খতনার ব্যাপারে কুরআন কী বলে?

অধিকাংশ মুসলিম পরিবারে শিশু পুত্রের খতনা করানোকে বাধ্যবাধকতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু কখনো কি আমরা প্রশ্ন করি—এই রীতির ভিত্তি আসলে কোথায়? আল্লাহ কি তাঁর কুরআনে এর অনুমোদন দিয়েছেন? নাকি এটি কেবল পূর্বসূরীদের অন্ধ অনুকরণ?

সরাসরি বলা যায়, পবিত্র কুরআনের কোথাও খতনার নির্দেশ দেওয়া হয়নি, এরূপ একটি কথাও নেই যে মুসলিম পুরুষদের লিঙ্গের অগ্রচর্ম কেটে ফেলতে হবে। বরং কুরআনে আল্লাহ মানবদেহকে নিখুঁতভাবে সৃষ্টি করেছেন বলেই ঘোষণা দিয়েছেন।

আল্লাহ বলেন:
“যিনি সৃষ্ট প্রতিটি জিনিসকে সুন্দর ও উৎকৃষ্ট করেছেন…”—(৩২:৭)

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে:
“আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম গঠনে (তাকউইম)।”—(৯৫:৪)

এখানে আরবি শব্দ ‘তাকউইম’ ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ সুন্দর আকৃতি, পরিপূর্ণ কাঠামো। প্রশ্ন জাগে—আল্লাহ যদি মানুষকে সর্বোত্তম গঠনে সৃষ্টি করে থাকেন, তবে কেন তাঁর সৃষ্টিতে পরিবর্তন আনা হবে? কেন অগ্রচর্ম কেটে ফেলাকে ধর্মের অংশ মনে করা হবে?

কুরআনে বর্ণিত শয়তানের উক্তি:
“আমি অবশ্যই তাদের পথভ্রষ্ট করব, তাদের মধ্যে মিথ্যা আশা সৃষ্টি করব, তাদের আদেশ দেব যে তারা গবাদি পশুর কান ছিদ্র করবে এবং তারা আল্লাহর সৃষ্টিতে বিকৃতি ঘটাবে।”—(৪:১১৯)

এই আয়াত অনুযায়ী, আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন আনার অর্থ হলো শয়তানের অনুসরণ করা। খতনাকে যদি ধর্মীয় অনুষঙ্গ হিসেবে বাধ্যতামূলক করা হয়, তবে তা কি এই আয়াতের আওতায় পড়ে না?

অনেক মুসলিমের মধ্যে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে খতনা করা ইব্রাহিমের সুন্নত এবং এই প্রথা ইব্রাহিমের সময়কাল থেকেই চলে আসছে।

আমাদেরকে একটি কথা মনে রাখতে হবে যে কুরআনকে আল্লাহ পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের উপর সত্যায়নকারী বানিয়েছেন (৫:৪৮)। সুতরাং পূর্ববর্তী কিতাবের কোনো বর্ণনা কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক হলে বুঝে নিতে হবে সেটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসেনি।

“ঈশ্বর আব্রাহামকে বললেন: ‘তুমি আমার চুক্তি পালন করো, তুমি ও তোমার বংশধররা। প্রতিটি পুরুষ শিশুকে খতনা করতে হবে। আট দিন বয়সী প্রতিটি পুরুষ শিশুকে খতনা করা হবে… যে পুরুষ শিশুর খতনা করা হয়নি, সে তার সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন হবে; সে আমার চুক্তি ভঙ্গ করেছে।’”(জেনেসিস ১৭:৯-১৪)

কুরআনে আল্লাহ যেসব অঙ্গীকারের কথা বলেছেন, সেগুলো সবই ইবাদত ও নৈতিকতা কেন্দ্রিক। যেমন:
“হে আদম সন্তান! আমি কি তোমাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিইনি যে, তোমরা শয়তানের ইবাদত করবে না? নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।”—(৩৬:৬০)

এছাড়াও আল্লাহ বনী ইস্রাইলের কাছ থেকে যেসকল অঙ্গীকার নিয়েছিলেন সেগুলোর উল্লেখও কুরআনে আছে:
“আর যখন আমি বনী ইস্রাইলের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম যে, ‘তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত করবে না, পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে, আত্মীয়, এতিম ও মিসকিনদের সাথেও…’”—(২:৮৩)

লক্ষ্য করুন, কুরআনের সব অঙ্গীকারই তাওহিদ, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্বের সাথে সম্পর্কিত। দেহের কোনো অংশ কেটে ফেলতে হবে এমন কোনো অঙ্গীকারের অস্তিত্ব কুরআনে নেই।

জেনেসিসের বর্ণনায় বলা হচ্ছে, আট দিন বয়সী শিশু যদি খতনা না করা হয়, তবে সে চুক্তি ভঙ্গ করায় সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন হবে।—এটি অত্যন্ত অযৌক্তিক! একটি শিশু কীভাবে কোনো চুক্তি ভঙ্গের দায় বহন করবে? শিশুর তো স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো ক্ষমতা নেই। বাবা যদি খতনা না করান, তবে শিশুর কী দোষ? আল্লাহ তো পরম ন্যায়বিচারক ও দয়ালু। কুরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে:

“কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না”—(৬:১৬৪)

বাইবেলের অন্যত্রও অনুরূপ বর্ণনা আছে:
“প্রত্যেকে নিজ পরিশ্রম অনুযায়ী তার পুরস্কার পাবে।” (১ কোরিন্থিয়ান্স ৩:৮)

