়ে করতে পারবেন (সূরা আল-বাকারা ২:২৩৪)।

৫. কুরআনে হিল্লা বিয়ে (বা হালালা) বলতে কোনো কিছু নেই। সাময়িক বিয়ে কুরআন সমর্থন করে না। বিচ্ছেদের নিয়তে বিয়ে করলে, কুরআন অনুযায়ী সেটি বিবাহ বলেই গণ্য হবে না। বিয়ে হতে হবে স্থায়ী বন্ধনের উদ্দেশ্যে (সূরা আন-নিসা ৪:২১)।