অতএব, একটি নিষ্পাপ শিশুকে ‘সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন’ করার ধারণা আল্লাহর ন্যায়বিচারের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এটি প্রমাণ করে যে জেনেসিসের সেই বর্ণনাটি আল্লাহর বাণী হতে পারে না; বরং এটি পরবর্তী সংযোজন।

অনেকে মনে করেন যে নবীর যুগ থেকেই মুসলিমরা খতনা করে আসছে। কিন্তু ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ইসলামের প্রাথমিক যুগেও এ বিষয়ে কোনো ঐক্যমত ছিল না। নিচে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বর্ণনা দেওয়া হলো:

১. নবীর খতনার ব্যাপারে সিরাত লেখকদের নীরবতা
নবীর প্রথম জীবনী লেখক ইবনে ইসহাক (মৃ. ৭৬১ খ্রি.) এবং তাঁর সম্পাদক ইবনে হিশাম (মৃ. ৮৩৩ খ্রি.) তাদের বিশাল গ্রন্থে নবীর খতনার ব্যাপারে কিছুই উল্লেখ করেননি। অথচ যুদ্ধক্ষেত্রে যোদ্ধাদের দ্বারা আবৃত্ত বিভিন্ন অসঙ্গত কবিতাও তারা তাদের গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন। এ থেকে বোঝা যায়, নবীর খতনা হয়েছিল কি না—সেটি সে সময় তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।

২. হাসান আল-বসরীর (মৃ. ৭২৮ খ্রি.) বক্তব্য
হাসান আল-বসরী বলেন: “মুহাম্মদ-এর যুগে বিভিন্ন জাতির অনেক লোক মুসলিম হয়েছিল। কেউ তাদের কাপড়ের নিচে তাকিয়ে দেখতো না যে তারা খতনা করেছে কি না।” (ইবনে কুদামা, আল-মুগনি, ১:৮৫)

৩. আহমাদ ইবনে হাম্বলের বর্ণনা
ইবনে হাম্বল তার ‘মুসনাদ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন: ‘উসমান ইবনে আবিল-আসকে একবার খতনার দাওয়াত দেওয়া হলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন: “মুহাম্মদ-এর যুগে আমরা খতনা করতাম না এবং আমাদের দাওয়াতও দেওয়া হতো না।”’ (ইবনে হাম্বল, আল-মুসনাদ, ৪:১২৭)

৪. খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজের নির্দেশ
ইতিহাসবিদ তাবারি (মৃ. ৯২৩ খ্রি.) বর্ণনা করেন: খারাসান অঞ্চলের শাসক সেনাপতি আল-জাররাহ খলিফার কাছে লিখলেন যে অনেক মানুষ কর ফাঁকি দিতে ইসলাম গ্রহণ করছে, তাই তাদের খতনা পরীক্ষা করা উচিত। খলিফা উত্তর দিলেন: “আল্লাহ মুহাম্মদকে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার জন্য পাঠিয়েছেন, তাদের খতনা করানোর জন্য নয়।” (সূত্র: তাবারি, তারিখ আল-রুসুল ওয়াল-মুলুক, ৩:৫৯২)

৫. মিসরের আল-আজহারের ঘটনা
আহমাদ আমিন (মৃ. ১৯৫৪) বর্ণনা করেন: একবার সুদানের একটি গোত্র ইসলাম গ্রহণ করতে চাইলে তাদের দলপ্রধান আল-আজহারে চিঠি পাঠিয়ে জানতে চান মুসলিম হতে হলে কী কী শর্ত পূরণ করতে হবে। আল-আজহার থেকে একটি তালিকা পাঠানো হয়, যেখানে খতনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তখন সেই গোত্র ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। (সূত্র: আহমাদ আমিন, যুহর আল-ইসলাম, ১৮৭ পৃষ্ঠা)

৬. ইমাম মাহমুদ শালতুতের মত
মিশরের প্রখ্যাত আলিম ইমাম মাহমুদ শালতুত (মৃ. ১৯৬৩) ইমাম শাওকানির (মৃ. ১৮৩৪) উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন: “পুরুষ ও নারীর খতনা সম্পর্কিত বর্ণনাগুলো স্পষ্ট বা বিশুদ্ধ নয়।” (সূত্র: শালতুত, আল-ফাতাওয়া, ৩৩১-৩২ পৃষ্ঠা)

উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটি পরিষ্কার হয় যে কুরআনে খতনার কোনো ভিত্তি নেই। বিভিন্ন প্রাথমিক ইসলামি সূত্রেও এটিকে ধর্মীয় কোনো বিধান হিসেবে বর্ণনা করা হয়নি। বরং দেখা যায়, অনেক সাহাবি ও তাবেয়ি এই প্রথা পালন করতেন না বা একে গুরুত্ব দিতেন না।

আমরা যদি পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুকরণ ছেড়ে কুরআনের নির্দেশনাকে প্রাধান্য দিই, তাহলে খতনাকে ধর্মের অংশ মনে করার কোনো কারণ নেই। এটি ব্যক্তির ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় হতে পারে—চিকিৎসাগত কারণে কেউ করাতে পারেন, আবার কেউ নাও করতে পারেন। কিন্তু একে আল্লাহর নির্দেশ বা ইসলামের অংশ হিসেবে প্রচার করা সম্পূর্ণ ভুল।